সহজ শর্তে টাকার জোগানে মূল্যস্ফীতি ঝুঁকিতে
jugantor
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন 
সহজ শর্তে টাকার জোগানে মূল্যস্ফীতি ঝুঁকিতে

  যুগান্তর রিপোর্ট   

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে সহজ শর্তে টাকার জোগান বাড়ানোর ফলে আগামী প্রান্তিকে পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতে বেড়ে যেতে পারে মূল্যস্ফীতির হার। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো ও দামের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে নজরদারি বাড়াতে হবে।

যাতে কোনোক্রমেই টাকার প্রবাহ উৎপাদন খাতের বাইরে বেশি না যায়। একই সঙ্গে এসব এসব অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় ঘূর্ণায়মান থাকে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়লে চাহিদা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক নিয়মে পণ্যের ওপর চাপ পড়ে। এতে দাম বেড়ে যায়। ফলে বাড়ে মূল্যস্ফীতির হার। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

বাজারে ইতোমধ্যে চাল, ডাল, আটা, শাকসবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। করোনার কারণে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বন্যার প্রভাব ও কারসাজির কারণে এগুলোর দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর বার্তাটি কাজ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে টাকার প্রবাহ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

গত জুন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী জুনের মধ্যে তা ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উন্নত ও উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতি করোনার প্রভাব সীমিত করে লকডাউনের আওতা থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসছে। সচল হতে শুরু করেছে অর্থনৈতক কর্মকাণ্ড।

এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিও পুরোমাত্রায় সচলের দিকে এগুচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষে আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

ফলে অদূরভবিষ্যতে দেশের সার্বিক অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে পারে।

সূত্র জানায়, করোনার প্রভাব মোকাবেলার জন্য ইতোমধ্যে বাজারে টাকার জোগান বাড়াতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কম সুদে ও সহজ শর্তে জোগান দেয়ার জন্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই জোগান দেয়া হচ্ছে ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের জমা অর্থের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বিধি-বিধানেও ছাড় দেয়া হয়েছে।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর টাকার প্রবাহ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

এসব অর্থ সহজ শর্তে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহজনিত মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। ফলে পণ্যমূল্যও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যদিও ইতোমধ্যে বাজারে পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে। প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই ইতোমধ্যে বেড়েছে। এর প্রভাবে বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হারও।

গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগস্টে তা আরও বেড়ে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

যদিও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন পণ্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে এতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি হওয়ার কথা।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে টাকার জোগান বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

তবে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে ব্যাংকের মাধ্যমে যেসব টাকা বের হবে সেগুলো যাতে উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হয় এবং মেয়াদ শেষে ফেরৎ আসে।

উৎপাদন খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে বেশি টাকা গেলে, টাকা ফেরত না এলে বা বিদেশে পাচার হয়ে গেলে অর্থনীতিতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, মন্দার মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যেমন চমক বা ম্যাজিক দেখানোর সুযোগ থাকে, তেমনি কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এর সুফল ঘরে তুলতে হয়।

এটি বড় চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য কঠোর সুপারভিশন থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রাখতে হলে এখন রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে হবে।

এর জন্য বিদেশে জনশক্তি রফতানিও বাড়াতে হবে। করোনায় যেসব শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছে তাদের বিদেশে পাঠানো এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন 

সহজ শর্তে টাকার জোগানে মূল্যস্ফীতি ঝুঁকিতে

 যুগান্তর রিপোর্ট  
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে সহজ শর্তে টাকার জোগান বাড়ানোর ফলে আগামী প্রান্তিকে পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এতে বেড়ে যেতে পারে মূল্যস্ফীতির হার। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। 

এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো ও দামের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে নজরদারি বাড়াতে হবে।

যাতে কোনোক্রমেই টাকার প্রবাহ উৎপাদন খাতের বাইরে বেশি না যায়। একই সঙ্গে এসব এসব অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় ঘূর্ণায়মান থাকে। 

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়লে চাহিদা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক নিয়মে পণ্যের ওপর চাপ পড়ে। এতে দাম বেড়ে যায়। ফলে বাড়ে মূল্যস্ফীতির হার। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। 

বাজারে ইতোমধ্যে চাল, ডাল, আটা, শাকসবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। করোনার কারণে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বন্যার প্রভাব ও কারসাজির কারণে এগুলোর দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর বার্তাটি কাজ করেছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে টাকার প্রবাহ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

গত জুন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী জুনের মধ্যে তা ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উন্নত ও উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতি করোনার প্রভাব সীমিত করে লকডাউনের আওতা থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসছে। সচল হতে শুরু করেছে অর্থনৈতক কর্মকাণ্ড।

এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিও পুরোমাত্রায় সচলের দিকে এগুচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষে আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

ফলে অদূরভবিষ্যতে দেশের সার্বিক অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে পারে। 

সূত্র জানায়, করোনার প্রভাব মোকাবেলার জন্য ইতোমধ্যে বাজারে টাকার জোগান বাড়াতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কম সুদে ও সহজ শর্তে জোগান দেয়ার জন্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই জোগান দেয়া হচ্ছে ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের জমা অর্থের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বিধি-বিধানেও ছাড় দেয়া হয়েছে।

ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর টাকার প্রবাহ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

এসব অর্থ সহজ শর্তে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহজনিত মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। ফলে পণ্যমূল্যও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

যদিও ইতোমধ্যে বাজারে পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে। প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই ইতোমধ্যে বেড়েছে। এর প্রভাবে বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হারও।

গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগস্টে তা আরও বেড়ে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

যদিও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন পণ্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে এতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি হওয়ার কথা। 

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবেলা করতে টাকার জোগান বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

তবে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে ব্যাংকের মাধ্যমে যেসব টাকা বের হবে সেগুলো যাতে উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হয় এবং মেয়াদ শেষে ফেরৎ আসে।

উৎপাদন খাতের চেয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে বেশি টাকা গেলে, টাকা ফেরত না এলে বা বিদেশে পাচার হয়ে গেলে অর্থনীতিতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। 

তিনি আরও বলেন, মন্দার মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যেমন চমক বা ম্যাজিক দেখানোর সুযোগ থাকে, তেমনি কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এর সুফল ঘরে তুলতে হয়।

এটি বড় চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য কঠোর সুপারভিশন থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রাখতে হলে এখন রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে হবে।

এর জন্য বিদেশে জনশক্তি রফতানিও বাড়াতে হবে। করোনায় যেসব শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছে তাদের বিদেশে পাঠানো এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।