আজম খান ও তার সঙ্গীর জবানবন্দি

দুবাইয়ে ৪ হোটেলের বার্ষিক আয় ১৯২ কোটি টাকা

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টুরিস্ট ভিসায় দুবাইয়ে নারী পাচার করতেন আজম খান ও তার সঙ্গীরা। ১০ জন দালালের মাধ্যমে সুন্দরী তরুণীদের সংগ্রহের পর তাদের ভুলিয়ে নেয়া হতো দুবাই। সেখানে জোর করে তাদের ডান্স ক্লাবে নাচ-গানের পর দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হতো।

দুবাইয়ের চারটি হোটেল থেকে এদের মাধ্যমে বছরে ১৯২ কোটি টাকা আয় করেন আজম খান। হোটেলগুলোর খদ্দেরের তালিকায় আছে বাংলাদেশ ও ভারতের বড় মাপের ব্যবসায়ী। রোববার আদালতে আজম খান ও তার সহযোগী আল আমিন ওরফে ডায়মন্ডের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে আজম খান ও তার সঙ্গীরা সিআইডির হাতে গ্রেফতার হন।

সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে জানান, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আজম খান চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। গতকাল তিনি ও তার এক সহযোগী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেখানে দেশে ও বিদেশের কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। যারা নিয়মিত আজম খানের হোটেলে আসা-যাওয়া করত।

এ ছাড়া দেশে অর্ধশতাধিক দালাল রয়েছে, যাদের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করা হতো। তাদের মধ্যে ১০ জন হাইক্লাস দালালের নামও পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারলে এই চক্রের জাল ছিন্ন করা যাবে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, ডান্সবার, কফিশপ ও দেহ ব্যবসা চালিয়ে দুবাইয়ে ৪টি হোটেলের মালিক বনে গেছেন আজম খান। এসব হোটেলে কাজ দেয়ার নাম করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীদের সংগ্রহ করা হতো। প্রথমে তাদের ৩০-৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির অফার করা হতো। একপর্যায়ে তাদের আগাম এক মাসের বেতনও দেয়া হতো। এসব কাজ করত আজম খানের বিশ্বস্ত সহযোগী আল আমিন ওরফে ডায়মন্ড। এই ডায়মন্ড নারীপ্রতি ৫-১০ হাজার টাকা পেত।

ডায়মন্ড ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছেন, নারীদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব ছিল তার। এরপর তিনি নারীদের তথ্যগুলো উচ্চমাপের দালাল সোহেল রহমান, ইভান শাহরিয়ার সোহাগ, অসিম, জসিম, সজিব, মাইনুদ্দিন অনিক সোহেল, ওয়াসেক মোন্তাকিনুর রহমান, আনিসুল ইসলাম হিরুকে দিত। এরাই এসব নারীকে ফুসলিয়ে টুরিস্ট ভিসায় দুবাইয়ে আজম খানের কাছে পাঠাত। দুবাইয়ে নারী পৌঁছানোর পরপরই ডায়মন্ডের কাছে টাকার ভাগ চলে আসত।

ওই নারীরা দুবাই পৌঁছানোর পর তাদের হোটেলে ডান্স করার কথা বললে অনেকে রাজি হতো না। এ কারণে তাদের ওপর নির্যাতনও চলত। খাওয়া বন্ধ করে দেয়ার একপর্যায়ে তারা বাধ্য হয়ে এসব কাজে জড়াত। চক্রের এই সদস্যরা আগেও র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে তারা আবারও একই পেশায় জড়িয়েছে।

সিআইডির কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যমতে, যেসব নারীকে দুবাইয়ে পাচার করা হয় তাদের অনেকেই ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। এ ছাড়া এদের কারও কারও ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে যাতায়াতের অভ্যাস আছে। মোটা বেতনের লোভে পড়ে তারা সেখানে যান। অনেকে জেনেশুনেই গেছেন।

সূত্রমতে, আজম খানের নামে দুবাইয়ে চার তারকাযুক্ত তিনটি ও তিন তারকাবিশিষ্ট একটি হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলো হচ্ছে : ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়াল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্র্যান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ার। এসব হোটেলে প্রতিরাতেই ফিকসড ১৫ জনের জন্য রুম বরাদ্দ থাকত। তারা ভারত ও বাংলাদেশের বড়মাপের ব্যবসায়ী। প্রতিরাতে ১৫ জনের বেশি তিনি হোটেলে রাখতেন না। এ জন্য তাদের কাছ থেকে ৪ হাজার দিরহাম নেয়া হতো।

এ ছাড়া কফিশপের আড়ালেও অসামাজিক কার্যক্রম চালানো হতো। সেখানে ঘণ্টায় ১শ’ দিরহাম নেয়া হতো। ডান্সবারে যেতে হলেও আলাদা টাকা দেয়া লাগত। এসব থেকে বছরে ১৯২ কোটি টাকা উপার্জন করতেন আজম খান। করোনাকালে এসব হোটেলে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জড়িত নারীদের টাকার ঘাটতি দেখা দেয়। তারা আজম খানকে বারবার কল করেও না পেয়ে দুবাই পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। এতেই আজম খানের নাড়িনক্ষত্র বেরিয়ে আসে। এরপরই দুবাই পুলিশ আজম খানের ব্যাপারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাসে জানায়। পরে তার পাসপোর্ট বাতিল করে এক্সিট পাস নিয়ে আজম খান দেশে চলে আসেন।

সিআইডি সূত্র জানায়, আজম খানের নামে মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি দেশে তিনি কোথায় কী সম্পত্তি করেছেন, তাও সন্ধান করে দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিদেশে পাঠানো তরুণীদের মধ্যে সারা নামে এক তরুণীকে পছন্দ হয় আজম খানের। চাঁদপুরের মতলবের ওই তরুণী দেশে ফিরে এলে তার বাড়িতে যান আজম খান। এরপর ওই তরুণীকে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি করে দিয়ে মন জয় করেন। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ওইসব ফ্ল্যাটে হাই প্রোফাইলের নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতেও তার অনেক সম্পত্তি রয়েছে।

ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, গত আট বছরে চাকরির নামে দেশের হাজারেরও বেশি তরুণী-কিশোরীকে দুবাইয়ে পাচার এবং তাদের দেহ ব্যবসায় জড়াতে বাধ্য করেছে আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী এই চক্রের সদস্যরা। দুটি বিদেশি এয়ারলাইন্স এজেন্সির মাধ্যমে দুবাই পাঠানো হতো।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত