তিন কারণে জোয়ারে ডুবছে লোকালয়
jugantor
তিন কারণে জোয়ারে ডুবছে লোকালয়
ভবিষ্যতে নদ-নদী বিলীনের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের * ১৯৬৭ সালে নাব্য নৌপথ ছিল ১২ হাজার কিলোমিটার ১৯৮৯ সালে কমে দাঁড়ায় ৬ হাজারে, বর্তমানে আরও কম

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলে পানি

গত কয়েক মাস ধরেই জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে দেশের ভাটি অঞ্চলের লোকালয়। এমন ঘটনা স্মরণকালে আর হয়নি। ১৯৮৮-এর ভয়াবহ বন্যায়ও প্লাবিত হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী কোনো জেলা-উপজেলা বা গ্রাম। এতদিন দক্ষিণের মানুষ শুধু নদী-খালেই দেখেছে জোয়ার-ভাটা। কিন্তু এখন পানির স্রোত বইছে লোকালয়ে। শুক্রবারও দিনে ২ বার জোয়ারের পানিতে ডুবেছে দক্ষিণের শহর-বন্দরসহ বিস্তীর্ণ লোকালয়। শুধু দক্ষিণাঞ্চলই নয়, বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবনমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে প্রায় সারা দেশে। রাজধানী ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়েছে জোয়ারে। হঠাৎ কেন প্রকৃতির এ ভয়াবহ আগ্রাসন। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানত ৩টি কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে লোকালয়। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেশে নদ-নদী বলে কিছু থাকবে না।

৬৩ থেকে ২০২০, ভয়াবহ নাব্য সংকটে নদ-নদী : ১৯৬৩ থেকে ’৬৭ সাল পর্যন্ত দেশের নদ-নদীর ওপর গবেষণা চালায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেডেকো (nedeco)। দেশের এসএ খতিয়ান ও ম্যাপভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সব নৌপথে জরিপ চালায় তারা। পরে প্রকাশিত রিপোর্টে নেডেকো জানায়, বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের তথ্য কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে নাব্য নৌপথ রয়েছে ১২ হাজার কিমি.। বাকি ১২ হাজার কিমির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এসব নৌপথের অধিকাংশ ছিল বড় নদীগুলোর শাখা-প্রশাখা এবং খাল। দখল-দূষণের পাশাপাশি নানা কারণে ভরাট হয়ে এসব জলাধার তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। তার ২০ বছর পর ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ২ বছর বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর আরেকটি গবেষণা চালায় নেদারল্যান্ডসেরই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিএইচভি (D.H.V)। স্বাধীনতাপরবর্তী দেশের নদী-খাল দখলের পাশাপাশি নৌপথের নাব্য হারানোর বিষয়টি কত ভয়াবহভাবে এগিয়েছে তার প্রমাণ মেলে ওই রিপোর্টে। ডিএইচভি জানায়, ‘১৯৬৭ সালের তুলনায় নৌপথের দৈর্ঘ্য অর্ধেক কমে ১২ হাজার থেকে ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সারা বছর চলাচলের উপযোগী নাব্য নৌপথ রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৬শ’ কিমি.। বাকি ২ হাজার ৩৬৮ কিমি. সচল থাকে শুধু বর্ষা মৌসুমে। পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, ‘নদীর নাব্য হারানোর মানে হচ্ছে এর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। ১৯৬৭ সালে যেখানে নাব্য নৌপথ ছিল ১২ হাজার সেখানে ১৯৮৯ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৬৮ কিমি.। ’৮৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যাবে, এ ৬ হাজার কিমি.ও এখন অবশিষ্ট নেই। সহজেই অনুমেয় যে ১৯৬৭ সালে এসব নদী যতটা পানি ধারণ করতে পারত তার অর্ধেকও এখন আর পারছে না। ফলে জোয়ারের পানি নদী ধারণ করতে না পারায় প্লাবিত হচ্ছে লোকালয়। চলতি বর্ষায় সেই জোয়ার-ভাটার স্রোতই আমরা দেখছি বরিশাল নগরসহ পুরো দক্ষিণের শহর, বন্দর আর গ্রামে।’

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী, খাল, জলাশয় ভরাট : দেশের নদী গবেষকদের অন্যতম হচ্ছে মরফোলজিস্ট ড. এমএ সালাম সিকদার। জোয়ারের পানিতে লোকালয় প্লাবিত হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা এ গবেষক বলেন, ‘সাগর পাড়ের দক্ষিণ থেকে দেশের মধ্যাঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার নিয়ন্ত্রণ করে সমুদ্র। সাগরের জোয়ারের পানি নদ-নদী হয়ে চলে যায় রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের আরও উত্তরে। ভাটায় আবার ফিরে আসে সেই পানি। নদীর সেই স্বাভাবিক গতিপথ কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি? যখনই জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকেছে আমরা বাঁধ দিয়ে নদী শাসন করেছি। সেচ প্রকল্পের নামে হাজার হাজার স্লুইস গেট করে জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। রাস্তা তৈরি করতে নদী-খালে বাঁধ দিয়ে আটকেছি পানির প্রবাহ। ফলে পলি জমে এসব নদী-খাল মরে গেছে। নদ-নদীর সেই জোয়ার-ভাটার শক্তি আর নেই। যে শক্তির বলে সে পানির সঙ্গে থাকা পলিমাটি নিয়ে যেত সমুদ্রে। জোয়ার-ভাটার শক্তি কমে যাওয়ায় তলদেশে জমছে পলি। এভাবে তলদেশ উচু হওয়ার পাশাপাশি দু’পাড়ে চর পড়ে ভরাট হচ্ছে নদী। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে নদী-খাল দখল এবং জলাশয় ভরাটের বিষয়টি। বরিশাল শহরে আগে ২৩টি প্রধান এবং ২৪টি শাখা খাল ছিল। ছিল ১০ হাজারের বেশি জলাশয়। এগুলোর সঙ্গে ছিল জোয়ার-ভাটার সংযোগ। জোয়ার এলে নদীর পানি ছড়িয়ে যেত এসব খাল-শাখা খাল-জলাশয়ে। দখলের কবলে পড়ে সেই খাল-শাখা আর নেই। ভরাট হয়ে গেছে জলাশয়। এ চিত্র সারা দেশেই। কিন্তু জোয়ারের পানি তো কমেনি। খাল-জলাশয় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এ পানি কোথায় যাবে? জায়গা না পেয়েই তারা এখন ডুবিয়ে দিচ্ছে লোকালয়। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ বন্ধের পাশাপাশি নদী বাঁচানো আর খাল উদ্ধার করতে না পারলে ৫০-৬০ বছর পর দেশে নদী বলে কিছু থাকবে না।’

বেড়েছে জোয়ারের উচ্চতা, প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি : লোকালয় প্লাবিত হওয়ার পেছনে নদ-নদীর নাব্য হারানোর সঙ্গে স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফিউদ্দিন বলেন, ‘গত ৫০ বছরের জোয়ার-ভাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে জোয়ারের স্বাভাবিক উচ্চতা বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ’৭০-এর দশকে দেশের নদ-নদীর জোয়ারের উচ্চতা ছিল আড়াই থেকে ৩ মিটার। সেখানে চলতি বছর ১৬ আগস্ট দক্ষিণের প্রধান ৩ নদী বিষখালী-পায়রা-বলেশ্বরে জোয়ারের উচ্চতা পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৫৪ মিটার। ২০০৬ সালে জোয়ার আসে ৩ দশমিক ৯৬ মিটার উঁচু হয়ে। এছাড়া আমরা ৩ দশমিক ৬২ এবং ৩ দশমিক ৬১ মিটার উচ্চতাও রেকর্ড করেছি। এসব তথ্য বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতা গড়ে প্রায় দশমিক ৬০ মিটার বেড়েছে। সরকারেরও এ বিষয়ে নজর রয়েছে। ৮শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে বরগুনা-পটুয়াখালী-খুলনা ও বাগেরহাটকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘কোস্টাল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ নামে এ প্রকল্পের আওতায় সাগর এবং নদী তীরবর্তী বাঁধগুলো আরও উঁচু করে নির্মাণ পুনর্নির্মাণ করা হবে।’ বিআইডব্লিউটিএর সাবেক সচিব নদী বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভয়াবহ এ ক্ষতির সূচনা হয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যেখানে নৌপথভিত্তিক দ্রুততর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠার কথা ছিল সেখানে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দেশের ভূ-প্রকৃতিগত অভিজ্ঞতায় এখানে রেল আর সড়কপথের উন্নয়নের নামে নদী ধ্বংসের কাজ শুরু করে। সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরাও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে বাঁধ দিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ আটকানো এমনকি নদী হত্যা করে সড়ক বানিয়েছি। দেশে যত বড় বড় সেতু আছে সেখানে গিয়ে দেখুন, সেতুর পিলার আটকাচ্ছে নদীর স্রোত। পলি জমে মরে যাচ্ছে নদী। আমরা শুধু সড়ক আর সেতু বানিয়ে গেছি। এসবের ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবিনি। এখন তার প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি। এখনও সময় আছে, প্রকৃতির গতির সঙ্গে তালমিলিয়ে প্রকৌশলের সমন্বয় ঘটাতে হবে। নইলে অদূর ভবিষ্যতে যে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটবে তার হাত থেকে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না।’

তিন কারণে জোয়ারে ডুবছে লোকালয়

ভবিষ্যতে নদ-নদী বিলীনের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের * ১৯৬৭ সালে নাব্য নৌপথ ছিল ১২ হাজার কিলোমিটার ১৯৮৯ সালে কমে দাঁড়ায় ৬ হাজারে, বর্তমানে আরও কম
 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
উপকূলে পানি
ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েক মাস ধরেই জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে দেশের ভাটি অঞ্চলের লোকালয়। এমন ঘটনা স্মরণকালে আর হয়নি। ১৯৮৮-এর ভয়াবহ বন্যায়ও প্লাবিত হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী কোনো জেলা-উপজেলা বা গ্রাম। এতদিন দক্ষিণের মানুষ শুধু নদী-খালেই দেখেছে জোয়ার-ভাটা। কিন্তু এখন পানির স্রোত বইছে লোকালয়ে। শুক্রবারও দিনে ২ বার জোয়ারের পানিতে ডুবেছে দক্ষিণের শহর-বন্দরসহ বিস্তীর্ণ লোকালয়। শুধু দক্ষিণাঞ্চলই নয়, বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবনমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে প্রায় সারা দেশে। রাজধানী ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়েছে জোয়ারে। হঠাৎ কেন প্রকৃতির এ ভয়াবহ আগ্রাসন। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানত ৩টি কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে লোকালয়। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেশে নদ-নদী বলে কিছু থাকবে না।

৬৩ থেকে ২০২০, ভয়াবহ নাব্য সংকটে নদ-নদী : ১৯৬৩ থেকে ’৬৭ সাল পর্যন্ত দেশের নদ-নদীর ওপর গবেষণা চালায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেডেকো (nedeco)। দেশের এসএ খতিয়ান ও ম্যাপভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সব নৌপথে জরিপ চালায় তারা। পরে প্রকাশিত রিপোর্টে নেডেকো জানায়, বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের তথ্য কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে নাব্য নৌপথ রয়েছে ১২ হাজার কিমি.। বাকি ১২ হাজার কিমির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এসব নৌপথের অধিকাংশ ছিল বড় নদীগুলোর শাখা-প্রশাখা এবং খাল। দখল-দূষণের পাশাপাশি নানা কারণে ভরাট হয়ে এসব জলাধার তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। তার ২০ বছর পর ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ২ বছর বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর আরেকটি গবেষণা চালায় নেদারল্যান্ডসেরই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিএইচভি (D.H.V)। স্বাধীনতাপরবর্তী দেশের নদী-খাল দখলের পাশাপাশি নৌপথের নাব্য হারানোর বিষয়টি কত ভয়াবহভাবে এগিয়েছে তার প্রমাণ মেলে ওই রিপোর্টে। ডিএইচভি জানায়, ‘১৯৬৭ সালের তুলনায় নৌপথের দৈর্ঘ্য অর্ধেক কমে ১২ হাজার থেকে ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সারা বছর চলাচলের উপযোগী নাব্য নৌপথ রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৬শ’ কিমি.। বাকি ২ হাজার ৩৬৮ কিমি. সচল থাকে শুধু বর্ষা মৌসুমে। পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, ‘নদীর নাব্য হারানোর মানে হচ্ছে এর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। ১৯৬৭ সালে যেখানে নাব্য নৌপথ ছিল ১২ হাজার সেখানে ১৯৮৯ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৬৮ কিমি.। ’৮৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যাবে, এ ৬ হাজার কিমি.ও এখন অবশিষ্ট নেই। সহজেই অনুমেয় যে ১৯৬৭ সালে এসব নদী যতটা পানি ধারণ করতে পারত তার অর্ধেকও এখন আর পারছে না। ফলে জোয়ারের পানি নদী ধারণ করতে না পারায় প্লাবিত হচ্ছে লোকালয়। চলতি বর্ষায় সেই জোয়ার-ভাটার স্রোতই আমরা দেখছি বরিশাল নগরসহ পুরো দক্ষিণের শহর, বন্দর আর গ্রামে।’

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী, খাল, জলাশয় ভরাট : দেশের নদী গবেষকদের অন্যতম হচ্ছে মরফোলজিস্ট ড. এমএ সালাম সিকদার। জোয়ারের পানিতে লোকালয় প্লাবিত হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা এ গবেষক বলেন, ‘সাগর পাড়ের দক্ষিণ থেকে দেশের মধ্যাঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বেশ খানিকটা দূর পর্যন্ত নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার নিয়ন্ত্রণ করে সমুদ্র। সাগরের জোয়ারের পানি নদ-নদী হয়ে চলে যায় রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের আরও উত্তরে। ভাটায় আবার ফিরে আসে সেই পানি। নদীর সেই স্বাভাবিক গতিপথ কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি? যখনই জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকেছে আমরা বাঁধ দিয়ে নদী শাসন করেছি। সেচ প্রকল্পের নামে হাজার হাজার স্লুইস গেট করে জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। রাস্তা তৈরি করতে নদী-খালে বাঁধ দিয়ে আটকেছি পানির প্রবাহ। ফলে পলি জমে এসব নদী-খাল মরে গেছে। নদ-নদীর সেই জোয়ার-ভাটার শক্তি আর নেই। যে শক্তির বলে সে পানির সঙ্গে থাকা পলিমাটি নিয়ে যেত সমুদ্রে। জোয়ার-ভাটার শক্তি কমে যাওয়ায় তলদেশে জমছে পলি। এভাবে তলদেশ উচু হওয়ার পাশাপাশি দু’পাড়ে চর পড়ে ভরাট হচ্ছে নদী। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে নদী-খাল দখল এবং জলাশয় ভরাটের বিষয়টি। বরিশাল শহরে আগে ২৩টি প্রধান এবং ২৪টি শাখা খাল ছিল। ছিল ১০ হাজারের বেশি জলাশয়। এগুলোর সঙ্গে ছিল জোয়ার-ভাটার সংযোগ। জোয়ার এলে নদীর পানি ছড়িয়ে যেত এসব খাল-শাখা খাল-জলাশয়ে। দখলের কবলে পড়ে সেই খাল-শাখা আর নেই। ভরাট হয়ে গেছে জলাশয়। এ চিত্র সারা দেশেই। কিন্তু জোয়ারের পানি তো কমেনি। খাল-জলাশয় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এ পানি কোথায় যাবে? জায়গা না পেয়েই তারা এখন ডুবিয়ে দিচ্ছে লোকালয়। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ বন্ধের পাশাপাশি নদী বাঁচানো আর খাল উদ্ধার করতে না পারলে ৫০-৬০ বছর পর দেশে নদী বলে কিছু থাকবে না।’

বেড়েছে জোয়ারের উচ্চতা, প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি : লোকালয় প্লাবিত হওয়ার পেছনে নদ-নদীর নাব্য হারানোর সঙ্গে স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফিউদ্দিন বলেন, ‘গত ৫০ বছরের জোয়ার-ভাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে জোয়ারের স্বাভাবিক উচ্চতা বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ’৭০-এর দশকে দেশের নদ-নদীর জোয়ারের উচ্চতা ছিল আড়াই থেকে ৩ মিটার। সেখানে চলতি বছর ১৬ আগস্ট দক্ষিণের প্রধান ৩ নদী বিষখালী-পায়রা-বলেশ্বরে জোয়ারের উচ্চতা পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৫৪ মিটার। ২০০৬ সালে জোয়ার আসে ৩ দশমিক ৯৬ মিটার উঁচু হয়ে। এছাড়া আমরা ৩ দশমিক ৬২ এবং ৩ দশমিক ৬১ মিটার উচ্চতাও রেকর্ড করেছি। এসব তথ্য বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতা গড়ে প্রায় দশমিক ৬০ মিটার বেড়েছে। সরকারেরও এ বিষয়ে নজর রয়েছে। ৮শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে বরগুনা-পটুয়াখালী-খুলনা ও বাগেরহাটকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘কোস্টাল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ নামে এ প্রকল্পের আওতায় সাগর এবং নদী তীরবর্তী বাঁধগুলো আরও উঁচু করে নির্মাণ পুনর্নির্মাণ করা হবে।’ বিআইডব্লিউটিএর সাবেক সচিব নদী বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভয়াবহ এ ক্ষতির সূচনা হয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যেখানে নৌপথভিত্তিক দ্রুততর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠার কথা ছিল সেখানে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দেশের ভূ-প্রকৃতিগত অভিজ্ঞতায় এখানে রেল আর সড়কপথের উন্নয়নের নামে নদী ধ্বংসের কাজ শুরু করে। সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরাও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে বাঁধ দিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ আটকানো এমনকি নদী হত্যা করে সড়ক বানিয়েছি। দেশে যত বড় বড় সেতু আছে সেখানে গিয়ে দেখুন, সেতুর পিলার আটকাচ্ছে নদীর স্রোত। পলি জমে মরে যাচ্ছে নদী। আমরা শুধু সড়ক আর সেতু বানিয়ে গেছি। এসবের ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবিনি। এখন তার প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি। এখনও সময় আছে, প্রকৃতির গতির সঙ্গে তালমিলিয়ে প্রকৌশলের সমন্বয় ঘটাতে হবে। নইলে অদূর ভবিষ্যতে যে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটবে তার হাত থেকে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না।’