সিসা লাউঞ্জ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ
jugantor
করোনা সংক্রমণ
সিসা লাউঞ্জ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ

  তোহুর আহমদ  

২১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিসা লাউঞ্জ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ

করোনা সংক্রমণের ব্যাপক ঝুঁকির কারণে রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সিসা লাউঞ্জের তালিকা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মাঠে নেমেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসাসেবনের সময় হুঁকার পাইপ হাতে হাতে ঘোরে। এ কারণে করোনা সংক্রমণের শতভাগ ঝুঁকি তৈরি হয়। কেউ একজন সংক্রমিত থাকলে সবার মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইন অনুযায়ী সিসা মাদক শ্রেণিভুক্ত হিসাবে চিহ্নিত।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের নবনিযুক্ত সচিব মোকাব্বির হোসেন। এ সময় তিনি সিসা লাউঞ্জগুলোর হালনাগাদ সম্পর্কে জানতে চান। নারকোটিক্স কর্মকর্তারা সচিবকে বলেন, সিসা লাউঞ্জে অভিযানের ক্ষেত্রে আইনগত কিছু জটিলতা রয়েছে। এরপর সভায় জটিলতাগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সিসা লাউঞ্জগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে রাসায়নিক পরীক্ষায় পাঠাতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় নিকোটিনের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে নারকোটিক্স। আইন অনুযায়ী সিসার উপাদান বা মলাসেস পরীক্ষায় ৩ শতাংশের বেশি নিকোটিন পাওয়া গেলে সেটি মাদক হিসাবে গণ্য করা হয়।

তালিকা : সিসা লাউঞ্জের বেশিরভাগই রাজধানীর গুলশান এবং বনানীতে অবস্থিত। এছাড়া অনেক নামিদামি রেস্টুরেন্টেও সিসা পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়েও বিভিন্ন জায়গায় সিসা লাউঞ্জ খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বনানীর ডি-ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়িতে চলছে আরগিলা নামের রেস্টুরেন্ট কাম সিসা লাউঞ্জ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি রাজধানীর সব থেকে পুরোনো লাউঞ্জগুলোর একটি। এখানে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি। এছাড়া বনানীর ফ্লোর-সিক্স রিলোডেড নামের আরেকটি সিসা লাউঞ্জ চলছে প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে। দ্য নিউ ঢাকা ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে উন্নতমানের খাবারদাবারের সঙ্গে সিসাসেবনের আয়োজনটাও জাঁকজমকপূর্ণ।

এছাড়া বনানী কবরস্থানের সন্নিকটে অবস্থিত ফিউশান হান্ট নামক রেস্তোরাঁয় চলে জমজমাট সিসা সেবনের আড্ডা। ধনাঢ্য পরিবারের বখে যাওয়া ছেলেমেয়ে ছাড়াও এখানে মাঝেমধ্যে সরকারের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাও বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন। দোতলার স্পেশাল রুম বুকিং নিয়ে সেখানে তারা নানা রকম তদবির মিটিংয়ের পাশাপাশি সিসাও সেবন করেন।

সূত্র বলছে, বনানীর ই ব্লকের ১২/বি রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে আল গ্রিসিনো নামের সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগ পাওয়া যায়। এখানে টেবিল-চেয়ার সহকারে ছোট ছোট জায়গা আড়াল করে বসার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত সিসাসেবনে মত্ত তরুণ-তরুণীদের ভিড় দেখা যায়। কাচের তৈরি বড় হুঁকায় ২-৩টি পাইপ দিয়ে সিসার ধোঁয়া একসঙ্গে টানা হয়।

বনানীর জি ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর বাড়িতে আরেকটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে সিসা পরিবেশন করা হয়। এটির নাম ব্ল্যাক ব্রিচ কিচেন অ্যান্ড লাউঞ্জ। এছাড়া ১৫৩ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জে সিসার পাশাপাশি বিদেশি মদ-বিয়ার পরিবেশনেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনানী ১১ নম্বর রোডে আরেকটি সিসা লাউঞ্জের নাম এআর রেস্টুরেন্ট।

এছাড়া গুলশানের আরএম সেন্টারে অবস্থিত মন্টানা লাউঞ্জ, ডাউন টাউন, কিউডিএস ও কোর্ট ইয়ার্ড বাজার নামের সিসা লাউঞ্জ থেকে আল ফাকির নামের মলাসেস বা সিসার নমুনা জব্দ করে নারকোটিক্স ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র বলছে, রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি অভিজাত আবাসিক হোটেলেও জমজমাট সিসা পরিবেশন করা হয়। বিদেশি অতিথিদের চাহিদার কথা বলে অনেকেই সিসা পরিবেশনের ব্যবস্থা চালু রাখছে। কেউ কেউ আবার হার্বাল বা ভেষজ উপকরণ বলে সিসার ব্যবসা উন্মুক্ত করার পক্ষে।

ইতোমধ্যে একাধিক পাঁচতারকা হোটেল কর্তৃপক্ষ সিসা বার চালানোর জন্য নারকোটিক্সের কাছে হার্বাল সার্টিফিকেটও দাখিল করেছে। তবে অনুমোদন না মিললেও অনেক জায়গায় সিসা পরিবেশিত হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে বনানী ১১ নম্বর রোডের এইচ ব্লকের ৫২ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত প্লাটিনাম গ্র্যান্ড আবাসিক হোটেল। রাজধানীতে রেস্টুরেন্টের আড়ালে শতাধিক প্রতিষ্ঠানে সিসা পরিবেশন করা হয়। সিসাসেবনের হুঁকা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া দিয়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

নারকোটিক্স কর্মকর্তারা জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী সিসা ‘খ’ শ্রেণির মাদক হিসাবে চিহ্নিত। তবে সিসায় নিকোটিনের মাত্রা ২ শতাংশের নিচে হলে মাদক হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। এ সুযোগে বেশির ভাগ সিসা লাউঞ্জে একটি রাসায়নিক রিপোর্ট রেডি থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গেলে ওই রিপোর্ট দেখিয়ে দায় এড়ানোর অপচেষ্টা করা হয়।

করোনা সংক্রমণ

সিসা লাউঞ্জ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ

 তোহুর আহমদ 
২১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সিসা লাউঞ্জ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ
প্রতীকী ছবি

করোনা সংক্রমণের ব্যাপক ঝুঁকির কারণে রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সিসা লাউঞ্জের তালিকা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মাঠে নেমেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসাসেবনের সময় হুঁকার পাইপ হাতে হাতে ঘোরে। এ কারণে করোনা সংক্রমণের শতভাগ ঝুঁকি তৈরি হয়। কেউ একজন সংক্রমিত থাকলে সবার মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইন অনুযায়ী সিসা মাদক শ্রেণিভুক্ত হিসাবে চিহ্নিত।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের নবনিযুক্ত সচিব মোকাব্বির হোসেন। এ সময় তিনি সিসা লাউঞ্জগুলোর হালনাগাদ সম্পর্কে জানতে চান। নারকোটিক্স কর্মকর্তারা সচিবকে বলেন, সিসা লাউঞ্জে অভিযানের ক্ষেত্রে আইনগত কিছু জটিলতা রয়েছে। এরপর সভায় জটিলতাগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সিসা লাউঞ্জগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে রাসায়নিক পরীক্ষায় পাঠাতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় নিকোটিনের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে নারকোটিক্স। আইন অনুযায়ী সিসার উপাদান বা মলাসেস পরীক্ষায় ৩ শতাংশের বেশি নিকোটিন পাওয়া গেলে সেটি মাদক হিসাবে গণ্য করা হয়।

তালিকা : সিসা লাউঞ্জের বেশিরভাগই রাজধানীর গুলশান এবং বনানীতে অবস্থিত। এছাড়া অনেক নামিদামি রেস্টুরেন্টেও সিসা পরিবেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়েও বিভিন্ন জায়গায় সিসা লাউঞ্জ খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বনানীর ডি-ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়িতে চলছে আরগিলা নামের রেস্টুরেন্ট কাম সিসা লাউঞ্জ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি রাজধানীর সব থেকে পুরোনো লাউঞ্জগুলোর একটি। এখানে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি। এছাড়া বনানীর ফ্লোর-সিক্স রিলোডেড নামের আরেকটি সিসা লাউঞ্জ চলছে প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে। দ্য নিউ ঢাকা ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে উন্নতমানের খাবারদাবারের সঙ্গে সিসাসেবনের আয়োজনটাও জাঁকজমকপূর্ণ।

এছাড়া বনানী কবরস্থানের সন্নিকটে অবস্থিত ফিউশান হান্ট নামক রেস্তোরাঁয় চলে জমজমাট সিসা সেবনের আড্ডা। ধনাঢ্য পরিবারের বখে যাওয়া ছেলেমেয়ে ছাড়াও এখানে মাঝেমধ্যে সরকারের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাও বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন। দোতলার স্পেশাল রুম বুকিং নিয়ে সেখানে তারা নানা রকম তদবির মিটিংয়ের পাশাপাশি সিসাও সেবন করেন।

সূত্র বলছে, বনানীর ই ব্লকের ১২/বি রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে আল গ্রিসিনো নামের সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগ পাওয়া যায়। এখানে টেবিল-চেয়ার সহকারে ছোট ছোট জায়গা আড়াল করে বসার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত সিসাসেবনে মত্ত তরুণ-তরুণীদের ভিড় দেখা যায়। কাচের তৈরি বড় হুঁকায় ২-৩টি পাইপ দিয়ে সিসার ধোঁয়া একসঙ্গে টানা হয়।

বনানীর জি ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর বাড়িতে আরেকটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে সিসা পরিবেশন করা হয়। এটির নাম ব্ল্যাক ব্রিচ কিচেন অ্যান্ড লাউঞ্জ। এছাড়া ১৫৩ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জে সিসার পাশাপাশি বিদেশি মদ-বিয়ার পরিবেশনেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনানী ১১ নম্বর রোডে আরেকটি সিসা লাউঞ্জের নাম এআর রেস্টুরেন্ট।

এছাড়া গুলশানের আরএম সেন্টারে অবস্থিত মন্টানা লাউঞ্জ, ডাউন টাউন, কিউডিএস ও কোর্ট ইয়ার্ড বাজার নামের সিসা লাউঞ্জ থেকে আল ফাকির নামের মলাসেস বা সিসার নমুনা জব্দ করে নারকোটিক্স ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র বলছে, রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি অভিজাত আবাসিক হোটেলেও জমজমাট সিসা পরিবেশন করা হয়। বিদেশি অতিথিদের চাহিদার কথা বলে অনেকেই সিসা পরিবেশনের ব্যবস্থা চালু রাখছে। কেউ কেউ আবার হার্বাল বা ভেষজ উপকরণ বলে সিসার ব্যবসা উন্মুক্ত করার পক্ষে।

ইতোমধ্যে একাধিক পাঁচতারকা হোটেল কর্তৃপক্ষ সিসা বার চালানোর জন্য নারকোটিক্সের কাছে হার্বাল সার্টিফিকেটও দাখিল করেছে। তবে অনুমোদন না মিললেও অনেক জায়গায় সিসা পরিবেশিত হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে বনানী ১১ নম্বর রোডের এইচ ব্লকের ৫২ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত প্লাটিনাম গ্র্যান্ড আবাসিক হোটেল। রাজধানীতে রেস্টুরেন্টের আড়ালে শতাধিক প্রতিষ্ঠানে সিসা পরিবেশন করা হয়। সিসাসেবনের হুঁকা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া দিয়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

নারকোটিক্স কর্মকর্তারা জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী সিসা ‘খ’ শ্রেণির মাদক হিসাবে চিহ্নিত। তবে সিসায় নিকোটিনের মাত্রা ২ শতাংশের নিচে হলে মাদক হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। এ সুযোগে বেশির ভাগ সিসা লাউঞ্জে একটি রাসায়নিক রিপোর্ট রেডি থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গেলে ওই রিপোর্ট দেখিয়ে দায় এড়ানোর অপচেষ্টা করা হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন