অগ্নিকন্যা মতিয়ায় আস্থা আ’লীগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপিতে

  মো. আবদুর রহিম বাদল, শেরপুর ও এমএ হাকাম হীরা, নালিতাবাড়ী ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলা নিয়ে শেরপুর-২ আসনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্র্থীরা গণসংযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আসনটি মূলত কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরীর আসন হিসেবে পরিচিত। ক্লিন ইমেজ ও ব্যক্তিত্বের কারণে এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বিশেষ করে নারী ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। ২১টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে মতিয়াবিরোধী একটি বলয় রয়েছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ওই গ্রুপটি এখন সক্রিয়। অগ্নিকন্যাখ্যাত মতিয়া চৌধুরী ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মাঝখানে ২০০১ সালের ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরী।

তৃণমূল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই শক্তিশালী। এছাড়া সর্বত্রই মতিয়ার উন্নয়নের চিত্র। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির সংস্কার, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দান-অনুদান বিতরণে উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়। মতিয়া চৌধুরী ছাড়াও আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- এক সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা কৃষক লীগের সাবেক নেতা ও নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা, নালিতাবাড়ী উপজেলা আ’লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকছেদুর রহমান লেবু। বদিউজ্জামান বাদশা সম্প্রতি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নৌকা আমাদের, আর কারও নয়। প্রয়োজনে নালিতাবাড়ী ও নকলা অচল করে দেব। বাদশার সমর্থকরা মনে করেন আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বাদশাই। তবে দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই বলছেন, আগামী নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেছে নেবেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকেই। অগ্নিকন্যা মতিয়াতেই আস্থা স্থানীয় আওয়ামী লীগে।

এলাকায় বিএনপির বিশাল কর্মী বাহিনী থাকলেও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও দলীয় কোন্দলের কারণে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এখানে অস্তিত্বহীন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বসে নেই। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাবেক সচিব ও বিসিএস প্রশাসন একাডেমির সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার হায়দার আলী মনোনয়নের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য জোর চেষ্টা করছেন প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী। এছাড়াও নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মো. মোখলেছুর রহমান রিপনও নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে অবিরাম প্রচার চালাচ্ছেন। আবার নকলার বাসিন্দা সাবেক ছাত্রদল নেতা ব্যবসায়ী জায়েদুর রশীদ শ্যামলও সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এক সময় নালিতাবাড়ীতে জাতীয় পার্টির অবস্থান বেশ ভালো ছিল। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালামের মৃত্যুর পর দলের অবস্থান আগের মতো নেই। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় প্রয়াত সালামের ছেলে মো. শওকত সাইদ জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইছেন।

প্রতিদিনই গ্রামেগঞ্জে মতিয়া চৌধুরীর পক্ষে সভা-সমাবেশ হচ্ছে। সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতা হিসেবেও সুনাম রয়েছে এলাকায়। স্থানীয় আ’লীগ নেতাকর্মীরা বলেন, কৃষিতে বিপ্লব ঘটেছে দেশ তথা শেরপুরে। নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও স্থলবন্দরকে প্রথম শ্রেণীর বন্দরে রূপ দেয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন মতিয়া। এ বন্দরের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে এলাকা সমৃদ্ধ হবে বলে আশায় বুক বেঁধেছেন ব্যবসায়ীরা। মতিয়া চৌধুরীর স্বপ্নের এ স্থলবন্দরটি আগামীতে শেরপুরের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকার পরও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নালিতাবাড়ী ও নকলায় দুটি ১০ শয্যার হাসপাতাল করেছেন। নালিতাবাড়ীর ওপর দিয়ে ৫৩ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক, নকলা-নাকুগাঁও পর্যন্ত ৪ লেন বিশিষ্ট সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। টিআর ও কাবিটা ছিল হরিলুটের বাতাসার মতো। নেতাকর্মীরা লুটেপুটে খেতেন। মতিয়ার কারণে টিআর-কাবিটা দিয়ে দেড় হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। টিআরের অর্থে দুই উপজেলায় অর্ধ-শতাধিক ব্রিজ নির্মাণ করে দেয়ায় পাহাড়ি এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমেছে। নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদী ছিল মানুষের দুর্ভোগের কারণ। এ নদীর কারণে হাজার হাজার একর জমি পতিত ছিল সেখানে আজ ফসল ফলছে। এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দূর হয়েছে খাবার পানি সংকট। চাষাবাদে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। সর্বত্রই উন্নয়নের ছোঁয়া।

আগামী নির্বাচন নিয়ে মতামত জানতে এ আসনে এমপি মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে আগামী নির্বাচন এবং প্রার্থিতা নিয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

কথা হয় কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ২৭ বছর ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। আগামী নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে মনোনয়ন চাইব। দিন-রাত গণসংযোগ করছি। তিনি বলেন, মতিয়া চৌধুরী পরম শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেত্রী। তবে তিনি এলাকার নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। তিনি উপজেলা আ’লীগের কমিটি নিয়েও মতিয়া চৌধুরীর সমালোচনা করেন। ভোটের মাঠে আমার অবস্থা ভালো এবং দল আমাকে নমিনেশন দেবে। তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের আগের দিন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। দল থেকে বহিষ্কার করলেও দলের সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে ফিরে এসেছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেলে আগামী নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি তার সমর্থকদের নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মোকছেদুর রহমান লেবু বলেন, প্রতিনিয়ত এলাকায় জনসংযোগ করছি। জনগণের সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। আমি ছাড়া এলাকার মানুষের কার প্রতি বিশ্বাস নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। শেখ হাসিনা আমাকে নিরাশ করবেন না। মনোনয়ন দিলে নিশ্চিত দলকে আসনটি আমি উপহার দিতে পারব।

নানামুখী চাপে থাকা বিএনপি আগামী নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়াতে চায়। নির্বাচন নিয়ে কথা হয় ব্যারিস্টার হায়দার আলীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে ৪ বছর শিক্ষকতা করেছি। জেলা প্রশাসক হিসেবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এমপি ও মন্ত্রী হতে হলে উচ্চ শিক্ষিত হতে হয় বলে আমি মনে করি। আমার সেসব যোগ্যতা আছে। তাছাড়া মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সব যোগ্যতাই আমার রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, ভোটেও জয়লাভ করব।

বিএনপির আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী ফাহিম চৌধুরী বলেন, এলাকায় বিএনপির অবস্থা খুবই ভালো। ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি রয়েছে। আশা করছি আমিই মনোনয়ন পাব। ভোটারদের সঙ্গে আমার বাবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভোটাররা আমাকেও ভালোবাসেন। বাবা অনেক উন্নয়ন কাজ করেছেন। ভোটে বিজয়ী হলে মানুষের কল্যাণে সব ধরনের কাজ করার পাশাপাশি আমার বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করব।

নালিতাবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম মোখলেছুর রহমান রিপন বলেন, আমার জ্যাঠা প্রয়াত অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। আমার বাবাও নন্নী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ছিলেন। আমার তিন বোন শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও জামালপুরে মহিলা দলের নেত্রী। ছাত্রদল করেছি। তিনবার ইউপি চেয়ারম্যান ছিলাম, এখন উপজেলা চেয়ারম্যান। খালেদা জিয়া আমাকেই মনোনয়ন দেবেন। মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে ভোটযুদ্ধে লড়ার যোগ্যতা আছে বলে মনে করি। দল মনোনয়ন দিলে বিজয়ের মালা ছিনিয়ে আনতে পারব। জায়েদুর রশিদ শ্যামল বলেন, সাবেক হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরী মৃত্যুর পর এলাকায় বিএনপি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দলের নেতাকর্মীদের কেউ খোঁজ রাখেনি। নেতাকর্মীদের বিপদের সময় আমি পাশে ছিলাম, এখনও আছি। ম্যাডাম ত্যাগী নেতা হিসেবে আমাকেই মনোনয়ন দেবেন। মনোনয়ন দিলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

জাতীয় পার্টির মো. শওকত সাঈদ বলেন, আমার বাবা সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত অধ্যাপক আবদুস সালাম দীর্ঘদিন জনসেবায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমি জনসেবা করতে চাই। সে লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছি। মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব। ভোটাররাও আমার বাবাকে ভালোবেসে তাদের প্রতিনিধি বানিয়েছিলেন। আমি একবার উপজেলা নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছি। আগামী জাতীয় নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter