দ্বিতীয় দফায় রুদ্ররূপ

চার অঞ্চলে একসঙ্গে বন্যা

একের পর এক প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন জেলা * চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে বন্যার পানি ঢুকতে পারে ঢাকায়

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

দেশের চার অঞ্চলে একসঙ্গে বন্যা শুরু হয়েছে। দু’দিন ধরে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা চলছে। রোববার দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় শুরু হয়েছে এ বন্যা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশের দশটি নদ-নদীর পানি অন্তত ১৭ স্থানে বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ১১ জেলায় সৃষ্টি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি।

আজকে দুপুরের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্যাঞ্চলের আরও পাঁচটি নদীর পানি বিপদসীমার উপরে চলে যেতে পারে। এতে এ দু’অঞ্চলের আরও কয়েকটি জেলা বন্যা কবলিত হতে পারে।

বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ টিউবওয়েল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা দেখা দিয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হলেও করোনায় ভয়ে অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন না। দু’দফা বন্যায় মাঠ ও গোচারণ ভূমির ঘাস মরে যাওয়ায় গবাদিপশুর খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) রোববার এক বুলেটিনে বলেছে, বর্তমানে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নাটোর, সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনায় বন্যা চলছে। যুগান্তর ব্যুরো, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সুনামগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার : সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি রোববার কিছুটা কমলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। জেলা সদরের হাওরাঞ্চলসহ প্রতিটি উপজেলায় পানি বাড়ছে। ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমাসহ সবক’টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

রোববার বেলা ৩টায় সুরমার পানি শহরের ষোলোঘর পয়েন্টে ৩৯ সেমি.র উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সুনামগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিমি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ যুগান্তরকে বলেন, সুনামগঞ্জে দ্বিতীয় দফা বন্যা পারিস্থিতি মোকাবেলায় জেলার ১১টি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হাতে ৪০০ টন চাল ও ৮ লাখ নগদ টাকা রয়েছে। যা দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

ছাতকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন তিন লক্ষাধিক মানুষ। ছাতক-গোন্দিগঞ্জ-সিলেট, ছাতক-সুনামগঞ্জ, ছাতক-জাউয়া, ছাতক-দোয়ারা সড়কের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এখানে সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) : হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার আহমদাবাদ, দেওরগাছ, পাইকপাড়া, শানখলা ও সাটিয়াজুরী ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার আউশ ফসল ও আমনের বীজতলাসহ পানিতে এলাকার মানুষের চলাচলের প্রধান সড়ক প্লাবিত হয়েছে। ২ শতাধিক পরিবারের বসতঘর বন্যায় ডুবে গেছে।

কুড়িগ্রাম, চিলমারী ও নাগেশ্বরী : কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দেড় শতাধিক চর ও নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৬৫ হাজার মানুষ।

রোববার সন্ধ্যায় ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৬ সেমির উপর দিয়ে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়ায় ৩০ এবং চিলমারীতে ২০ সেমির ও তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২ সেমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২২ সেমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নিম্নাঞ্চলগুলোর প্রায় ৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে অষ্টমীরচর, চিলমারী ও নয়ারহাট ইউনিয়নে কিছু কিছু এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। নাগেশ্বরীতে পানি ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। দেখা দিয়েছে ফের বন্যা।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে শনিবার বেলা ৩টা থেকে রোববার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৯ সেমি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩০ সেমির উপর দিয়ে ও ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা জেলা শহর পয়েন্টে ৩১ সেমি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২ সেমি. উপর দিয়ে বইছে। অপরদিকে তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেমি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট হুমকির মুখে পড়েছে।

নাটোর ও সিংড়া : নাটোরে গত কয়েক দিন ধরে অতি বৃষ্টিপাতের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে নদ-নদীর পানি। এতে বিলের পানি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বর্তমানে আত্রাই নদীতে বিপদসীমার ২০ সেমি. উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নাটোর সিংড়া উপজেলার নদীর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিংড়ায় কৃষকের ২০ হেক্টর বীজতলা ও ৭০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এদিকে, সিংড়ার আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেমি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী তীরবর্তী জনগণের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

রংপুর ও কাউনিয়া : রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় নদীর পানিতে ডুবে গেছে তিস্তা পারের গ্রামগুলো। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মানুষের বাড়িঘর ডুবে গেছে। গৃহহীন পরিবারগুলোর জন্য গড়ে ওঠা দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৪ শতাধিক পরিবারের ঘরে বিশুদ্ধ পানি ও চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কাউনিয়ায় নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ডিমলা (নীলফামারী) : নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার (৫২.৬০ মিটার) ৩০ সেমির উপর দিয়ে প্রবহিত হয়। সন্ধ্যা ৭টায় তা বিপদসীমার আরও ১০ সেমি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪০ সেমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি রাত নাগাদ বিপদসীমার আরও ৬০ সেমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নীলফামারীর ডালিয়াস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র।

চাঁদপুর : চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদী এখন উত্তাল। বইছে তীব্র স্রোত। দেখা দিয়েছে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বন্যা। সে সঙ্গে শুরু হয়েছে হাইমচর ও চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের পুরানবাজার হরিসভাসহ রাজরাজেশ্বর, ইব্রাহিমপুর ও হানারচর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন।

এক সপ্তাহে পদ্মা-মেঘনার ভাঙনে নদীর দু’পারে অসংখ্য বাড়িঘর ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। হাইমচর রক্ষা বাঁধের তেলির মোড়ের উত্তর পাশে ও আমতলী হতে চরভৈরবী লঞ্চ ঘাট পর্যন্ত বাঁধের বিভিন্ন স্থান দিয়ে ব্লক দেবে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাবুল আক্তার বলেন, চঁাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে নদীর তীব্র স্রোতে কোথাও কোথাও ভাঙন দেখা দেয়ায় আমরা তা রোধ করতে তৎপর রয়েছি। তবে বন্যার পানি বৃদ্ধি ও প্রচণ্ড স্রোতের কারণে শহর রক্ষা বাঁধের হরিসভা এলাকার কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।

কলমাকান্দা ও মদন (নেত্রকোনা) : শুক্রবার থেকে অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার প্রধান উব্দাখালি নদীর পানি বেড়েই চলছে।

এতে উপজেলার প্রায় ২৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন। মদনের গোবিন্দশ্রী গুচ্ছ গ্রামের ৫০ পরিবারসহ উপজেলার ৫ ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : ইসলামপুরের বন্যা পরিস্থিতি আবারও অবনতি হয়েছে। বেলা ৩টা নাগাদ ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জে ২য় দফা বন্যায় উপজেলার চুকাইবাড়ী, চিকাজানী, বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে।

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) : ধোবাউড়া উপজেলায় নেতাই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এতে গামারীতলা, পোড়াকান্দুলিয়া, দক্ষিণ মাইজপাড়া, ঘোষগাঁও, বাঘবেড় (কিছু অংশ), ধোবাউড়া সদর (কিছু অংশ), গোয়াতলা (কিছু অংশ) ইউনিয়নে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবার।

শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরাঞ্চলের ৪টি ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পানিতে তলিয়ে গেছে পুরো চরাঞ্চলের মানুষের ধান, পাট, বাদাম ও সবজি চাষের ফসলি জমি।

রাজশাহী : রাজশাহীতে প্রতিদিনই পদ্মার পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে রাজশাহীর অনেক স্থানে পদ্মার পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধও। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। রোববার সকাল ৯টায় পদ্মার পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হয় ১৫ দশমিক ১৬ মিটার।

এটি বিপদসীমার মাত্র ৩ মিটার নিচে রয়েছে। রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমার উচ্চতা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার।

লালমনিরহাট : তিস্তার পর এবার ধরলার পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করছে। রোববার লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাটের শিমুলবাড়ি পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত