চট্টগ্রামে হাহাকার বিচারপ্রার্থীদের
jugantor
চট্টগ্রামে হাহাকার বিচারপ্রার্থীদের
জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সোয়া ২ লাখ * বিচারক নিয়োগ, সার্কিট বেঞ্চ ও কোর্ট বৃদ্ধি করে সংকট নিরসনে প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি * ‘বিলম্বিত বিচারে ন্যায়বিচারবঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা’

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো  

২৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে বিচারপ্রার্থীদের হাহাকার বাড়ছে। আদালত ও বিচারক সংকট, চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল না-থাকাসহ নানা কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কবলে বিচারপ্রার্থীরা।

ফলে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রামে গত জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ২ লাখ ১৮ হাজারে। জজশিপে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতসহ অন্তত ১৪টি আদালতে বিচারক নেই বছরের পর বছর। একজন বিচারক চার্জে দায়িত্ব পালন করছেন একাধিক আদালতের। প্রতিদিন নতুন নতুন মামলা হচ্ছে। বিচারের জন্য মামলা প্রস্তুত হলেও মামলা আর নিষ্পত্তি হচ্ছে না। জমেছে মামলার পাহাড়। সৃষ্টি হচ্ছে জট।

এদিকে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে বেশ কিছু প্রস্তাবনা প্রধান বিচারপ্রতির কাছে পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে সৎ যোগ্য ও দক্ষ বিচারক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এএইচএম জিয়াউদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, ‘নানা সংকটে চট্টগ্রামের আদালতসমূহে বিচারপ্রার্থীদের হাহাকার চলছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আমরা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সংবলিত চিঠি প্রধান বিচারপতিকে দিয়েছি।

এতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছি। আশা করছি, বিচারপ্রার্থীদের কথা বিবেচনা করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়ে এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে ভার্চুয়াল বক্তব্যের মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়।’

চট্টগ্রামে যেসব আদালত বিচারকশূন্য রয়েছে তার মধ্যে বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩, অতিরিক্ত জেলা জজ দেউলিয়া আদালত, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালত, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালত, সহকারী জজ চন্দনাইশ আদালত (পটিয়া চৌকি), সহকারী জজ অতিরিক্ত আদালত, পটিয়া চৌকি, সহকারী জজ অতিরিক্ত আদালত সাতকানিয়া চৌকি, সহকারী জজ লোহাগাড়া আদালত সাতকানিয়া চৌকি, অতিরিক্ত জেলা জজ বাঁশখালী আদালত, বাঁশখালী চৌকি, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২য় আদালত, চট্টগ্রাম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বন আদালত, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৪র্থ আদালত, চট্টগ্রাম। প্রধান বিচারপতির কাছে জেলা আইনজীবী সমিতির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে সর্বজনবিদিত চট্টগ্রাম।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা চট্টগ্রামের আদালতসমূহে বিচার ও নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের জজশিপের ১৪টি আদালতে দীর্ঘদিন বিচারকের পদ শূন্য থাকায় বিচারপ্রার্থীরা চরম দুর্ভোগের শিকার ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সার্বিক বিচারকার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে (জুন-২০২০ পর্যন্ত) চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীন ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৬টি মামলা বিচারাধীন। মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৪ হাজার ৫২২টি। মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ৩৫ হাজার ১৫৯টি, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৩ হাজার ৫১২টি মামলা বিচারাধীন।

পক্ষান্তরে মুখ্য মহানগর হাকিম (মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে ৩৫ হাজার ১৫৯টি মামলার বিপরীতে বিচারক আছেন মাত্র ৮ জন। গড়ে প্রতি মাসে বিচারকপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি মামলা পরিচালনা করতে হয়। যার ফলে মামলাজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মুখ্য মহানগর হাকিম বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আরও ৩টি কোর্ট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মামলার সংখ্যা অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এখতিয়ারাধীন যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী জজ আদালতের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী জজ আদালতের সংখ্যা ন্যূনতম ৪টি করে মোট ৮টি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করে জেলা আইনজীবী সমিতি। এনআই অ্যাক্টের (চেকের) মামলা পরিচালনার জন্য জেলা এবং মহানগর পর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজপদ মর্যাদার ২টি ভিন্ন ভিন্ন আদালতকে দায়িত্ব দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করে সমিতি।

সমিতি বলছে, চট্টগ্রামে কোনো সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল নাই। সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত মামলাসমূহ দায়ের করার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। যা বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ এবং হয়রানিমূলক। সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে যথাসময়ে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চট্টগ্রামে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল স্থাপন আবশ্যক বলেও জানিয়েছেন আইনজীবী সমিতির নেতারা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট সানোয়ার আহমেদ লাভলু যুগান্তরকে বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের দুর্নীতি সংক্রান্ত সব মামলার বিচারিক কার্যক্রম হয় এই আদালতে।

কিন্তু এই আদালত এক বছর ৯ মাস ধরে বিচারক শূন্য। জেলা জজ (ইসমাইল হোসেন) মহোদয় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি করেন। বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার বাদী-বিবাদীসহ বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

একইভাবে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি সংক্রান্ত অনেক ঘটনা আমরা উদ্ঘাটন করছি। মামলাও হচ্ছে। কিন্তু বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে আমাদের অর্জনও চাপা পড়ে যাচ্ছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই আদালতে বিচারক নিয়োগ জরুরি। এই আদালতে সাড়ে ৯শ’ মামলা বিচারাধীন আছে বলে জানান পেশকার সাইফুদ্দিন পারভেজ।

চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম সেন্টু যুগান্তরকে বলেন, তিনি ৭ বছর এই আদালতের সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সাত বছরের মধ্যে মাত্র আড়াই বছর তিনি বিচারক পেয়েছেন। বাকি সাড়ে চার বছরই বিচারকশূন্য ছিল। সর্বশেষ বিচারক হিসাবে মার্চে বিদায় নেন জান্নাতুল ফেরদৌস আলেয়া।

তার আদালতে আড়াই হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। ‘বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’-বিষয়টি মাথায় রেখে আদালতে বিচারক নিয়োগ দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী এসএম মোরেশদ যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু জেলা জজ আদালতেই ২০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের মামলাও পরিচালনা করতে হয় জেলা জজ মহোদয়কে। একদিকে মামলার চাপ অন্যদিকে সময়ের স্বল্পতা-এই দুই কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিচার কাজ ত্বরান্বিত করা যাচ্ছে না। সূত্র জানায়, জেলা জজের অধীন ৪৫টি আদালতে ৪১ জন বিচারক রয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকই মহিলা। তাদের অনেকেই মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা ছুটিতে থাকেন। এ কারণে এসব আদালতে বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়।

সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের দাবি: সার্কিট বেঞ্চ বাস্তবায়ন পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮২ সালের ১১ মে চট্টগ্রামে হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই মামলা নিয়ে চট্টগ্রামের বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করতে হতো না।

কিন্তু ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ সংক্রান্ত অষ্টম সংশোধনীর ২(ক) অনুচ্ছেদটি বাতিলের আদেশ দিলে চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা ও সিলেটের হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো ঢাকায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকে সার্কিট বেঞ্চ ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অনেক উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে সার্কিট বেঞ্চ আছে।

চট্টগ্রামে হাহাকার বিচারপ্রার্থীদের

জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সোয়া ২ লাখ * বিচারক নিয়োগ, সার্কিট বেঞ্চ ও কোর্ট বৃদ্ধি করে সংকট নিরসনে প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি * ‘বিলম্বিত বিচারে ন্যায়বিচারবঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা’
 শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো 
২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে বিচারপ্রার্থীদের হাহাকার বাড়ছে। আদালত ও বিচারক সংকট, চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল না-থাকাসহ নানা কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কবলে বিচারপ্রার্থীরা।

ফলে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রামে গত জুন পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ২ লাখ ১৮ হাজারে। জজশিপে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতসহ অন্তত ১৪টি আদালতে বিচারক নেই বছরের পর বছর। একজন বিচারক চার্জে দায়িত্ব পালন করছেন একাধিক আদালতের। প্রতিদিন নতুন নতুন মামলা হচ্ছে। বিচারের জন্য মামলা প্রস্তুত হলেও মামলা আর নিষ্পত্তি হচ্ছে না। জমেছে মামলার পাহাড়। সৃষ্টি হচ্ছে জট।

এদিকে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে বেশ কিছু প্রস্তাবনা প্রধান বিচারপ্রতির কাছে পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে সৎ যোগ্য ও দক্ষ বিচারক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এএইচএম জিয়াউদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, ‘নানা সংকটে চট্টগ্রামের আদালতসমূহে বিচারপ্রার্থীদের হাহাকার চলছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আমরা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সংবলিত চিঠি প্রধান বিচারপতিকে দিয়েছি।

এতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছি। আশা করছি, বিচারপ্রার্থীদের কথা বিবেচনা করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়ে এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে ভার্চুয়াল বক্তব্যের মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়।’

চট্টগ্রামে যেসব আদালত বিচারকশূন্য রয়েছে তার মধ্যে বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩, অতিরিক্ত জেলা জজ দেউলিয়া আদালত, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালত, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালত, সহকারী জজ চন্দনাইশ আদালত (পটিয়া চৌকি), সহকারী জজ অতিরিক্ত আদালত, পটিয়া চৌকি, সহকারী জজ অতিরিক্ত আদালত সাতকানিয়া চৌকি, সহকারী জজ লোহাগাড়া আদালত সাতকানিয়া চৌকি, অতিরিক্ত জেলা জজ বাঁশখালী আদালত, বাঁশখালী চৌকি, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২য় আদালত, চট্টগ্রাম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বন আদালত, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৪র্থ আদালত, চট্টগ্রাম। প্রধান বিচারপতির কাছে জেলা আইনজীবী সমিতির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে সর্বজনবিদিত চট্টগ্রাম।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা চট্টগ্রামের আদালতসমূহে বিচার ও নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের জজশিপের ১৪টি আদালতে দীর্ঘদিন বিচারকের পদ শূন্য থাকায় বিচারপ্রার্থীরা চরম দুর্ভোগের শিকার ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সার্বিক বিচারকার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে (জুন-২০২০ পর্যন্ত) চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীন ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৬টি মামলা বিচারাধীন। মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৪ হাজার ৫২২টি। মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ৩৫ হাজার ১৫৯টি, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৩ হাজার ৫১২টি মামলা বিচারাধীন।

পক্ষান্তরে মুখ্য মহানগর হাকিম (মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে ৩৫ হাজার ১৫৯টি মামলার বিপরীতে বিচারক আছেন মাত্র ৮ জন। গড়ে প্রতি মাসে বিচারকপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি মামলা পরিচালনা করতে হয়। যার ফলে মামলাজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মুখ্য মহানগর হাকিম বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আরও ৩টি কোর্ট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মামলার সংখ্যা অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এখতিয়ারাধীন যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী জজ আদালতের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী জজ আদালতের সংখ্যা ন্যূনতম ৪টি করে মোট ৮টি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করে জেলা আইনজীবী সমিতি। এনআই অ্যাক্টের (চেকের) মামলা পরিচালনার জন্য জেলা এবং মহানগর পর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজপদ মর্যাদার ২টি ভিন্ন ভিন্ন আদালতকে দায়িত্ব দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করে সমিতি।

সমিতি বলছে, চট্টগ্রামে কোনো সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল নাই। সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত মামলাসমূহ দায়ের করার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। যা বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ এবং হয়রানিমূলক। সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে যথাসময়ে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চট্টগ্রামে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল স্থাপন আবশ্যক বলেও জানিয়েছেন আইনজীবী সমিতির নেতারা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট সানোয়ার আহমেদ লাভলু যুগান্তরকে বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের দুর্নীতি সংক্রান্ত সব মামলার বিচারিক কার্যক্রম হয় এই আদালতে।

কিন্তু এই আদালত এক বছর ৯ মাস ধরে বিচারক শূন্য। জেলা জজ (ইসমাইল হোসেন) মহোদয় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি করেন। বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার বাদী-বিবাদীসহ বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

একইভাবে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি সংক্রান্ত অনেক ঘটনা আমরা উদ্ঘাটন করছি। মামলাও হচ্ছে। কিন্তু বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে আমাদের অর্জনও চাপা পড়ে যাচ্ছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই আদালতে বিচারক নিয়োগ জরুরি। এই আদালতে সাড়ে ৯শ’ মামলা বিচারাধীন আছে বলে জানান পেশকার সাইফুদ্দিন পারভেজ।

চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম সেন্টু যুগান্তরকে বলেন, তিনি ৭ বছর এই আদালতের সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সাত বছরের মধ্যে মাত্র আড়াই বছর তিনি বিচারক পেয়েছেন। বাকি সাড়ে চার বছরই বিচারকশূন্য ছিল। সর্বশেষ বিচারক হিসাবে মার্চে বিদায় নেন জান্নাতুল ফেরদৌস আলেয়া।

তার আদালতে আড়াই হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। ‘বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’-বিষয়টি মাথায় রেখে আদালতে বিচারক নিয়োগ দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী এসএম মোরেশদ যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু জেলা জজ আদালতেই ২০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের মামলাও পরিচালনা করতে হয় জেলা জজ মহোদয়কে। একদিকে মামলার চাপ অন্যদিকে সময়ের স্বল্পতা-এই দুই কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিচার কাজ ত্বরান্বিত করা যাচ্ছে না। সূত্র জানায়, জেলা জজের অধীন ৪৫টি আদালতে ৪১ জন বিচারক রয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকই মহিলা। তাদের অনেকেই মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা ছুটিতে থাকেন। এ কারণে এসব আদালতে বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়।

সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের দাবি: সার্কিট বেঞ্চ বাস্তবায়ন পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮২ সালের ১১ মে চট্টগ্রামে হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই মামলা নিয়ে চট্টগ্রামের বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করতে হতো না।

কিন্তু ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ সংক্রান্ত অষ্টম সংশোধনীর ২(ক) অনুচ্ছেদটি বাতিলের আদেশ দিলে চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা ও সিলেটের হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো ঢাকায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকে সার্কিট বেঞ্চ ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অনেক উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে সার্কিট বেঞ্চ আছে।