‘মিশ্রণ মিল’র লাইসেন্স পাচ্ছেন মূল হোতা
jugantor
সিলেটে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল কেলেঙ্কারি
‘মিশ্রণ মিল’র লাইসেন্স পাচ্ছেন মূল হোতা

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট  

২৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে পুষ্টিচাল মিশ্রণ কার্যক্রমের নীতিমালা লঙ্ঘন, চুক্তিভঙ্গ, চাল সরবরাহে অনিয়ম, অবৈধ মজুদ ও আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল এক মিল মালিকের।

কিন্তু কারসাজির মাধ্যমে নাম পরিবর্তনের পর একই ব্যক্তিকে পুষ্টিচাল মিশ্রণ মিল স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে খাদ্য অধিদফতর। এতে খাদ্য বিভাগের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারের তরফ থেকে বরাদ্দ বিশেষ পুষ্টিচাল চুরির ঘটনায় জড়িত ওই ব্যবসায়ীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল খাদ্য অধিদফতর। ওই ঘটনায় এই ব্যবসায়ী গ্রেফতার হন এবং কারাবাস করেন। তার মালিকানাধীন মিলের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়।

কিন্তু কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে তিনি কৌশলে অন্য দুই উপজেলা থেকে ভিন্ন দুই প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে আবারও পুষ্টিচাল কার্যক্রমে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এমন চাঞ্চল্যকর কাণ্ড ঘটিয়েছেন সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ তথ্য। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে ১৫ নভেম্বর ওই দুটি মিলের ভেলিডেশন কার্যক্রম আপাতত স্থগিতের নির্দেশ দেন খাদ্য অধিদফতরের সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. আফিফ আল মাহমুদ ভূঞা।

উল্লেখ্য, একশ’ চালের মধ্যে একটি ১টি ‘কার্নেল’ মেশানো হয়। কার্নেল হচ্ছে ছয়টি উপাদানের সম্মিলিত রূপ। যেমন: ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি-১, ভিটামিন-বি-৯, ভিটামিন-বি-১২, জিংক ও আয়রন। এর মাধ্যমে চালকে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ করার যে মিল সেটাই ‘মিশন মিল’।

জানা গেছে, সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিল থেকে ২৬ এপ্রিল ৫৭০ বস্তা ১০ টাকা দরের ওএমএসের পুষ্টিচাল কালোবাজারির মাধ্যমে বিক্রির জন্য জকিগঞ্জে পাঠানো হয়। মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম বিক্রির জন্য ওই চাল জকিগঞ্জের কালীগঞ্জ বাজারের একটি গুদামে পাঠান।

চোরাই পথে ওই চাল খালাস করার সময় জনতা হাতেনাতে ধরে ফেলে। এ সময় উত্তেজিত জনতা ট্রাক থেকে কিছু চাল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ৩৪৬ বস্তা চাল উদ্ধার করে পুলিশ। তবে ২২৪ বস্তা চাল গায়েব হয়ে যায়। গায়েব হওয়া চালের কোনো হদিস মেলেনি।

চাল লুটের ঘটনায় ওইদিনই জকিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মামলা করেন। মামলায় মেঘনা অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম, ট্রাকচালক, সহকারী, দু’জন ডিলার এবং স্থানীয় দু’জনসহ মোট নয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বর্তমানে তারা সবাই জামিনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জকিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুশাংকর পাল। তবে গায়েব হওয়া চালের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

খাদ্য অধিদফতরের যেই পরিচালক ওই ব্যবসায়ীকে নতুন কাজের জন্য তালিকাভুক্ত করেছেন, তিনি হলেন সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের পরিচালক আমজাদ হোসেন। ২২ অক্টোবর আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে দুটি শর্তে ২১ মিশ্রণ মিল স্থাপনের অনুমোদন দেন।

ওই ২১টির তালিকায় শফিকুলের সুনামগঞ্জের ছাতকের রহমান অটো রাইস মিল ও সিলেটের শেখের হাটের এমএ আহাদ অটো রাইস মিলের নাম রয়েছে।

এ ব্যাপারে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সিলেটের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, কালো তালিকাভুক্ত মেঘনা অটো রাইস মিলের শফিকুলই ওই দুটি মিলের মালিক। এ কথা জানার পর এগুলো বাতিল করা হয়েছে। গায়েব হওয়া ২২৪ বস্তা চালের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনার পর আমি সিলেটে এসেছি। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এটা বলতে পারবেন।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের তদন্তে মেঘনা অটো রাইস মিলের লাইসেন্স বাতিল করে মালিক শফিকুলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। আমাদের কাছে জামানত রেখে চাল নিয়েছিল। দায়ভার সম্পূর্ণ তার। সুতরাং এখানে সরকারের কোনো ক্ষতি নেই।

সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিল, সুনামগঞ্জের ছাতকের রহমান অটো রাইস মিল ও সিলেটের শেখের ঘাটের এমএ আহাদ অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, অনুমোদন পাইনি। যে দুটি মিলের নামে আবেদন করেছিলাম, এর একটি আমার বড় ভাইয়ের নামে পাওয়ার দেয়া আছে। অপরটি আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম।

অধিদফতরে যখন অভিযোগ গেল তখন তারা বলল: ওনার নামে যেহেতু মামলা আছে সেহেতু ওনাকে দেয়া যাবে না। শফিকুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আদালত থেকে এখনও আমি দোষী সাব্যস্ত হইনি। আর মেঘনা অটো রাইস মিলের মামলার পর থেকে আমি সিলেটে পুষ্টির ব্যবসা বন্ধ রেখেছি। গায়েব হওয়া ২২৪ বস্তা চালের জন্য আদালতে সিআর মামলা করেছেন বলেও জানান শফিকুল।

সিলেটে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল কেলেঙ্কারি

‘মিশ্রণ মিল’র লাইসেন্স পাচ্ছেন মূল হোতা

 ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট 
২৬ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে পুষ্টিচাল মিশ্রণ কার্যক্রমের নীতিমালা লঙ্ঘন, চুক্তিভঙ্গ, চাল সরবরাহে অনিয়ম, অবৈধ মজুদ ও আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল এক মিল মালিকের।

কিন্তু কারসাজির মাধ্যমে নাম পরিবর্তনের পর একই ব্যক্তিকে পুষ্টিচাল মিশ্রণ মিল স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে খাদ্য অধিদফতর। এতে খাদ্য বিভাগের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারের তরফ থেকে বরাদ্দ বিশেষ পুষ্টিচাল চুরির ঘটনায় জড়িত ওই ব্যবসায়ীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল খাদ্য অধিদফতর। ওই ঘটনায় এই ব্যবসায়ী গ্রেফতার হন এবং কারাবাস করেন। তার মালিকানাধীন মিলের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়।

কিন্তু কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে তিনি কৌশলে অন্য দুই উপজেলা থেকে ভিন্ন দুই প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে আবারও পুষ্টিচাল কার্যক্রমে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এমন চাঞ্চল্যকর কাণ্ড ঘটিয়েছেন সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ তথ্য। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে ১৫ নভেম্বর ওই দুটি মিলের ভেলিডেশন কার্যক্রম আপাতত স্থগিতের নির্দেশ দেন খাদ্য অধিদফতরের সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. আফিফ আল মাহমুদ ভূঞা।

উল্লেখ্য, একশ’ চালের মধ্যে একটি ১টি ‘কার্নেল’ মেশানো হয়। কার্নেল হচ্ছে ছয়টি উপাদানের সম্মিলিত রূপ। যেমন: ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি-১, ভিটামিন-বি-৯, ভিটামিন-বি-১২, জিংক ও আয়রন। এর মাধ্যমে চালকে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ করার যে মিল সেটাই ‘মিশন মিল’।

জানা গেছে, সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিল থেকে ২৬ এপ্রিল ৫৭০ বস্তা ১০ টাকা দরের ওএমএসের পুষ্টিচাল কালোবাজারির মাধ্যমে বিক্রির জন্য জকিগঞ্জে পাঠানো হয়। মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম বিক্রির জন্য ওই চাল জকিগঞ্জের কালীগঞ্জ বাজারের একটি গুদামে পাঠান।

চোরাই পথে ওই চাল খালাস করার সময় জনতা হাতেনাতে ধরে ফেলে। এ সময় উত্তেজিত জনতা ট্রাক থেকে কিছু চাল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ৩৪৬ বস্তা চাল উদ্ধার করে পুলিশ। তবে ২২৪ বস্তা চাল গায়েব হয়ে যায়। গায়েব হওয়া চালের কোনো হদিস মেলেনি।

চাল লুটের ঘটনায় ওইদিনই জকিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মামলা করেন। মামলায় মেঘনা অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম, ট্রাকচালক, সহকারী, দু’জন ডিলার এবং স্থানীয় দু’জনসহ মোট নয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বর্তমানে তারা সবাই জামিনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জকিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুশাংকর পাল। তবে গায়েব হওয়া চালের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

খাদ্য অধিদফতরের যেই পরিচালক ওই ব্যবসায়ীকে নতুন কাজের জন্য তালিকাভুক্ত করেছেন, তিনি হলেন সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের পরিচালক আমজাদ হোসেন। ২২ অক্টোবর আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে দুটি শর্তে ২১ মিশ্রণ মিল স্থাপনের অনুমোদন দেন।

ওই ২১টির তালিকায় শফিকুলের সুনামগঞ্জের ছাতকের রহমান অটো রাইস মিল ও সিলেটের শেখের হাটের এমএ আহাদ অটো রাইস মিলের নাম রয়েছে।

এ ব্যাপারে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সিলেটের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, কালো তালিকাভুক্ত মেঘনা অটো রাইস মিলের শফিকুলই ওই দুটি মিলের মালিক। এ কথা জানার পর এগুলো বাতিল করা হয়েছে। গায়েব হওয়া ২২৪ বস্তা চালের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনার পর আমি সিলেটে এসেছি। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এটা বলতে পারবেন।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের তদন্তে মেঘনা অটো রাইস মিলের লাইসেন্স বাতিল করে মালিক শফিকুলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। আমাদের কাছে জামানত রেখে চাল নিয়েছিল। দায়ভার সম্পূর্ণ তার। সুতরাং এখানে সরকারের কোনো ক্ষতি নেই।

সিলেটের মেঘনা অটো রাইস মিল, সুনামগঞ্জের ছাতকের রহমান অটো রাইস মিল ও সিলেটের শেখের ঘাটের এমএ আহাদ অটো রাইস মিলের মালিক শফিকুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, অনুমোদন পাইনি। যে দুটি মিলের নামে আবেদন করেছিলাম, এর একটি আমার বড় ভাইয়ের নামে পাওয়ার দেয়া আছে। অপরটি আমরা ভাড়া নিয়েছিলাম।

অধিদফতরে যখন অভিযোগ গেল তখন তারা বলল: ওনার নামে যেহেতু মামলা আছে সেহেতু ওনাকে দেয়া যাবে না। শফিকুল নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আদালত থেকে এখনও আমি দোষী সাব্যস্ত হইনি। আর মেঘনা অটো রাইস মিলের মামলার পর থেকে আমি সিলেটে পুষ্টির ব্যবসা বন্ধ রেখেছি। গায়েব হওয়া ২২৪ বস্তা চালের জন্য আদালতে সিআর মামলা করেছেন বলেও জানান শফিকুল।