হেরোইন আত্মসাতে হত্যা পুলিশের
jugantor
রাজশাহীর আদালতে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি
হেরোইন আত্মসাতে হত্যা পুলিশের

  রাজশাহী ব্যুরো  

০১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হেরোইন আত্মসাতের জন্য রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার পাঁচ পুলিশ সদস্য রফিকুল ইসলাম নামে একজনকে হত্যা করেছেন। শুক্রবার রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল মাহমুদের আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন হত্যা মামলার আসামি ইসাহাক আলী ওরফে ইসা। নিহত রফিকুল ও ইসা দুজনই মাদক ব্যবসায়ী।

১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে গোদাগাড়ী থানার এসআই মিজানুর রহমান, আবদুল মান্নান ও রেজাউল ইসলাম এবং কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও শফিকুল ইসলামের নাম এসেছে। এর মধ্যে এসআই মিজানুর ও একজন কনস্টেবল ছাড়া বাকিরা অন্যত্র বদলি হয়েছেন।

জানা যায়, ২২ মার্চ গোদাগাড়ীর দেওয়ানপাড়া পদ্মার চরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পোলাডাঙ্গা গাইনপাড়া গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে রফিকুল ইসলামের লাশ পাওয়া যায়। পরে থানা পুলিশ বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন ১৭ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আবদুল মালেকের ছেলে শরিফুল ইসলাম ও একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে জামাল উদ্দিনকে আসামি করে গোদাগাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআই’র এসআই জামাল উদ্দিন ২৮ অক্টোবর গোদাগাড়ীর মাদারপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে ইসাহাক আলী ইসা, একই গ্রামের আজিজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম ও আজাদ আলীর ছেলে মাহাবুব আলীকে গ্রেফতার করেন। পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে রাতভর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে ইসাহাক আলী ইসা তদন্ত কর্মকর্তাকে রফিকুল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সব খুলে বলেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেও রাজি হন তিনি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইসা তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার কিছুদিন আগে হেরোইন পাঠানোর জন্য তিনি ভারতের মুর্শিদাবাদের কাশেম নামে এক ব্যক্তিকে দুই লাখ টাকা দেন। কিন্তু কাশেম তাকে নকল হেরোইন পাঠায়। এরপর টাকা ফেরত চাইলে কাশেম তাকে আসল হেরোইন পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ইসা ১০০ গ্রামের বদলে কাশেমের কাছ থেকে বাকিতে আরও ৪০০ গ্রামসহ মোট ৫০০ গ্রাম হেরোইন দাবি করেন। মাল আসার দিনক্ষণ ঠিক হলে কাশেমকে ঠকানোর জন্য গোদাগাড়ী থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইসা। পরিকল্পনা হয়- যে মাল আসবে তা তিনি ধরিয়ে দেবেন, বিনিময়ে তাকে নগদ দুই লাখ টাকা দিতে হবে। বাকি মাল পুলিশ বিক্রি করলে ১৫ লাখ টাকা পাবে। আসল হেরোইন কেড়ে নিয়ে নকল হেরোইন দিয়ে দুই বাহককে চালান দিলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে। ২১ মার্চ রাতে দুই বাহক রফিকুল ও জামাল ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ী কাশেমের দেয়া ৫০০ গ্রাম হেরোইন নিয়ে পদ্মা নদীতে নৌকা থেকে নেমে ঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় গোদাগাড়ী থানার অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য তাদের ধরে ফেলেন। রফিকুলের কাছে থাকা হেরোইন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশ রফিকুলকে বেধড়ক মারধর করে। কিছুক্ষণ পর রফিকুল হাত পা ছেড়ে দিয়ে বালুর ওপর পড়ে যায়। পরে পুলিশের দলটি নিশ্চিত হয়, রফিকুল মারা গেছে।

ইসা জবানবন্দিতে আরও বলেন, এরপরই পুলিশ কর্মকর্তারা ঘাবড়ে যান। তারা সবাই মিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, জামালকে নকল হেরোইনের মামলা দিয়ে রফিকুলকে পলাতক দেখানো হবে। এরপর পুলিশ চরের মধ্যে রফিকুলের লাশ ফেলে দিয়ে জামালকে নিয়ে থানায় চলে যায়। ইসা আদালতে আরও বলেন, রফিকুল মারা গেছেন দেখে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পুলিশ কথা অনুযায়ী তাকে টাকা দেয়নি। তিনিও আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরে জানতে পারেন রফিকুল বজ পাতে মারা গেছেন বলে থানার কাগজপত্রে লেখা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, এই মামলায় রফিকুলের সঙ্গী জামালকেও গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তবে এজাহারভুক্ত আসামি শরিফুল এখনও পলাতক রয়েছে। আদালতের কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

রাজশাহী পিবিআই’র একজন কর্মকর্তা জানান, তারা রফিকুলের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখতে পান গুরুতর আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জামালের নামে দায়ের করা মাদক মামলাটিতে রফিকুলকে পলাতক আসামি করার ঘটনাটি ছিল রহস্যজনক। কারণ যে রাতে (২১ মার্চ) পলাতক আসামি করা হল, পরের দিন সকালেই তার লাশ মিলেছে।

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী থানার ওসি খাইরুল ইসলাম জানান, তিনি গোদাগাড়ীতে যোগ দেয়ার কয়েকদিন পরই পদ্মার চরে রফিকুলের লাশ পাওয়া যায়। তিনি বজ পাতে মারা গেছেন বলে প্রথমে শোনেন। এরপর হত্যা মামলা হলে জামালকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর কয়েকদিন পরই মামলাটি পিবিআইতে চলে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমি রাজশাহী আসার আগের। আমি কিছু বলতে পারছি না। কেউ জবানবন্দিতে পুলিশের নাম দিলেই যে পুলিশ জড়িত, সেটাও বলা যাবে না। আবার পুলিশ জড়িত নয়, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। জবানবন্দির নথিপত্র দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাজশাহীর আদালতে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

হেরোইন আত্মসাতে হত্যা পুলিশের

 রাজশাহী ব্যুরো 
০১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হেরোইন আত্মসাতের জন্য রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার পাঁচ পুলিশ সদস্য রফিকুল ইসলাম নামে একজনকে হত্যা করেছেন। শুক্রবার রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল মাহমুদের আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন হত্যা মামলার আসামি ইসাহাক আলী ওরফে ইসা। নিহত রফিকুল ও ইসা দুজনই মাদক ব্যবসায়ী।

১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে গোদাগাড়ী থানার এসআই মিজানুর রহমান, আবদুল মান্নান ও রেজাউল ইসলাম এবং কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও শফিকুল ইসলামের নাম এসেছে। এর মধ্যে এসআই মিজানুর ও একজন কনস্টেবল ছাড়া বাকিরা অন্যত্র বদলি হয়েছেন।

জানা যায়, ২২ মার্চ গোদাগাড়ীর দেওয়ানপাড়া পদ্মার চরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পোলাডাঙ্গা গাইনপাড়া গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে রফিকুল ইসলামের লাশ পাওয়া যায়। পরে থানা পুলিশ বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে রফিকুলের স্ত্রী রুমিসা খাতুন ১৭ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আবদুল মালেকের ছেলে শরিফুল ইসলাম ও একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে জামাল উদ্দিনকে আসামি করে গোদাগাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআই’র এসআই জামাল উদ্দিন ২৮ অক্টোবর গোদাগাড়ীর মাদারপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে ইসাহাক আলী ইসা, একই গ্রামের আজিজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম ও আজাদ আলীর ছেলে মাহাবুব আলীকে গ্রেফতার করেন। পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে রাতভর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে ইসাহাক আলী ইসা তদন্ত কর্মকর্তাকে রফিকুল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সব খুলে বলেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেও রাজি হন তিনি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইসা তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ঘটনার কিছুদিন আগে হেরোইন পাঠানোর জন্য তিনি ভারতের মুর্শিদাবাদের কাশেম নামে এক ব্যক্তিকে দুই লাখ টাকা দেন। কিন্তু কাশেম তাকে নকল হেরোইন পাঠায়। এরপর টাকা ফেরত চাইলে কাশেম তাকে আসল হেরোইন পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ইসা ১০০ গ্রামের বদলে কাশেমের কাছ থেকে বাকিতে আরও ৪০০ গ্রামসহ মোট ৫০০ গ্রাম হেরোইন দাবি করেন। মাল আসার দিনক্ষণ ঠিক হলে কাশেমকে ঠকানোর জন্য গোদাগাড়ী থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইসা। পরিকল্পনা হয়- যে মাল আসবে তা তিনি ধরিয়ে দেবেন, বিনিময়ে তাকে নগদ দুই লাখ টাকা দিতে হবে। বাকি মাল পুলিশ বিক্রি করলে ১৫ লাখ টাকা পাবে। আসল হেরোইন কেড়ে নিয়ে নকল হেরোইন দিয়ে দুই বাহককে চালান দিলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে। ২১ মার্চ রাতে দুই বাহক রফিকুল ও জামাল ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ী কাশেমের দেয়া ৫০০ গ্রাম হেরোইন নিয়ে পদ্মা নদীতে নৌকা থেকে নেমে ঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় গোদাগাড়ী থানার অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য তাদের ধরে ফেলেন। রফিকুলের কাছে থাকা হেরোইন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশ রফিকুলকে বেধড়ক মারধর করে। কিছুক্ষণ পর রফিকুল হাত পা ছেড়ে দিয়ে বালুর ওপর পড়ে যায়। পরে পুলিশের দলটি নিশ্চিত হয়, রফিকুল মারা গেছে।

ইসা জবানবন্দিতে আরও বলেন, এরপরই পুলিশ কর্মকর্তারা ঘাবড়ে যান। তারা সবাই মিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, জামালকে নকল হেরোইনের মামলা দিয়ে রফিকুলকে পলাতক দেখানো হবে। এরপর পুলিশ চরের মধ্যে রফিকুলের লাশ ফেলে দিয়ে জামালকে নিয়ে থানায় চলে যায়। ইসা আদালতে আরও বলেন, রফিকুল মারা গেছেন দেখে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পুলিশ কথা অনুযায়ী তাকে টাকা দেয়নি। তিনিও আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরে জানতে পারেন রফিকুল বজ পাতে মারা গেছেন বলে থানার কাগজপত্রে লেখা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, এই মামলায় রফিকুলের সঙ্গী জামালকেও গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তবে এজাহারভুক্ত আসামি শরিফুল এখনও পলাতক রয়েছে। আদালতের কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

রাজশাহী পিবিআই’র একজন কর্মকর্তা জানান, তারা রফিকুলের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখতে পান গুরুতর আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জামালের নামে দায়ের করা মাদক মামলাটিতে রফিকুলকে পলাতক আসামি করার ঘটনাটি ছিল রহস্যজনক। কারণ যে রাতে (২১ মার্চ) পলাতক আসামি করা হল, পরের দিন সকালেই তার লাশ মিলেছে।

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী থানার ওসি খাইরুল ইসলাম জানান, তিনি গোদাগাড়ীতে যোগ দেয়ার কয়েকদিন পরই পদ্মার চরে রফিকুলের লাশ পাওয়া যায়। তিনি বজ পাতে মারা গেছেন বলে প্রথমে শোনেন। এরপর হত্যা মামলা হলে জামালকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর কয়েকদিন পরই মামলাটি পিবিআইতে চলে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমি রাজশাহী আসার আগের। আমি কিছু বলতে পারছি না। কেউ জবানবন্দিতে পুলিশের নাম দিলেই যে পুলিশ জড়িত, সেটাও বলা যাবে না। আবার পুলিশ জড়িত নয়, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। জবানবন্দির নথিপত্র দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।