বাজার ভরা পণ্যে তবু বাড়ছে দাম
jugantor
করোনা পরিস্থিতি ও রোজায় ভোক্তার অস্বস্তি
বাজার ভরা পণ্যে তবু বাড়ছে দাম
দুই মাস ধরে ছোলা, ডাল, চাল, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেল, দুধ ও মাংস বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে * নতুন করে আলু, বেগুন, শসা, আদা ও ফলের দাম বেড়েছে

  ইয়াসিন রহমান  

০৫ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক। ফলে মোকাম থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভরপুর রয়েছে সব ধরনের পণ্য। তারপরও আসন্ন রমজান উপলক্ষ্যে রোজানির্ভর পণ্যসহ একাধিক পণ্যের দাম হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে। দুই মাস আগে বেড়ে যাওয়া ছোলা, ডাল, চিনি, দুধ, মাছ ও সব ধরনের মাংস বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে করোনার বিস্তার রোধে সরকারের লকডাউনের খবরে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ায় দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ভোক্তারা পড়েছেন বিপাকে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। তাই অতিরিক্ত পণ্য না-কেনার জন্য ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার। রোববার দুপুরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আব্দুল লতিফ বকসীর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে এ বছর ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বাড়িয়েছে টিসিবি। রমজানে যেসব পণ্যের বেশি চাহিদা থাকে সেগুলোর ১০ থেকে ১২ শতাংশ টিসিবির মজুত রয়েছে। সেক্ষেত্রে রমজান উপলক্ষ্যে সংস্থাটি সাশ্রয়ী মূল্যে ২৬ হাজার ৫০০ টন ভোজ্যতেল, ১৮ হাজার টন চিনি, ১২ হাজার টন মসুর ডাল, ৮ হাজার টন ছোলা ও ৬ হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করবে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। এসব পণ্য এখন বিক্রি চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একদিকে দেশে পণ্যের উৎপাদন বেড়েছে, অপরদিকে রোজানির্ভর সব ধরনের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে এলসি খোলার হার। আমদানির পর যেসব পণ্য খালাস হয়েছে, সেসব পণ্য ইতোমধ্যে বাজারে বিক্রিও হচ্ছে। পাশাপাশি বিক্রির টাকায় আমদানিকারকরা ব্যাংকের এলসির দেনাও শোধ করছেন।

টিসিবি সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত এক বছর ধরে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। তবে গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রোজা সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম। টিসিবির তথ্যমতে, রাজধানীর খুচরা বাজারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি চাল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। অ্যাংকর ডাল ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ, ভোজ্যতেল সর্বোচ্চ ৪৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, চিনি ২ দশমিক ২২ শতাংশ, প্রতি কেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি গত বছর একই সময়ের তুলনায় ৪৭ দশমিক ৬২ ও দেশি মুরগি ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, হলুদ ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গরুর মাংস শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কারণে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থির করে। বিশেষ করে প্রতিবছর রমজান আসলেই সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ায়। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের জবাবদিহির মধ্যে নেই। যে কারণে অসাধুরা নির্বিঘ্নে কারসাজি করছে। এ ছাড়া বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। একেক সংস্থা একেকভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে বাজার তদারকি করছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রমতে, রোজানির্ভর সব ধরনের পণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার হার গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। পেঁয়াজ আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশে উৎপাদনও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এলসি খোলা বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১২ কোটি ৪০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের ওই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আলোচ্য সময়ে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এদিকে গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ২৫ লাখ ৬০ হাজার টন। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ লাখ ৬০ হাজার টনের। ইতোমধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। এখন পেঁয়াজের দাম কমার কথা। তা না-কমে বরং বেড়েছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ২০-২৫ টাকা। এর মধ্যে তা বেড়ে ৪০-৪৫ টাকায় উঠেছে। কোনো কোনো স্থানে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৬৯ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের ওই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ২০ শতাংশ। তারপরও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ৯৫ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা।

আমদানিকারকরা জানান, ছোলার চাহিদা রোজায় বেশি থাকে। গত বছরের রোজার সময়ে করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির থাকায় ছোলার চাহিদা ছিল কম। যে কারণে ওই সময়ে আমদানি করা ছোলা এখনো রয়ে গেছে। আর এবারও বেশি আমদানি হয়েছে। তাই রোজার চাহিদার তুলনায় দেশে ছোলা বেশি রয়েছে। তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারে ছোলার সরবরাহ ও মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও এর দাম বেড়েছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজি। এখন তা বেড়ে ৭৫-৮০ টাকায় উঠেছে। অথচ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চিনি আমদানি হয়েছে ৩৮ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ১৪ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে চিনি আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তার পরও দুই মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনি ৫ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ফল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ওই সময়ে ফল আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। ওই সময়ে আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ১১ শতাংশ। তারপরও বাজারে ফলের দামে আগুন। বর্তমানে আঙুর বিক্রি হচ্ছে ১৭০-২০০ টাকা কেজি। গত বছরের এই সময়ে ছিল ১৬০-১৭০ টাকা কেজি। প্রতি কেজি ভারতীয় কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, যা এক মাস আগেও ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে ২৮০ টাকার আনার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাল্টা ৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা।

রাজধানীর খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, সোমবার সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি রসুন ১০ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি আলু ৪ টাকা বেড়ে ২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি বেগুন ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি শসা ১০ টাকা বেড়ে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি টমেটো ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে খুচরা মুদি বিক্রেতা মো. সালাউদ্দিন বলেন, জানুয়ারি মাসের তুলনায় বর্তমানে মুগডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে অ্যাংকর ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। এ ছাড়া মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৫ টাকা বেড়ে রোববার পর্যন্ত ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক দিনের ব্যবধানে সোমবার কেজিতে আরও ১৫ টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো ইস্যু পেলেই বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত বছর করোনা পরিস্থিতিতেও পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এবার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের বিধি-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ও বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকায় বিক্রেতারা পণ্যের দাম আবারও বাড়িয়েছে, যা কোনোমতে ঠিক নয়।

তাই অসাধুদের বাগে আনতে ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন সংস্থাগুলোর আইন আছে। এসব আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

বাজারে পণ্যের দাম বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, দুই মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬০০ টাকায়, ব্রয়লার ৩০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা, খাসির মাংস ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৯০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ৩৫ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধ ফ্রেশ ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি আদা ২০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, রমজান উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার তদারকি করছেন। পাশাপাশি অধিদপ্তরের তদারকি সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহায়তা করছে। কোনো অনিয়ম পেলে এবার অসাধুদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আশা করি দাম কমে আসবে।

করোনা পরিস্থিতি ও রোজায় ভোক্তার অস্বস্তি

বাজার ভরা পণ্যে তবু বাড়ছে দাম

দুই মাস ধরে ছোলা, ডাল, চাল, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেল, দুধ ও মাংস বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে * নতুন করে আলু, বেগুন, শসা, আদা ও ফলের দাম বেড়েছে
 ইয়াসিন রহমান 
০৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক। ফলে মোকাম থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভরপুর রয়েছে সব ধরনের পণ্য। তারপরও আসন্ন রমজান উপলক্ষ্যে রোজানির্ভর পণ্যসহ একাধিক পণ্যের দাম হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে। দুই মাস আগে বেড়ে যাওয়া ছোলা, ডাল, চিনি, দুধ, মাছ ও সব ধরনের মাংস বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে করোনার বিস্তার রোধে সরকারের লকডাউনের খবরে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ায় দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ভোক্তারা পড়েছেন বিপাকে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। তাই অতিরিক্ত পণ্য না-কেনার জন্য ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার। রোববার দুপুরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আব্দুল লতিফ বকসীর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে এ বছর ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বাড়িয়েছে টিসিবি। রমজানে যেসব পণ্যের বেশি চাহিদা থাকে সেগুলোর ১০ থেকে ১২ শতাংশ টিসিবির মজুত রয়েছে। সেক্ষেত্রে রমজান উপলক্ষ্যে সংস্থাটি সাশ্রয়ী মূল্যে ২৬ হাজার ৫০০ টন ভোজ্যতেল, ১৮ হাজার টন চিনি, ১২ হাজার টন মসুর ডাল, ৮ হাজার টন ছোলা ও ৬ হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করবে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। এসব পণ্য এখন বিক্রি চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একদিকে দেশে পণ্যের উৎপাদন বেড়েছে, অপরদিকে রোজানির্ভর সব ধরনের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে এলসি খোলার হার। আমদানির পর যেসব পণ্য খালাস হয়েছে, সেসব পণ্য ইতোমধ্যে বাজারে বিক্রিও হচ্ছে। পাশাপাশি বিক্রির টাকায় আমদানিকারকরা ব্যাংকের এলসির দেনাও শোধ করছেন।

টিসিবি সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত এক বছর ধরে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। তবে গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রোজা সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম। টিসিবির তথ্যমতে, রাজধানীর খুচরা বাজারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি চাল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। অ্যাংকর ডাল ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ, ভোজ্যতেল সর্বোচ্চ ৪৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, চিনি ২ দশমিক ২২ শতাংশ, প্রতি কেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি গত বছর একই সময়ের তুলনায় ৪৭ দশমিক ৬২ ও দেশি মুরগি ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, হলুদ ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গরুর মাংস শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কারণে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থির করে। বিশেষ করে প্রতিবছর রমজান আসলেই সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ায়। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের জবাবদিহির মধ্যে নেই। যে কারণে অসাধুরা নির্বিঘ্নে কারসাজি করছে। এ ছাড়া বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। একেক সংস্থা একেকভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে বাজার তদারকি করছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রমতে, রোজানির্ভর সব ধরনের পণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার হার গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। পেঁয়াজ আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশে উৎপাদনও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এলসি খোলা বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১২ কোটি ৪০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের ওই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আলোচ্য সময়ে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এদিকে গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ২৫ লাখ ৬০ হাজার টন। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ লাখ ৬০ হাজার টনের। ইতোমধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। এখন পেঁয়াজের দাম কমার কথা। তা না-কমে বরং বেড়েছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ২০-২৫ টাকা। এর মধ্যে তা বেড়ে ৪০-৪৫ টাকায় উঠেছে। কোনো কোনো স্থানে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৬৯ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের ওই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ২০ শতাংশ। তারপরও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ৯৫ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা।

আমদানিকারকরা জানান, ছোলার চাহিদা রোজায় বেশি থাকে। গত বছরের রোজার সময়ে করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির থাকায় ছোলার চাহিদা ছিল কম। যে কারণে ওই সময়ে আমদানি করা ছোলা এখনো রয়ে গেছে। আর এবারও বেশি আমদানি হয়েছে। তাই রোজার চাহিদার তুলনায় দেশে ছোলা বেশি রয়েছে। তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারে ছোলার সরবরাহ ও মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও এর দাম বেড়েছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজি। এখন তা বেড়ে ৭৫-৮০ টাকায় উঠেছে। অথচ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চিনি আমদানি হয়েছে ৩৮ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ১৪ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে চিনি আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তার পরও দুই মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনি ৫ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ফল আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ওই সময়ে ফল আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। ওই সময়ে আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ১১ শতাংশ। তারপরও বাজারে ফলের দামে আগুন। বর্তমানে আঙুর বিক্রি হচ্ছে ১৭০-২০০ টাকা কেজি। গত বছরের এই সময়ে ছিল ১৬০-১৭০ টাকা কেজি। প্রতি কেজি ভারতীয় কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, যা এক মাস আগেও ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে ২৮০ টাকার আনার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাল্টা ৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা।

রাজধানীর খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, সোমবার সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি রসুন ১০ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি আলু ৪ টাকা বেড়ে ২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি বেগুন ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি শসা ১০ টাকা বেড়ে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি টমেটো ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে খুচরা মুদি বিক্রেতা মো. সালাউদ্দিন বলেন, জানুয়ারি মাসের তুলনায় বর্তমানে মুগডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে অ্যাংকর ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। এ ছাড়া মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৫ টাকা বেড়ে রোববার পর্যন্ত ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক দিনের ব্যবধানে সোমবার কেজিতে আরও ১৫ টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো ইস্যু পেলেই বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত বছর করোনা পরিস্থিতিতেও পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এবার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের বিধি-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ও বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকায় বিক্রেতারা পণ্যের দাম আবারও বাড়িয়েছে, যা কোনোমতে ঠিক নয়।

তাই অসাধুদের বাগে আনতে ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন সংস্থাগুলোর আইন আছে। এসব আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

বাজারে পণ্যের দাম বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, দুই মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬০০ টাকায়, ব্রয়লার ৩০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা, খাসির মাংস ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৯০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ৩৫ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধ ফ্রেশ ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি আদা ২০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, রমজান উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার তদারকি করছেন। পাশাপাশি অধিদপ্তরের তদারকি সদস্যদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহায়তা করছে। কোনো অনিয়ম পেলে এবার অসাধুদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আশা করি দাম কমে আসবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন