পুলিশি তদন্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ২৭৮৯ মামলা
jugantor
২০২০ সালের সড়ক দুর্ঘটনা
পুলিশি তদন্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ২৭৮৯ মামলা
৪১৯৮ দুর্ঘটনায় মামলা হয় ২৯৫৬টি বিচারাধীন ২৬টি * ১৮৪৫ চালক পলাতক, আটক ৭৪৩

  সিরাজুল ইসলাম ও কাজী জেবেল  

২২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর জুনদহ এলাকায় গত মে মাসে রডবাহী ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যান ১৩ জন শ্রমিক। আইন অনুযায়ী মালবাহী ট্রাকে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ।

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে নিহত এই ১৩ জনকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে বহন করছিলেন চালক। গত সাত মাস পার হলেও এখনো এ মামলায় চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পলাশবাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মতিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তদন্তকাজ চলছে। কবে নাগাদ চার্জশিট দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তদন্ত শেষ হতে আরও ২-৩ মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। শুধু এই দুর্ঘটনার মামলাই নয়, ২০২০ সালে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ২ হাজার ৭৮৯টি মামলা তদন্তাধীন। এ সময়ে চার্জশিট দাখিল হয়ে বিচারধীন রয়েছে মাত্র ২৬টি মামলা।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর সারা দেশে ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সড়কে মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮২৬ জন। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৬টি মামলা হয়েছে। আর সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ১ হাজার ২৪৬টি। মামলা হয়েছে এমন ২ হাজার ৯৫৬টি দুর্ঘটনার মধ্যে তদন্ত হচ্ছে ২ হাজার ৭৮৯টির। যদিও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী চালকরা। বর্তমানে যানবাহনের তুলনায় সাত লাখের বেশি চালকের অভাব রয়েছে। এছাড়া সরকার আইন শিথিল করায় হালকা (প্রাইভেট কার) যান চালানোর লাইসেন্স দিয়ে মধ্যম মানের এবং মধ্যম মানের যানবাহনের লাইসেন্স দিয়ে ভারী যান চলানোর সুযোগ দিয়েছে।

গত সোমবার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে আকাশ ইকবাল (২৬) ও হাজারিকা মায়া মিতু (২২) দম্পতিকে চাপা দেওয়া আজমেরি গ্লোরি পরিবহনের বাসচালক তসিকুল ইসলাম। ওই চালক প্রাইভেট কার চালানোর লাইসেন্স নিয়ে বাস চালাচ্ছিলেন।

ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণে দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। অনেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সখ্য রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায় না। তবে যে কারণেই হোক না কেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা ও বিচারের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার। এতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তার সহযোগীরা পার পেয়ে যান। তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন।

এ বিষয়ে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, বিচার ও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের ধারণা মামলা করে কিছু হবে না। তাই দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে তার স্বজনরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করে লাশ নিয়ে যান।

এছাড়া দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের বসতবাড়ি বা সাক্ষীদের অবস্থান অন্য এলাকায় হয়ে থাকে। এটিও মামলা কম হওয়ার অন্যতম কারণ। এসব কারণে সুযোগ পেয়ে যান দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও অন্যরা। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে পুলিশের অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। তারা প্রকৃত কারণ না খুঁজে গৎবাধাভাবে চালককে দায়ী করে চার্জশিট দেন। এতেও মামলা দুর্বল হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মনিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা তদন্তে বিলম্বের মূল কারণ হলো সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়া। কারণ, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া যায় না। যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া চার্জশিট দেওয়া হলে আসামিদের খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ডিএমপির এ অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর অনেক সময় মামলার বাদী পেতেই কষ্ট হয়। কোনো কোনো সময় মামলা হতে বিলম্ব হয়। তখন সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, দুর্ঘটনা হয় রাস্তায়। যারা সাক্ষী থাকেন, তারা বেশির ভাগই পথচারী। তদন্তকালে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কয়েকবার নোটিশ করেও তাদের পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা এবং পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১১১ দফা সুপারিশ নিয়ে কাজ করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিকে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্স সদস্যরা ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথম সভা করেন।

এর এক বছর এক মাস পর ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সভা হয়। প্রথম সভায় ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে চারজন সচিবের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়।

দ্বিতীয় সভায় ওই চার কমিটির কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। এছাড়া চালক তৈরি ও পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানীতে পরীক্ষামূলকভাবে এক রুটে এক কোম্পানির গাড়ি চলাচলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া পরিবহণ খাতে উল্লেখযোগ্য শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি।

পুলিশের আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময়ে সড়কের গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়েনি। ২০১৬ সালে সড়কে ২ হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৬৩ জন মারা যান।

২০১৭ সালে ২ হাজার ৫৬২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ জন এবং ২০১৮ সালে ২ হাজার ৬০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৩৫ জন মারা যান। অপরদিকে ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনা দেড়গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১৪৭টিতে। ওই বছর দুর্ঘটনায় মারা যান ৪ হাজার ১৩৮ জন ও আহত হন ৪ হাজার ৪১১ জন। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে কয়েক মাস যানচলাচল বন্ধ ছিল। তবুও ওই বছর ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮২৬ জন।

পুলিশের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সব দুর্ঘটনায় মামলা দায়ের হয় না। সাধারণত যেসব দুর্ঘটনায় সংঘর্ষ বা অন্য কোনো যানবাহন ও পথচারীকে ধাক্কা ও চাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটে, সেগুলোয় মামলা হয়ে থাকে। বাকিগুলোয় জিডি করা হয়। আবার মামলা হলেও তদন্তের জন্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকে।

বিদায়ি ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৬টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৬টি বিচারাধীন। মামলা তদন্তাধীন রয়েছে ২ হাজার ৭৮৯টি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক ও ভিআইপি প্রটোকলে পুলিশ বেশি ব্যস্ত থাকে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় তাদের আগ্রহ কম থাকে।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সঠিকভাবে এজাহার, তদন্ত ও চার্জশিট হয় না। এসব কারণে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা সঠিক বিচার পান না। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মামলা হয়, এর ২-৩ শতাংশের বিচার হয়।

আরও দেখা গেছে, দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ দায়ী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের চালকরা। এছাড়া বাস ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলচালক ২২ দশমিক ৮৯ শতাংশ দায়ী। তবে দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের বেশির ভাগ চালকই পালিয়ে যান। তারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। ওই বছরে দুর্ঘটনায় ৭৪৩ জন চালককে আটক করেছে পুলিশ। পলাতক রয়েছেন ১ হাজার ৮৪৫ জন।

হাইওয়ে ও ডিএমপিতে বেশি দুর্ঘটনা : পুলিশের নয়টি রেঞ্জের মধ্যে হাইওয়ে রেঞ্জ এবং ৮টি মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে ঢাকায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ দুটি এলাকায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও বেশি। বিদায়ি ২০২০ সালে হাইওয়ে রেঞ্জে সব মিলিয়ে ১ হাজার ৭৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫৭৮ জন মারা গেছেন।

এসব ঘটনায় ৭০০টি মামলা এবং ১ হাজার ৯১টি জিডি হয়েছে। ৭০০টি মামলার সবকটিই তদন্তাধীন রয়েছে। একটিরও চার্জশিট হয়নি। এসব ঘটনায় ১০৪ জন চালককে আটক করেছে পুলিশ।

পলাতক রয়েছেন ৪৪৩ জন চালক। অপরদিকে ডিএমপিতে ৩২৪টি দুর্ঘটনায় সবকটিতে মামলা করা হয়েছে। সবকটি মামলাই তদন্তাধীন রয়েছে।

শহর এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলেও ১৫৭টি দুর্ঘটনায় দায়ী চালককে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে ১২৮টি দুর্ঘটনায় চালককে আটক করা হয়েছে। পুলিশের রেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরিশালে ৬৯টি ও খুলনা মেট্রোপলিটনে ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটে।

২০২০ সালের সড়ক দুর্ঘটনা

পুলিশি তদন্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ২৭৮৯ মামলা

৪১৯৮ দুর্ঘটনায় মামলা হয় ২৯৫৬টি বিচারাধীন ২৬টি * ১৮৪৫ চালক পলাতক, আটক ৭৪৩
 সিরাজুল ইসলাম ও কাজী জেবেল 
২২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর জুনদহ এলাকায় গত মে মাসে রডবাহী ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যান ১৩ জন শ্রমিক। আইন অনুযায়ী মালবাহী ট্রাকে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ।

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে নিহত এই ১৩ জনকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে বহন করছিলেন চালক। গত সাত মাস পার হলেও এখনো এ মামলায় চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পলাশবাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মতিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তদন্তকাজ চলছে। কবে নাগাদ চার্জশিট দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তদন্ত শেষ হতে আরও ২-৩ মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। শুধু এই দুর্ঘটনার মামলাই নয়, ২০২০ সালে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ২ হাজার ৭৮৯টি মামলা তদন্তাধীন। এ সময়ে চার্জশিট দাখিল হয়ে বিচারধীন রয়েছে মাত্র ২৬টি মামলা।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর সারা দেশে ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সড়কে মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮২৬ জন। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৬টি মামলা হয়েছে। আর সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ১ হাজার ২৪৬টি। মামলা হয়েছে এমন ২ হাজার ৯৫৬টি দুর্ঘটনার মধ্যে তদন্ত হচ্ছে ২ হাজার ৭৮৯টির। যদিও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী চালকরা। বর্তমানে যানবাহনের তুলনায় সাত লাখের বেশি চালকের অভাব রয়েছে। এছাড়া সরকার আইন শিথিল করায় হালকা (প্রাইভেট কার) যান চালানোর লাইসেন্স দিয়ে মধ্যম মানের এবং মধ্যম মানের যানবাহনের লাইসেন্স দিয়ে ভারী যান চলানোর সুযোগ দিয়েছে।

গত সোমবার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে আকাশ ইকবাল (২৬) ও হাজারিকা মায়া মিতু (২২) দম্পতিকে চাপা দেওয়া আজমেরি গ্লোরি পরিবহনের বাসচালক তসিকুল ইসলাম। ওই চালক প্রাইভেট কার চালানোর লাইসেন্স নিয়ে বাস চালাচ্ছিলেন।

ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নানা কারণে দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। অনেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সখ্য রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায় না। তবে যে কারণেই হোক না কেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা ও বিচারের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার। এতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তার সহযোগীরা পার পেয়ে যান। তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন।

এ বিষয়ে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, বিচার ও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের ধারণা মামলা করে কিছু হবে না। তাই দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে তার স্বজনরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করে লাশ নিয়ে যান।

এছাড়া দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের বসতবাড়ি বা সাক্ষীদের অবস্থান অন্য এলাকায় হয়ে থাকে। এটিও মামলা কম হওয়ার অন্যতম কারণ। এসব কারণে সুযোগ পেয়ে যান দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও অন্যরা। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে পুলিশের অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। তারা প্রকৃত কারণ না খুঁজে গৎবাধাভাবে চালককে দায়ী করে চার্জশিট দেন। এতেও মামলা দুর্বল হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মনিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা তদন্তে বিলম্বের মূল কারণ হলো সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়া। কারণ, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া যায় না। যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া চার্জশিট দেওয়া হলে আসামিদের খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ডিএমপির এ অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর অনেক সময় মামলার বাদী পেতেই কষ্ট হয়। কোনো কোনো সময় মামলা হতে বিলম্ব হয়। তখন সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, দুর্ঘটনা হয় রাস্তায়। যারা সাক্ষী থাকেন, তারা বেশির ভাগই পথচারী। তদন্তকালে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কয়েকবার নোটিশ করেও তাদের পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা এবং পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১১১ দফা সুপারিশ নিয়ে কাজ করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিকে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্স সদস্যরা ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথম সভা করেন।

এর এক বছর এক মাস পর ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সভা হয়। প্রথম সভায় ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে চারজন সচিবের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়।

দ্বিতীয় সভায় ওই চার কমিটির কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। এছাড়া চালক তৈরি ও পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানীতে পরীক্ষামূলকভাবে এক রুটে এক কোম্পানির গাড়ি চলাচলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া পরিবহণ খাতে উল্লেখযোগ্য শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি।

পুলিশের আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময়ে সড়কের গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়েনি। ২০১৬ সালে সড়কে ২ হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৬৩ জন মারা যান।

২০১৭ সালে ২ হাজার ৫৬২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ জন এবং ২০১৮ সালে ২ হাজার ৬০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৩৫ জন মারা যান। অপরদিকে ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনা দেড়গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১৪৭টিতে। ওই বছর দুর্ঘটনায় মারা যান ৪ হাজার ১৩৮ জন ও আহত হন ৪ হাজার ৪১১ জন। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে কয়েক মাস যানচলাচল বন্ধ ছিল। তবুও ওই বছর ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮২৬ জন।

পুলিশের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সব দুর্ঘটনায় মামলা দায়ের হয় না। সাধারণত যেসব দুর্ঘটনায় সংঘর্ষ বা অন্য কোনো যানবাহন ও পথচারীকে ধাক্কা ও চাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটে, সেগুলোয় মামলা হয়ে থাকে। বাকিগুলোয় জিডি করা হয়। আবার মামলা হলেও তদন্তের জন্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকে।

বিদায়ি ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৬টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৬টি বিচারাধীন। মামলা তদন্তাধীন রয়েছে ২ হাজার ৭৮৯টি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক ও ভিআইপি প্রটোকলে পুলিশ বেশি ব্যস্ত থাকে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় তাদের আগ্রহ কম থাকে।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সঠিকভাবে এজাহার, তদন্ত ও চার্জশিট হয় না। এসব কারণে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা সঠিক বিচার পান না। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মামলা হয়, এর ২-৩ শতাংশের বিচার হয়।

আরও দেখা গেছে, দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ দায়ী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের চালকরা। এছাড়া বাস ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলচালক ২২ দশমিক ৮৯ শতাংশ দায়ী। তবে দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের বেশির ভাগ চালকই পালিয়ে যান। তারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। ওই বছরে দুর্ঘটনায় ৭৪৩ জন চালককে আটক করেছে পুলিশ। পলাতক রয়েছেন ১ হাজার ৮৪৫ জন।

হাইওয়ে ও ডিএমপিতে বেশি দুর্ঘটনা : পুলিশের নয়টি রেঞ্জের মধ্যে হাইওয়ে রেঞ্জ এবং ৮টি মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে ঢাকায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ দুটি এলাকায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও বেশি। বিদায়ি ২০২০ সালে হাইওয়ে রেঞ্জে সব মিলিয়ে ১ হাজার ৭৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫৭৮ জন মারা গেছেন।

এসব ঘটনায় ৭০০টি মামলা এবং ১ হাজার ৯১টি জিডি হয়েছে। ৭০০টি মামলার সবকটিই তদন্তাধীন রয়েছে। একটিরও চার্জশিট হয়নি। এসব ঘটনায় ১০৪ জন চালককে আটক করেছে পুলিশ।

পলাতক রয়েছেন ৪৪৩ জন চালক। অপরদিকে ডিএমপিতে ৩২৪টি দুর্ঘটনায় সবকটিতে মামলা করা হয়েছে। সবকটি মামলাই তদন্তাধীন রয়েছে।

শহর এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলেও ১৫৭টি দুর্ঘটনায় দায়ী চালককে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে ১২৮টি দুর্ঘটনায় চালককে আটক করা হয়েছে। পুলিশের রেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরিশালে ৬৯টি ও খুলনা মেট্রোপলিটনে ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটে।