শেয়ারবাজারের টাকায় বাজেট ঘাটতি মেটানো উচিত
jugantor
সাক্ষাৎকার: মো. রকিবুর রহমান
শেয়ারবাজারের টাকায় বাজেট ঘাটতি মেটানো উচিত
করোনায় সামগ্রিকভাবে দেশের রাজস্ব আদায় কমেছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র সাড়ে ৮ শতাংশ। এরপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে শেয়ারবাজার থেকে টাকা নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারি কোম্পানি ছেড়ে অথবা বন্ড ইস্যু করে বাজার থেকে টাকা নেওয়া যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও সরকার উভয়েই লাভবান হবে। শেয়ারবাজারেও স্বচ্ছতা আসবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এভাবেই দেশের উন্নয়নে শেয়ারবাজারকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সম্ভাবনাময় এ বাজারকে আমরা ভালোভালো ব্যবহার করতে পারিনি। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান এসব কথা বলেন। তার মতে, যে দেশের পুঁজিবাজার যত শক্তিশালী, ওই দেশের অর্থনীতি তত সমৃদ্ধ। অর্থাৎ পুঁজিবাজার শক্তিশালী না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর করোনায় বিশ্বের সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের আয়ও কমেছে। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলো নিজস্ব অর্থায়নে জোর দিয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও গতানুগতিক বাজেটের চেয়ে বাইরে এসে নতুন কিছু চিন্তা করতে হবে। এছাড়া আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের জন্য কর কাঠামোয় পরিবর্তন, শেয়ারবাজারের দুর্বলতা এবং কারসাজি রোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-

  মনির হোসেন  

০৬ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : করোনা মহামারি দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?

রকিবুর রহমান : একটি বিষয় লক্ষ করবেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই এগিয়ে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এর স্বীকৃতিও দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে করোনাভাইরাস এসে সেখানে ছন্দপতন ঘটিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিতেও এর ধাক্কা লেগেছে। আর এজন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। এরপর এলো দ্বিতীয় ঢেউ। সবকিছু মিলে করোনা পরিস্থিতি কর আদায়সহ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে আমরা আশাবাদী। কারণ বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। পুরো অর্থনীতির ৭০ শতাংশই নির্ভর করে নিজস্ব শক্তির ওপর। ফলে করোনা চলে গেলে অর্থনীতি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

যুগান্তর : পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় কী?

রকিবুর রহমান : সামনে বাজেট। আর সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের আর্থিক রূপ হলো বাজেট। এ বাজেটে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় থাকে, যা হলো আয়, ব্যয় ও ঘাটতি। অস্বীকার করা যাবে না, এ বছরের পরিস্থিতি আগের মতো নয়। করোনার কারণে আয় কমেছে। কিন্তু ব্যয় বাড়াতে হবে। ফলে ঘাটতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো, ঘাটতির টাকা কোথা থেকে আসবে? সাধারণত ঘাটতি অর্থায়নের জন্য আমরা তিনটি খাত ব্যবহার করি। এগুলো হলো-বিদেশি সহায়তা, ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি। কিন্তু এবার এর কোনোটাই সরকারের জন্য সহায়ক নয়। কারণ হলো-প্রথমত, বিদেশি সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। করোনাকেন্দ্রিক কিছুটা সহায়তা পেলেও বাজেট ব্যবহারের মতো অর্থ কম আসবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের সুদ খুব বেশি। এ অবস্থায় শেয়ারবাজার থেকে টাকা নিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানো যায়। আর শেয়ারবাজারের টাকা অনেক সাশ্রয়ী।

যুগান্তর : শেয়ারবাজার কীভাবে ঘাটতি অর্থায়নের উৎস হতে পারে?

রকিবুর রহমান : বিষয়টি আমি ব্যাখ্যা করছি। সরকার শেয়ারবাজার থেকে অনেকভাবে টাকা নিতে পারে। যেমন সরকারি অনেক বড় বড় কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোর শেয়ার বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা নেওয়া যায়। এছাড়া বন্ড ইস্যু করে বাজার থেকে টাকা নিতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরাও আস্থা পাবেন। কারণ সরকারি কোম্পানির প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে বাজারের গভীরতাও বাড়বে। কারসাজির সুযোগ কমে আসবে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা এ কথাটি বলে আসছি। সংস্কারের পরিবর্তে আমলাদের একটি অংশ সব সময়ই বাজার নিয়ে নেতিবাচক কথা বলে আসছে।

যুগান্তর : এ মুহূর্তে বিনিয়োগ করার মতো টাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে কি না?

রকিবুর রহমান : অর্থনীতির স্বাভাবিক হিসাবে দেশে বিনিয়োগযোগ্য টাকা রয়েছে ছয় লাখ কোটির বেশি। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের বড় একটি অংশ বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে পায় না। ব্যাংকে আমানত রাখলে তিন শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখলে লোকসান হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সময়ে উত্থান-পতনের কারণে শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা কম। এ কারণে মানুষ জমির দিকে ঝুঁকছে। আর জমি একটি অনুৎপাদনশীল খাত। ফলে মানুষকে বিনিয়োগের একটি সুযোগ করে দিতে হবে। মানুষ যদি আস্থা পায়, তবে টাকার অভাব নেই। আর মুনাফার নিশ্চয়তা দিয়ে আস্থা ফেরানোর দায়িত্ব সরকারের। আমরা বাজেটে সেই ধরনের কিছু কর্মসূচি আশা করছি।

যুগান্তর : আপনি শেয়ারবাজারে কথা বলছেন, কিন্তু এ বাজার নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন রয়েছে?

রকিবুর রহমান : শেয়ারবাজার নিয়ে যেসব প্রশ্ন আসছে, তার সব যে অবাস্তব তা কিন্তু নয়। বাজারের বেশকিছু দুর্বলতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অনেক ক্ষেত্রে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে করপোরেট কালচার নেই। তারা ভালো মুনাফা না দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকাতে চায়। এছাড়া বাজারের অন্যতম দুর্বলতা হলো মার্জিন ঋণ। এ মার্জিন ঋণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো বাজারে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা বিজ্ঞানসম্মত নয়। সবকিছু বিবেচনা করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা বেশকিছু সুপারিশ করেছি। যেমন, বাইব্যাক আইন চালু করতে বলেছি। উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানি যে দামে শেয়ার ইস্যু করেছে, ওই কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ইস্যু মূল্যের নিচে নামলে কোম্পানিকে ওই সময় শেয়ার কিনে বাজারে সাপোর্ট দিতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে। বাজারে নতুন পুঁজি আসবে। সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, এ বাজারের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ওই দেশের জিডিপির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা ১৫ শতাংশের নিচে, এটি যৌক্তিক নয়। কারণ যে দেশের পুঁজিবাজার যত শক্তিশালী, সেদেশের অর্থনীতি তত সমৃদ্ধ। পৃথিবীতে একটি দেশও দেখাতে পারবেন না, যারা পুঁজিবাজার ছাড়া শিল্পায়নের বিকাশ ঘটিয়েছে। আমাদেরও ওই দিকেই যেতে হবে।

যুগান্তর : আগামী বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ আশা করছেন?

রকিবুর রহমান : আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, দেশের শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। আর এসব ভালো কোম্পানিই বাজারকে ধরে রেখেছে। কোম্পানিগুলো অনেক বড় হওয়ায় এদের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা যায় না। তাই ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য আমরা শেয়ারবাজারের কোম্পানির করপোরেট কর ২০ শতাংশের মধ্যে রাখতে বলেছি। এছাড়া অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ এ বছর অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন আইনকানুন সংস্কারের মাধ্যমে বাজারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গায় নিতে যেতে হবে। আর কাজটুকু করতে পারলে বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও সরকার সবাই লাভবান হবে। দেশ এগিয়ে যাবে।

যুগান্তর : ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কীভাবে তাদের পুঁজির সুরক্ষা পেতে পারেন?

রকিবুর রহমান : দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুঁজিবাজার যখন চাঙা থাকে, তখন বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ছোট অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। বড় প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কখনো লাভ এবং কখনো লোকসান দেয়। তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ অ্যাডভাইজার এবং রিসার্চ টিম আছে। পুঁজি হারালে তারা কাউকে দোষ দিতে পারে না। তাই অনুরোধ করছি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, ২০১০ সালে বাজার যখন বড় হচ্ছিল, আমি বলেছিলাম ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেন জমিজমা বিক্রি করে এখানে না আসে। জমি, স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে, বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের কষ্টার্জিত আয় বা অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নিয়ে আসা উচিত নয়। আর বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ এবং মৌলভিত্তি যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত লোভে কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগ করা একেবারেই ঠিক নয়। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি থাকে। পুঁজিবাজার শুধু লাভের নয়, লোকসানেরও। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ার ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের লোকসানের পরিমাণ অনেক কম হয়। অপরদিকে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন না। তাই লাভের সঙ্গে সঙ্গে লোকসানের আশঙ্কাও সব সময়ই থাকে। বিনিয়োগকারীদের বলব, টাকা ও বিনিয়োগ যেহেতু আপনার, তাই দিনশেষে লাভ-লোকসান আপনাকেই নিতে হবে। এখানে কারও ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই।

যুগান্তর : শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকাণ্ড কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রকিবুর রহমান : পুঁজিবাজারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রেগুলেটর হলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), যার হাতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে। পৃথিবীর সব দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ ক্ষমতা দেওয়া আছে। বিএসইসিকে কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না। বাজারসংশিষ্ট সবাইকে বিএসইসির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। অতএব বিএসইসিকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, বাজারে যারা যেভাবেই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন-লিস্টেড কোম্পানি, ব্রোকার, ইনস্টিটিউশন, আন্ডার রাইটার, উদ্যোক্তা, মিউচুয়াল ফান্ড, সম্পদ মূল্যায়ন কোম্পানি, বন্ড মার্কেট এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সবাই কমপ্লায়েন্স মেনে চলছে। বিএসইসিকে একটি মেসেজ সবাইকে দিতে হবে যে, আইন ও বিধি-বিধান মেনে ব্যবসা করতে হবে। বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উদ্যোক্তা পরিচালক বা গোষ্ঠী তাদের ইচ্ছামতো কোম্পানি পরিচালনা করতে পারবেন না। বিএসইসি যত কঠোর অবস্থানে থাকবে, পুঁজিবাজার তত গতিশীল হবে, ভালো ভালো আইপিও আসবে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া অন্যান্য স্টেকহোল্ডারেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেমন: সরকারের পলিসির কারণে বাজারকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকেও কাজ করতে হবে। অন্যদিকে ইক্যুইটি মার্কেটের বাইরে বন্ড, সুকুক (ইসলামি বন্ড), এসএমই প্ল্যাটফরম এবং ডেরিভেটিভস দ্রুতই চালু করতে হবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

রকিবুর রহমান : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: মো. রকিবুর রহমান

শেয়ারবাজারের টাকায় বাজেট ঘাটতি মেটানো উচিত

করোনায় সামগ্রিকভাবে দেশের রাজস্ব আদায় কমেছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র সাড়ে ৮ শতাংশ। এরপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে শেয়ারবাজার থেকে টাকা নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সরকারি কোম্পানি ছেড়ে অথবা বন্ড ইস্যু করে বাজার থেকে টাকা নেওয়া যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও সরকার উভয়েই লাভবান হবে। শেয়ারবাজারেও স্বচ্ছতা আসবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এভাবেই দেশের উন্নয়নে শেয়ারবাজারকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সম্ভাবনাময় এ বাজারকে আমরা ভালোভালো ব্যবহার করতে পারিনি। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান এসব কথা বলেন। তার মতে, যে দেশের পুঁজিবাজার যত শক্তিশালী, ওই দেশের অর্থনীতি তত সমৃদ্ধ। অর্থাৎ পুঁজিবাজার শক্তিশালী না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর করোনায় বিশ্বের সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের আয়ও কমেছে। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলো নিজস্ব অর্থায়নে জোর দিয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও গতানুগতিক বাজেটের চেয়ে বাইরে এসে নতুন কিছু চিন্তা করতে হবে। এছাড়া আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের জন্য কর কাঠামোয় পরিবর্তন, শেয়ারবাজারের দুর্বলতা এবং কারসাজি রোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-
 মনির হোসেন 
০৬ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : করোনা মহামারি দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?

রকিবুর রহমান : একটি বিষয় লক্ষ করবেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই এগিয়ে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এর স্বীকৃতিও দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে করোনাভাইরাস এসে সেখানে ছন্দপতন ঘটিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিতেও এর ধাক্কা লেগেছে। আর এজন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। এরপর এলো দ্বিতীয় ঢেউ। সবকিছু মিলে করোনা পরিস্থিতি কর আদায়সহ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে আমরা আশাবাদী। কারণ বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। পুরো অর্থনীতির ৭০ শতাংশই নির্ভর করে নিজস্ব শক্তির ওপর। ফলে করোনা চলে গেলে অর্থনীতি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

যুগান্তর : পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় কী?

রকিবুর রহমান : সামনে বাজেট। আর সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের আর্থিক রূপ হলো বাজেট। এ বাজেটে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় থাকে, যা হলো আয়, ব্যয় ও ঘাটতি। অস্বীকার করা যাবে না, এ বছরের পরিস্থিতি আগের মতো নয়। করোনার কারণে আয় কমেছে। কিন্তু ব্যয় বাড়াতে হবে। ফলে ঘাটতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো, ঘাটতির টাকা কোথা থেকে আসবে? সাধারণত ঘাটতি অর্থায়নের জন্য আমরা তিনটি খাত ব্যবহার করি। এগুলো হলো-বিদেশি সহায়তা, ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি। কিন্তু এবার এর কোনোটাই সরকারের জন্য সহায়ক নয়। কারণ হলো-প্রথমত, বিদেশি সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। করোনাকেন্দ্রিক কিছুটা সহায়তা পেলেও বাজেট ব্যবহারের মতো অর্থ কম আসবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের সুদ খুব বেশি। এ অবস্থায় শেয়ারবাজার থেকে টাকা নিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানো যায়। আর শেয়ারবাজারের টাকা অনেক সাশ্রয়ী।

যুগান্তর : শেয়ারবাজার কীভাবে ঘাটতি অর্থায়নের উৎস হতে পারে?

রকিবুর রহমান : বিষয়টি আমি ব্যাখ্যা করছি। সরকার শেয়ারবাজার থেকে অনেকভাবে টাকা নিতে পারে। যেমন সরকারি অনেক বড় বড় কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোর শেয়ার বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা নেওয়া যায়। এছাড়া বন্ড ইস্যু করে বাজার থেকে টাকা নিতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরাও আস্থা পাবেন। কারণ সরকারি কোম্পানির প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে বাজারের গভীরতাও বাড়বে। কারসাজির সুযোগ কমে আসবে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা এ কথাটি বলে আসছি। সংস্কারের পরিবর্তে আমলাদের একটি অংশ সব সময়ই বাজার নিয়ে নেতিবাচক কথা বলে আসছে।

যুগান্তর : এ মুহূর্তে বিনিয়োগ করার মতো টাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে কি না?

রকিবুর রহমান : অর্থনীতির স্বাভাবিক হিসাবে দেশে বিনিয়োগযোগ্য টাকা রয়েছে ছয় লাখ কোটির বেশি। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের বড় একটি অংশ বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে পায় না। ব্যাংকে আমানত রাখলে তিন শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখলে লোকসান হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সময়ে উত্থান-পতনের কারণে শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা কম। এ কারণে মানুষ জমির দিকে ঝুঁকছে। আর জমি একটি অনুৎপাদনশীল খাত। ফলে মানুষকে বিনিয়োগের একটি সুযোগ করে দিতে হবে। মানুষ যদি আস্থা পায়, তবে টাকার অভাব নেই। আর মুনাফার নিশ্চয়তা দিয়ে আস্থা ফেরানোর দায়িত্ব সরকারের। আমরা বাজেটে সেই ধরনের কিছু কর্মসূচি আশা করছি।

যুগান্তর : আপনি শেয়ারবাজারে কথা বলছেন, কিন্তু এ বাজার নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন রয়েছে?

রকিবুর রহমান : শেয়ারবাজার নিয়ে যেসব প্রশ্ন আসছে, তার সব যে অবাস্তব তা কিন্তু নয়। বাজারের বেশকিছু দুর্বলতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অনেক ক্ষেত্রে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে করপোরেট কালচার নেই। তারা ভালো মুনাফা না দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকাতে চায়। এছাড়া বাজারের অন্যতম দুর্বলতা হলো মার্জিন ঋণ। এ মার্জিন ঋণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো বাজারে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা বিজ্ঞানসম্মত নয়। সবকিছু বিবেচনা করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা বেশকিছু সুপারিশ করেছি। যেমন, বাইব্যাক আইন চালু করতে বলেছি। উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানি যে দামে শেয়ার ইস্যু করেছে, ওই কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ইস্যু মূল্যের নিচে নামলে কোম্পানিকে ওই সময় শেয়ার কিনে বাজারে সাপোর্ট দিতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে। বাজারে নতুন পুঁজি আসবে। সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, এ বাজারের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ওই দেশের জিডিপির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা ১৫ শতাংশের নিচে, এটি যৌক্তিক নয়। কারণ যে দেশের পুঁজিবাজার যত শক্তিশালী, সেদেশের অর্থনীতি তত সমৃদ্ধ। পৃথিবীতে একটি দেশও দেখাতে পারবেন না, যারা পুঁজিবাজার ছাড়া শিল্পায়নের বিকাশ ঘটিয়েছে। আমাদেরও ওই দিকেই যেতে হবে।

যুগান্তর : আগামী বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ আশা করছেন?

রকিবুর রহমান : আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, দেশের শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। আর এসব ভালো কোম্পানিই বাজারকে ধরে রেখেছে। কোম্পানিগুলো অনেক বড় হওয়ায় এদের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা যায় না। তাই ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য আমরা শেয়ারবাজারের কোম্পানির করপোরেট কর ২০ শতাংশের মধ্যে রাখতে বলেছি। এছাড়া অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ এ বছর অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন আইনকানুন সংস্কারের মাধ্যমে বাজারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গায় নিতে যেতে হবে। আর কাজটুকু করতে পারলে বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও সরকার সবাই লাভবান হবে। দেশ এগিয়ে যাবে।

যুগান্তর : ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কীভাবে তাদের পুঁজির সুরক্ষা পেতে পারেন?

রকিবুর রহমান : দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুঁজিবাজার যখন চাঙা থাকে, তখন বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ছোট অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। বড় প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কখনো লাভ এবং কখনো লোকসান দেয়। তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ অ্যাডভাইজার এবং রিসার্চ টিম আছে। পুঁজি হারালে তারা কাউকে দোষ দিতে পারে না। তাই অনুরোধ করছি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, ২০১০ সালে বাজার যখন বড় হচ্ছিল, আমি বলেছিলাম ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেন জমিজমা বিক্রি করে এখানে না আসে। জমি, স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে, বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের কষ্টার্জিত আয় বা অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নিয়ে আসা উচিত নয়। আর বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ এবং মৌলভিত্তি যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত লোভে কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগ করা একেবারেই ঠিক নয়। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি থাকে। পুঁজিবাজার শুধু লাভের নয়, লোকসানেরও। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ার ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের লোকসানের পরিমাণ অনেক কম হয়। অপরদিকে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন না। তাই লাভের সঙ্গে সঙ্গে লোকসানের আশঙ্কাও সব সময়ই থাকে। বিনিয়োগকারীদের বলব, টাকা ও বিনিয়োগ যেহেতু আপনার, তাই দিনশেষে লাভ-লোকসান আপনাকেই নিতে হবে। এখানে কারও ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই।

যুগান্তর : শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকাণ্ড কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রকিবুর রহমান : পুঁজিবাজারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রেগুলেটর হলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), যার হাতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে। পৃথিবীর সব দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ ক্ষমতা দেওয়া আছে। বিএসইসিকে কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না। বাজারসংশিষ্ট সবাইকে বিএসইসির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। অতএব বিএসইসিকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, বাজারে যারা যেভাবেই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন-লিস্টেড কোম্পানি, ব্রোকার, ইনস্টিটিউশন, আন্ডার রাইটার, উদ্যোক্তা, মিউচুয়াল ফান্ড, সম্পদ মূল্যায়ন কোম্পানি, বন্ড মার্কেট এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সবাই কমপ্লায়েন্স মেনে চলছে। বিএসইসিকে একটি মেসেজ সবাইকে দিতে হবে যে, আইন ও বিধি-বিধান মেনে ব্যবসা করতে হবে। বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উদ্যোক্তা পরিচালক বা গোষ্ঠী তাদের ইচ্ছামতো কোম্পানি পরিচালনা করতে পারবেন না। বিএসইসি যত কঠোর অবস্থানে থাকবে, পুঁজিবাজার তত গতিশীল হবে, ভালো ভালো আইপিও আসবে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া অন্যান্য স্টেকহোল্ডারেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেমন: সরকারের পলিসির কারণে বাজারকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকেও কাজ করতে হবে। অন্যদিকে ইক্যুইটি মার্কেটের বাইরে বন্ড, সুকুক (ইসলামি বন্ড), এসএমই প্ল্যাটফরম এবং ডেরিভেটিভস দ্রুতই চালু করতে হবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

রকিবুর রহমান : ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন