ডিবির এসআইয়ের সাজানো ফাঁদে অটোরিকশাচালক
jugantor
ডিবির এসআইয়ের সাজানো ফাঁদে অটোরিকশাচালক
অভিযোগ আড়াল করতে ভুক্তভোগীকে ভয়-ভীতি

  জাফর খান ও বিলাস দাস, পটুয়াখালী  

২০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালীতে ডিবি পুলিশের এসআই রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফের মাদকের অভিযান পরিচালনার নামে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ উঠেছে। তার সাজানো ‘আটকের নাটক’ ফাঁদে পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন কাওছার নামের এক অটোরিকশাচালক।

রফিকের আধা ঘণ্টার আলটিমেটামে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে শেষ রক্ষা হয়েছিল কাওছারের। কিন্তু তাৎক্ষণিক রফিকের দাবি মেটাতে একমাত্র আয়ের উৎস অটোরিকশাটিও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

পটুয়াখালী পৌর শহরের বিটাইপ বাজারে চায়ের দোকান করে সংসার চালান কাওছারের বাবা কামাল মাতব্বর। বিটাইপ বাজারের দক্ষিণ প্রান্তে বহাল গাছিয়া খালের তীরে সাবেক পটুয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মোশারফ মোল্লার জমিতে ঝুপড়ি উঠিয়ে বসবাস করে কাওছারের পরিবার। জানা যায়, বিটাইপ বাজার এলাকার অনিয়মিত মাদকসেবী রাসেলকে প্রভাবিত করে তার মাধ্যমে মাদক কেনার টাকা দেয়া হয় কাওছারকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাওছারের হাতে টাকা ধরিয়ে ইয়াবা কিনতে পাঠানো হয়।

ইয়াবা কিনে ফেরার পথে শহরের ব্যায়ামাগার চত্বরে পৌঁছালে এসআই রফিকের নেতৃত্বে একটি দল কাওছারকে আটক করে। এ সময় ডিবি পুলিশের চিহ্নিত সোর্স মাসুদের মাধ্যমে আটক কাওছারের বাবা কামালকে অবহিত করা হয়। নগদ এক লাখ টাকা হলে কাওছারকে ছেড়ে দেয়ার আলটিমেটাম দেয়া হয়।

ঘণ্টাব্যাপী রফাদফার একপর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা চুক্তি হলে মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয় কাওছারের বাবাকে। শেষমেশ এনজিওর ঋণের ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ছুটে আসেন কাওছারের মা মালেকাসহ প্রতিবেশীরা। ৩০ হাজার টাকায় সন্তুষ্ট না হলে প্রতিবেশী সাইফুলের কাছ থেকে আরও ২০ হাজার টাকা ধার করে ৫০ হাজার টাকায় কাওছারকে মুক্ত করা হয়।

বিটাইপের বাসিন্দা ডিবির কাজে সহযোগিতাকারী রাসেল বলেন, আমি কাওছারকে ফাঁসাইনি। কাওছারকে ডিবি পুলিশ আটক করেছিল। প্রথমে ৩০ হাজার ও পরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে তার বাবা-মা তাকে মুক্ত করেছেন। আমি আর কিছু জানি না।

কাওছারের মা মালেকা বেগম বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কাওছারকে ডিবি পুলিশের কাছ থেকে মুক্ত করেছি। ধার ও ঋণ পরিশোধের জন্য পাওনাদার নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে কাওছারের একমাত্র অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেই।

১৭ অক্টোবর বিকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্টেনোটাইপিস্ট খাদিজা ফোন দিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, আপনার কাছে কাওছারের মা যা বলেছেন তা উল্লেখ না করলে হয় না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাওছারের বাবাকে নানা মহল থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলতে। কাওছারের বাবাও তার মাকে ঘরে এসে চাপ দিচ্ছে।

কাওছারের বাবা কামাল মাতব্বর বলেন, ‘এডা নিয়া আমাগো তো কোন কমপ্লেইন নাই। এডা এলাকার পোলারা আমার ছেলেরে একটা ফাইলে হালাইছেলে। অ্যাহোন সমাধান হইছে। আমার তো কামাই কইরা খাইতে হইবে, আমারতো চলতে হাইবে। কোন ঝামেলায় যামু না।’

এদিকে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে এসআই রফিক শনিবার দুপুরে কাওছারের বাবাকে বিটাইপসংলগ্ন ডাক বিভাগ কলোনিতে নিয়ে যায়। ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে কাওছারের বাবার মুচলেকা (অনাপত্তি) বক্তব্য ভিডিও সংগ্রহ করে রফিক। ওই সময় হাতিয়ে নেয়া অর্থ ফেরত দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় কাওছারের বাবাকে।

কাওছার বলেন, ‘রোজার দু-তিন দিন আগে বিকাল বেলার ঘটনা। রাসেল টাহা দিয়া হ্যার লোকের ধারে আমারে মাল আনতে পাডাইছে। মাল লইয়া আওয়ার সময় ডিবি পুলিশ আমারে আটক করে। এরপর ৫০ হাজার টাহা লইয়া আমারে ছাড়ে। মায় সুপারি ছিললা টাহা আয় করছে। হেই কষ্টের টাকা লইয়া গেছে। ঘটনার পরে এলাকা ছারা আমি। মানের পাওনা টাহা দিতে আমার অটোরিকশা বিক্রি করছি।

আপনে আমার মায়ের লগে কতা কইছেন। তা শুনে বাপে মারে গালাগালি করে। পুলিশে বাপেরে কি যেন কইছে অ্যাহোন বাপে ভয় পাইছে। বাপ-মারে মানেও ভয়-ভীতি দেহায়। অটো নাই, কাজ-কাম নাই, তাই এলাকা ছারছি। আমি মাদকের সাথে জড়িত না। আমাকে ফাঁসানো হইছে।’

ওই অভিযানে থাকা ডিবির সদস্য ইব্রাহীম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি এমনিতে বিভিন্ন ঝামেলায় আছি বলে ফোন কেটে দেন। অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই রফিক বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর যাই হোক, মাদক ধরে ছেড়ে দিয়েছি এ রকম রেকর্ড আমার নেই। আমি মাদকের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করি বিধায় আমার পেছনে শত্রু লেগেছে।

ডিবির এসআইয়ের সাজানো ফাঁদে অটোরিকশাচালক

অভিযোগ আড়াল করতে ভুক্তভোগীকে ভয়-ভীতি
 জাফর খান ও বিলাস দাস, পটুয়াখালী 
২০ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালীতে ডিবি পুলিশের এসআই রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফের মাদকের অভিযান পরিচালনার নামে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ উঠেছে। তার সাজানো ‘আটকের নাটক’ ফাঁদে পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন কাওছার নামের এক অটোরিকশাচালক।

রফিকের আধা ঘণ্টার আলটিমেটামে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে শেষ রক্ষা হয়েছিল কাওছারের। কিন্তু তাৎক্ষণিক রফিকের দাবি মেটাতে একমাত্র আয়ের উৎস অটোরিকশাটিও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

পটুয়াখালী পৌর শহরের বিটাইপ বাজারে চায়ের দোকান করে সংসার চালান কাওছারের বাবা কামাল মাতব্বর। বিটাইপ বাজারের দক্ষিণ প্রান্তে বহাল গাছিয়া খালের তীরে সাবেক পটুয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মোশারফ মোল্লার জমিতে ঝুপড়ি উঠিয়ে বসবাস করে কাওছারের পরিবার। জানা যায়, বিটাইপ বাজার এলাকার অনিয়মিত মাদকসেবী রাসেলকে প্রভাবিত করে তার মাধ্যমে মাদক কেনার টাকা দেয়া হয় কাওছারকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাওছারের হাতে টাকা ধরিয়ে ইয়াবা কিনতে পাঠানো হয়।

ইয়াবা কিনে ফেরার পথে শহরের ব্যায়ামাগার চত্বরে পৌঁছালে এসআই রফিকের নেতৃত্বে একটি দল কাওছারকে আটক করে। এ সময় ডিবি পুলিশের চিহ্নিত সোর্স মাসুদের মাধ্যমে আটক কাওছারের বাবা কামালকে অবহিত করা হয়। নগদ এক লাখ টাকা হলে কাওছারকে ছেড়ে দেয়ার আলটিমেটাম দেয়া হয়।

ঘণ্টাব্যাপী রফাদফার একপর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা চুক্তি হলে মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয় কাওছারের বাবাকে। শেষমেশ এনজিওর ঋণের ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ছুটে আসেন কাওছারের মা মালেকাসহ প্রতিবেশীরা। ৩০ হাজার টাকায় সন্তুষ্ট না হলে প্রতিবেশী সাইফুলের কাছ থেকে আরও ২০ হাজার টাকা ধার করে ৫০ হাজার টাকায় কাওছারকে মুক্ত করা হয়।

বিটাইপের বাসিন্দা ডিবির কাজে সহযোগিতাকারী রাসেল বলেন, আমি কাওছারকে ফাঁসাইনি। কাওছারকে ডিবি পুলিশ আটক করেছিল। প্রথমে ৩০ হাজার ও পরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে তার বাবা-মা তাকে মুক্ত করেছেন। আমি আর কিছু জানি না।

কাওছারের মা মালেকা বেগম বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কাওছারকে ডিবি পুলিশের কাছ থেকে মুক্ত করেছি। ধার ও ঋণ পরিশোধের জন্য পাওনাদার নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে কাওছারের একমাত্র অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেই।

১৭ অক্টোবর বিকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্টেনোটাইপিস্ট খাদিজা ফোন দিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, আপনার কাছে কাওছারের মা যা বলেছেন তা উল্লেখ না করলে হয় না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাওছারের বাবাকে নানা মহল থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলতে। কাওছারের বাবাও তার মাকে ঘরে এসে চাপ দিচ্ছে।

কাওছারের বাবা কামাল মাতব্বর বলেন, ‘এডা নিয়া আমাগো তো কোন কমপ্লেইন নাই। এডা এলাকার পোলারা আমার ছেলেরে একটা ফাইলে হালাইছেলে। অ্যাহোন সমাধান হইছে। আমার তো কামাই কইরা খাইতে হইবে, আমারতো চলতে হাইবে। কোন ঝামেলায় যামু না।’

এদিকে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে এসআই রফিক শনিবার দুপুরে কাওছারের বাবাকে বিটাইপসংলগ্ন ডাক বিভাগ কলোনিতে নিয়ে যায়। ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে কাওছারের বাবার মুচলেকা (অনাপত্তি) বক্তব্য ভিডিও সংগ্রহ করে রফিক। ওই সময় হাতিয়ে নেয়া অর্থ ফেরত দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় কাওছারের বাবাকে।

কাওছার বলেন, ‘রোজার দু-তিন দিন আগে বিকাল বেলার ঘটনা। রাসেল টাহা দিয়া হ্যার লোকের ধারে আমারে মাল আনতে পাডাইছে। মাল লইয়া আওয়ার সময় ডিবি পুলিশ আমারে আটক করে। এরপর ৫০ হাজার টাহা লইয়া আমারে ছাড়ে। মায় সুপারি ছিললা টাহা আয় করছে। হেই কষ্টের টাকা লইয়া গেছে। ঘটনার পরে এলাকা ছারা আমি। মানের পাওনা টাহা দিতে আমার অটোরিকশা বিক্রি করছি।

আপনে আমার মায়ের লগে কতা কইছেন। তা শুনে বাপে মারে গালাগালি করে। পুলিশে বাপেরে কি যেন কইছে অ্যাহোন বাপে ভয় পাইছে। বাপ-মারে মানেও ভয়-ভীতি দেহায়। অটো নাই, কাজ-কাম নাই, তাই এলাকা ছারছি। আমি মাদকের সাথে জড়িত না। আমাকে ফাঁসানো হইছে।’

ওই অভিযানে থাকা ডিবির সদস্য ইব্রাহীম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি এমনিতে বিভিন্ন ঝামেলায় আছি বলে ফোন কেটে দেন। অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই রফিক বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর যাই হোক, মাদক ধরে ছেড়ে দিয়েছি এ রকম রেকর্ড আমার নেই। আমি মাদকের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করি বিধায় আমার পেছনে শত্রু লেগেছে।