উদ্ধার বিদেশি পিস্তল পুলিশি তদন্তে দেশি
jugantor
অস্ত্র মামলায় ইরফান সেলিমের অব্যাহতি
উদ্ধার বিদেশি পিস্তল পুলিশি তদন্তে দেশি
রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে কে বা কারা অতিথি কক্ষে পিস্তল রেখেছিল তদন্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি -পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন

  মাহবুব আলম লাবলু  

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে র‌্যাবের করা অস্ত্র মামলার এজাহার ও পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে।

আলোচিত সেই অভিযান বিভিন্ন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে সেটি ছিল পুরোপুরি দৃশ্যমান। অভিযানের পর র‌্যাব মামলার এজাহারে বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের কথা বললেও পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে দেশি সচল পিস্তল উদ্ধারের তথ্য।

এজাহারে পিস্তলটি ইরফানের ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার অতিথি কক্ষ থেকে পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছে।

কে বা কারা এ অস্ত্র সেখানে রেখেছিলেন তদন্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ইরফানের রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা নষ্টের জন্য কেউ অস্ত্রটি সেখানে রাখতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে পুলিশ প্রতিবেদনে।

বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন গ্রহণ করে ইরফান সেলিমকে এ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।

এছাড়া আলোচিত যে ম্যাজিস্ট্রেট ইরফানকে ঘটনাস্থলেই সাজা দিয়েছিলেন সেই ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য পর্যন্ত দেননি।

আদালত পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে বৃহস্পতিবার ইরফান সেলিমকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেন। উল্লেখ্য, অভিযানের কয়েক দিন পরই সারোয়ার আলমকে র‌্যাব থেকে বদলি করে দেওয়া হয়।

বিপরীতমুখী এমন পুলিশ প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে, ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা যেটা তদন্তে পেয়েছি সেটি দিয়েছি। এ বিষয়ে কথা বলার কিছু নেই।

এজাহার ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে একেবারে বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে আসামির সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন. এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলা চাইলে র‌্যাবও তদন্ত করতে পারত। সে এখতিয়ার র‌্যাবের আছে।

এই মামলার তদন্ত কাজ যারা সুপারভাইজ করেছেন তারাও এর দায় এড়াতে পারেন না। কারণ এজাহার ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সন্দেহজনক অসঙ্গতি থাকলে সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের।

আর একই আসামির এক ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা হওয়ার আদালত থেকে অব্যাহতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সামারি ট্রায়ালে অনেক সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

জানা গেছে, র‌্যাবের করা অস্ত্র ও মাদক মামলায় ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ।

চকবাজার থানা পুলিশ তদন্ত শেষে মামলা দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করলে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালত শুনানি শেষে অস্ত্র মামলার প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সেলিম পুত্রকে অব্যাহতি দেন। ঢাকা মহানগর ১নং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ এ আদেশ দেন। আর মাদক মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি ২৮ ফেব্রুয়ারি ধার্য আছে।

ইরফানের আইনজীবী শ্রী প্রাণনাথ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমামের আদালতে পুলিশ অস্ত্র ও মাদক মামলায় ইরফানকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানে ইরফানের দেহরক্ষী জাহিদকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর মাদক মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রহণযোগ্যতার শুনানি ২৮ ফেব্রুয়ারি ধার্য আছে। তবে নৌ বাহিনীর সদস্যকে মারধরের মামলায় ইরফান সেলিমকে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই মামলায় ধানমণ্ডি থানা পুলিশ ইরফানসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

১১ মার্চ এ মামলার শুনানির দিন ধার্য আছে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যার পর ধানমণ্ডি এলাকায় হাজী সেলিমের ছেলের গাড়ি নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খানের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরফান সেলিম ও তার সহযোগীরা ওয়াসিফকে মেরে রক্তাক্ত জখম করে। এ ঘটনার পর দিন র‌্যাব পুরান ঢাকার হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালায়। এ অভিযান বিভিন্ন ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। লম্বা সময় অভিযানকালে ইরফানের শয়ন কক্ষসহ বিভিন্ন রুম থেকে ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মাদকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। তখনই র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম ইরফানকে দেড় বছরের সাজা দেন।

অস্ত্র মামলার এজাহারে যা বলেছিল র‌্যাব : উল্লিখিত ঘটনায় চকবাজার থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়।

র‌্যাব ৩ এর ডিএডি কাইয়ুম ইসলাম বাদী হয়ে অস্ত্র মামলার এজাহারে বলেন. র‌্যাবের গোয়েন্দা তথ্যে তারা জানতে পারেন চান সরদার দাদা বাড়ি ভবনে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ কয়েক জন ব্যক্তি অবস্থান করছেন। এ খবর পেয়েই বিপুল সংখ্যক র‌্যাব সদস্য বাড়িটি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায়।

তল্লাশিকালে চার তলা থেকে জাহিদ মোল্লাকে আটক করে তার কাছ থেকে একটি কালো রংয়ের বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ছয় ইঞ্চি। পিস্তলটির গায়ে মেইড ইন ইউএসএ, আরেক দিকে অটো পিস্তল লেখা ছিল। ২ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিন পিস্তলের ভেতর ছিল।

এরপর র‌্যাব সদস্যরা ভবনের চার তরায় ইরফান সেলিমের শয়ন কক্ষে ঢুকে তল্লাশি চালায়। তল্লাশিকালে ইরফানের ব্যক্তিগত বিছানার নিচ থেকে একটি কালো রঙের বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

যার ব্যারেলের একদিকে মেইড ইন ইউএসএ ও অন্যদিকে অটো পিস্তল এবং উপরে আর্মি লেখা ছিল। যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ৬ ইঞ্চি। পিস্তলটির বাঁট সাদা রঙের। বাঁটের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭ ইঞ্চি।

উদ্ধার করা অবৈধ অস্ত্র, গুলি এবং মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আসামিরা সন্তোষজনক জবাব কিংবা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৮৮ ধারার অপরাধে অস্ত্র আইনে ছয় মাস এবং মাদকদ্রব্য আইনে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেন, নিয়মমাফিক তদন্তভার গ্রহর করার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ বিভিন্ন আলামত ডকেটভুক্ত করেন। সাক্ষীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

কিন্তু ঘটনার সময় অভিযানে থাকা বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকে মামলার ঘটনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সাক্ষী দেবেন না মর্মে জানান।

র‌্যাবের মামলার এজাহারে বিদেশি পিস্তলের কথা বলা বলেও সিআইডির ব্যালিস্টিক রিপোর্টের বরাত দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় উদ্ধার করা অস্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি পিস্তল, যা সচল আছে। গুলি দুটিও তাজা।

মামলার এজাহারে র‌্যাব ইরফানের শয়ন কক্ষের বিছানার নিচ থেকে অস্ত্রটি উদ্ধারের কথা বললেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরেজমিনে তদন্তকালে সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা যায় অস্ত্র মামলার ঘটনাস্থলটি ইরফান সেলিমের ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ নয়।

আর অভিযুক্ত ইরফান সেলিমের পরিবার একটি রাজনৈতিক পরিবার বিধায় উক্ত অতিথি কক্ষে বিভিন্ন আগন্তুক অতিথি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং এলাকার সাধারণ জনগণ ইরফান সেলিমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করতে আসেন।

বিদেশে পড়াশনা শেষ করা ইরফান সেলিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য এবং সমাজে তার মানসম্মান ক্ষুণ্ন করাসহ সমাজে হেয়পতিপন্ন করার জন্য কে বা কারা অস্ত্র মামলায় জব্দ করা পিস্তলটি ইরফান সেলিমের চার তলার অতিথি কক্ষে রেখেছিলেন তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাছাড়া মামলার বাদী এজাহারে ও জব্দ তালিকায় কার অস্ত্র বা কার দেখানো মতে জব্দ করা হয়েছে তা উল্লেখ করেননি।

এ মামলার গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় অভিযুক্ত ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে অত্র মামলার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। সাক্ষীদের সাক্ষ্যেও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। বিধায় মামলার দায় থেকে ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

র‌্যাবের করা মামলার এজাহার ও পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আমরা অভিযানকালে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এজাহারে উল্লেখ করেছিলাম।

তদন্ত কর্মকর্তা কোনো প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছেন সে বিষয়ে র‌্যাবের স্পষ্ট ধারণা নেই। ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের সাক্ষ্য না দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, তিনি বলেন এজাহারকারী নিজেও একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি যাদেরকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন তাদেরকেই সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

অস্ত্র মামলায় ইরফান সেলিমের অব্যাহতি

উদ্ধার বিদেশি পিস্তল পুলিশি তদন্তে দেশি

রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে কে বা কারা অতিথি কক্ষে পিস্তল রেখেছিল তদন্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি -পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন
 মাহবুব আলম লাবলু 
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে র‌্যাবের করা অস্ত্র মামলার এজাহার ও পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে।

আলোচিত সেই অভিযান বিভিন্ন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে সেটি ছিল পুরোপুরি দৃশ্যমান। অভিযানের পর র‌্যাব মামলার এজাহারে বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের কথা বললেও পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে দেশি সচল পিস্তল উদ্ধারের তথ্য।

এজাহারে পিস্তলটি ইরফানের ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার অতিথি কক্ষ থেকে পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছে।

কে বা কারা এ অস্ত্র সেখানে রেখেছিলেন তদন্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ইরফানের রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা নষ্টের জন্য কেউ অস্ত্রটি সেখানে রাখতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে পুলিশ প্রতিবেদনে।

বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন গ্রহণ করে ইরফান সেলিমকে এ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।

এছাড়া আলোচিত যে ম্যাজিস্ট্রেট ইরফানকে ঘটনাস্থলেই সাজা দিয়েছিলেন সেই ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য পর্যন্ত দেননি।

আদালত পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে বৃহস্পতিবার ইরফান সেলিমকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেন। উল্লেখ্য, অভিযানের কয়েক দিন পরই সারোয়ার আলমকে র‌্যাব থেকে বদলি করে দেওয়া হয়।

বিপরীতমুখী এমন পুলিশ প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে, ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা যেটা তদন্তে পেয়েছি সেটি দিয়েছি। এ বিষয়ে কথা বলার কিছু নেই।

এজাহার ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে একেবারে বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে আসামির সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন. এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলা চাইলে র‌্যাবও তদন্ত করতে পারত। সে এখতিয়ার র‌্যাবের আছে।

এই মামলার তদন্ত কাজ যারা সুপারভাইজ করেছেন তারাও এর দায় এড়াতে পারেন না। কারণ এজাহার ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সন্দেহজনক অসঙ্গতি থাকলে সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের।

আর একই আসামির এক ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা হওয়ার আদালত থেকে অব্যাহতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সামারি ট্রায়ালে অনেক সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

জানা গেছে, র‌্যাবের করা অস্ত্র ও মাদক মামলায় ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ।

চকবাজার থানা পুলিশ তদন্ত শেষে মামলা দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করলে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালত শুনানি শেষে অস্ত্র মামলার প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সেলিম পুত্রকে অব্যাহতি দেন। ঢাকা মহানগর ১নং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ এ আদেশ দেন। আর মাদক মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি ২৮ ফেব্রুয়ারি ধার্য আছে।

ইরফানের আইনজীবী শ্রী প্রাণনাথ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমামের আদালতে পুলিশ অস্ত্র ও মাদক মামলায় ইরফানকে অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানে ইরফানের দেহরক্ষী জাহিদকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর মাদক মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রহণযোগ্যতার শুনানি ২৮ ফেব্রুয়ারি ধার্য আছে। তবে নৌ বাহিনীর সদস্যকে মারধরের মামলায় ইরফান সেলিমকে বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই মামলায় ধানমণ্ডি থানা পুলিশ ইরফানসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

১১ মার্চ এ মামলার শুনানির দিন ধার্য আছে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যার পর ধানমণ্ডি এলাকায় হাজী সেলিমের ছেলের গাড়ি নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খানের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরফান সেলিম ও তার সহযোগীরা ওয়াসিফকে মেরে রক্তাক্ত জখম করে। এ ঘটনার পর দিন র‌্যাব পুরান ঢাকার হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালায়। এ অভিযান বিভিন্ন ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। লম্বা সময় অভিযানকালে ইরফানের শয়ন কক্ষসহ বিভিন্ন রুম থেকে ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মাদকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। তখনই র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম ইরফানকে দেড় বছরের সাজা দেন।

অস্ত্র মামলার এজাহারে যা বলেছিল র‌্যাব : উল্লিখিত ঘটনায় চকবাজার থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়।

র‌্যাব ৩ এর ডিএডি কাইয়ুম ইসলাম বাদী হয়ে অস্ত্র মামলার এজাহারে বলেন. র‌্যাবের গোয়েন্দা তথ্যে তারা জানতে পারেন চান সরদার দাদা বাড়ি ভবনে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ কয়েক জন ব্যক্তি অবস্থান করছেন। এ খবর পেয়েই বিপুল সংখ্যক র‌্যাব সদস্য বাড়িটি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায়।

তল্লাশিকালে চার তলা থেকে জাহিদ মোল্লাকে আটক করে তার কাছ থেকে একটি কালো রংয়ের বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ছয় ইঞ্চি। পিস্তলটির গায়ে মেইড ইন ইউএসএ, আরেক দিকে অটো পিস্তল লেখা ছিল। ২ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিন পিস্তলের ভেতর ছিল।

এরপর র‌্যাব সদস্যরা ভবনের চার তরায় ইরফান সেলিমের শয়ন কক্ষে ঢুকে তল্লাশি চালায়। তল্লাশিকালে ইরফানের ব্যক্তিগত বিছানার নিচ থেকে একটি কালো রঙের বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

যার ব্যারেলের একদিকে মেইড ইন ইউএসএ ও অন্যদিকে অটো পিস্তল এবং উপরে আর্মি লেখা ছিল। যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ৬ ইঞ্চি। পিস্তলটির বাঁট সাদা রঙের। বাঁটের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭ ইঞ্চি।

উদ্ধার করা অবৈধ অস্ত্র, গুলি এবং মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আসামিরা সন্তোষজনক জবাব কিংবা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৮৮ ধারার অপরাধে অস্ত্র আইনে ছয় মাস এবং মাদকদ্রব্য আইনে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেন, নিয়মমাফিক তদন্তভার গ্রহর করার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ বিভিন্ন আলামত ডকেটভুক্ত করেন। সাক্ষীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

কিন্তু ঘটনার সময় অভিযানে থাকা বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকে মামলার ঘটনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সাক্ষী দেবেন না মর্মে জানান।

র‌্যাবের মামলার এজাহারে বিদেশি পিস্তলের কথা বলা বলেও সিআইডির ব্যালিস্টিক রিপোর্টের বরাত দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় উদ্ধার করা অস্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি পিস্তল, যা সচল আছে। গুলি দুটিও তাজা।

মামলার এজাহারে র‌্যাব ইরফানের শয়ন কক্ষের বিছানার নিচ থেকে অস্ত্রটি উদ্ধারের কথা বললেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরেজমিনে তদন্তকালে সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা যায় অস্ত্র মামলার ঘটনাস্থলটি ইরফান সেলিমের ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ নয়।

আর অভিযুক্ত ইরফান সেলিমের পরিবার একটি রাজনৈতিক পরিবার বিধায় উক্ত অতিথি কক্ষে বিভিন্ন আগন্তুক অতিথি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং এলাকার সাধারণ জনগণ ইরফান সেলিমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করতে আসেন।

বিদেশে পড়াশনা শেষ করা ইরফান সেলিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য এবং সমাজে তার মানসম্মান ক্ষুণ্ন করাসহ সমাজে হেয়পতিপন্ন করার জন্য কে বা কারা অস্ত্র মামলায় জব্দ করা পিস্তলটি ইরফান সেলিমের চার তলার অতিথি কক্ষে রেখেছিলেন তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাছাড়া মামলার বাদী এজাহারে ও জব্দ তালিকায় কার অস্ত্র বা কার দেখানো মতে জব্দ করা হয়েছে তা উল্লেখ করেননি।

এ মামলার গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় অভিযুক্ত ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে অত্র মামলার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। সাক্ষীদের সাক্ষ্যেও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। বিধায় মামলার দায় থেকে ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

র‌্যাবের করা মামলার এজাহার ও পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আমরা অভিযানকালে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এজাহারে উল্লেখ করেছিলাম।

তদন্ত কর্মকর্তা কোনো প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছেন সে বিষয়ে র‌্যাবের স্পষ্ট ধারণা নেই। ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের সাক্ষ্য না দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, তিনি বলেন এজাহারকারী নিজেও একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি যাদেরকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন তাদেরকেই সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : হাজী সেলিমপুত্র ইরফানের কাণ্ড