অষ্টম দিনেও অধরা সাহেদ

রিজেন্টের এমডি গ্রেফতার

কর্মীদের অভিযোগ- দেয়া হতো না বেতন, করানো হতো অনৈতিক কাজ, চাকরি ছাড়তে চাইলেও চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৫ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতারণার কাজে সাহেদের অন্যতম সহযোগী রিজেন্ট গ্রুপের এমডি মাসুদ পারভেজকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এখনও অধরাই আছেন সাহেদ। তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে এ মামলায় আরও আটজনকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে সাহেদের প্রতারণার শিকার অনেক তরুণী মুখ খুলতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের বর্ণনায় সাহেদের নির্যাতন, প্রতারণা ও পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়ার তথ্য বেরিয়ে আসছে।

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রতারক সাহেদ করিম ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারে অষ্টম দিনের মতো অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ধরনের এক অভিযানে রিজেন্টের এমডি মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। সাহেদ যাতে দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করা সাহেদকে গ্রেফতারে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। র‌্যাব বলছে, যেকোনো সময় সাহেদও গ্রেফতার হবেন। সাহেদের আটকের বিষয়ে র‌্যাবের মুখপাত্র এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। সে প্রতারণার কৌশল এতটাই রপ্ত করেছে যে, তাকে আটকে কিছুটা সময় লাগছে। তবে যেকোনো সময় সে গ্রেফতার হবে বলে আশা করছি। গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিরও সহায়তা নিচ্ছি। তার দেশত্যাগের কোনো সুযোগ নেই। পাসপোর্ট আমাদের কাছে জব্দ রয়েছে। অপরাধের দায়ে তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

পরীক্ষা ছাড়াই করোনাভাইরাসের ভুয়া ফলাফল দেয়াসহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে র‌্যাব। প্রতারণার ঘটনায় ৭ জুলাই রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে এক নম্বর আসামি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এদিকে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান বহুমুখী প্রতারক সাহেদ করিমের বিভিন্ন অপকর্মে উঠে আসছে সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহারের কথা। কখনও কাজ আদায় করতে এবং কখনও পাওনা টাকা পরিশোধ না করে ব্ল্যাকমেইল করতে তাদের ব্যবহার করতেন তিনি। এ ক্ষেত্রে টার্গেট করা হতো নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণীদের।

চাকরি দেয়ার নাম করে তাদের একাধিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করত সাহেদ। এরপর নানা কৌশলে বাধ্য করা হতো বিভিন্ন অপকর্ম ও প্রতারণায় জড়াতে। শুরুতে অনেকে চাকরি হারানোর ভয়ে সাহেদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন। পরে অনিয়মিত বেতন, খারাপ ব্যবহার ও সীমাহীন প্রতারণা বুঝতে পেরে তাদের কেউ কেউ চাকরি ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু চাকরি ছাড়ার কথা বললেই ওইসব তরুণী ও তাদের পরিবারের ওপর নেমে আসত অবর্ণনীয় নির্যাতন। এসব তরুণীর ভাষ্য, ‘সাহেদের ফাঁদে একবার পড়লে বের হওয়ার সুযোগ নেই।’

এদিকে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর একে একে বের হয়ে আসতে থাকে এর মালিক সাহেদ করিমের অভিনব প্রতারণার সব খবর। এতদিন সাহেদের ভয়ে চুপ থাকলেও এরপর থেকে মুখ খুলতে শুরু করেন ভুক্তভোগীদের অনেকেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ জমা হতে থাকে। এবার সাহেদের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কথা বলতে শুরু করেছেন।

প্রতারক সাহেদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কয়েক তরুণীর সঙ্গে কথা হয় যুগান্তরের। তারা দাবি করেন, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সাহেদের সঙ্গে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সাহেদের হয়রানির শিকার হয়েছেন তার চিত্র তুলে ধরেন। প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর নেমে আসত অবর্ণনীয় নির্যাতন বলে জানান তারা।

সাহেদের সঙ্গে ২০১১ সাল থেকে কাজ করেছেন এমন একজন রমিজা রহমান (ছদ্মনাম) যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সাহেদের বিভিন্ন অপকর্ম ও নির্যাতন নিয়ে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে তার ও পরিবারের ওপর বলপ্রয়োগ ও মানসিক নির্যাতনের কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, চাকরি ছেড়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার। থানায় গিয়েও তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার পাননি। এর আগেও বহুবার চেষ্টা করেছেন সাহেদের অন্যায়ের বিষয়ে কথা বলতে। কিন্তু বলার মতো প্ল্যাটফর্ম পাননি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ২০১১ সালে ‘বিডিএস কুরিয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রতারক সাহেদের সঙ্গে কাজ করতেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে অনার্সে পড়ুয়া আরও সাত-আটজন তরুণী স্বল্প বেতনে প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরি নেয়। এর কিছু দিন পর নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ করে দেশ ছাড়েন সাহেদ। তিনি বলেন, এরপর ধানমণ্ডি এলাকাটা আমাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। প্রায়ই বিভিন্ন পাওনাদার আমাদের কাছে টাকা চাইতেন। আমরা তো খুব সামান্য বেতনে কাজ করতাম। এই প্রতারণার বিষয়ে কিছু বুঝতেই পারিনি। খুব বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম আমরা।

রমিজা বলেন, সাহেদ প্রতারণা করে দেশ ছাড়ার পর অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। এরপর সে পুনরায় দেশে ফিরে বারিধারায় ‘সাফিয়া সিটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডেভেলপার ব্যবসা শুরু করেন। পুরনো কর্মী হিসেবে আমাকে বেতন বাড়িয়ে সেখানে যোগ দিতে বলে। ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার’ রেডি করে রাখে। আমি সেখানে যোগ দেই।

এখানে থাকাবস্থায় ২০১৩ সালে বিয়ে করি। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ২০১৭ সালে আমাদের ‘সেপারেশন’ হয়। এরপর থেকেই সে (সাহেদ) আমার দিকে খারাপ নজর দিতে শুরু করে। এর কিছু দিন পর সে জ্বালানো শুরু করে (কুপ্রস্তাব দেয়া)। তখন এসবের কিছু ডকুমেন্ট রেখে দেই। বাড়াবাড়ি করলে এগুলো সবাইকে দেব বলে জানাই। এরপর সে কিছুটা ক্ষান্ত হয়।

তিনি বলেন, অনেক উঠতি বয়সী মেয়ের আসা-যাওয়া ছিল সাহেদের অফিসে। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা বেশি আসত। কারণ তাদের চাকরির দরকার ছিল। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েই সাহেদ ব্ল্যাকমেইল করতেন। ২০১৭ সালে সাহেদের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন এক তরুণী যুগান্তরকে বলেন, অনেক বড় বড় লোকের যাওয়া-আসা ছিল স্যারের কাছে। পুলিশ প্রটোকল নিয়ে একটি গাড়ি প্রায়ই তার অফিসে আসত।

তিনি খুব মিষ্টভাষী ছিলেন। সেজন্য সবার সঙ্গেই তিনি সখ্য গড়ে তুলতে পারতেন। চলতি বছরে সাহেদের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন আরেক তরুণী বলেন, আমি সেখানে চাকরি নিয়েছি। কিন্তু তিনি নিয়মিত বেতন দিতেন না। অনেক সময় অনৈতিক কাজ করাতে চাইতেন। পরে চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলে তিনি হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। অফিসের বাইরে অনেক তরুণী আসত তার অফিসে।

কাপাসিয়ায় রিজেন্টের এমডি মাসুদের নানা অপকর্ম : কাপাসিয়া প্রতিনিধি জানান, কাপাসিয়ায় রিজেন্ট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজের নানা অপকর্মের চিত্র পাওয়া গেছে। কাপাসিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হোমিও চিকিৎসক আবু হানিফ মোড়লের ছেলে হওয়ায় এতদিন তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। পরকীয়ায় জড়িয়ে কাপাসিয়ার সাবেক ইউপি মেম্বার দুই সন্তানের জননী রওশনারা বীথিকে মাসুদ বিয়ে করেন।

পরে এ তথ্য গোপন করে সহকর্মী ব্যাংকারকে তিনি বিয়ে করেন। আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে মাসুদ চাকরিচ্যুত হন। চাকরির প্রলোভনে একাধিক লোকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিয়ের সময় কাপাসিয়া বাজারের জুয়েলারি ব্যবসায়ী চন্দন রক্ষিতকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দিলে তা ব্যাংক থেকে ডিজঅনার হয়।

এ টাকা অনেক দেনদরবার করেও চন্দন পাননি। রাওনাট গ্রামের আলমগীর আকন্দ, আলতা মাসুদ, লাকি স্টোরের মালিক আল আমিন মোড়ল, আপন মামাতো ভাই আনোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মাসুদ পারভেজ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো আত্মসাৎ করেছেন। এ সব অভিযোগের কারণে মাসুদ একমাত্র ছেলে হওয়ার পর এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয়া হয় বলেও পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন।

কর্মকর্তা কর্মচারী রিমান্ড শেষে কারাগারে: করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে প্রতারণা মামলায় রিজেন্ট হাসপাতালের সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে আসামিদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারী আসামিদের কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেন।

কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন- রিজেন্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব হাসান, হেলথ টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব, হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক মো. রাকিবুল হাসান ওরফে সুমন, মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, গাড়িচালক আবদুস সালাম ও হাসপাতালের কর্মী আবদুর রশিদ খান ওরফে জুয়েল। এর আগে গত ৮ জুলাই এই সাত আসামির পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলা ডিবিতে : উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা জানিয়েছেন, সাহেদের মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত