নৌ-চলাচল আইন ৫ বছরেও হলো না
jugantor
আজ নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ শুরু
নৌ-চলাচল আইন ৫ বছরেও হলো না
সাজা নির্ধারণে মালিক শ্রমিকদের পক্ষে নৌ-মন্ত্রণালয় * অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইন করতে লেগে গেছে অন্তত পাঁচ বছর * খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর সাজা আবার কমানো হয়

  কাজী জেবেল  

০৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা নদী বন্দরের (সদরঘাট) কাছাকাছি বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ছোট আকারের লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ড ডুবে যায়। ২৯ জুন সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট লঞ্চের মালিক ও চালককে দায়ী করে তদন্ত কমিটি।

আবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে। রোববার মালবাহী এক নৌযানের ধাক্কায় ছোট আকারের লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসান ডুবে যায়। এ ঘটনায় ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে চালকের গাফিলতি, অদক্ষতা ও অবহেলার তথ্য পেয়েছে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গঠিত কমিটির সদস্যরা সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পান।

নৌ-দুর্ঘটনায় মালিক ও চালকরা দায়ী হলেও বরাবরই তাদের পক্ষেই নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয় ও নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তরের অবস্থান। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপের কারণে গত কয়েক বছরেও অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ-১৯৭৬ সংশোধন হয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইনে রূপ নেয়নি। এসব সংগঠনের অনুরোধে বারবার তাদের মতামত নেওয়ার জন্য সময়ক্ষেপণ করা হয়। শুধু তাই নয়, আইনে বারবার সাজা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা থেকে সরে আসা হয়।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে নৌ-দুর্ঘটনার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের বিধান রাখা হলেও চাপের মুখে তা আবার ৫ বছর করে খসড়া তৈরি করে নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর। ওই খসড়া নিয়ে এখনো কাজ করছে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি খসড়াটির বানান সংশোধনের জন্য বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষে (বাবাকো) পাঠানো হয়েছে। সেটি ফেরত আসার পর সাজার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আবার বসবেন নৌ-মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে এমন নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ।

এবাবের প্রতিপাদ্য ‘মুজিব বর্ষের শপথ, নিরাপদ রবে নৌপথ’। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম এবং নৌসচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী অংশ নেবেন। সভাপতিত্ব করবেন নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এ জেড এম জালাল উদ্দিন।

এ আইনটি নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, নৌদুর্ঘটনার বিচার হয় অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশের আওতায়। আইনটি অত্যন্ত দুর্বল। এই আইনে সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর। তিনি বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে আইনটি যুগোপযোগী করার সুপারিশ করা হয়।

২০১৫ সালে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দফায় দফায় মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। ২০১৯ সালে খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সিরিজ বৈঠকে ১০ বছর সাজার বিষয়টি মেনেও নেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা আবার ফিরিয়ে এনে এখন ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের বিধান রাখা হচ্ছে। এমনকি এ সাজার বিধান এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়।

নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসাবে ২০২০ সালে ৩২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৮১ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১০ জন ও নিখোঁজ ১২ জন। এর আগের বছর ২০১৯ সালে ২৬টি দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু, ২০ জন নিখোঁজ ও ৩৩ জন আহত হন। ৩০ বছরে ৬০২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৭৩৫ জন মানুষ মারা গেছেন ও নিখোঁজ ৫০১ জন।

আইন সংশোধনে বারবার সময়ক্ষেপণ ও সাজা কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এমন কোনো আইন করা উচিত হবে না যা বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ করা যাবে না। এমন আইন করতে হবে যা প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন, যেহেতু এ আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিকরা বেশি সম্পৃক্ত তাদের কথাও ভাবতে হবে। যাত্রী নিরাপত্তা, নৌপথের শৃঙ্খলা ঠিক থাকে এমন আইনই হচ্ছে।

মার্চেও নৌযান মালিকসহ স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক করেছে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকেও বিভিন্ন অপরাধ ও বিধি লঙ্ঘনের জন্য বিদ্যমান সাজা আরও কমিয়ে জাহাজের আকার অনুযায়ী সর্বনিু দুই হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করেছে মালিকদের ছয়টি সংগঠন। তারা নৌযানের বয়সসীমা ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ বছর করার প্রস্তাব করেছে। ওই বৈঠকে বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন মতামত দেওয়া হয়। তবে কোনো সংস্থাই বিদ্যমান সাজা বাড়ানোর পক্ষে মতামত দেয়নি।

নারায়ণগঞ্জের দুর্ঘটনায় তদন্তে কমিটি : রোববার নারায়ণগঞ্জে সাবিত আল হাসান লঞ্চ দুর্ঘটনায় গঠিত নৌ-মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর গঠিত কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

কমিটির একাধিক সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, সেখানে নির্মাণাধীন সেতুর কারণে নৌপথটি সরু হয়ে গেছে। কার্গো জাহাজের চালক দ্রুত গতিতে চালিয়ে লঞ্চটির প্রথমে বাম পাশের মাঝ বরাবর ও দ্বিতীয়বার পেছন দিকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলে লঞ্চটি ডুবে যায়। তাৎক্ষণিক ঘটনা ঘটনায় যাত্রীরা বের হতে না পারায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

তারা জানান, দুর্ঘটনার সময়ে লঞ্চটি জাহাঙ্গীর নামের একজন সুকানি চালাচ্ছিলেন। লঞ্চটির কেরানি জীবিত আছে। তবে মারা গেছেন গ্রিজার। কেরানিকে পাওয়া গেলে আঘাতকারী জাহাজটির বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। তারা আরও জানান, ওই দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি সিসি ক্যামেরা ও স্থানীয়দের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ তারা পেয়েছেন। এতে আঘাতকারী জাহাজের গায়ে নাম ও নিবন্ধন লেখা দেখা যায়নি। যদিও সোমবার বিআইডব্লিউটিএর প্রেস রিলিজ দিয়ে জানিয়েছে, এসকে-৩ নামের একটি মালবাহী জাহাজ আঘাত দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কমিটির সদস্যরা আরও জানান, আঘাতকারী জাহাজ খুঁজে বের করতে নৌপুলিশকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চের সার্ভে সনদ অনুযায়ী সাবিত আল হাসান নামের লঞ্চটি ১৯৮৩ সালে প্রথম নির্মাণ করা হয়। তখন কাঠের লঞ্চ ছিল। নাম ছিল এম এল রিগ্যাল এক্সপ্রেস। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে স্টিলবডিতে রূপান্তর করা হয়। লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা ৬৮জন।

বিপদের ঝুঁকি নিয়ে নৌভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। গ্রীষ্মকালে দেশে প্রায়শ কালবৈশাখী ঝড় ওঠে। তাই এ সময়ে নৌযান চালক এবং যাত্রীসাধারণকে সতর্ক থাকতে হবে। খারাপ আবহাওয়ায় বা অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে অথবা যান্ত্রিক ত্রুটিসহ যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চালানো বা নৌভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উপকরণ ব্যবহার করে আমাদের সমুদ্র, নদী ও স্থলবন্দরসমূহের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সহজতর তথা প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য আমাদের সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও অন্য নাব্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

আজ নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ শুরু

নৌ-চলাচল আইন ৫ বছরেও হলো না

সাজা নির্ধারণে মালিক শ্রমিকদের পক্ষে নৌ-মন্ত্রণালয় * অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইন করতে লেগে গেছে অন্তত পাঁচ বছর * খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর সাজা আবার কমানো হয়
 কাজী জেবেল 
০৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা নদী বন্দরের (সদরঘাট) কাছাকাছি বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ছোট আকারের লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ড ডুবে যায়। ২৯ জুন সংঘটিত ওই দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট লঞ্চের মালিক ও চালককে দায়ী করে তদন্ত কমিটি।

আবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে। রোববার মালবাহী এক নৌযানের ধাক্কায় ছোট আকারের লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসান ডুবে যায়। এ ঘটনায় ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে চালকের গাফিলতি, অদক্ষতা ও অবহেলার তথ্য পেয়েছে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গঠিত কমিটির সদস্যরা সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পান।

নৌ-দুর্ঘটনায় মালিক ও চালকরা দায়ী হলেও বরাবরই তাদের পক্ষেই নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয় ও নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তরের অবস্থান। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপের কারণে গত কয়েক বছরেও অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ-১৯৭৬ সংশোধন হয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইনে রূপ নেয়নি। এসব সংগঠনের অনুরোধে বারবার তাদের মতামত নেওয়ার জন্য সময়ক্ষেপণ করা হয়। শুধু তাই নয়, আইনে বারবার সাজা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা থেকে সরে আসা হয়।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে নৌ-দুর্ঘটনার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের বিধান রাখা হলেও চাপের মুখে তা আবার ৫ বছর করে খসড়া তৈরি করে নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর। ওই খসড়া নিয়ে এখনো কাজ করছে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি খসড়াটির বানান সংশোধনের জন্য বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষে (বাবাকো) পাঠানো হয়েছে। সেটি ফেরত আসার পর সাজার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আবার বসবেন নৌ-মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে এমন নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ।

এবাবের প্রতিপাদ্য ‘মুজিব বর্ষের শপথ, নিরাপদ রবে নৌপথ’। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম এবং নৌসচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী অংশ নেবেন। সভাপতিত্ব করবেন নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এ জেড এম জালাল উদ্দিন।

এ আইনটি নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, নৌদুর্ঘটনার বিচার হয় অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশের আওতায়। আইনটি অত্যন্ত দুর্বল। এই আইনে সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর। তিনি বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে আইনটি যুগোপযোগী করার সুপারিশ করা হয়।

২০১৫ সালে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দফায় দফায় মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। ২০১৯ সালে খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সিরিজ বৈঠকে ১০ বছর সাজার বিষয়টি মেনেও নেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা আবার ফিরিয়ে এনে এখন ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের বিধান রাখা হচ্ছে। এমনকি এ সাজার বিধান এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়।

নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসাবে ২০২০ সালে ৩২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৮১ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১০ জন ও নিখোঁজ ১২ জন। এর আগের বছর ২০১৯ সালে ২৬টি দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু, ২০ জন নিখোঁজ ও ৩৩ জন আহত হন। ৩০ বছরে ৬০২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৭৩৫ জন মানুষ মারা গেছেন ও নিখোঁজ ৫০১ জন।

আইন সংশোধনে বারবার সময়ক্ষেপণ ও সাজা কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এমন কোনো আইন করা উচিত হবে না যা বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ করা যাবে না। এমন আইন করতে হবে যা প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন, যেহেতু এ আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিকরা বেশি সম্পৃক্ত তাদের কথাও ভাবতে হবে। যাত্রী নিরাপত্তা, নৌপথের শৃঙ্খলা ঠিক থাকে এমন আইনই হচ্ছে।

মার্চেও নৌযান মালিকসহ স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক করেছে নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকেও বিভিন্ন অপরাধ ও বিধি লঙ্ঘনের জন্য বিদ্যমান সাজা আরও কমিয়ে জাহাজের আকার অনুযায়ী সর্বনিু দুই হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করেছে মালিকদের ছয়টি সংগঠন। তারা নৌযানের বয়সসীমা ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ বছর করার প্রস্তাব করেছে। ওই বৈঠকে বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন মতামত দেওয়া হয়। তবে কোনো সংস্থাই বিদ্যমান সাজা বাড়ানোর পক্ষে মতামত দেয়নি।

নারায়ণগঞ্জের দুর্ঘটনায় তদন্তে কমিটি : রোববার নারায়ণগঞ্জে সাবিত আল হাসান লঞ্চ দুর্ঘটনায় গঠিত নৌ-মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর গঠিত কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

কমিটির একাধিক সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, সেখানে নির্মাণাধীন সেতুর কারণে নৌপথটি সরু হয়ে গেছে। কার্গো জাহাজের চালক দ্রুত গতিতে চালিয়ে লঞ্চটির প্রথমে বাম পাশের মাঝ বরাবর ও দ্বিতীয়বার পেছন দিকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলে লঞ্চটি ডুবে যায়। তাৎক্ষণিক ঘটনা ঘটনায় যাত্রীরা বের হতে না পারায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

তারা জানান, দুর্ঘটনার সময়ে লঞ্চটি জাহাঙ্গীর নামের একজন সুকানি চালাচ্ছিলেন। লঞ্চটির কেরানি জীবিত আছে। তবে মারা গেছেন গ্রিজার। কেরানিকে পাওয়া গেলে আঘাতকারী জাহাজটির বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। তারা আরও জানান, ওই দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি সিসি ক্যামেরা ও স্থানীয়দের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ তারা পেয়েছেন। এতে আঘাতকারী জাহাজের গায়ে নাম ও নিবন্ধন লেখা দেখা যায়নি। যদিও সোমবার বিআইডব্লিউটিএর প্রেস রিলিজ দিয়ে জানিয়েছে, এসকে-৩ নামের একটি মালবাহী জাহাজ আঘাত দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কমিটির সদস্যরা আরও জানান, আঘাতকারী জাহাজ খুঁজে বের করতে নৌপুলিশকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চের সার্ভে সনদ অনুযায়ী সাবিত আল হাসান নামের লঞ্চটি ১৯৮৩ সালে প্রথম নির্মাণ করা হয়। তখন কাঠের লঞ্চ ছিল। নাম ছিল এম এল রিগ্যাল এক্সপ্রেস। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে স্টিলবডিতে রূপান্তর করা হয়। লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা ৬৮জন।

বিপদের ঝুঁকি নিয়ে নৌভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। গ্রীষ্মকালে দেশে প্রায়শ কালবৈশাখী ঝড় ওঠে। তাই এ সময়ে নৌযান চালক এবং যাত্রীসাধারণকে সতর্ক থাকতে হবে। খারাপ আবহাওয়ায় বা অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে অথবা যান্ত্রিক ত্রুটিসহ যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চালানো বা নৌভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উপকরণ ব্যবহার করে আমাদের সমুদ্র, নদী ও স্থলবন্দরসমূহের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সহজতর তথা প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য আমাদের সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও অন্য নাব্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন