ভেস্তে গেল নিম্নমানের গম আমদানির আয়োজন
jugantor
সম্মতি দেননি এফপিএমসির সদস্যরা
ভেস্তে গেল নিম্নমানের গম আমদানির আয়োজন
চালের দর নিয়ে একমত হতে পারেননি মন্ত্রীরা * প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে, মজুত নিয়ে সভায় উদ্বেগ * চালের কেজি ৪০ টাকা করার প্রস্তাব

  উবায়দুল্লাহ বাদল  

২৩ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিম্নমানের গম আমদানি করতে গমের ‘স্পেসিফিকেশন’ (বিনির্দেশ) পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করেছে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সদস্যরা। ওই প্রস্তাব বিদ্যমান গমের প্রোটিনের পরিমাণ সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে গত ২১ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তরে ‘বিনির্দেশ পরিবর্তন হচ্ছে : নিম্নমানের গম আমদানির আয়োজন চূড়ান্ত’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা। বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপনের পর বিস্তারিত আলোচনার পর তা বাতিল করা হয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র আরও জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কিনবে সরকার। তবে কত টাকা দরে ধান-চাল কেনা হবে-সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি এফপিএমসি’র সদস্য মন্ত্রীরা। তারা মিলারদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৩৯ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকদের কাছ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনার প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবের সার-সংক্ষেপ অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিললেই তা চূড়ান্ত করা হবে। এছাড়া বৈঠকে সরকারি গুদামে খাদ্য মজুত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
দুপুর সাড়ে ১২টায় এফপিএমসির সভায় সভাপতিত্ব করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। ভার্চুয়ালি যুক্ত হন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুমসহ কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রতিবারই বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিং বা প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানান খাদ্যমন্ত্রী বা খাদ্য মন্ত্রণালয়। এবারই প্রথম এফপিএমসির বৈঠকের পর খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনো বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। এমনকি নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নিম্নমানের গম আমদানি করতে গমের ‘স্পেসিফিকেশন’ (বিনির্দেশ) পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করেছে এফপিএমসি সদস্যরা। ফলে আমদানি করা গমে প্রোটিনের মাত্রার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ গম আমদানি করে থাকে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও গত এফপিএমসি সভায় আমদানি করা গমের বিনির্দেশে প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে গম আমদানির বিষয় প্রস্তাব করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি করা গমের বিনির্দেশে প্রোটিনের মাত্রা পুনর্র্নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএএনসি) এবং বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মতামত চাওয়া হয় হলে বিএনএনসির সুপারিশ করা প্রোটিনের পরিমাণ ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। অপরদিকে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশ করা প্রোটিনের পরিমাণ ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। সভায় এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে খাদ্যমন্ত্রী ও সচিব প্রোটিনের পরিমাণ কমাতে রাজি নন বলে তাদের মত জানিয়ে দেন। তবে কমিটির একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী গমের মজুত কম থাকাসহ প্রস্তাবের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গমের মজুত পর্যাপ্ত আছে, বন্দরে গম খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা ও পাঞ্জাবেও সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম পাওয়া যায়। বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, নিম্নমানের কম প্রোটিনের গম কেনার বিরোধিতা করে খাদ্য সচিব বলেন, বিষয়টি নিয়ে যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার দিন দিন যেখানে আমরা পুষ্টিযুক্ত খাবারের দিকে যাচ্ছি। দেশ মধ্যম আয়ের দিকে যাচ্ছে। সেখানে কেন কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করব। আমাদের সীমিত সাধ্যের মধ্যেই সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। তার কথার সঙ্গে কমিটির অধিকাংশ সদস্যই একমত পোষণ করলে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়।
বৈঠক সূত্র আরও জানায়, সভায় খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুতের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, দেশে বর্তমানে (২১ এপ্রিল) খাদ্যশস্যের মোট মজুত ৪ লাখ ৬৮ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ৩ লাখ ১০ হাজার টন এবং গম এক লাখ ৫৮ হাজার টন। গত বছর এই সময়ে মজুত ছিল ১৩ লাখ ৭৬ হাজার টন। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক এই মজুতকে আশঙ্কাজনকভাবে কম বলে মন্তব্য করেন। তিনি দ্রুত মজুত বাড়ানোর তাগিদ দেন। অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়, খাদ্যশস্যের মজুত কমপক্ষে ১০ লাখ টন থাকা উচিত। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ১৪ লাখ টন সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খাদ্য মজুত বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও এক লাখ টন বেশি সংগ্রহ করতে বলা হয়। ফলে চালের আকারে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ২৮ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করতে চায় খাদ্য বিভাগ। বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় গত বোরো ও আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল কিনতে পারেনি সরকার।
সভায় বোরো ধান ও চালের কেজি প্রতি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় বলে জানান সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা। তিনি জানান, সভায় এবারের বোরো ধান ও চালের উৎপাদন ব্যয় তুলে ধরা হয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ধানের উৎপাদন ব্যয় কেজি প্রতি ২৬ টাকা ১ পয়সা, চাল ৩৮ টাকা ৯৬ পয়সা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৬ টাকা ১৯ পয়সা, চাল ৩৮ টাকা ৫৩ পয়সা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৫ টাকা ২৮ পয়সা, চাল ৩৭ টাকা ৭ পয়সা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৭ টাকা এবং চালের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করেছে ৩৯ টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সভায় বলা হয়, ধান ও চালের এমন একটি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যেটা বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা না হলে মূল্য নির্ধারণ করে কোনো লাভ হবে না। সরকার আগের মতো ধান-চাল কিনতে পারবে না।
এ সময় খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী কেজি প্রতি চালের দাম ৪০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর চালের দাম ছিল ৩৬ টাকা, একবার ৪ টাকা বাড়িয়ে ৪০ টাকায় যাওয়া ঠিক হবে না। এটা খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। তাই খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৩৯ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আলোচনার পরে ঠিক হয় কেজি প্রতি ধানের দাম ২৭ টাকা এবং চাল ৪০ টাকাই থাকবে। আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে সিদ্ধ চালের চেয়ে এক টাকা কম দামে। তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেবে। তারপরই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। প্রস্তাবটি সারসংক্ষেপ আকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

সম্মতি দেননি এফপিএমসির সদস্যরা

ভেস্তে গেল নিম্নমানের গম আমদানির আয়োজন

চালের দর নিয়ে একমত হতে পারেননি মন্ত্রীরা * প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে, মজুত নিয়ে সভায় উদ্বেগ * চালের কেজি ৪০ টাকা করার প্রস্তাব
 উবায়দুল্লাহ বাদল 
২৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিম্নমানের গম আমদানি করতে গমের ‘স্পেসিফিকেশন’ (বিনির্দেশ) পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করেছে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সদস্যরা। ওই প্রস্তাব বিদ্যমান গমের প্রোটিনের পরিমাণ সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে গত ২১ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তরে ‘বিনির্দেশ পরিবর্তন হচ্ছে : নিম্নমানের গম আমদানির আয়োজন চূড়ান্ত’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা। বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপনের পর বিস্তারিত আলোচনার পর তা বাতিল করা হয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র আরও জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কিনবে সরকার। তবে কত টাকা দরে ধান-চাল কেনা হবে-সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি এফপিএমসি’র সদস্য মন্ত্রীরা। তারা মিলারদের কাছ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৩৯ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকদের কাছ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনার প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবের সার-সংক্ষেপ অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিললেই তা চূড়ান্ত করা হবে। এছাড়া বৈঠকে সরকারি গুদামে খাদ্য মজুত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। 
দুপুর সাড়ে ১২টায় এফপিএমসির সভায় সভাপতিত্ব করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। ভার্চুয়ালি যুক্ত হন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুমসহ কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রতিবারই বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিং বা প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানান খাদ্যমন্ত্রী বা খাদ্য মন্ত্রণালয়। এবারই প্রথম এফপিএমসির বৈঠকের পর খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনো বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। এমনকি নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নিম্নমানের গম আমদানি করতে গমের ‘স্পেসিফিকেশন’ (বিনির্দেশ) পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করেছে এফপিএমসি সদস্যরা। ফলে আমদানি করা গমে প্রোটিনের মাত্রার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ গম আমদানি করে থাকে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও গত এফপিএমসি সভায় আমদানি করা গমের বিনির্দেশে প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে গম আমদানির বিষয় প্রস্তাব করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি করা গমের বিনির্দেশে প্রোটিনের মাত্রা পুনর্র্নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএএনসি) এবং বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মতামত চাওয়া হয় হলে বিএনএনসির সুপারিশ করা প্রোটিনের পরিমাণ ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। অপরদিকে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশ করা প্রোটিনের পরিমাণ ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। সভায় এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে খাদ্যমন্ত্রী ও সচিব প্রোটিনের পরিমাণ কমাতে রাজি নন বলে তাদের মত জানিয়ে দেন। তবে কমিটির একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী গমের মজুত কম থাকাসহ প্রস্তাবের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গমের মজুত পর্যাপ্ত আছে, বন্দরে গম খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা ও পাঞ্জাবেও সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম পাওয়া যায়। বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, নিম্নমানের কম প্রোটিনের গম কেনার বিরোধিতা করে খাদ্য সচিব বলেন, বিষয়টি নিয়ে যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার দিন দিন যেখানে আমরা পুষ্টিযুক্ত খাবারের দিকে যাচ্ছি। দেশ মধ্যম আয়ের দিকে যাচ্ছে। সেখানে কেন কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করব। আমাদের সীমিত সাধ্যের মধ্যেই সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। তার কথার সঙ্গে কমিটির অধিকাংশ সদস্যই একমত পোষণ করলে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়।
বৈঠক সূত্র আরও জানায়, সভায় খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে খাদ্যশস্যের সরকারি মজুতের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, দেশে বর্তমানে (২১ এপ্রিল) খাদ্যশস্যের মোট মজুত ৪ লাখ ৬৮ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ৩ লাখ ১০ হাজার টন এবং গম এক লাখ ৫৮ হাজার টন। গত বছর এই সময়ে মজুত ছিল ১৩ লাখ ৭৬ হাজার টন। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক এই মজুতকে আশঙ্কাজনকভাবে কম বলে মন্তব্য করেন। তিনি দ্রুত মজুত বাড়ানোর তাগিদ দেন। অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়, খাদ্যশস্যের মজুত কমপক্ষে ১০ লাখ টন থাকা উচিত। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ১৪ লাখ টন সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খাদ্য মজুত বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও এক লাখ টন বেশি সংগ্রহ করতে বলা হয়। ফলে চালের আকারে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ২৮ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করতে চায় খাদ্য বিভাগ। বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় গত বোরো ও আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল কিনতে পারেনি সরকার। 
সভায় বোরো ধান ও চালের কেজি প্রতি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় বলে জানান সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা। তিনি জানান, সভায় এবারের বোরো ধান ও চালের উৎপাদন ব্যয় তুলে ধরা হয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ধানের উৎপাদন ব্যয় কেজি প্রতি ২৬ টাকা ১ পয়সা, চাল ৩৮ টাকা ৯৬ পয়সা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৬ টাকা ১৯ পয়সা, চাল ৩৮ টাকা ৫৩ পয়সা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৫ টাকা ২৮ পয়সা, চাল ৩৭ টাকা ৭ পয়সা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ধান ২৭ টাকা এবং চালের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করেছে ৩৯ টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সভায় বলা হয়, ধান ও চালের এমন একটি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যেটা বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা না হলে মূল্য নির্ধারণ করে কোনো লাভ হবে না। সরকার আগের মতো ধান-চাল কিনতে পারবে না।
এ সময় খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী কেজি প্রতি চালের দাম ৪০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর চালের দাম ছিল ৩৬ টাকা, একবার ৪ টাকা বাড়িয়ে ৪০ টাকায় যাওয়া ঠিক হবে না। এটা খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। তাই খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৩৯ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আলোচনার পরে ঠিক হয় কেজি প্রতি ধানের দাম ২৭ টাকা এবং চাল ৪০ টাকাই থাকবে। আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে সিদ্ধ চালের চেয়ে এক টাকা কম দামে। তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেবে। তারপরই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। প্রস্তাবটি সারসংক্ষেপ আকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন