অনেকেই বেপরোয়া বিচারের অভাবে
jugantor
বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের দুর্নীতি
অনেকেই বেপরোয়া বিচারের অভাবে

  মুসতাক আহমদ  

০৯ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নানান বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আইনে পাওয়া একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগে তাদের অনেকেই নানান অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ-আইন এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতিও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অন্তত ৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করছে। এছাড়া আরও ১৬ উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত শেষ করেছে সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে ওঠা বেশির ভাগ অভিযোগই স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত। আইন সংশোধন ও শর্ত শিথিল করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়োগের অভিযোগ আছে বেশ কয়েকটি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে নিয়োগ ও আর্থিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগই বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই দশক ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়ানোর অভিযোগ বেশি উত্থাপিত হচ্ছে। ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় থাকা জোট সরকারের আমলে ডজনখানেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপকর্মের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ইউজিসি তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করে।

কিন্তু সেসব প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ওইসব প্রতিবেদন ধরে ৮ উপাচার্যকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তাদের কাউকে ফৌজদারি মামলা বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার রেকর্ড নেই। ২০০৯ সালের পরও একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আসতে থাকে। কিন্তু বিগত এক যুগে কেবল রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জ’ আদ্যাক্ষরের সাবেক এক উপাচার্যকে কিছুদিনের জন্য জেল খাটতে হয়েছে। এছাড়া তিন উপাচার্যকে অপসারণ করা হয়। অথচ এ সময়ে অন্তত ২ উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করেছে ইউজিসি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কাছে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দুর্নীতিবাজ উপাচার্যকে পদচ্যুত বা অপসারণ করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সেটিও হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্তও হয় না। ‘ক্ষমতাশালী ও দুর্নীতিবাজ’ ওইসব উপাচার্যের অনেকে কলাম লিখে আবার কেউ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর গ্রন্থ লিখে নিজেদের বড় দলবাজ হিসেবে জাহির করেন। ফলে তাদের শক্তভাবে ধরতে তদন্ত কমিটিও বিব্রত হয়। আবার তদন্ত করতে গেলে কমিটির সদস্যদের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও আছে। এভাবে অপকর্ম করেও নির্বিঘ্ন পার পেয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে কোনো উপাচার্য কখনো অপসারণ হলেও পরে নতুন যিনি আসেন তিনিও সাবেকের দেখানো পথ অনুসরণ করেন।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন দিন নানান দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের ঘটনা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত নেই। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য ছাড়া চলবে না। এ পদে যেহেতু নিয়োগ দিতেই হবে তাই কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধের জন্য বিচার ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হলে পরের জন ওই দৃষ্টান্ত মনে রাখেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। বিএনপির আমলে এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে শুনেছি, ‘খতিয়ে দেখা হবে।’ আর এখন শুনি ‘ছাড় দেওয়া হবে না।’ প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পার পায় কীভাবে?

ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান যুগান্তরকে জানান, এই মুহূর্তে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। আর গত ৭-৮ মাসে আরও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৯ সালের পর রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যদের বিরুদ্ধেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে ইউজিসি তদন্ত করে। এগুলোর মধ্যে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আবদুল জলিল মণ্ডল ও ইবির ভিসি অধ্যাপক আবদুল হাকিমকে অপসারণ করা হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের মুখে বিদায় করা হয় গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসিকে। ইউজিসির তদন্ত দলের অবশ্য এ ব্যাপারে সুপারিশ ছিল। উল্লিখিতদের মধ্যে কেবল জলিল মণ্ডলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হয়। এছাড়া বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে সংস্থাটির সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, দুর্নীতি করে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না-এমন বিশ্বাস যদি থাকে তাহলে বেপরোয়া হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ইউজিসির এক কর্মকর্তা জানান, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর একটি হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থায় না গিয়ে গত ডিসেম্বরে নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু এরপরও শেষ কর্মদিবসে তিনি ১৩৮ জন নিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত আবার তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরেজমিন যায়। সূত্র জানিয়েছে, নিয়োগ পাওয়া জনবলের এ সংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রম শনিবার স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অফিস ও হল-ইনস্টিটিউটকে চিঠি দিয়েছেন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম। তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে দেখেছি ১৩৮ জন শেষ কর্মদিবসে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে গেছেন। আমরা প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে নির্ধারিত ৭ কর্মদিবসের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিল করব।’ উল্লেখ্য, এই নিয়োগকে মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অবৈধ বলেছে। দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৪৯টি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ১০ ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে বলে ইউজিসি থেকে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক চিঠিতে দেখা গেছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পূর্বানুমতি ছাড়া নতুন বিভাগ খোলা, অনুমোদন ছাড়াই বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয়, টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটা।

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের দুর্নীতি

অনেকেই বেপরোয়া বিচারের অভাবে

 মুসতাক আহমদ 
০৯ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নানান বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আইনে পাওয়া একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগে তাদের অনেকেই নানান অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ-আইন এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতিও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অন্তত ৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করছে। এছাড়া আরও ১৬ উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত শেষ করেছে সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে ওঠা বেশির ভাগ অভিযোগই স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত। আইন সংশোধন ও শর্ত শিথিল করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়োগের অভিযোগ আছে বেশ কয়েকটি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে নিয়োগ ও আর্থিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগই বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই দশক ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়ানোর অভিযোগ বেশি উত্থাপিত হচ্ছে। ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় থাকা জোট সরকারের আমলে ডজনখানেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপকর্মের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ইউজিসি তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করে।

কিন্তু সেসব প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ওইসব প্রতিবেদন ধরে ৮ উপাচার্যকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তাদের কাউকে ফৌজদারি মামলা বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার রেকর্ড নেই। ২০০৯ সালের পরও একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আসতে থাকে। কিন্তু বিগত এক যুগে কেবল রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জ’ আদ্যাক্ষরের সাবেক এক উপাচার্যকে কিছুদিনের জন্য জেল খাটতে হয়েছে। এছাড়া তিন উপাচার্যকে অপসারণ করা হয়। অথচ এ সময়ে অন্তত ২ উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করেছে ইউজিসি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কাছে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দুর্নীতিবাজ উপাচার্যকে পদচ্যুত বা অপসারণ করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সেটিও হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্তও হয় না। ‘ক্ষমতাশালী ও দুর্নীতিবাজ’ ওইসব উপাচার্যের অনেকে কলাম লিখে আবার কেউ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর গ্রন্থ লিখে নিজেদের বড় দলবাজ হিসেবে জাহির করেন। ফলে তাদের শক্তভাবে ধরতে তদন্ত কমিটিও বিব্রত হয়। আবার তদন্ত করতে গেলে কমিটির সদস্যদের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও আছে। এভাবে অপকর্ম করেও নির্বিঘ্ন পার পেয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে কোনো উপাচার্য কখনো অপসারণ হলেও পরে নতুন যিনি আসেন তিনিও সাবেকের দেখানো পথ অনুসরণ করেন।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন দিন নানান দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের ঘটনা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত নেই। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য ছাড়া চলবে না। এ পদে যেহেতু নিয়োগ দিতেই হবে তাই কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধের জন্য বিচার ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হলে পরের জন ওই দৃষ্টান্ত মনে রাখেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। বিএনপির আমলে এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে শুনেছি, ‘খতিয়ে দেখা হবে।’ আর এখন শুনি ‘ছাড় দেওয়া হবে না।’ প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পার পায় কীভাবে?

ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান যুগান্তরকে জানান, এই মুহূর্তে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। আর গত ৭-৮ মাসে আরও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৯ সালের পর রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যদের বিরুদ্ধেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে ইউজিসি তদন্ত করে। এগুলোর মধ্যে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আবদুল জলিল মণ্ডল ও ইবির ভিসি অধ্যাপক আবদুল হাকিমকে অপসারণ করা হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের মুখে বিদায় করা হয় গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসিকে। ইউজিসির তদন্ত দলের অবশ্য এ ব্যাপারে সুপারিশ ছিল। উল্লিখিতদের মধ্যে কেবল জলিল মণ্ডলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হয়। এছাড়া বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে সংস্থাটির সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, দুর্নীতি করে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না-এমন বিশ্বাস যদি থাকে তাহলে বেপরোয়া হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ইউজিসির এক কর্মকর্তা জানান, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর একটি হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থায় না গিয়ে গত ডিসেম্বরে নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু এরপরও শেষ কর্মদিবসে তিনি ১৩৮ জন নিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত আবার তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরেজমিন যায়। সূত্র জানিয়েছে, নিয়োগ পাওয়া জনবলের এ সংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রম শনিবার স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অফিস ও হল-ইনস্টিটিউটকে চিঠি দিয়েছেন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম। তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে দেখেছি ১৩৮ জন শেষ কর্মদিবসে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে গেছেন। আমরা প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে নির্ধারিত ৭ কর্মদিবসের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিল করব।’ উল্লেখ্য, এই নিয়োগকে মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অবৈধ বলেছে। দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৪৯টি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ১০ ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে বলে ইউজিসি থেকে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক চিঠিতে দেখা গেছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পূর্বানুমতি ছাড়া নতুন বিভাগ খোলা, অনুমোদন ছাড়াই বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয়, টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন