সুরসম্রাট আলাউদ্দীন আলী আর নেই
jugantor
সুরসম্রাট আলাউদ্দীন আলী আর নেই
জন্ম: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫২ * মৃত্যু: ৯ আগস্ট ২০২০

  সাংস্কৃতিক রিপোর্টার  

১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুরসম্রাট গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী আর নেই। রোববার বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।

বাংলা গান, বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রে বহু হৃদয়কাড়া গানের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। একটি দুটি নয় পাঁচ হাজারের বেশি গানে সুর করেছেন। তার সেসব সৃষ্টি মানুষের মুখে মুখে।

সুরের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন বাংলার মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৬৮ বছর বয়সে বরেণ্য এই সঙ্গীতব্যক্তিত্ব চিরবিদায় নিলেন।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাবার মৃত্যুর বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন তার কন্যা আলিফ আলাউদ্দীন।

এর আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত শনিবার ভোরে রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এই সঙ্গীতজ্ঞকে। এরপর থেকে হাসপাতালটির ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। কিন্তু অবস্থার আর কোনো উন্নতি হয়নি।

আলিফ আলাউদ্দীন বলেন, ‘শনিবার ভোরে হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি করা হয় বাবাকে। ভর্তির পর করোনা টেস্ট করা হয়। কিন্তু ফলাফল আজ দুপুরে নেগেটিভ পাই। এটা আমাদের জন্য স্বস্তির খবর ছিল।

কিন্তু পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্রমশ অবনতি হচ্ছিল। চিকিৎসকরা তেমন কোনো আশা দিতে পারেননি। তবু একটা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। যেটা আগামীকাল পাওয়ার কথা।

কিন্তু তার আগেই তো চলে গেলেন। সবার কাছে আমার বাবার জন্য দোয়া চাই।’ ২০১৫ সালের জুন মাসে আলাউদ্দীন আলীর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর থেকে তিনি কয়েক দফায় বিদেশেও চিকিৎসা নিয়েছেন।

তবে এরপর থেকে তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে, সঙ্গীতে। আলাউদ্দীন আলী বাংলাদেশের বরেণ্য সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার। এ পর্যন্ত ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

এর মধ্যে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার পুরস্কৃত হয়ে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। আলাউদ্দীন আলী ১৯৭৫ সাল থেকে সংগীত পরিচালনা করে বেশ প্রশংসিত হন।

‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’ এবং ‘যোগাযোগ’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

তিনি খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। আলাউদ্দিন আলী বাংলা গান, বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান তৈরি করেছেন।

তিনি একই সঙ্গে সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, বেহালাবাদক ও গীতিকার। ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। বাবা ওস্তাদ জাদব আলী। মায়ের নাম জোহরা খাতুন।

দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলে এজিবি কলোনিতে চলে আসেন আলাউদ্দিন আলী। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেই কলোনিতেই বড় হন এই গুণী শিল্পী। সঙ্গীতে প্রথম হাতেখড়ি ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে।

পরে ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। শুরুটা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে, পরে প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে কাজ করেন দীর্ঘদিন।

আলাউদ্দিন আলীর সুরারোপিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দী, আবিদা সুলতানা থেকে শুরু করে দেশের খ্যাতিমান সব শিল্পী।

এই সুরসম্রাটের অনবদ্য কিছু সৃষ্টির মধ্যে একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়, দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়, হয় যদি বদনাম হোক আরও, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার, সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না, যেটুকু সময় তুমি থাকো পাশে, এমনও তো প্রেম হয় চোখের জলে কথা কয়, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না, আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা, শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে-সহ আরও অসংখ্য গান।

আলাউদ্দিন আলীর জামাতা কাজী ফায়সাল আহমেদ যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে আলাউদ্দিন আলীর মরদেহ। আজ সোমবার বাদ জোহর খিলগাঁও তালতলা মসজিদে এই সঙ্গীতজ্ঞের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

সেখান থেকে তার মরদেহ নেয়া হবে এফডিসিতে। সেখানে হবে দ্বিতীয় জানাজা। এরপর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন আলাউদ্দিন আলী।
 

সুরসম্রাট আলাউদ্দীন আলী আর নেই

জন্ম: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫২ * মৃত্যু: ৯ আগস্ট ২০২০
 সাংস্কৃতিক রিপোর্টার 
১০ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুরসম্রাট গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী আর নেই। রোববার বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।

বাংলা গান, বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রে বহু হৃদয়কাড়া গানের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। একটি দুটি নয় পাঁচ হাজারের বেশি গানে সুর করেছেন। তার সেসব সৃষ্টি মানুষের মুখে মুখে।

সুরের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন বাংলার মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৬৮ বছর বয়সে বরেণ্য এই সঙ্গীতব্যক্তিত্ব চিরবিদায় নিলেন।

তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাবার মৃত্যুর বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন তার কন্যা আলিফ আলাউদ্দীন।

এর আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত শনিবার ভোরে রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এই সঙ্গীতজ্ঞকে। এরপর থেকে হাসপাতালটির ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। কিন্তু অবস্থার আর কোনো উন্নতি হয়নি।

আলিফ আলাউদ্দীন বলেন, ‘শনিবার ভোরে হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি করা হয় বাবাকে। ভর্তির পর করোনা টেস্ট করা হয়। কিন্তু ফলাফল আজ দুপুরে নেগেটিভ পাই। এটা আমাদের জন্য স্বস্তির খবর ছিল।

কিন্তু পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্রমশ অবনতি হচ্ছিল। চিকিৎসকরা তেমন কোনো আশা দিতে পারেননি। তবু একটা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। যেটা আগামীকাল পাওয়ার কথা।

কিন্তু তার আগেই তো চলে গেলেন। সবার কাছে আমার বাবার জন্য দোয়া চাই।’ ২০১৫ সালের জুন মাসে আলাউদ্দীন আলীর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর থেকে তিনি কয়েক দফায় বিদেশেও চিকিৎসা নিয়েছেন।

তবে এরপর থেকে তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে, সঙ্গীতে। আলাউদ্দীন আলী বাংলাদেশের বরেণ্য সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার। এ পর্যন্ত ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

এর মধ্যে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার পুরস্কৃত হয়ে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। আলাউদ্দীন আলী ১৯৭৫ সাল থেকে সংগীত পরিচালনা করে বেশ প্রশংসিত হন।

‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’ এবং ‘যোগাযোগ’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

তিনি খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। আলাউদ্দিন আলী বাংলা গান, বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান তৈরি করেছেন।

তিনি একই সঙ্গে সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, বেহালাবাদক ও গীতিকার। ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। বাবা ওস্তাদ জাদব আলী। মায়ের নাম জোহরা খাতুন।

দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলে এজিবি কলোনিতে চলে আসেন আলাউদ্দিন আলী। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেই কলোনিতেই বড় হন এই গুণী শিল্পী। সঙ্গীতে প্রথম হাতেখড়ি ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে।

পরে ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। শুরুটা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে, পরে প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে কাজ করেন দীর্ঘদিন।

আলাউদ্দিন আলীর সুরারোপিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দী, আবিদা সুলতানা থেকে শুরু করে দেশের খ্যাতিমান সব শিল্পী।

এই সুরসম্রাটের অনবদ্য কিছু সৃষ্টির মধ্যে একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়, দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়, হয় যদি বদনাম হোক আরও, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার, সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না, যেটুকু সময় তুমি থাকো পাশে, এমনও তো প্রেম হয় চোখের জলে কথা কয়, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না, আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা, শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে-সহ আরও অসংখ্য গান।

আলাউদ্দিন আলীর জামাতা কাজী ফায়সাল আহমেদ যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে আলাউদ্দিন আলীর মরদেহ। আজ সোমবার বাদ জোহর খিলগাঁও তালতলা মসজিদে এই সঙ্গীতজ্ঞের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

সেখান থেকে তার মরদেহ নেয়া হবে এফডিসিতে। সেখানে হবে দ্বিতীয় জানাজা। এরপর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন আলাউদ্দিন আলী।