কুয়েতের কারাগারে কে এই রাশেদ?
jugantor
কুয়েতের কারাগারে কে এই রাশেদ?

  যুগান্তর প্রতিবেদন, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)  

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুয়েতের কারাগারে কে এই রাশেদ?

মানব ও অর্থ পাচারের দায়ে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন কুয়েতের আদালত।

২৮ জানুয়ারি তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে পাপুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী টাঙ্গাইলের রাশেদ। পত্রিকায় এ খবর পেয়ে জেলার মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও প্রশ্ন জাগে- কে এই রাশেদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে ‘যুগান্তর’। আর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রহস্য। কুয়েতে যার নাম রাশেদ, এ দেশে ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম হচ্ছে ছাত্তার।

ঘাটাইল সদর থেকে ৩ কিমি. পূর্বে চৌডাল নামে একটি গ্রাম রয়েছে। সেই গ্রামের জনৈক আন্তাজ আলীর ছেলে হলেন আ. ছাত্তার। চৌডাল এলাকায় বনবিভাগের খাস ভূমিতে বাস করতেন তারা। অভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। নুন আনতে পান্তা ফুরাত। অভাবের তাড়নায় সংরক্ষিত বনের গাছ চুরি আর লাকড়ি বিক্রির টাকায় চলত সংসার।

সেনানিবাস হওয়ার পর ওই জমি হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে আশ্রয় নেন স্থানীয় ঝড়কা বাজারে। ১১ ভাই, ১ বোনের মধ্যে ছাত্তার দ্বিতীয়। এর মধ্যে এক ভাই মারা গেছেন। ভাইয়েদের মধ্যে কেউ মাছ বিক্রি করেন, কেউ দিনমজুর।

আবার কারও বিরুদ্ধে রয়েছে ছিঁচকে চুরির অভিযোগ। তার বাবা আন্তাজ আলী এখনো জীবিত। ছাত্তারের বাপ-চাচাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে চুরি-ডাকাতির অভিযোগ। আর বাপ-চাচাদের মতো ছাত্তারও দুর্ধর্ষ স্বভাবের। এ সময় ছাত্তারের চুরি করা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় ঝড়কা বাজারে প্রতিনিয়ত ছিঁচকে চুরির ঘটনা ঘটত।

চুরি করতে গিয়ে ছাত্তার একাধিকবার ধরাও পড়ে। এ নিয়ে ঝড়কা বাজারে তার বিরুদ্ধে সালিশ-দরবারও হয়েছে। কুড়ি বছর আগের কথা। সেনানিবাস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রেশনের দোকান দেয় ছাত্তার।

ব্যবসার নাম নিয়ে সেনা সদস্যসহ অনেকের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে তা না দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ-দরবারও হয়। নানা অভিযোগ মাথায় নিয়ে ছাত্তার হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যান। কিছুদিন পর এলাকাবাসী জানতে পারেন ছাত্তার কুয়েত চলে গেছে। কীভাবে গেল? সে আরেক কাহিনি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, খুলনা বাগেরহাটের জনৈক অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সদস্য চাকরির সুবাদে ঝড়কা বাজারে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শ্যালকের পরিচয়ে রাশেদ নামে এক যুবক আসেন ওই সেনা সদস্যের বাসায়।

বাড়ি ঢাকা সাভার এলাকায় বলে জানা যায়। তার নামে কুয়েতের একটি ভিসা আসে। ওই যুবক কুয়েত যেতে ইচ্ছুক না হওয়ায় তার ভিসাটি ছাত্তার কিনে নেয়। পরে রাশেদের ছবিতে ছাত্তারের ছবি গলাকাটা করে ভিসা তৈরি করে কুয়েত পাড়ি জমায়। সেই থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি ছাত্তারের।

করোনার সময় কুয়েত থেকে আসা ছাত্তারের ছোট ভাই বিপ্লবের সঙ্গে সেলফোনে কথোপকথন তুলে ধরা হলো। যুগান্তর- ছাত্তার কি আপনার ভাই? উত্তরে বলেন, হে...(হ্যাঁ)। যুগান্তর- এখন উনি কোথায় আছেন? এর জবাবে বলেন, কুয়েত।

যুগান্তর- কুয়েতে ওনি কি নামে পরিচিত? বলেন ছাত্তার। যুগান্তর- তাহলে রাশেদ কে? জবাবে বলেন, রাশেদ হচ্ছে পাপুল সাহেবের পিএস। পরে জানতে চাওয়া হয় আপনি কুয়েতে কতদিন ছিলেন, এর সদুত্তর না দিয়ে বলেন, এ নম্বরে আর ফোন দিয়েন না। এ বলেই কেটে দেন।

কুয়েত অভিবাসী ও কুয়েত ফেরত একাধিক ভুক্তভোগীর কাছে জানা যায়, রাশেদ (ছাত্তার) ওই দেশের মারাফিয়া কুয়েতিয়ার ম্যানেজার ও পাপুলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ভিটেবাড়ি বিক্রি করে তার (ছাত্তার) ভাই ও নিকটাÍীয়দের মাধ্যমে কুয়েত গিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। মানব পাচারের অভিযোগে তিনি গত বছর ৬ ফেব্র“য়ারি কুয়েতে গ্রেফতার হন। চলতি বছর ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত পাপুলের মতো তাকেও ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও আর্থিক দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাটাইল থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকছুদুল আলম বলেন, ছাত্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নিয়ে এখনো কেউ থানায় আসেনি।

কুয়েতের কারাগারে কে এই রাশেদ?

 যুগান্তর প্রতিবেদন, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) 
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কুয়েতের কারাগারে কে এই রাশেদ?
রাশেদ ও পাপুল (বাঁ থেকে)

মানব ও অর্থ পাচারের দায়ে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন কুয়েতের আদালত।

২৮ জানুয়ারি তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে পাপুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী টাঙ্গাইলের রাশেদ। পত্রিকায় এ খবর পেয়ে জেলার মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও প্রশ্ন জাগে- কে এই রাশেদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে ‘যুগান্তর’। আর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রহস্য। কুয়েতে যার নাম রাশেদ, এ দেশে ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম হচ্ছে ছাত্তার।

ঘাটাইল সদর থেকে ৩ কিমি. পূর্বে চৌডাল নামে একটি গ্রাম রয়েছে। সেই গ্রামের জনৈক আন্তাজ আলীর ছেলে হলেন আ. ছাত্তার। চৌডাল এলাকায় বনবিভাগের খাস ভূমিতে বাস করতেন তারা। অভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। নুন আনতে পান্তা ফুরাত। অভাবের তাড়নায় সংরক্ষিত বনের গাছ চুরি আর লাকড়ি বিক্রির টাকায় চলত সংসার।

সেনানিবাস হওয়ার পর ওই জমি হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে আশ্রয় নেন স্থানীয় ঝড়কা বাজারে। ১১ ভাই, ১ বোনের মধ্যে ছাত্তার দ্বিতীয়। এর মধ্যে এক ভাই মারা গেছেন। ভাইয়েদের মধ্যে কেউ মাছ বিক্রি করেন, কেউ দিনমজুর।

আবার কারও বিরুদ্ধে রয়েছে ছিঁচকে চুরির অভিযোগ। তার বাবা আন্তাজ আলী এখনো জীবিত। ছাত্তারের বাপ-চাচাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে চুরি-ডাকাতির অভিযোগ। আর বাপ-চাচাদের মতো ছাত্তারও দুর্ধর্ষ স্বভাবের। এ সময় ছাত্তারের চুরি করা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় ঝড়কা বাজারে প্রতিনিয়ত ছিঁচকে চুরির ঘটনা ঘটত।

চুরি করতে গিয়ে ছাত্তার একাধিকবার ধরাও পড়ে। এ নিয়ে ঝড়কা বাজারে তার বিরুদ্ধে সালিশ-দরবারও হয়েছে। কুড়ি বছর আগের কথা। সেনানিবাস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রেশনের দোকান দেয় ছাত্তার।

ব্যবসার নাম নিয়ে সেনা সদস্যসহ অনেকের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে তা না দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ-দরবারও হয়। নানা অভিযোগ মাথায় নিয়ে ছাত্তার হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যান। কিছুদিন পর এলাকাবাসী জানতে পারেন ছাত্তার কুয়েত চলে গেছে। কীভাবে গেল? সে আরেক কাহিনি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, খুলনা বাগেরহাটের জনৈক অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সদস্য চাকরির সুবাদে ঝড়কা বাজারে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শ্যালকের পরিচয়ে রাশেদ নামে এক যুবক আসেন ওই সেনা সদস্যের বাসায়।

বাড়ি ঢাকা সাভার এলাকায় বলে জানা যায়। তার নামে কুয়েতের একটি ভিসা আসে। ওই যুবক কুয়েত যেতে ইচ্ছুক না হওয়ায় তার ভিসাটি ছাত্তার কিনে নেয়। পরে রাশেদের ছবিতে ছাত্তারের ছবি গলাকাটা করে ভিসা তৈরি করে কুয়েত পাড়ি জমায়। সেই থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি ছাত্তারের।

করোনার সময় কুয়েত থেকে আসা ছাত্তারের ছোট ভাই বিপ্লবের সঙ্গে সেলফোনে কথোপকথন তুলে ধরা হলো। যুগান্তর- ছাত্তার কি আপনার ভাই? উত্তরে বলেন, হে...(হ্যাঁ)। যুগান্তর- এখন উনি কোথায় আছেন? এর জবাবে বলেন, কুয়েত।

যুগান্তর- কুয়েতে ওনি কি নামে পরিচিত? বলেন ছাত্তার। যুগান্তর- তাহলে রাশেদ কে? জবাবে বলেন, রাশেদ হচ্ছে পাপুল সাহেবের পিএস। পরে জানতে চাওয়া হয় আপনি কুয়েতে কতদিন ছিলেন, এর সদুত্তর না দিয়ে বলেন, এ নম্বরে আর ফোন দিয়েন না। এ বলেই কেটে দেন।

কুয়েত অভিবাসী ও কুয়েত ফেরত একাধিক ভুক্তভোগীর কাছে জানা যায়, রাশেদ (ছাত্তার) ওই দেশের মারাফিয়া কুয়েতিয়ার ম্যানেজার ও পাপুলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ভিটেবাড়ি বিক্রি করে তার (ছাত্তার) ভাই ও নিকটাÍীয়দের মাধ্যমে কুয়েত গিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। মানব পাচারের অভিযোগে তিনি গত বছর ৬ ফেব্র“য়ারি কুয়েতে গ্রেফতার হন। চলতি বছর ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত পাপুলের মতো তাকেও ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও আর্থিক দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাটাইল থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকছুদুল আলম বলেন, ছাত্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নিয়ে এখনো কেউ থানায় আসেনি।