অবহেলায় লোকাল ট্রেন মনোযোগ আন্তঃনগরে
jugantor
৪৯৩ স্টেশনের ৪৫১টিই করছে খাঁখাঁ
অবহেলায় লোকাল ট্রেন মনোযোগ আন্তঃনগরে
৭৫ ভাগ যাত্রী বহন করে লোকাল মেইল ও কমিউটার ট্রেন * আন্তঃনগর ট্রেনের নির্ধারিত আসনের অর্ধেকই ফাঁকা

  শিপন হাবীব  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭৫ ভাগ যাত্রীই বহন করে লোকাল ট্রেন। অথচ রেল কর্তৃপক্ষের বেশিরভাগ মনঃসংযোগই যেন দূরপাল্লার ট্রেনকে ঘিরে। করোনা মহামারির প্রকোপ কিছুটা কমে আসায় দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হলেও আজও বন্ধ লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন।

দেশের প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়ার সঙ্গে সব ধরনের বাস চালু করা হলেও প্রচণ্ড চাহিদা থাকার পরও লোকাল ট্রেন চালুর কোনো উদ্যোগ নেই। কবে নাগাদ চালু হবে, তারও কোনো উত্তর নেই। শুধু তাই নয়, যুগ যুগ ধরে লোকাল ট্রেনের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার চিত্র স্পষ্ট।

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ, আধুনিক সব ইঞ্জিন ও কোচ আনা হলেও বলার মতো লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে নতুন কিছু সংযোজন হয়নি। অথচ রেলের হিসাবেই প্রতিবছর ট্রেনে ভ্রমণকারী প্রায় ১০ কোটি যাত্রীর ৭৫ ভাগই বহন করে লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন। এর ফলে রেলের আয়ও কমে গেছে। দুর্ভোগ বেড়েছে অল্প আয়ের ও দূরত্বে চলাচলকারী রেলযাত্রীদের।

গত ছয় মাসে রেল আয় করেছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে রেলের আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। বেশিরভাগ ট্রেন বন্ধ থাকায় ৪৯৩টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫১টিই খাঁখাঁ করছে। নেই মানুষের কোলাহল। তা ছাড়া এই স্টেশনগুলোর ওপর ভর করে যেসব মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত, বন্ধ হয়ে গেছে তাদের আয়-রোজগারও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার এই সময়ে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চলাচল করার কথা থাকলেও যাত্রী মিলছে নির্ধারিত আসনের প্রায় অর্ধেক। এই দুর্যোগে অল্প দূরত্বেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন যাত্রীরা। অথচ লোকাল ট্রেনই বন্ধ।

কথা হয় রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, করোনার সময়ে ভাড়া বৃদ্ধি না করে পূর্বের মূল্যে এবং অর্ধেক সিটে যাত্রী বহন করায় আয়ও কমে গেছে অনেক। কিন্তু সাধারণ মানুষের বাহন ট্রেনের এই লোকসান স্বীকার করেই আমরা যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছি। যেসব ট্রেন বন্ধ রয়েছে সেগুলো চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ট্রেনগুলো চালু করলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না-এ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। আমরা যাত্রীদের ঝুঁকিতে না ফেলে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে চাই। লোকাল ট্রেনের ইঞ্জিন কোচের স্বল্পতা দীর্ঘদিনের। আমরা এসব মেরামত করছি।

রেলওয়ে প্রকৌশল ও মেকানিক্যাল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক যুগ ধরে রেলে নতুন ইঞ্জিনসহ অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী কোচ ক্রয় করা হলেও; লোকাল, মেইল কিংবা কমিউটার ট্রেনে নতুন কোনো কিছু সংযোজন হয়নি। বর্তমানে ৩৫১টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে, যার মধ্যে ১০৪টি আন্তঃনগর এবং ১৪৮টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন।

এসব ট্রেনের কোচ ও ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে আগেই। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ইঞ্জিন ও কোচ দিয়েই ট্রেনগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ট্রেন উনিশ-বিশ হলেই লাইনচ্যুতসহ চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ছে। জানা গেছে, বন্ধ রাখা ট্রেনগুলোর ইঞ্জিন কোচগুলোকে পাহাড়তলী ও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পাঠানো হয়েছে মেরামতের জন্য। তবে আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া লোকাল ও মেইল ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ ছিল আগে থেকেই।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামানের সরকারি মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।

তবে কথা হয় রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, করোনার এ কঠিন সময়েও জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সঙ্গে কিছু লোকাল-মেইল-কমিউটার ট্রেন চালু করা হয়েছে। বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর মেরামতকাজ চলছে। উপর মহল থেকে নির্দেশনা এলেই এগুলো চালু করা হবে। তবে বাস মালিকদের সঙ্গে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা মোতাবেক বন্ধ ট্রেনগুলো চালুর ব্যবস্থা করব।

জানা যায়, ঢাকা-কলকাতা ও খুলনা-কলকাতা রুটে চলা ৪টি যাত্রীবাহী ট্রেনও বন্ধ। আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চালুর পর লোকসানের পাশাপাশি সেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ধ ট্রেনগুলো চালু হলে লোকসানও কমে আসত। গত ৬ মাসে রেল যাত্রী পরিবহণ করেছে মাত্র এক কোটি ৬০ লাখ।

এর আগে একই সময়ে সাড়ে চার কোটি যাত্রী পরিবহণ করা হয়। ছয় মাসে যাত্রী কমেছে প্রায় ৭০ ভাগ। এদিকে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেস চার জোড়া ট্রেন বন্ধ থাকার কারণেও লোকসান বাড়ছে। এসব ট্রেনে মাসে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করত। এ রুটে আয়ের ৭৫ ভাগই পেত বাংলাদেশ।

লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকার নেপথ্য কারণ হিসেবে অনেকে আবার বাস মালিকদের সঙ্গে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও করছেন। তবে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি। তারা বলছেন, এসবই ভিত্তিহীন।

অভিযোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ যুগান্তরকে জানান, ট্রেন বন্ধ রাখার পেছনে অবৈধ লেনদেনের কোনো ব্যাপার নেই। যেখানে ট্রেন বন্ধ সেখানকার যাত্রীরা বাসে চড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের যদি কোনো কিছু ঘটে সেটার খোঁজ নেওয়া হবে। তবে ট্রেন বন্ধ রাখার বিষয়ে বাস মালিকদের হাত নেই।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৪৯৩টির মধ্যে মাত্র ৪১টি স্টেশনে ১০৪টি আন্তঃনগর ট্রেন বিরতি দিচ্ছে। কিন্তু গরিবের বাহন মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনগুলো প্রতিটি স্টেশনেই বিরতি দিত। এ ছাড়া ঢাকা-কলকাতা, খুলনা-কলকাতা পথে চলা ৪টি যাত্রীবাহী ট্রেনও বন্ধ। তবে ট্রেন বন্ধ থাকলেও এসব স্টেশনের প্রয়োজনীয় লোকবলকে বসিয়ে বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। বন্ধ ট্রেন চালু হলে এসব স্টেশন সচল হয়ে উঠত। বাড়ত আয়।

সূত্র জানায় করোনা সংক্রমণ রোধে প্রায় দুমাস সব ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চালু করা হলেও অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হচ্ছে। লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনের মধ্যে সিলেট সেকশনে তিন জোড়া, আখাউড়া-সিলেট, আখাউড়া-চট্টগ্রাম, আখাউড়া-ভৈরব, চট্টগ্রাম-লাকসাম-চাঁদপুর রুটে আট জোড়া, ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার রুটে চার জোড়া, খুলনা-বেনাপোল, রাজশাহী-খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট-পার্বতীপুর, নীলফামারী-চিলাহাটি, দিনাজপুর-পঞ্চগড় রুটে ১৬ জোড়া, ঢাকা ময়মনসিংহ, ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চার জোড়া ট্রেন বন্ধ থাকায় এসব অঞ্চলের রেলযাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই।

কথা হয় এসব রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের সঙ্গে। তারা একই সুরে যুগান্তরকে বলেছেন, ময়মনসিংহ-ভৈরব পথে চারটি লোকাল ট্রেন চলত। ১০ মাস ধরে বন্ধ। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস নামে দুটি মেইল ট্রেনও বন্ধ। সব কটি ট্রেনেই উপচে পড়া ভিড় ছিল। এগুলো বন্ধ থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

৪৯৩ স্টেশনের ৪৫১টিই করছে খাঁখাঁ

অবহেলায় লোকাল ট্রেন মনোযোগ আন্তঃনগরে

৭৫ ভাগ যাত্রী বহন করে লোকাল মেইল ও কমিউটার ট্রেন * আন্তঃনগর ট্রেনের নির্ধারিত আসনের অর্ধেকই ফাঁকা
 শিপন হাবীব 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭৫ ভাগ যাত্রীই বহন করে লোকাল ট্রেন। অথচ রেল কর্তৃপক্ষের বেশিরভাগ মনঃসংযোগই যেন দূরপাল্লার ট্রেনকে ঘিরে। করোনা মহামারির প্রকোপ কিছুটা কমে আসায় দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হলেও আজও বন্ধ লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন।

দেশের প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়ার সঙ্গে সব ধরনের বাস চালু করা হলেও প্রচণ্ড চাহিদা থাকার পরও লোকাল ট্রেন চালুর কোনো উদ্যোগ নেই। কবে নাগাদ চালু হবে, তারও কোনো উত্তর নেই। শুধু তাই নয়, যুগ যুগ ধরে লোকাল ট্রেনের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার চিত্র স্পষ্ট।

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ, আধুনিক সব ইঞ্জিন ও কোচ আনা হলেও বলার মতো লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে নতুন কিছু সংযোজন হয়নি। অথচ রেলের হিসাবেই প্রতিবছর ট্রেনে ভ্রমণকারী প্রায় ১০ কোটি যাত্রীর ৭৫ ভাগই বহন করে লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন। এর ফলে রেলের আয়ও কমে গেছে। দুর্ভোগ বেড়েছে অল্প আয়ের ও দূরত্বে চলাচলকারী রেলযাত্রীদের।

গত ছয় মাসে রেল আয় করেছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে রেলের আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। বেশিরভাগ ট্রেন বন্ধ থাকায় ৪৯৩টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫১টিই খাঁখাঁ করছে। নেই মানুষের কোলাহল। তা ছাড়া এই স্টেশনগুলোর ওপর ভর করে যেসব মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত, বন্ধ হয়ে গেছে তাদের আয়-রোজগারও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার এই সময়ে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চলাচল করার কথা থাকলেও যাত্রী মিলছে নির্ধারিত আসনের প্রায় অর্ধেক। এই দুর্যোগে অল্প দূরত্বেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন যাত্রীরা। অথচ লোকাল ট্রেনই বন্ধ।

কথা হয় রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, করোনার সময়ে ভাড়া বৃদ্ধি না করে পূর্বের মূল্যে এবং অর্ধেক সিটে যাত্রী বহন করায় আয়ও কমে গেছে অনেক। কিন্তু সাধারণ মানুষের বাহন ট্রেনের এই লোকসান স্বীকার করেই আমরা যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছি। যেসব ট্রেন বন্ধ রয়েছে সেগুলো চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ট্রেনগুলো চালু করলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না-এ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। আমরা যাত্রীদের ঝুঁকিতে না ফেলে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে চাই। লোকাল ট্রেনের ইঞ্জিন কোচের স্বল্পতা দীর্ঘদিনের। আমরা এসব মেরামত করছি।

রেলওয়ে প্রকৌশল ও মেকানিক্যাল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক যুগ ধরে রেলে নতুন ইঞ্জিনসহ অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী কোচ ক্রয় করা হলেও; লোকাল, মেইল কিংবা কমিউটার ট্রেনে নতুন কোনো কিছু সংযোজন হয়নি। বর্তমানে ৩৫১টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে, যার মধ্যে ১০৪টি আন্তঃনগর এবং ১৪৮টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন।

এসব ট্রেনের কোচ ও ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে আগেই। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ইঞ্জিন ও কোচ দিয়েই ট্রেনগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ট্রেন উনিশ-বিশ হলেই লাইনচ্যুতসহ চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ছে। জানা গেছে, বন্ধ রাখা ট্রেনগুলোর ইঞ্জিন কোচগুলোকে পাহাড়তলী ও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পাঠানো হয়েছে মেরামতের জন্য। তবে আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া লোকাল ও মেইল ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ ছিল আগে থেকেই।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামানের সরকারি মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।

তবে কথা হয় রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, করোনার এ কঠিন সময়েও জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সঙ্গে কিছু লোকাল-মেইল-কমিউটার ট্রেন চালু করা হয়েছে। বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর মেরামতকাজ চলছে। উপর মহল থেকে নির্দেশনা এলেই এগুলো চালু করা হবে। তবে বাস মালিকদের সঙ্গে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা মোতাবেক বন্ধ ট্রেনগুলো চালুর ব্যবস্থা করব।

জানা যায়, ঢাকা-কলকাতা ও খুলনা-কলকাতা রুটে চলা ৪টি যাত্রীবাহী ট্রেনও বন্ধ। আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চালুর পর লোকসানের পাশাপাশি সেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ধ ট্রেনগুলো চালু হলে লোকসানও কমে আসত। গত ৬ মাসে রেল যাত্রী পরিবহণ করেছে মাত্র এক কোটি ৬০ লাখ।

এর আগে একই সময়ে সাড়ে চার কোটি যাত্রী পরিবহণ করা হয়। ছয় মাসে যাত্রী কমেছে প্রায় ৭০ ভাগ। এদিকে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেস চার জোড়া ট্রেন বন্ধ থাকার কারণেও লোকসান বাড়ছে। এসব ট্রেনে মাসে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করত। এ রুটে আয়ের ৭৫ ভাগই পেত বাংলাদেশ।

লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকার নেপথ্য কারণ হিসেবে অনেকে আবার বাস মালিকদের সঙ্গে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও করছেন। তবে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি। তারা বলছেন, এসবই ভিত্তিহীন।

অভিযোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ যুগান্তরকে জানান, ট্রেন বন্ধ রাখার পেছনে অবৈধ লেনদেনের কোনো ব্যাপার নেই। যেখানে ট্রেন বন্ধ সেখানকার যাত্রীরা বাসে চড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের যদি কোনো কিছু ঘটে সেটার খোঁজ নেওয়া হবে। তবে ট্রেন বন্ধ রাখার বিষয়ে বাস মালিকদের হাত নেই।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৪৯৩টির মধ্যে মাত্র ৪১টি স্টেশনে ১০৪টি আন্তঃনগর ট্রেন বিরতি দিচ্ছে। কিন্তু গরিবের বাহন মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনগুলো প্রতিটি স্টেশনেই বিরতি দিত। এ ছাড়া ঢাকা-কলকাতা, খুলনা-কলকাতা পথে চলা ৪টি যাত্রীবাহী ট্রেনও বন্ধ। তবে ট্রেন বন্ধ থাকলেও এসব স্টেশনের প্রয়োজনীয় লোকবলকে বসিয়ে বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। বন্ধ ট্রেন চালু হলে এসব স্টেশন সচল হয়ে উঠত। বাড়ত আয়।

সূত্র জানায় করোনা সংক্রমণ রোধে প্রায় দুমাস সব ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চালু করা হলেও অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হচ্ছে। লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনের মধ্যে সিলেট সেকশনে তিন জোড়া, আখাউড়া-সিলেট, আখাউড়া-চট্টগ্রাম, আখাউড়া-ভৈরব, চট্টগ্রাম-লাকসাম-চাঁদপুর রুটে আট জোড়া, ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার রুটে চার জোড়া, খুলনা-বেনাপোল, রাজশাহী-খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট-পার্বতীপুর, নীলফামারী-চিলাহাটি, দিনাজপুর-পঞ্চগড় রুটে ১৬ জোড়া, ঢাকা ময়মনসিংহ, ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চার জোড়া ট্রেন বন্ধ থাকায় এসব অঞ্চলের রেলযাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই।

কথা হয় এসব রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের সঙ্গে। তারা একই সুরে যুগান্তরকে বলেছেন, ময়মনসিংহ-ভৈরব পথে চারটি লোকাল ট্রেন চলত। ১০ মাস ধরে বন্ধ। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস নামে দুটি মেইল ট্রেনও বন্ধ। সব কটি ট্রেনেই উপচে পড়া ভিড় ছিল। এগুলো বন্ধ থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন