আওয়ামী লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি জামায়াত নিয়ে শঙ্কায় বিএনপি

জাপার একাধিক প্রার্থী মাঠে

  মো. আব্দুর রহিম বাদল, শেরপুর ও ফরিদ আহম্মেদ রুবেল, শ্রীবরদী ২১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা নিয়ে শেরপুর-৩ আসনে শুরু হয়ে গেছে ভোটের প্রচার। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দোয়া ও শুভেচ্ছাসংবলিত রঙিন ব্যানার, প্যানা ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। শহর এবং হাটবাজারে ভোটারদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কুশলবিনিময় ও কোলাকুলি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। অসহায়দের আর্থিক সহযোগিতাও করছেন কেউ কেউ। প্রার্থীরা যোগ দিচ্ছেন এলাকার সভা-সমাবেশ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। সীমান্তবর্তী ১৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত আসনটিতে একসময় বিএনপির ব্যাপক প্রভাব ছিল। গত দুই টার্ম আসনটি আওয়ামী লীগের কব্জায়। নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেরপুর-৩ আসনে ১৯৯১ সালের ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির ডা. মো. সেরাজুল হক। ১৯৯৩ সালে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন তার ছেলে মাহমুদুল হক রুবেল। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও এমপি হন রুবেল। একই বছর ১২ জুনের নির্বাচনে আসনটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। বিজয়ী হন এমএ বারী। তবে ২০০১ সালে আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায় আওয়ামী লীগের। বিজয়ী হন বিএনপির মাহমুদুল হক রুবেল। ২০০৮ সালে এমপি হন আওয়ামী লীগের প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক। ২০১৪ সালেও এমপি হন ফজলুল হক। আগামী নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী। জাতীয় পর্যায়ে এ আসনটি ‘লাকি আসন’ হিসেবে পরিচিত। কেননা এ আসনে যে দল থেকে এমপি হয় সেই দল ক্ষমতায় যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আওয়ামী লীগের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান এমপিসহ ১৪ জন প্রার্থী মাঠে দৌড়ঝাঁপ করছেন। ফজলুল হক চাঁন ছাড়াও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হলেন- জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আবু সালেহ মো. নূরুল ইসলাম হিরো, ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম ওয়ারেছ নাঈম, শ্রীবরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম লিটন, প্রয়াত সাবেক এমপি এমএ বারীর ছেলে মহসীনুল বারী রুমী, খড়িয়াকাজীর চর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এডিএম শহীদুল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইফতেখার হোসেন কাফি জুবেরী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাছরিন বেগম ফাতিমা, কৃষিবিদ আল ফারুক ডিউন, কৃষিবিদ ড. ফররুক আহমেদ ফারুক, প্রয়াত সাবেক এমপি এমএ বারীর স্ত্রী হোসনে আরা বেগম, মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ডা. ওয়ালীউজ্জামান আশরাফি লতা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. মিজানুর রহমান রাজা, ও ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান লেবু। মনোনয়নের দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি। নানামুখী চাপে থাকা দলটির একজন মাত্র প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে। তিনি হলেন জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মাহমুদুল হক রুবেল। রুবেলের ভয়ের জায়গাটি হচ্ছে জামায়াত। জামায়াতের নুরুজ্জামান বাদল ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। নুরুজ্জামান জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে থাকার ব্যাপারে অনড়। ভোট নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ দলের ৩ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এরা হলেন- জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু নাসের বাদল, জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি শ্রীবরদী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ফর্সা ও জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান খালেদ তালুকদার কাজল।

শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে ফজলুল হকের। তবে ভোটারদের কাছে নিজের এবং সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে ভোট ভিক্ষা চাইছেন আগে থেকেই। স্থানীয়দের ধারণা, শেষ পর্যন্ত শেরপুর-৩ আসনের মানুষ চাচা-ভাতিজার লড়াই-ই দেখতে পাবে। বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল হচ্ছেন বর্তমান এমপির আপন ভাতিজা। নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক চানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের ছাপ। এক হাজার ছয়শ’ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। বিদ্যুতের ৪টি সাবস্টেশন হয়েছে। আসনের ৮০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে। ৫০ শয্যার হাসপাতাল, নতুন থানা ভবন, সীমান্ত সড়ক, ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ সড়কের ২৬ কিলো সড়ক নির্মাণ ও আদিবাসীদের উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তৃতীয় দফায় নির্বাচিত হয়ে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাই। আপন ভাতিজা বিএনপির প্রার্থী হলে ভোটে প্রভাব পড়বে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০০৮ সালেও তাকে হারিয়ে এমপি হয়েছি। এসব নির্বাচনে প্রভাব পড়বে না। নুরুল ইসলাম হিরো ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে গণসংযোগ করছেন। যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান তার ছোট ভগ্নিপতি হলেও তাকে ছাড় দেয়া হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর তার লাশ শেরপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেয়ার ডাক দিয়ে আলোচনায় উঠে আসা নুরুল ইসলাম আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ওয়ারেজ নাইম বলেন, ঝিনাইগাতী থেকে কেউ এমপি না হওয়ায় এলাকাটি বৈষম্যের শিকার। অবহেলিত জনপদের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করতে চাই। এর আগে দু’বার মনোনয়ন চেয়েছি, দেয়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দিলে তাকে আসনটি উপহার দিতে পারব। মোতাহারুল ইসলাম লিটন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা গড়ার স্লোগান দিয়ে নির্বাচনী মাঠ বিচরণ করছেন। তিনি বলেন, মানুষ আমাকে ভালোবাসেন। তৃণমূল আমাকে এমপি হিসেবে দেখতে চায়। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকেই বেছে নেবেন। ব্যাপক গণসংযোগের দাবি করে মহসীনুল বারী রুমী যুগান্তরকে বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি মনোনয়ন দেন, আমার বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করব। প্রতিবছর বন্যহাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে। সিরামিক কারখানা গড়ে তোলা, পাহাড়ি অঞ্চলের পতিত জমি চা-বাগান ও কমলা চাষের আওতায় এনে মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ঘটাব।

আইডিয়াল প্রিপারেটরি অ্যান্ড হাইস্কুলের উপাধ্যক্ষ নাছরিন বেগম ফাতেমা বলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি করে আওয়ামী লীগে এসেছি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুইপ আতিউর রহমানের আশীর্বাদ আমার ওপর রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে প্রত্যাশা করছি।

জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে শেরপুর-৩ আসনটি আমি নেত্রীকে উপহার দিতে পারব। কৃষিবিদ আসম হোসেন আল ফারুক ডিউন জানান, অবহেলিত জনপদকে শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক বিভেদ দূর করে দলকে সংগঠিত করতে চাই।

বিএনপির একসময়ের শক্ত ঘাঁটি শেরপুর-৩ আসনটি আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফিরিয়ে আনতে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে গত ৯ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এ আসনে একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে। এ লক্ষ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও তিনবারের সাবেক এমপি মাহমুদুল হক রুবেল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দলমত নির্বিশেষে আমি এলাকার ভোটারদের সুখে-দুঃখে সর্বদাই পাশে রয়েছি। দলের কাঠামো মজবুত থাকায় আগামী নির্বাচনে আমাকে পরাজিত করা কঠিন হবে। আমার বাবা দু’বার এবং আমি একবার এমপি ছিলাম এ আসনে। ওই সময় এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা সেই উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন সত্ত্বেও দলকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সব সময় নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছি। মানুষ এখন পরিবর্তন চাচ্ছে। সুষ্ঠুভাবে ভোট হলে বিজয় কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জোট থেকে যাকেই মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন আমি তার পক্ষে। জামায়াত নেতা বাদলকেও জোট মনোনয়ন দিলে আমি তার পক্ষেই কাজ করব। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান এমপি আমার চাচা। আত্মীয়তার বিষয়টি বড় না। আগেও বিএনপির প্রার্থী ছিলাম। শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির নুরুজ্জামান বাদল এলাকায় গণসংযোগ করছেন। বাদল বলেন, ২০ দলীয় জোট মনোনয়ন না দিলেও জামায়াত থেকে নির্বাচন করব। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনই আমার টার্গেট। শেরপুর জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি ও শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী জাপার সন্বয়কারী মো. খোরশেদ আলম ফর্সা বলেন, আমি ছোট থেকে রাজনীতি করছি। মানুষের সেবা করতে চাই। মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter