সাজানো মামলায় হয়রানির শিকার হাজারও মানুষ
jugantor
নয়া হাতিয়ার মানব পাচারের ঘটনা
সাজানো মামলায় হয়রানির শিকার হাজারও মানুষ
হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি * কোটি টাকার লুট ঠেকাতে গিয়ে আসামি বোরহানুদ্দীন কলেজের অধ্যাপক

  যুগান্তর রিপোর্ট, ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি  

০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভুয়া মামলা করে নিরীহ মানুষকে হয়রানির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে বেছে নেয়া হচ্ছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে মামলাগুলো করে।

কিছু দুষ্ট লোকের পাশাপাশি আইনজীবী এবং অসৎ পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িত এই সিন্ডিকেটে। তারা মামলায় ফাঁসিয়ে কথিত আসামিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা, জমি ও সোনা-গয়না হাতিয়ে নেয়।

যারা চাহিদা মতো অর্থ দিতে পারে না, তাদের মাসের পর মাস টানতে হয় জেলের ঘানি। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানেও ভুয়া এবং মিথ্যা মামলায় নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে।

এছাড়া এমন ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘটনাও বাড়ছে। সর্বশেষ ২৬ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে একদল ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করেন।

এর আগে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি এনএইচআরসির সামনে ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন করেন। ওইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই সংস্থাটি অনুসন্ধান চালায়।

সোমবার রাতে এ প্রসঙ্গে এনএইচআরসির চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম যুগান্তরকে বলেন, সংস্থার পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদন করা হয়েছে সেটির সঙ্গে আমরা একমত।

প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আদালতে মামলা করার সময় বাদীকে এফিডেভিট করতে হয়।

সেখানে যদি কেউ ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তাহলে সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনা যায়। এতে যদি কোনো আইনজীবীও জড়িত তাকে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি বলেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেয়া যাবে না।

এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে সেটা সংশ্লিষ্ট আদালতের নজরে আনতে হবে। আদালত বিচার-বিশ্লেষণ করে রায় দিবেন। মিথ্যা মামলা করলে বাদীর বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাজানো মামলা এবং ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি করার মতো সিন্ডিকেট আছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।

জেলার মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ২০ আগস্ট মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি মো. বদরুল ইসলাম নামে ঢাকার বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপক।

তিনি এই কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচিত সদস্য। মামলাটি হওয়ার পর থেকে এর বাদী কুলছুমা আকতারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মামলার নথিতে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা বাদীর মোবাইল ফোন নম্বরও নেই।

মামলাটিতে ৫ জন নামীয় আসামি আছেন। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি ছাড়া বাকিদেরও কোনো সন্ধান মিলছে না। চারজন সাক্ষী আছেন মামলায়।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় ‘শ’ আদ্যক্ষরের এক আইনজীবী সাক্ষীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। মামলার বিবরণে দেখা যায়, বাদী ও সাক্ষীরা নিয়ম মেনে যথারীতি জবানবন্দি দিয়েছেন।

একজন আইনজীবীও আছেন এ মামলার। যুগান্তরের এ প্রতিনিধি ওই আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাদীর মোবাইল ফোন নম্বর চেয়েছেন।

বারবার বলার পরও তিনি সোমবার দুপুর পর্যন্ত মোবাইল ফোন নম্বর বা বাদীর কোনো সন্ধান দিতে পারেননি। এছাড়া মামলায় দেয়া ঠিকানামতোও বাদীকে পাওয়া যায়নি।

আসামি বদরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ১৮ নভেম্বর হঠাৎ তার বাসায় পুলিশ আসে। তার অনুপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা তার স্ত্রীকে জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলার আসামি তিনি।

অধ্যাপক ইসলাম বলেন, মামলার বাদী ও অন্য আসামি এবং সাক্ষী কাউকেই তিনি চেনেন না। তাদের সম্পর্কে জানেনও না। তিনি বলেন, জীবনে আমি কখনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাইনি।

মামলায় বর্ণিত বিভিন্ন তারিখ ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসন্ধান চালালে এ ঘটনা যে মিথ্যা ও সাজানো, তা প্রমাণিত হবে।

আর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রহমান বলেন, মামলার বিবরণ মতে বাদীর সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাক্ষাৎ, তাকে মেহেরপুরের সীমান্তে নিয়ে যাওয়া, ঢাকায় নিয়ে আসাসহ বিভিন্ন ঘটনাক্রমের যেসব তারিখ আছে, সেই দিনগুলোয় বদরুল ইসলাম কলেজে ক্লাস ও বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়েছেন। এ সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক দালিলিক প্রমাণ আছে।

এ মামলার (নং ১৩/২০) বিবরণে বাদী কুলছুমা আকতারের বাবার নাম লেখা হয়েছে নজির আহমদ। তার অস্থায়ী ঠিকানা দেয়া হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার গোর্কণ ঘাট এলাকার জামাল মিয়ার বাড়ি।

আর স্থায়ী ঠিকানা: নোয়াবিল, লোহাগড়া, জেলা চট্টগ্রাম। এতে বাদীর কোনো মুঠোফোন নম্বর, পাসপোর্টের ফটোকপি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করা হয়নি। মামলায় আরও চার আসামি আছেন।

মামলাটির বিবরণে বাদী তাকে মালদ্বীপে পাঠানোর কথা বলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তেইনপুরে পাচার এবং তাকে আটকে রেখে যৌন পেশায় বাধ্য করার দাবি করেন।

বাদী কুলছুমা আকতারের মামলায় দেয়া তথ্যমতে, সরেজমিনে সোমবার সকালে গোর্কণ ঘাট এলাকার জামাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে (বাদী) খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মাছ ধরে বিক্রি করে জীবনযাপন করেন জামাল মিয়া। তিনি বউ-বাচ্চাসহ ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। ভাড়া দেয়ার মতো তার কোনো ঘর নেই।

জামাল মিয়া যুগান্তরকে জানান, তার ঘর কাউকে ভাড়া দেয়া হয় না। যতটুকু আছে তাতে নিজেরা বসবাস করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘শ’ আদ্যাক্ষরের স্থানীয় এক আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ক’ আদ্যক্ষরের স্থানীয় এক ব্যক্তিকে নিয়ে এসে ওই আইনজীবী সাক্ষী হিসেবে তার সম্মতি নিয়ে গেছেন।

এই প্রতিবেদক মামলার অপর তিন সাক্ষীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের একজন চা দোকানি। তিনি নাম প্রকাশ না করে বলেন, তাকে কিছু টাকা দিয়ে সাক্ষী হিসেবে সাজানো হয়েছে।

তবে বাকি দু’জন বলেছেন, তাদেরকে টাকা দেয়া হয়নি। এদের একজনের টিপসই এবং আরেকজনের স্বাক্ষর নিয়েছেন স্থানীয় এক আইনজীবী।

এ ব্যাপারে মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন মুঠোফোনে যুগান্তরকে জানান, তিনি বাদীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তার এক জুনিয়র মামলাটি প্রস্তুত করে তার স্বাক্ষর নিয়েছেন।

তার কাছে মোবাইল ফোন নম্বর নেই। তিনি তার জুনিয়র অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, বাদীর নম্বর তার হাতে নেই।

তিনি ডায়েরি দেখে বলবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও বাদীর নম্বর তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

বদরুল ইসলামের স্ত্রী উম্মে সুমাইয়া যুগান্তরকে জানান, মামলায় উল্লিখিত অপরাধের সঙ্গে তার স্বামীর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।

বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের সাবেক গভর্নিং কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে জমি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে কেনাকাটা, অন্যান্য আর্থিক কাজে নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠে। কলেজের প্রায় ১২ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) দুটি দল পৃথক তদন্ত করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি অবগত।

এ ঘটনায় কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার স্বামী ওই আন্দোলনে নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন। এ কারণে সাবেক কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তার স্বামীর মতবিরোধ আছে।

ওই বিরোধের জেরে তার স্বামীকে বিপদে ফেলতে এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কেননা কলেজের ওই চক্র এর আগে কলেজে ঘোষণা দিয়েছে যে, তার স্বামীর ঘুম হারাম করে দেবে তারা।

এনএইচআরসির অনুসন্ধান : ২৪ আগস্ট ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করে হয়রানির মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন’ নামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল করে এনএইচআরসি।

২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১২টি সিদ্ধান্ত এবং সাতটি সুপারিশ আছে। সিদ্ধান্তে বলা হয়, সারা দেশে ৫০-৬০ সদস্যের সিন্ডিকেট আছে। বেশির ভাগ মামলা মানব পাচার আইনে।

অনুসন্ধানের আওতায় আনা মামলার আসামিরা পূর্বপরিচিত নন। বাদী-সাক্ষী ঘুরেফিরে একই। মামলায় সমাজের শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, ভালো মানুষ থেকে শিশু পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি।

মামলাগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের যেসব সদস্য (মামলার) কাজে সহায়তা করেন তাদের বিরুদ্ধেও ভিন্ন ভিন্ন জেলায় মামলা করে দেয়া হয়। মামলাগুলোর কোনো আসামির বিরুদ্ধে এর আগে ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এমনই যে, ভুক্তভোগীরা কোনো মামলায় জামিন পেলে ‘ভুয়া ওয়ারেন্টে’ ফের কারাগারে আটকে রাখা হয়। এরপর ফের ফাঁসানো হয় নতুন কোনো মামলায়।

প্রতিবেদনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে করা ভুয়া মামলার সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে অ্যাডভোকেট ফেরদৌস মিয়া এবং তার সহকারী সাহেদ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

সুপারিশের একটি হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন থানায় মিথ্যা মামলা দায়েরে সিন্ডিকেটভুক্ত যেসব অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা সহায়তা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নিশ্চিত। প্রতিবেদনে মামলাগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার তথ্য উল্লেখ আছে।

নয়া হাতিয়ার মানব পাচারের ঘটনা

সাজানো মামলায় হয়রানির শিকার হাজারও মানুষ

হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি * কোটি টাকার লুট ঠেকাতে গিয়ে আসামি বোরহানুদ্দীন কলেজের অধ্যাপক
 যুগান্তর রিপোর্ট, ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি 
০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভুয়া মামলা করে নিরীহ মানুষকে হয়রানির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে বেছে নেয়া হচ্ছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে মামলাগুলো করে।

কিছু দুষ্ট লোকের পাশাপাশি আইনজীবী এবং অসৎ পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িত এই সিন্ডিকেটে। তারা মামলায় ফাঁসিয়ে কথিত আসামিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা, জমি ও সোনা-গয়না হাতিয়ে নেয়।

যারা চাহিদা মতো অর্থ দিতে পারে না, তাদের মাসের পর মাস টানতে হয় জেলের ঘানি। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানেও ভুয়া এবং মিথ্যা মামলায় নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে।

এছাড়া এমন ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘটনাও বাড়ছে। সর্বশেষ ২৬ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে একদল ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করেন।

এর আগে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি এনএইচআরসির সামনে ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন করেন। ওইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই সংস্থাটি অনুসন্ধান চালায়।

সোমবার রাতে এ প্রসঙ্গে এনএইচআরসির চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম যুগান্তরকে বলেন, সংস্থার পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদন করা হয়েছে সেটির সঙ্গে আমরা একমত।

প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আদালতে মামলা করার সময় বাদীকে এফিডেভিট করতে হয়।

সেখানে যদি কেউ ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তাহলে সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আনা যায়। এতে যদি কোনো আইনজীবীও জড়িত তাকে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি বলেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেয়া যাবে না।

এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে সেটা সংশ্লিষ্ট আদালতের নজরে আনতে হবে। আদালত বিচার-বিশ্লেষণ করে রায় দিবেন। মিথ্যা মামলা করলে বাদীর বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাজানো মামলা এবং ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি করার মতো সিন্ডিকেট আছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।

জেলার মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ২০ আগস্ট মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি মো. বদরুল ইসলাম নামে ঢাকার বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপক।

তিনি এই কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচিত সদস্য। মামলাটি হওয়ার পর থেকে এর বাদী কুলছুমা আকতারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মামলার নথিতে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা বাদীর মোবাইল ফোন নম্বরও নেই।

মামলাটিতে ৫ জন নামীয় আসামি আছেন। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি ছাড়া বাকিদেরও কোনো সন্ধান মিলছে না। চারজন সাক্ষী আছেন মামলায়। 

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় ‘শ’ আদ্যক্ষরের এক আইনজীবী সাক্ষীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। মামলার বিবরণে দেখা যায়, বাদী ও সাক্ষীরা নিয়ম মেনে যথারীতি জবানবন্দি দিয়েছেন।

একজন আইনজীবীও আছেন এ মামলার। যুগান্তরের এ প্রতিনিধি ওই আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাদীর মোবাইল ফোন নম্বর চেয়েছেন।

বারবার বলার পরও তিনি সোমবার দুপুর পর্যন্ত মোবাইল ফোন নম্বর বা বাদীর কোনো সন্ধান দিতে পারেননি। এছাড়া মামলায় দেয়া ঠিকানামতোও বাদীকে পাওয়া যায়নি।

আসামি বদরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, ১৮ নভেম্বর হঠাৎ তার বাসায় পুলিশ আসে। তার অনুপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরা তার স্ত্রীকে জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলার আসামি তিনি।

অধ্যাপক ইসলাম বলেন, মামলার বাদী ও অন্য আসামি এবং সাক্ষী কাউকেই তিনি চেনেন না। তাদের সম্পর্কে জানেনও না। তিনি বলেন, জীবনে আমি কখনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাইনি।

মামলায় বর্ণিত বিভিন্ন তারিখ ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসন্ধান চালালে এ ঘটনা যে মিথ্যা ও সাজানো, তা প্রমাণিত হবে। 

আর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রহমান বলেন, মামলার বিবরণ মতে বাদীর সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাক্ষাৎ, তাকে মেহেরপুরের সীমান্তে নিয়ে যাওয়া, ঢাকায় নিয়ে আসাসহ বিভিন্ন ঘটনাক্রমের যেসব তারিখ আছে, সেই দিনগুলোয় বদরুল ইসলাম কলেজে ক্লাস ও বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়েছেন। এ সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক দালিলিক প্রমাণ আছে।

এ মামলার (নং ১৩/২০) বিবরণে বাদী কুলছুমা আকতারের বাবার নাম লেখা হয়েছে নজির আহমদ। তার অস্থায়ী ঠিকানা দেয়া হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার গোর্কণ ঘাট এলাকার জামাল মিয়ার বাড়ি।

আর স্থায়ী ঠিকানা: নোয়াবিল, লোহাগড়া, জেলা চট্টগ্রাম। এতে বাদীর কোনো মুঠোফোন নম্বর, পাসপোর্টের ফটোকপি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করা হয়নি। মামলায় আরও চার আসামি আছেন।

মামলাটির বিবরণে বাদী তাকে মালদ্বীপে পাঠানোর কথা বলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তেইনপুরে পাচার এবং তাকে আটকে রেখে যৌন পেশায় বাধ্য করার দাবি করেন। 

বাদী কুলছুমা আকতারের মামলায় দেয়া তথ্যমতে, সরেজমিনে সোমবার সকালে গোর্কণ ঘাট এলাকার জামাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে (বাদী) খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মাছ ধরে বিক্রি করে জীবনযাপন করেন জামাল মিয়া। তিনি বউ-বাচ্চাসহ ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। ভাড়া দেয়ার মতো তার কোনো ঘর নেই।

জামাল মিয়া যুগান্তরকে জানান, তার ঘর কাউকে ভাড়া দেয়া হয় না। যতটুকু আছে তাতে নিজেরা বসবাস করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘শ’ আদ্যাক্ষরের স্থানীয় এক আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ক’ আদ্যক্ষরের স্থানীয় এক ব্যক্তিকে নিয়ে এসে ওই আইনজীবী সাক্ষী হিসেবে তার সম্মতি নিয়ে গেছেন।

এই প্রতিবেদক মামলার অপর তিন সাক্ষীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের একজন চা দোকানি। তিনি নাম প্রকাশ না করে বলেন, তাকে কিছু টাকা দিয়ে সাক্ষী হিসেবে সাজানো হয়েছে।

তবে বাকি দু’জন বলেছেন, তাদেরকে টাকা দেয়া হয়নি। এদের একজনের টিপসই এবং আরেকজনের স্বাক্ষর নিয়েছেন স্থানীয় এক আইনজীবী।

এ ব্যাপারে মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন মুঠোফোনে যুগান্তরকে জানান, তিনি বাদীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তার এক জুনিয়র মামলাটি প্রস্তুত করে তার স্বাক্ষর নিয়েছেন।

তার কাছে মোবাইল ফোন নম্বর নেই। তিনি তার জুনিয়র অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, বাদীর নম্বর তার হাতে নেই।

তিনি ডায়েরি দেখে বলবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও বাদীর নম্বর তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

বদরুল ইসলামের স্ত্রী উম্মে সুমাইয়া যুগান্তরকে জানান, মামলায় উল্লিখিত অপরাধের সঙ্গে তার স্বামীর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।

বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের সাবেক গভর্নিং কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে জমি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে কেনাকাটা, অন্যান্য আর্থিক কাজে নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠে। কলেজের প্রায় ১২ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) দুটি দল পৃথক তদন্ত করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি অবগত।

এ ঘটনায় কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার স্বামী ওই আন্দোলনে নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন। এ কারণে সাবেক কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তার স্বামীর মতবিরোধ আছে।

ওই বিরোধের জেরে তার স্বামীকে বিপদে ফেলতে এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কেননা কলেজের ওই চক্র এর আগে কলেজে ঘোষণা দিয়েছে যে, তার স্বামীর ঘুম হারাম করে দেবে তারা।

এনএইচআরসির অনুসন্ধান : ২৪ আগস্ট ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করে হয়রানির মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন’ নামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল করে এনএইচআরসি।

২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১২টি সিদ্ধান্ত এবং সাতটি সুপারিশ আছে। সিদ্ধান্তে বলা হয়, সারা দেশে ৫০-৬০ সদস্যের সিন্ডিকেট আছে। বেশির ভাগ মামলা মানব পাচার আইনে।

অনুসন্ধানের আওতায় আনা মামলার আসামিরা পূর্বপরিচিত নন। বাদী-সাক্ষী ঘুরেফিরে একই। মামলায় সমাজের শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, ভালো মানুষ থেকে শিশু পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি।

মামলাগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের যেসব সদস্য (মামলার) কাজে সহায়তা করেন তাদের বিরুদ্ধেও ভিন্ন ভিন্ন জেলায় মামলা করে দেয়া হয়। মামলাগুলোর কোনো আসামির বিরুদ্ধে এর আগে ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এমনই যে, ভুক্তভোগীরা কোনো মামলায় জামিন পেলে ‘ভুয়া ওয়ারেন্টে’ ফের কারাগারে আটকে রাখা হয়। এরপর ফের ফাঁসানো হয় নতুন কোনো মামলায়।

প্রতিবেদনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে করা ভুয়া মামলার সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে অ্যাডভোকেট ফেরদৌস মিয়া এবং তার সহকারী সাহেদ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

সুপারিশের একটি হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন থানায় মিথ্যা মামলা দায়েরে সিন্ডিকেটভুক্ত যেসব অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা সহায়তা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নিশ্চিত। প্রতিবেদনে মামলাগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার তথ্য উল্লেখ আছে।