রাজৈরে সালিশের নামে ১শ জুতাপেটা
jugantor
রাজৈরে সালিশের নামে ১শ জুতাপেটা

  টেকেরহাট (মাদারীপুর) প্রতিনিধি  

২৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জুতাপেটা

মাদারীপুরের রাজৈরে ‘পরকীয়ার’ অভিযোগ তুলে প্রহসনমূলক সালিশ বসিয়ে ধর্মের ভাই ও বোনকে ১শ জুতাপেটা করেছে প্রভাবশালী একটি মহল। শুধু তাই নয়, জুতার মালা পরিয়ে তাদের এলাকায় ঘুরানো হয়েছে। ঘরে তালা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সমাজ থেকে বের করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ এপ্রিল রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামে। এ ঘটনায় রাজৈর থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ ৩ সালিশকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। এলাকার প্রভাবশালী মহলের ভয়ে স্থানীয় লোকজন মুখ না খোলায় বিষয়টি সাংবাদিকরা জানতে পারেনি।

এক সপ্তাহ পর সোমবার রাতে বিভিন্ন সূত্রে তারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর গ্রামের মনির মিয়ার (৪০) সঙ্গে রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামের ছাবেদালী ফকিরের স্ত্রী খোদেজা বেগম (৫০) সম্পর্কে ধর্মের ভাই-বোন। সেই সূত্রে ১৯ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে মনির মিয়া বোন খোদেজা বেগমের বাড়ি বেড়াতে আসেন।

কিছুক্ষণ পর একই বাড়ির কালু ফকির, ইমরান ফকির, শাকিব আকন, রানা ফকির, শামীম ফকিরসহ ৮/১০ জন খোদেজা ও মনিরকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে বেঁধে ফেলে। এরপর লোকজন ডেকে এনে উঠানে সালিশ বসায়। কারো বক্তব্য না শুনেই সালিশরা ইচ্ছেমতো রায় ঘোষণা করেন। রায়ে খোদেজা ও মনিরকে ১০০ জুতাপেটা, জুতার মালা পরিয়ে সারা এলাকা ঘুরানো ও ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করার রায় দেওয়া হয়।

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ইমরান ফকির, কালু ফকির আজিজুলসহ ৮-১০ জন শত শত মানুষের সামনে দু’জনকে ১০০ জুতা পেটা করে ও জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরায়। পরে খোদেজা বেগমের ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। অমানবিক, ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় উৎসুক জনতা শুধু দেখেছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। ২৪ এপ্রিল (শনিবার) রাতে সালিশের প্রধান হোতা কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকিরসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৮-১০ জনের নামে রাজৈর থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর স্বামী। এরপর পুলিশ কালু ফকির, আজিজুল ফকির ও শাকিব আকনকে গ্রেফতার করে মাদারীপুর জেলহাজতে প্রেরণ করে।

নির্যাতনের শিকার খোদেজা বেগম বলেন, ‘এই অপমানের পর আর বাইচ্যা থাকতে ইচ্ছা করে না। গেছিলাম মরতে, কিন্তু তারা মেম্বার কইছে আমার অপমানের বিচার কইরা দিবো। হেই কারণে মরি নাই। যদি বিচার না পাই তাইলে আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না।’

জানতে চাইলে তারা মিয়া মেম্বার বলেন, ‘ওটি ছিল প্রহসনের সালিশ। এলাকার মেম্বার হিসাবে তারা আমার কোনো কথাই শোনেনি। এমনকি নির্যাতিত ওই নারীর কোনো কথা না শুনে কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকির, রানা ফকির গং নিজেদের ইচ্ছামতো রায় ঘোষণা করেন।’

বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘জঘন্যতম কাজটি যারা করেছে, যারা আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে তাদের এবং এর পেছনে যারা ইন্ধনদাতা তাদেরও বিচার হওয়া উচিৎ।’

খোদেজা বেগমের স্বামী ছাবেদালী ফকির বলেন, ‘আমি ৩৬ বছর ধরে খোদেজা বেগমকে নিয়ে ঘর-সংসার করে আসছি। তার চরিত্র খারাপ হলে আমিই আগে জানতাম। যদি আমার স্ত্রী কোনো অপরাধ করে থাকে তাহলে বিচার করতাম। ওনারা কেন আমার স্ত্রী ও আমার আত্মীয়কে জুতাপেটা করে জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরাল? এখন তারা বিচারের নামে আমাগো ঘরে তালা দিয়ে বের করে দিল। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরে যেতে পারছি না। আমাগো সমাজচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে, ভয়ে আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমার ছেলেমেয়ে আছে, তাদের বিয়ে দিয়েছি, নাতি-নাতনি রয়েছে। আমারা কীভাবে মানুষরে মুখ দেখাব। আমি এর বিচার চাই।’

প্রহসনের সালিশের প্রধান হোতা কালু ফকির বলেন, ‘ওই মহিলা খুবই বাজে চরিত্রের। তাই একটু শাসনের জন্য সালিশ বসানো হয়। সালিশে অনেক মাতুববর ছিল। তারা সবাই মিলে রায় দেন।’

রাজৈর থানার ওসি শেখ সাদী বলেন, ‘ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা থানায় মামলা নিয়েছি। রাতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল হোতা কালু ফকিরসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছি। বর্বরোচিত এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

জেলা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট সুজিত চ্যাটার্জি বলেন, ‘কাউকে বিচারের নামে জুতাপেটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার আইন কাউকে দেয়নি। কেউ এ ধরনের বিচার করলে তারও বিচার হবে। মধ্যযুগীয় ও বর্বরোচিত এ ধরনের অপরাধের জন্য আইনে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।’

রাজৈর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আমার কাছে ওই নারী এসেছিল এবং একটি অভিযোগ দিয়েছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে থানাকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি।’

রাজৈরে সালিশের নামে ১শ জুতাপেটা

 টেকেরহাট (মাদারীপুর) প্রতিনিধি 
২৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
জুতাপেটা
প্রতীকী ছবি

মাদারীপুরের রাজৈরে ‘পরকীয়ার’ অভিযোগ তুলে প্রহসনমূলক সালিশ বসিয়ে ধর্মের ভাই ও বোনকে ১শ জুতাপেটা করেছে প্রভাবশালী একটি মহল। শুধু তাই নয়, জুতার মালা পরিয়ে তাদের এলাকায় ঘুরানো হয়েছে। ঘরে তালা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সমাজ থেকে বের করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ এপ্রিল রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামে। এ ঘটনায় রাজৈর থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ ৩ সালিশকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। এলাকার প্রভাবশালী মহলের ভয়ে স্থানীয় লোকজন মুখ না খোলায় বিষয়টি সাংবাদিকরা জানতে পারেনি।

এক সপ্তাহ পর সোমবার রাতে বিভিন্ন সূত্রে তারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর গ্রামের মনির মিয়ার (৪০) সঙ্গে রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামের ছাবেদালী ফকিরের স্ত্রী খোদেজা বেগম (৫০) সম্পর্কে ধর্মের ভাই-বোন। সেই সূত্রে ১৯ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে মনির মিয়া বোন খোদেজা বেগমের বাড়ি বেড়াতে আসেন।

কিছুক্ষণ পর একই বাড়ির কালু ফকির, ইমরান ফকির, শাকিব আকন, রানা ফকির, শামীম ফকিরসহ ৮/১০ জন খোদেজা ও মনিরকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে বেঁধে ফেলে। এরপর লোকজন ডেকে এনে উঠানে সালিশ বসায়। কারো বক্তব্য না শুনেই সালিশরা ইচ্ছেমতো রায় ঘোষণা করেন। রায়ে খোদেজা ও মনিরকে ১০০ জুতাপেটা, জুতার মালা পরিয়ে সারা এলাকা ঘুরানো ও ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করার রায় দেওয়া হয়।

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ইমরান ফকির, কালু ফকির আজিজুলসহ ৮-১০ জন শত শত মানুষের সামনে দু’জনকে ১০০ জুতা পেটা করে ও জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরায়। পরে খোদেজা বেগমের ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। অমানবিক, ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় উৎসুক জনতা শুধু দেখেছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। ২৪ এপ্রিল (শনিবার) রাতে সালিশের প্রধান হোতা কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকিরসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৮-১০ জনের নামে রাজৈর থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর স্বামী। এরপর পুলিশ কালু ফকির, আজিজুল ফকির ও শাকিব আকনকে গ্রেফতার করে মাদারীপুর জেলহাজতে প্রেরণ করে।

নির্যাতনের শিকার খোদেজা বেগম বলেন, ‘এই অপমানের পর আর বাইচ্যা থাকতে ইচ্ছা করে না। গেছিলাম মরতে, কিন্তু তারা মেম্বার কইছে আমার অপমানের বিচার কইরা দিবো। হেই কারণে মরি নাই। যদি বিচার না পাই তাইলে আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না।’

জানতে চাইলে তারা মিয়া মেম্বার বলেন, ‘ওটি ছিল প্রহসনের সালিশ। এলাকার মেম্বার হিসাবে তারা আমার কোনো কথাই শোনেনি। এমনকি নির্যাতিত ওই নারীর কোনো কথা না শুনে কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকির, রানা ফকির গং নিজেদের ইচ্ছামতো রায় ঘোষণা করেন।’

বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘জঘন্যতম কাজটি যারা করেছে, যারা আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে তাদের এবং এর পেছনে যারা ইন্ধনদাতা তাদেরও বিচার হওয়া উচিৎ।’

খোদেজা বেগমের স্বামী ছাবেদালী ফকির বলেন, ‘আমি ৩৬ বছর ধরে খোদেজা বেগমকে নিয়ে ঘর-সংসার করে আসছি। তার চরিত্র খারাপ হলে আমিই আগে জানতাম। যদি আমার স্ত্রী কোনো অপরাধ করে থাকে তাহলে বিচার করতাম। ওনারা কেন আমার স্ত্রী ও আমার আত্মীয়কে জুতাপেটা করে জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরাল? এখন তারা বিচারের নামে আমাগো ঘরে তালা দিয়ে বের করে দিল। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরে যেতে পারছি না। আমাগো সমাজচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে, ভয়ে আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমার ছেলেমেয়ে আছে, তাদের বিয়ে দিয়েছি, নাতি-নাতনি রয়েছে। আমারা কীভাবে মানুষরে মুখ দেখাব। আমি এর বিচার চাই।’

প্রহসনের সালিশের প্রধান হোতা কালু ফকির বলেন, ‘ওই মহিলা খুবই বাজে চরিত্রের। তাই একটু শাসনের জন্য সালিশ বসানো হয়। সালিশে অনেক মাতুববর ছিল। তারা সবাই মিলে রায় দেন।’

রাজৈর থানার ওসি শেখ সাদী বলেন, ‘ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা থানায় মামলা নিয়েছি। রাতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল হোতা কালু ফকিরসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছি। বর্বরোচিত এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

জেলা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট সুজিত চ্যাটার্জি বলেন, ‘কাউকে বিচারের নামে জুতাপেটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার আইন কাউকে দেয়নি। কেউ এ ধরনের বিচার করলে তারও বিচার হবে। মধ্যযুগীয় ও বর্বরোচিত এ ধরনের অপরাধের জন্য আইনে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।’

রাজৈর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আমার কাছে ওই নারী এসেছিল এবং একটি অভিযোগ দিয়েছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে থানাকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন