আমাদের পিছু টানছে অনুকরণ প্রবণতা
jugantor
শুক্রবারের সাক্ষাৎকার
আমাদের পিছু টানছে অনুকরণ প্রবণতা

  জুননু রাইন  

০৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুস সেলিম। জন্ম ১৯৪৫। শিক্ষাবিদ, অনুবাদক, নাট্যসমালোচক এবং নাট্যকার। ইংরেজি সাহিত্য/ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের এক্সিটার এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তার প্রথম অনুবাদগ্রন্থ বেরটোলড ব্রেশট রচিত নাটক The Life of Galileo Galilei-র? বাংলা অনুবাদ গ্যালিলিও প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে; এটি বাংলাদেশে অন্যতম দর্শকনন্দিত মঞ্চনাটক।

বাংলাদেশের ষাট দশকের প্রধান কবিদের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ Selected Poems from Bangladesh আবদুস সেলিমের আর একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ কর্ম।

তার অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থের মাঝে আছে; বেরটোলড ব্রেশট-এর ছত্রিশটি কবিতার অনুবাদ কবিতা, তিন খণ্ডে প্রকাশিত উনিশটি নাটকের সংকলন অনুবাদ নাটক সমগ্র, Violated in 1971; আবদুস সেলিমের ইংরেজি অনুবাদে Binodini ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত।

নাটক ও অনুবাদ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শহিদ মুনির চৌধুরী পদক, বাংলা একাডেমি পদক, লোকনাট্যদল স্বর্ণপদকসহ বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।

যুগান্তর : দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা এবং সাহিত্যের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে উল্লেখ করার মতো বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?

আবদুস সেলিম : বিদেশে ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব পড়াশোনার সুবাদে মূলত ভাষাতত্ত্বে শিক্ষকতা করি। বাংলাসাহিত্যের পড়াশোনাটা একেবারে আত্মশিক্ষা। সাহিত্যের ছাত্র হিসাবে বাংলাসাহিত্যে আগ্রহ তো ছিলই, সেই সঙ্গে ষাটের দশকে আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহচর্যে বাংলাসাহিত্যে আরও অধিকতর আগ্রহী হই।

তারই প্রস্তাবে ‘শিল্পকলা’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন আমরা যৌথ সম্পাদনায় চার বছর প্রকাশ করেছি। ওই সময়ে আমি ষাটের দশকের কবিদের নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিলাম আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা হলো কবিতা এবং এখনো আমি তাই মনে করি। তবে ষাটের দশকে এ শাখা যত বৈপ্লবিকভাবে পল্লবিত হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, বর্তমানে তার তেমন বৈভব চোখে পড়ছে না। যদিও তখনকার মতো এখনো অধিকাংশ কবি শহরকেন্দ্রিক, তখনকার কবিদের মধ্যে যে জীবনবোধের বৈচিত্র্য ও গভীরতা ছিল, এখন তাতে কিছুটা অবসাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের দুটি দুর্বল সাহিত্য শাখা বেশ আলোড়িত হয়েছে: উপন্যাস এবং নাটক। মধ্যবিত্ত জীবন ও মনস্তত্ত্বের সুচারু বিশ্লেষণ মেলে হুমায়ূন আহমেদে, যদিও তিনি প্রাথমিকভাবে যে সম্ভাবনা প্রদর্শন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়েছে জনপ্রিয়তার জালে আবদ্ধ হয়ে এবং অনুবর্তিত মধ্যবিত্ত চরিত্র সৃজনে।

তবে বিপরীত ধারাতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক অনন্য আসনে স্থিত, নিঃসন্দেহে তার চেতনা প্রবাহ রচনা রীতির জন্য যার অঙ্কুর উদ্গম হয়েছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসে। সাম্প্রতিক যারা লিখছেন তাদের মধ্যে বিষয় ও বক্তব্যে বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারেন হরিশংকর জলদাস, শাহীন আখতার, শাহাদুজ্জামান, শহিদুল জহির, আনিসুল হক এবং অবশ্যই হাসান আজিজুল হক।

এদের বিষয় বৈচিত্র্যের অন্তর্গত হলো বাংলাদেশের প্রান্তিক নরনারী, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ব্যক্তিত্বের ওপর গবেষণা উপাখ্যান, নরনারীর মনোব্যাধি, মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিপর্ব ও অনুষঙ্গ। নাটক-সাহিত্য মৌলিকভাবে তেমন সমৃদ্ধ নয়, তবে মঞ্চসফল বেশকিছু নাটক রচিত হয়েছে আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশিদ, সাঈদ আহমেদ প্রমুখের হাতে।

একেবারে তরুণ অনেকেই নাটকে প্রশংসনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন পুরাণের পুনঃলিখনে এবং বর্ণনাধর্মী নাট্যালেখ্য রচনায়। আমাদের দুর্বলতম সাহিত্য শাখা হলো প্রবন্ধ। অবশ্য ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাসাহিত্যের এই শাখাটি তেমন উজ্জ্বল ছিল না এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে আমরা একে তেমন সামনে আনতে পারিনি। ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রবন্ধ সাহিত্য তেমন উর্বর নয়।

শিশুসাহিত্য বেশ অবহেলিত শাখা, যেখানে এখনো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়ই দাপটে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। দেশজ উপকরণ, মানসিকতা ও স্বাধীন দেশের মনস্তত্ত্বে একেবারে নিজস্ব শিশুসাহিত্য বেশ অপ্রতুল। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনাকে যতটা আলোড়িত করেছিল আমাদের সাহিত্য জগতে তার প্রভাব তেমন বৌদ্ধিক ও উল্লেখ্য নয়।

যুগান্তর : মহামারি পরিস্থিতিতে অথবা মহামারি-পরবর্তী সাহিত্যের বিষয় বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

আবদুস সেলিম : ঐতিহাসিকভাবে জানি প্লেগ, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু বা সাম্প্রতিক ৯/১১-সন্ত্রাস বিশ্বসাহিত্য জগতে বিশাল অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। নিঃসন্দেহে কোভিড-১৯ও তাই করবে। তফাৎটা হলো প্রথমোক্ত ঘটনাগুলোর প্রভাব বাংলাসাহিত্যে তেমন পড়েনি, কারণ এগুলোর আঁচ আমরা প্রত্যক্ষভাবে পাইনি। কোভিডের প্রভাব সারা বিশ্বেই ছড়িয়েছে। আমি মনে করি, মহামারি পরবর্তী লেখাতে আমাদের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের ছায়াটি স্পষ্টতর হবে এবং সমাজবিচ্ছিন্ন মানবতার ছবি ও ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক মানব সম্পর্কের কথা ও মনস্তত্ত্বের কথা স্থান পাবে।

যুগান্তর : আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আবদুস সেলিম : মননশীলতার অবনতিতে আমি বিশ্বাসী নই। মননশীলতা নান্দনিক ধারণা প্রসূত। বুদ্ধদেব বসু বলতেন, শিল্পসাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল বলে কিছু নেই। সবকিছু নির্ভর করে কে কীভাবে কী কারণে শিল্পে তা প্রকাশ করছে তার ওপরে। তাই হিউ হেফনার-এর হেডনিজম বা আনন্দবাদও শিল্পে গ্রহণযোগ্য। সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (অবশ্যই ধর্মীয় নিরিখে নয়) আমরা আগের চেয়ে অনেকটাই উন্মুক্তমনা। আমি নিজেও এটার পক্ষে। সঠিক মননশীলতারই চূড়ান্ত জয় হবে।

যুগান্তর : ভাষাভাষীর সংখ্যায় বাংলা বিশ্বের ৬ নম্বর ভাষা। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীসহ অনেক কীর্তিমান লেখকও রয়েছে এ ভাষায়। তবুও এ ভাষার লেখা অন্যান্য ভাষায় খুব একটা অনুবাদ হচ্ছে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

আবদুস সেলিম : এর প্রধান কারণ বাংলা ভাষায় রচিত সাহিতকর্ম বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত ভাষা, অর্থাৎ ইংরেজিতে ভাষান্তরিত হচ্ছে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ-এর উপন্যাসের সব উপাদানই ছিল বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার মতো; যেমন রবীন্দ্রনাথ নাড়া দিয়েছিলেন তার কবিতা অনুবাদ করে।

আমি মনে করি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর দুটি উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই এবং খোয়াবনামা ঠিকমতো অনুবাদ হলে বিশ্বপাঠকরা বুঝতে পারত আমাদের কথাসাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ। এ দুটো বইই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে; কিন্তু বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষার ভেতর-কাঠামো সঠিক ভাষান্তর করতে পারেনি অনুবাদকরা; কারণ তারা দুজনই বাংলাদেশের লোক নন।

যুগান্তর : আপনি ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটি ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। আর কোনো বাংলা গল্প-উপন্যাস অনুবাদের পরিকল্পনা আছে? ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ অনুবাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাই?

আবদুস সেলিম : আমি মান্নান সৈয়দ, শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর ছোটগল্প অনুবাদ করেছি, যেগুলো বাংলা একাডেমি ইংরেজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আমাকে বাংলা একাডেমি খোয়াবনামা অনুবাদের জন্য কমিশন করেছে, যদিও কাজটি ধীরগতিতে চলছে।

সূর্যদীঘল বাড়ি অনুবাদের অভিজ্ঞতা অসাধারণ! উপন্যাসটিতে অনেক আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যার সঙ্গে আমার নিজেরও পরিচয় ছিল না। এগুলোর অর্থ জেনে আমি বেশকিছু ক্ষেত্রে অনুবাদে মূল শব্দগুলো ইংরেজি বর্ণমালায় আইটালিক্সে রেখে বন্ধনীতে ইংরেজি অর্থ দিয়ে দিয়েছি।

এটা করেছি, কারণ আমরা জানি ইংরেজি বহু মৌলিক লেখায় এবং অনুবাদে লেখক-অনুবাদকরা বিদেশি শব্দ অঅনূদিত রাখে এবং আমরা তার অর্থ অভিধানে বা ইন্টারনেটে পাই। আমি দেখেছি অনেক এমন আঞ্চলিক বাংলা শব্দ আজকাল ইন্টারনেটে বা অনলাইন অভিধানে পাওয়া যায়। আমরা যদি কষ্ট করতে পারি, আমার মনে হয়, বিদেশি পাঠকরাও সেটা পারবে।

সাহিত্যানুবাদে ক্রিয়ার কাল এক বিড়ম্বনার ব্যাপার; কারণ বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণবিধীতি ক্রিয়ার কালের ব্যবহারে বিস্তর তফাৎ। এ বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল ছড়া ও বাকধারার ভাষান্তরের চ্যালেঞ্জ।

যুগান্তর : আপনি ইংরেজি থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। দুটো ভাষায় কাজ করতে গিয়ে অনুবাদের কারণে সাহিত্যমূল্যের যে সংযোজন-বিয়োজন দেখেছেন, তাতে বাংলা আর ইংরেজির মধ্যে সৃষ্টিশীলতার বিচারে কোন ভাষাকে এগিয়ে রাখবেন। এগিয়ে রাখার বিশেষ কয়েকটি কারণও জানতে চাই।

আবদুস সেলিম : ভাষাতত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো কোনো ভাষা কারো থেকে এগিয়ে নয়। সব ভাষার গুরুত্ব সমান; এমনকি সে ভাষা যদি মাত্র দশজনও ব্যবহার করে। শুধু তফাৎটা হলো আমরা সবাই যার যার মাতৃভাষাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। বুঝতে হবে বিশ্বের প্রতিটি ভাষা তার নিজ নিজ গুণাগুণে অনবদ্য। এ উপলব্ধিটা দৃঢ়তর হয়েছে আমার অনুবাদ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

যুগান্তর : আমাদের সাহিত্যের যথাযথ অনুবাদ হলে বিশ্বে বাংলাসাহিত্যের প্রভাব কেমন থাকত? এবং সেটা কোন ধরনের বিশেষ গুণের কারণে প্রভাব বিস্তারকারী হতে পারত?

আবদুস সেলিম : আমরা জিনগতভাবে আবেগপ্রবণ। আমাদের শোনিতে তার প্রবল প্রবাহ। এমন জাত বিশ্বে নেই বললেই চলে। তাই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন এবং নিরক্ষর সবাই কাব্য রচনা করে মুখে মুখে, ছন্দ ভালোবাসে। কল্পনার প্রাচুর্যও প্রখর। মানব ও প্রকৃতি সংবেদনশীলতাও অনবদ্য। শিল্প ও নানন্দনিকতার সৃষ্টিতে এর চেয়ে আর কিছু প্রয়োজন পড়ে না! আক্ষেপ এসবের যথাযথ অনুবাদ হচ্ছে না।

যুগান্তর : বাংলাসাহিত্যের অন্য ভাষায় অনুবাদে বিশেষ অন্তরায় কী বলে মনে করেন? এবং সেসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী করতে হবে?

আবদুস সেলিম : অন্তরায় অনেক। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব। যা কিছু অনুবাদ হচ্ছে তা শুধু ব্যক্তি প্রচেষ্টায় হচ্ছে এবং তার অধিকাংশই শুধু ইংরেজি থেকে বাংলা। বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে কাজ করছে; কিন্তু প্রতুল বা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। সরকারি উদ্যোগে কমিশন করে নিয়মিত অনুবাদকর্ম উৎসাহিত করা একান্ত প্রয়োজন, বিশেষ করে আমাদের সব ধরনের বাছাইকৃত সাহিত্যকর্মের।

আর একটি বিষয় হলো, ইংরেজি অনুবাদের মান নিশ্চিত করা। ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয় এবং আমরা তো জানি ভাষা সদাসচলমান। তাই ইংরেজিতে অনুবাদের পর একটি ভাষা বিশেষজ্ঞ কমিটি মারফত অনুবাদকর্মগুলো পরিমার্জিত ও সম্পাদিত হওয়া একান্তভাবে দরকার। প্রয়োজনে ইংরেজ ভাষাভাষী বিশেষজ্ঞেরও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

যুগান্তর : আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বের সাম্প্রতিক সাহিত্যের বিশেষ পার্থক্যটা কী?

আবদুস সেলিম : রবীন্দ্রনাথ তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন: ‘আমরা পরের সাহিত্য হইতে পড়িয়া থাকি বিস্তর- সেই পড়ার জোরে আমাদের সমালোচক তৈরি হইয়া থাকে- কিন্তু লেখক তো কেবল পড়ার জোরে হয় না, তার হজমের জোর, প্রাণের জোর থাকা চাই।’ আমিও তাই মনে করি।

এর সঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয রয়েছে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের প্রবন্ধ শাখাটি বড়ই নাজুক। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বাংলাসাহিত্যে কোনো সাহিত্যতত্ত্ব নেই যা লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত, পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন সাহিত্য তাত্ত্বিক দ্বারা বিভিন্ন ‘ইজম’-এর মাধ্যমে।

আমাদের বড় দীনতা হলো পশ্চিমের এই তত্ত্বগুলোরই অনুসরণ বা অনুকরণ করে সাহিত্য সৃজন করার চেষ্টা এবং ফলে ওই বদহজম হওয়া। আমরা চেতনা প্রবাহ নিয়ে উপন্যাস রচনা করলাম এই তত্ত্বের উত্থানের একশত বছর পরে। আসলে এই অনুকরণ প্রবণতাটা আমাদের পিছু টানছে।

অনেকে বলেন, লালন শাহ-এর শিল্প সৃজন রীতি একেবারেই আমাদের বাংলার মাটি-নদী-জল নিঃসৃত যার প্রভাব সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ওপর পড়েছিল গত শতাব্দীতে। কিন্তু দুখ হলো এ তত্ত্ব আমরা সঠিক লিপিবদ্ধ, পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করিনি। আমরা আসলে চোরাবালিতে আটকে গেছি।

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আবদুস সেলিম : এমন যে দুজনের নাম তাৎক্ষণিক মনে আসছে তারা হলেন: আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আল মাহমুদ। বিভিন্ন মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে মানুষে-মানুষে বিভেদ থাকতেই পারে যেমন এজরা পাউন্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও মুসোলিনির পক্ষ সমর্থন করে অনেক রেডিও প্রতিবেদন রচনা করেছিলেন; কিন্তু কবি হিসেবে তার স্বীকৃতি কেউ মুছে দিতে পারেনি। আমি মনে করি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরো অনেক অনেক আলোচনা ও গবেষণা হওয়া উচিত। সমস্যা প্রধানত মতাদর্শের বিভেদ। দ্বিতীয়, উপেক্ষা প্রবণতা। এবং তৃতীয় গবেষণার প্রতি অনীহা।

যুগান্তর : আমাদের প্রকাশনা এবং বিপণন ব্যবস্থাপনা উন্নত বিশ্বের তুলনায় কোথায় কোথায় পিছিয়ে আছে? সেই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো বলুন?

আবদুস সেলিম : প্রায় সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে। একমাত্র ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড ছাড়া পেশাগত নিয়মকানুন প্রায় কেউই অনুসরণ করে না, যেমন পেশাগত নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা, পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রুফ দেখা এবং সর্বোপরি অনূদিত গ্রন্থের কপিরাইট অনুমোদন নেয়া। তারপর আছে লেখক-অনুবাদকদের সময়মতো প্রাপ্য কমিশন না দেওয়া।

বিপণনেও গাফিলতি আছে- যেমন শুধু বইমেলায় বই বিক্রির অপেক্ষা করা। ব্যতিক্রম নেই তা নয়, তবে কম-বেশি বিষয়টা এমনই। বাংলা একাডেমির বিপণন ব্যবস্থটিও তেমন সুষ্ঠু নয়।

যুগান্তর : বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের জন্য জরুরি বিশ্বসাহিত্যের এমন দুটো বই যা এখনো বাংলা অনুবাদ হয়নি?

আবদুস সেলিম : প্রথমেই মনে পড়ছে হিস্পানি ক্ল্যাসিক মিগুয়েল ডি সেরভানতিস-এর ‘ডন কিহতে’-র কথা। এ উপন্যাসটি ১৭ শতাব্দীতে সারা পশ্চিমি উপন্যাস রচনার চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দিয়েছিল। অপর উপন্যাস জেমস জয়েস-এর ‘ইউলেসিস’।

যদিও দুটি নাম বলতে বলেছেন, আর একটি কবিতার বইয়ের নাম না বললেই নয়, যার লেখককে বলা হয় আধুনিক কবিতার জনক। শার্ল বোদলেয়ার-এর ‘লেস ফ্লারস দু মাল’ বা ইংরেজিতে ‘ফ্লাওয়ার্স অব ইভিল’।

শুক্রবারের সাক্ষাৎকার

আমাদের পিছু টানছে অনুকরণ প্রবণতা

 জুননু রাইন 
০৮ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুস সেলিম। জন্ম ১৯৪৫। শিক্ষাবিদ, অনুবাদক, নাট্যসমালোচক এবং নাট্যকার। ইংরেজি সাহিত্য/ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের এক্সিটার এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তার প্রথম অনুবাদগ্রন্থ বেরটোলড ব্রেশট রচিত নাটক The Life of Galileo Galilei-র? বাংলা অনুবাদ গ্যালিলিও প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে; এটি বাংলাদেশে অন্যতম দর্শকনন্দিত মঞ্চনাটক।

বাংলাদেশের ষাট দশকের প্রধান কবিদের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ Selected Poems from Bangladesh আবদুস সেলিমের আর একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ কর্ম।

তার অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থের মাঝে আছে; বেরটোলড ব্রেশট-এর ছত্রিশটি কবিতার অনুবাদ কবিতা, তিন খণ্ডে প্রকাশিত উনিশটি নাটকের সংকলন অনুবাদ নাটক সমগ্র, Violated in 1971; আবদুস সেলিমের ইংরেজি অনুবাদে Binodini ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত।

নাটক ও অনুবাদ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শহিদ মুনির চৌধুরী পদক, বাংলা একাডেমি পদক, লোকনাট্যদল স্বর্ণপদকসহ বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।

যুগান্তর : দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা এবং সাহিত্যের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে উল্লেখ করার মতো বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?

আবদুস সেলিম : বিদেশে ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব পড়াশোনার সুবাদে মূলত ভাষাতত্ত্বে শিক্ষকতা করি। বাংলাসাহিত্যের পড়াশোনাটা একেবারে আত্মশিক্ষা। সাহিত্যের ছাত্র হিসাবে বাংলাসাহিত্যে আগ্রহ তো ছিলই, সেই সঙ্গে ষাটের দশকে আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহচর্যে বাংলাসাহিত্যে আরও অধিকতর আগ্রহী হই।

তারই প্রস্তাবে ‘শিল্পকলা’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন আমরা যৌথ সম্পাদনায় চার বছর প্রকাশ করেছি। ওই সময়ে আমি ষাটের দশকের কবিদের নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিলাম আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা হলো কবিতা এবং এখনো আমি তাই মনে করি। তবে ষাটের দশকে এ শাখা যত বৈপ্লবিকভাবে পল্লবিত হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, বর্তমানে তার তেমন বৈভব চোখে পড়ছে না। যদিও তখনকার মতো এখনো অধিকাংশ কবি শহরকেন্দ্রিক, তখনকার কবিদের মধ্যে যে জীবনবোধের বৈচিত্র্য ও গভীরতা ছিল, এখন তাতে কিছুটা অবসাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের দুটি দুর্বল সাহিত্য শাখা বেশ আলোড়িত হয়েছে: উপন্যাস এবং নাটক। মধ্যবিত্ত জীবন ও মনস্তত্ত্বের সুচারু বিশ্লেষণ মেলে হুমায়ূন আহমেদে, যদিও তিনি প্রাথমিকভাবে যে সম্ভাবনা প্রদর্শন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়েছে জনপ্রিয়তার জালে আবদ্ধ হয়ে এবং অনুবর্তিত মধ্যবিত্ত চরিত্র সৃজনে।

তবে বিপরীত ধারাতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক অনন্য আসনে স্থিত, নিঃসন্দেহে তার চেতনা প্রবাহ রচনা রীতির জন্য যার অঙ্কুর উদ্গম হয়েছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসে। সাম্প্রতিক যারা লিখছেন তাদের মধ্যে বিষয় ও বক্তব্যে বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারেন হরিশংকর জলদাস, শাহীন আখতার, শাহাদুজ্জামান, শহিদুল জহির, আনিসুল হক এবং অবশ্যই হাসান আজিজুল হক।

এদের বিষয় বৈচিত্র্যের অন্তর্গত হলো বাংলাদেশের প্রান্তিক নরনারী, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ব্যক্তিত্বের ওপর গবেষণা উপাখ্যান, নরনারীর মনোব্যাধি, মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিপর্ব ও অনুষঙ্গ। নাটক-সাহিত্য মৌলিকভাবে তেমন সমৃদ্ধ নয়, তবে মঞ্চসফল বেশকিছু নাটক রচিত হয়েছে আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশিদ, সাঈদ আহমেদ প্রমুখের হাতে।

একেবারে তরুণ অনেকেই নাটকে প্রশংসনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন পুরাণের পুনঃলিখনে এবং বর্ণনাধর্মী নাট্যালেখ্য রচনায়। আমাদের দুর্বলতম সাহিত্য শাখা হলো প্রবন্ধ। অবশ্য ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাসাহিত্যের এই শাখাটি তেমন উজ্জ্বল ছিল না এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে আমরা একে তেমন সামনে আনতে পারিনি। ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রবন্ধ সাহিত্য তেমন উর্বর নয়।

শিশুসাহিত্য বেশ অবহেলিত শাখা, যেখানে এখনো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়ই দাপটে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। দেশজ উপকরণ, মানসিকতা ও স্বাধীন দেশের মনস্তত্ত্বে একেবারে নিজস্ব শিশুসাহিত্য বেশ অপ্রতুল। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনাকে যতটা আলোড়িত করেছিল আমাদের সাহিত্য জগতে তার প্রভাব তেমন বৌদ্ধিক ও উল্লেখ্য নয়।

যুগান্তর : মহামারি পরিস্থিতিতে অথবা মহামারি-পরবর্তী সাহিত্যের বিষয় বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

আবদুস সেলিম : ঐতিহাসিকভাবে জানি প্লেগ, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু বা সাম্প্রতিক ৯/১১-সন্ত্রাস বিশ্বসাহিত্য জগতে বিশাল অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। নিঃসন্দেহে কোভিড-১৯ও তাই করবে। তফাৎটা হলো প্রথমোক্ত ঘটনাগুলোর প্রভাব বাংলাসাহিত্যে তেমন পড়েনি, কারণ এগুলোর আঁচ আমরা প্রত্যক্ষভাবে পাইনি। কোভিডের প্রভাব সারা বিশ্বেই ছড়িয়েছে। আমি মনে করি, মহামারি পরবর্তী লেখাতে আমাদের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের ছায়াটি স্পষ্টতর হবে এবং সমাজবিচ্ছিন্ন মানবতার ছবি ও ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক মানব সম্পর্কের কথা ও মনস্তত্ত্বের কথা স্থান পাবে।

যুগান্তর : আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আবদুস সেলিম : মননশীলতার অবনতিতে আমি বিশ্বাসী নই। মননশীলতা নান্দনিক ধারণা প্রসূত। বুদ্ধদেব বসু বলতেন, শিল্পসাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল বলে কিছু নেই। সবকিছু নির্ভর করে কে কীভাবে কী কারণে শিল্পে তা প্রকাশ করছে তার ওপরে। তাই হিউ হেফনার-এর হেডনিজম বা আনন্দবাদও শিল্পে গ্রহণযোগ্য। সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (অবশ্যই ধর্মীয় নিরিখে নয়) আমরা আগের চেয়ে অনেকটাই উন্মুক্তমনা। আমি নিজেও এটার পক্ষে। সঠিক মননশীলতারই চূড়ান্ত জয় হবে।

যুগান্তর : ভাষাভাষীর সংখ্যায় বাংলা বিশ্বের ৬ নম্বর ভাষা। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীসহ অনেক কীর্তিমান লেখকও রয়েছে এ ভাষায়। তবুও এ ভাষার লেখা অন্যান্য ভাষায় খুব একটা অনুবাদ হচ্ছে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

আবদুস সেলিম : এর প্রধান কারণ বাংলা ভাষায় রচিত সাহিতকর্ম বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত ভাষা, অর্থাৎ ইংরেজিতে ভাষান্তরিত হচ্ছে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ-এর উপন্যাসের সব উপাদানই ছিল বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার মতো; যেমন রবীন্দ্রনাথ নাড়া দিয়েছিলেন তার কবিতা অনুবাদ করে।

আমি মনে করি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর দুটি উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই এবং খোয়াবনামা ঠিকমতো অনুবাদ হলে বিশ্বপাঠকরা বুঝতে পারত আমাদের কথাসাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ। এ দুটো বইই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে; কিন্তু বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষার ভেতর-কাঠামো সঠিক ভাষান্তর করতে পারেনি অনুবাদকরা; কারণ তারা দুজনই বাংলাদেশের লোক নন।

যুগান্তর : আপনি ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটি ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। আর কোনো বাংলা গল্প-উপন্যাস অনুবাদের পরিকল্পনা আছে? ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ অনুবাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাই?

আবদুস সেলিম : আমি মান্নান সৈয়দ, শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর ছোটগল্প অনুবাদ করেছি, যেগুলো বাংলা একাডেমি ইংরেজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আমাকে বাংলা একাডেমি খোয়াবনামা অনুবাদের জন্য কমিশন করেছে, যদিও কাজটি ধীরগতিতে চলছে।

সূর্যদীঘল বাড়ি অনুবাদের অভিজ্ঞতা অসাধারণ! উপন্যাসটিতে অনেক আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যার সঙ্গে আমার নিজেরও পরিচয় ছিল না। এগুলোর অর্থ জেনে আমি বেশকিছু ক্ষেত্রে অনুবাদে মূল শব্দগুলো ইংরেজি বর্ণমালায় আইটালিক্সে রেখে বন্ধনীতে ইংরেজি অর্থ দিয়ে দিয়েছি।

এটা করেছি, কারণ আমরা জানি ইংরেজি বহু মৌলিক লেখায় এবং অনুবাদে লেখক-অনুবাদকরা বিদেশি শব্দ অঅনূদিত রাখে এবং আমরা তার অর্থ অভিধানে বা ইন্টারনেটে পাই। আমি দেখেছি অনেক এমন আঞ্চলিক বাংলা শব্দ আজকাল ইন্টারনেটে বা অনলাইন অভিধানে পাওয়া যায়। আমরা যদি কষ্ট করতে পারি, আমার মনে হয়, বিদেশি পাঠকরাও সেটা পারবে।

সাহিত্যানুবাদে ক্রিয়ার কাল এক বিড়ম্বনার ব্যাপার; কারণ বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণবিধীতি ক্রিয়ার কালের ব্যবহারে বিস্তর তফাৎ। এ বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল ছড়া ও বাকধারার ভাষান্তরের চ্যালেঞ্জ।

যুগান্তর : আপনি ইংরেজি থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। দুটো ভাষায় কাজ করতে গিয়ে অনুবাদের কারণে সাহিত্যমূল্যের যে সংযোজন-বিয়োজন দেখেছেন, তাতে বাংলা আর ইংরেজির মধ্যে সৃষ্টিশীলতার বিচারে কোন ভাষাকে এগিয়ে রাখবেন। এগিয়ে রাখার বিশেষ কয়েকটি কারণও জানতে চাই।

আবদুস সেলিম : ভাষাতত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো কোনো ভাষা কারো থেকে এগিয়ে নয়। সব ভাষার গুরুত্ব সমান; এমনকি সে ভাষা যদি মাত্র দশজনও ব্যবহার করে। শুধু তফাৎটা হলো আমরা সবাই যার যার মাতৃভাষাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। বুঝতে হবে বিশ্বের প্রতিটি ভাষা তার নিজ নিজ গুণাগুণে অনবদ্য। এ উপলব্ধিটা দৃঢ়তর হয়েছে আমার অনুবাদ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

যুগান্তর : আমাদের সাহিত্যের যথাযথ অনুবাদ হলে বিশ্বে বাংলাসাহিত্যের প্রভাব কেমন থাকত? এবং সেটা কোন ধরনের বিশেষ গুণের কারণে প্রভাব বিস্তারকারী হতে পারত?

আবদুস সেলিম : আমরা জিনগতভাবে আবেগপ্রবণ। আমাদের শোনিতে তার প্রবল প্রবাহ। এমন জাত বিশ্বে নেই বললেই চলে। তাই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন এবং নিরক্ষর সবাই কাব্য রচনা করে মুখে মুখে, ছন্দ ভালোবাসে। কল্পনার প্রাচুর্যও প্রখর। মানব ও প্রকৃতি সংবেদনশীলতাও অনবদ্য। শিল্প ও নানন্দনিকতার সৃষ্টিতে এর চেয়ে আর কিছু প্রয়োজন পড়ে না! আক্ষেপ এসবের যথাযথ অনুবাদ হচ্ছে না।

যুগান্তর : বাংলাসাহিত্যের অন্য ভাষায় অনুবাদে বিশেষ অন্তরায় কী বলে মনে করেন? এবং সেসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী করতে হবে?

আবদুস সেলিম : অন্তরায় অনেক। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব। যা কিছু অনুবাদ হচ্ছে তা শুধু ব্যক্তি প্রচেষ্টায় হচ্ছে এবং তার অধিকাংশই শুধু ইংরেজি থেকে বাংলা। বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে কাজ করছে; কিন্তু প্রতুল বা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। সরকারি উদ্যোগে কমিশন করে নিয়মিত অনুবাদকর্ম উৎসাহিত করা একান্ত প্রয়োজন, বিশেষ করে আমাদের সব ধরনের বাছাইকৃত সাহিত্যকর্মের।

আর একটি বিষয় হলো, ইংরেজি অনুবাদের মান নিশ্চিত করা। ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয় এবং আমরা তো জানি ভাষা সদাসচলমান। তাই ইংরেজিতে অনুবাদের পর একটি ভাষা বিশেষজ্ঞ কমিটি মারফত অনুবাদকর্মগুলো পরিমার্জিত ও সম্পাদিত হওয়া একান্তভাবে দরকার। প্রয়োজনে ইংরেজ ভাষাভাষী বিশেষজ্ঞেরও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

যুগান্তর : আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বের সাম্প্রতিক সাহিত্যের বিশেষ পার্থক্যটা কী?

আবদুস সেলিম : রবীন্দ্রনাথ তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন: ‘আমরা পরের সাহিত্য হইতে পড়িয়া থাকি বিস্তর- সেই পড়ার জোরে আমাদের সমালোচক তৈরি হইয়া থাকে- কিন্তু লেখক তো কেবল পড়ার জোরে হয় না, তার হজমের জোর, প্রাণের জোর থাকা চাই।’ আমিও তাই মনে করি।

এর সঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয রয়েছে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের প্রবন্ধ শাখাটি বড়ই নাজুক। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বাংলাসাহিত্যে কোনো সাহিত্যতত্ত্ব নেই যা লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত, পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন সাহিত্য তাত্ত্বিক দ্বারা বিভিন্ন ‘ইজম’-এর মাধ্যমে।

আমাদের বড় দীনতা হলো পশ্চিমের এই তত্ত্বগুলোরই অনুসরণ বা অনুকরণ করে সাহিত্য সৃজন করার চেষ্টা এবং ফলে ওই বদহজম হওয়া। আমরা চেতনা প্রবাহ নিয়ে উপন্যাস রচনা করলাম এই তত্ত্বের উত্থানের একশত বছর পরে। আসলে এই অনুকরণ প্রবণতাটা আমাদের পিছু টানছে।

অনেকে বলেন, লালন শাহ-এর শিল্প সৃজন রীতি একেবারেই আমাদের বাংলার মাটি-নদী-জল নিঃসৃত যার প্রভাব সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ওপর পড়েছিল গত শতাব্দীতে। কিন্তু দুখ হলো এ তত্ত্ব আমরা সঠিক লিপিবদ্ধ, পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করিনি। আমরা আসলে চোরাবালিতে আটকে গেছি।

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আবদুস সেলিম : এমন যে দুজনের নাম তাৎক্ষণিক মনে আসছে তারা হলেন: আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আল মাহমুদ। বিভিন্ন মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে মানুষে-মানুষে বিভেদ থাকতেই পারে যেমন এজরা পাউন্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও মুসোলিনির পক্ষ সমর্থন করে অনেক রেডিও প্রতিবেদন রচনা করেছিলেন; কিন্তু কবি হিসেবে তার স্বীকৃতি কেউ মুছে দিতে পারেনি। আমি মনে করি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরো অনেক অনেক আলোচনা ও গবেষণা হওয়া উচিত। সমস্যা প্রধানত মতাদর্শের বিভেদ। দ্বিতীয়, উপেক্ষা প্রবণতা। এবং তৃতীয় গবেষণার প্রতি অনীহা।

যুগান্তর : আমাদের প্রকাশনা এবং বিপণন ব্যবস্থাপনা উন্নত বিশ্বের তুলনায় কোথায় কোথায় পিছিয়ে আছে? সেই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো বলুন?

আবদুস সেলিম : প্রায় সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে। একমাত্র ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড ছাড়া পেশাগত নিয়মকানুন প্রায় কেউই অনুসরণ করে না, যেমন পেশাগত নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা, পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রুফ দেখা এবং সর্বোপরি অনূদিত গ্রন্থের কপিরাইট অনুমোদন নেয়া। তারপর আছে লেখক-অনুবাদকদের সময়মতো প্রাপ্য কমিশন না দেওয়া।

বিপণনেও গাফিলতি আছে- যেমন শুধু বইমেলায় বই বিক্রির অপেক্ষা করা। ব্যতিক্রম নেই তা নয়, তবে কম-বেশি বিষয়টা এমনই। বাংলা একাডেমির বিপণন ব্যবস্থটিও তেমন সুষ্ঠু নয়।

যুগান্তর : বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের জন্য জরুরি বিশ্বসাহিত্যের এমন দুটো বই যা এখনো বাংলা অনুবাদ হয়নি?

আবদুস সেলিম : প্রথমেই মনে পড়ছে হিস্পানি ক্ল্যাসিক মিগুয়েল ডি সেরভানতিস-এর ‘ডন কিহতে’-র কথা। এ উপন্যাসটি ১৭ শতাব্দীতে সারা পশ্চিমি উপন্যাস রচনার চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দিয়েছিল। অপর উপন্যাস জেমস জয়েস-এর ‘ইউলেসিস’।

যদিও দুটি নাম বলতে বলেছেন, আর একটি কবিতার বইয়ের নাম না বললেই নয়, যার লেখককে বলা হয় আধুনিক কবিতার জনক। শার্ল বোদলেয়ার-এর ‘লেস ফ্লারস দু মাল’ বা ইংরেজিতে ‘ফ্লাওয়ার্স অব ইভিল’।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন