কর কাঠামো সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না
jugantor
বাজেট আলোচনা
কর কাঠামো সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৫ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিদ্যমান কর কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত কর নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে করপোরেট কর সাড়ে ৩২ শতাংশ। এখান থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো হলেও তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। এ অবস্থায় কর কাঠামোয় সংস্কার না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। করোনা পরবর্তী সময়ে যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাজধানীতে মঙ্গলবার এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সময়ে তারা সরকারকে চুরি-ডাকাতির টাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়াও অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন তারা।

হিসাববিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। আলোচনায় দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবের চেয়ে করোনা মোকাবিলাকে গুরুত্ব দেওয়া, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত টিকা কার্যক্রমকে গতিশীল করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।

আইসিএবির প্রেসিডেন্ট মাহমুদুল হাসান খসরুর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারিয়া হাওলাদার, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) প্রেসিডেন্ট রূপালী হক চৌধুরী, প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন মাসুম, ইআরএফের সভাপতি শারমিন রিনভী ও সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম প্রমুখ।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, আগামী ৩ বছরে করপোরেট কর হার ধাপে ধাপে সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো উচিত। এটি কমানোর পর যে কর হার হবে, তাও বৈশ্বিক গড় করপোরেট হারের তুলনায় বেশি। এছাড়া কালো টাকা বিনিয়োগের বিদ্যমান বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছর এ পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা হয়েছে। এখান থেকে সরকার কর পেয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো সাদা করা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি যদি ৩২ শতাংশ কর দিই, তাহলে কালো টাকার ক্ষেত্রে এর ওপর আরও ১০ শতাংশ জরিমানা থাকতে হবে। না হলে আমরা আগামীতে কর দেওয়া বন্ধ করে দেব। ঢালাও সব খাতে কালো বিনিয়োগের সুযোগ না দিয়ে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগে গুরুত্ব দেন তিনি।

এমসিসিআই সভাপতি ব্যরিস্টার নিহাদ কবীর বলেন, ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা হচ্ছে। আর অর্থমন্ত্রী বলছেন, এতে অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার তো সেটা ভালো লাগে না। কারণ আমি সাড়ে ৩২ শতাংশ কর দিই। তিনি বলেন, আমরা যখন কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার নিয়ে কথা বলি, সেটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কিন্তু সেটা না করে কেউ কেউ আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা আমাদের বৈধ আয় কোথায় ব্যয় করব, সেটা নিয়ে অন্যদের কথা না বললেও চলবে। এ সময় দেশের টাকা বিদেশে পাচার ইস্যুতেও কথা বলেন, নিহাদ কবীর। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের সহযোগিতায় যারা দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

আবুল কাশেম খান বলেন, ভোক্তার ব্যয় বা ভোগ ব্যয় ধরে রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে। ভোগ পড়ে গেলে উৎপাদন কমে যাবে। এতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্য ভোগ ব্যয়কে উৎসাহিত করতে বাজেটে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এবারের বাজেটে করোনার টিকাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে বাজেটে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই বাজেটে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। করোনার টিকা যতদিন না হবে, ততদিন একের পর এক ঢেউ আসতে থাকবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালো টাকার সুযোগ দেওয়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে আসছে। কিন্তু এর ফলে নিরুৎসাহিত হয়ে কী পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আইসিএবির প্রেসিডেন্ট মাহমাদুল হাসান খসরু দেশে জিডিপির তুলনায় রাজস্বের হার কম হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

ড. মসিউর রহমান কর ব্যবস্থায় সংস্কারে গুরুত্ব দেন। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া, ঘাটতি অর্থায়ন বাড়ানো এবং এ লক্ষ্যে বিদেশি উৎস থেকে তহবিলের জোগান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী শিক্ষা খাতে গুরুত্ব দেওয়া এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে করহার কমানোর প্রস্তাব দেন।

বাজেট আলোচনা

কর কাঠামো সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৫ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিদ্যমান কর কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত কর নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে করপোরেট কর সাড়ে ৩২ শতাংশ। এখান থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো হলেও তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। এ অবস্থায় কর কাঠামোয় সংস্কার না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। করোনা পরবর্তী সময়ে যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাজধানীতে মঙ্গলবার এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সময়ে তারা সরকারকে চুরি-ডাকাতির টাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়াও অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন তারা।

হিসাববিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। আলোচনায় দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবের চেয়ে করোনা মোকাবিলাকে গুরুত্ব দেওয়া, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত টিকা কার্যক্রমকে গতিশীল করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।

আইসিএবির প্রেসিডেন্ট মাহমুদুল হাসান খসরুর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারিয়া হাওলাদার, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) প্রেসিডেন্ট রূপালী হক চৌধুরী, প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন মাসুম, ইআরএফের সভাপতি শারমিন রিনভী ও সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম প্রমুখ।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, আগামী ৩ বছরে করপোরেট কর হার ধাপে ধাপে সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো উচিত। এটি কমানোর পর যে কর হার হবে, তাও বৈশ্বিক গড় করপোরেট হারের তুলনায় বেশি। এছাড়া কালো টাকা বিনিয়োগের বিদ্যমান বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছর এ পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা হয়েছে। এখান থেকে সরকার কর পেয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো সাদা করা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি যদি ৩২ শতাংশ কর দিই, তাহলে কালো টাকার ক্ষেত্রে এর ওপর আরও ১০ শতাংশ জরিমানা থাকতে হবে। না হলে আমরা আগামীতে কর দেওয়া বন্ধ করে দেব। ঢালাও সব খাতে কালো বিনিয়োগের সুযোগ না দিয়ে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগে গুরুত্ব দেন তিনি।

এমসিসিআই সভাপতি ব্যরিস্টার নিহাদ কবীর বলেন, ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা হচ্ছে। আর অর্থমন্ত্রী বলছেন, এতে অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার তো সেটা ভালো লাগে না। কারণ আমি সাড়ে ৩২ শতাংশ কর দিই। তিনি বলেন, আমরা যখন কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার নিয়ে কথা বলি, সেটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কিন্তু সেটা না করে কেউ কেউ আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা আমাদের বৈধ আয় কোথায় ব্যয় করব, সেটা নিয়ে অন্যদের কথা না বললেও চলবে। এ সময় দেশের টাকা বিদেশে পাচার ইস্যুতেও কথা বলেন, নিহাদ কবীর। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের সহযোগিতায় যারা দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

আবুল কাশেম খান বলেন, ভোক্তার ব্যয় বা ভোগ ব্যয় ধরে রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে। ভোগ পড়ে গেলে উৎপাদন কমে যাবে। এতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্য ভোগ ব্যয়কে উৎসাহিত করতে বাজেটে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এবারের বাজেটে করোনার টিকাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে বাজেটে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই বাজেটে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। করোনার টিকা যতদিন না হবে, ততদিন একের পর এক ঢেউ আসতে থাকবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালো টাকার সুযোগ দেওয়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে আসছে। কিন্তু এর ফলে নিরুৎসাহিত হয়ে কী পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আইসিএবির প্রেসিডেন্ট মাহমাদুল হাসান খসরু দেশে জিডিপির তুলনায় রাজস্বের হার কম হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

ড. মসিউর রহমান কর ব্যবস্থায় সংস্কারে গুরুত্ব দেন। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া, ঘাটতি অর্থায়ন বাড়ানো এবং এ লক্ষ্যে বিদেশি উৎস থেকে তহবিলের জোগান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী শিক্ষা খাতে গুরুত্ব দেওয়া এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে করহার কমানোর প্রস্তাব দেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন