মানুষকে কাজে রাখার বাজেট দরকার
jugantor
সাক্ষাৎকার: ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
মানুষকে কাজে রাখার বাজেট দরকার

  দেলোয়ার হুসেন  

১৯ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, গুরুত্বহীন ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসৃজন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সরকারি খাতের বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য থাকতে হবে সহায়ক নীতি ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা। তাহলে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন বিনিয়োগে। আসন্ন বাজেটে সরকার এসব কৌশল নিলে কর্মসৃজন বাড়বে। তখন মানুষ কাজ পাবে।

এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা অর্থনীতির অচল চাকা সচল হতে প্রয়োজন এবং বাড়ার পথে থাকবে জিডিপি। এ কারণে মানুষকে কাজের মধ্যে রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় করোনা মহামারি থেকে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আগামী বাজেট হতে হবে মানুষকে কাজে রাখার বাজেট। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার হুসেন

যুগান্তর : করোনার কারণে গত দুই বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : করোনায় গত অর্থবছরের তিন মাস অর্থনীতি একেবারে স্থবির ছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের বড় বড় খরচগুলো ঠিকমতো হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ আগের চেয়ে তেমন বেশি দেওয়া হয়নি। পরে বাড়ানো হলেও তার ব্যবহার নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য কম থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় করতে পারেনি রাজস্ব। ব্যাংক, বিদেশ ও ব্যক্তি খাত থেকে কঠিন শর্তের ঋণ নিয়ে সরকারকে চলতে হয়েছে। মানুষ বেকার হয়েছে। কমেছে আয়।

সব মিলে একটি অস্থির পরিবেশ গেছে। করোনার চাপ কমায় চলতি অর্থবছরে একপর্যায়ে রাজস্ব আয়ে কিছুটা গতি এসেছিল। কিন্তু গত এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ আবার সবকিছু থমকে গেছে। পরিস্থিতি এখন আবার জটিল হতে চলেছে। গত বছরের ক্ষতি এখন পর্যন্ত কোনো খাতই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এলো দ্বিতীয় ঢেউয়ের হানা। আবার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

করোনা বর্গী নিকট প্রতিবেশী দেশে যেভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে, বাংলাদেশ এর অগ্রযাত্রাকে কতটা থামাতে পারবে সে নিয়ে শঙ্কা প্রবল হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক অনিশ্চিত পর্বে অবস্থান করছে, যা বিবেচনার অবশ্যই অবকাশ রয়েছে নতুন বাজেটে।

যুগান্তর : পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় কী?

ড. মজিদ : করোনার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোথায় কী সমস্যা হয়েছে, আগে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের বাস্তবায়ন হিসাব ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। এর মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কাজ করতে হবে। সমস্যা জানলে তার সমাধান ও উত্তরণের পথনকশা তৈরি করা সম্ভব হবে।

যুগান্তর : সংকট মোকাবিলায় আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করনে?

ড. মজিদ : বাজেটে অবশ্যই সংকট মোকাবিলার সুর্নির্দিষ্ট পথনকশা ও কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন থাকতে হবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো-কমানোর পরিসংখ্যান দিলে হবে না, কীভাবে তা ব্যবহার বা অর্জন সম্ভব হবে সে ব্যাপারে প্রেসক্রাইব করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বড় কথা নয়, অর্থনীতি ও পরিস্থিতি উত্তরণে এই বরাদ্দ কতটুকু প্রভাবক ভূমিকা পালন করতে পারবে, সেটাই বড় কথা। গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

গত বছর এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে খরচ করা যায়নি। কেন খরচ করা যায়নি সেটা দেখতে হবে। গুণগত মানের খরচ ও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়াটা এখন জরুরি। কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। এতে কর্মসৃজন হবে।

বেকারত্বের দুর্নাম ঘুচবে। সরকারের অনেক অগুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে, সেগুলো থেকে অর্থ কাটছাঁট করে কর্মসংস্থানমূলক খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে অর্থবহ করতে হবে, নইলে করোনারভাইরাস জাতির ভবিষ্যৎ সুস্থতাকে বিকলাঙ্গ করে দেবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আদায় তো এখন বড় চ্যালেঞ্জে। এ খাতে আয় বাড়াতে করণীয় কী?

ড. মজিদ : মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে না, এটা মনে রেখেই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনীতিকে সচল ও সক্রিয় করেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। মানুষকে কর্মমুখী করতে হবে। মানুষ কাজ করলে আয় হবে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কেনাকাটা করবে।

ফলে বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য। এতে বাড়বে রাজস্ব আয়। ব্যবসা না বাড়লে রাজস্ব আসবে না। চলতি অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অর্থনীতির মন্দাবস্থায় এটা অর্জন করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে যদি আগামী অর্থবছরে আরও বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, সেটিও অর্জিত হবে না। এ ধরনের বাজেট হবে অবাস্তব।

রাজস্ব আয়ের বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। রাজস্ব বোর্ডকে সেই মর্মে দায়িত্বশীল করতে হবে। তাহলে বাজেটের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে বাস্তবায়ন ও গ্রহণযোগ্যতাও। সবার আগে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতির চাকা থেমে থাকলে বাজার থেকে রাজস্ব আসবে না।

যুগান্তর : কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে বাজেটে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মজিদ : করোনার কারণে যেমন বিনিয়োগ কম হয়েছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে টাকা পাচারও কম হয়েছে। এসব টাকার কিছু অংশ এ বছর সরকার কর্তৃক কালো টাকা পোষণমূলক সুযোগ প্রদানের আওতায় সাদা হয়েছে। সে

ছে, সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের প্রতি কর-অবিচার করা হয়েছে এবং কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না বলার মাধ্যমে দুর্নীতিজাত অর্থ উপার্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংঘর্ষিক ও পরিপন্থি। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা শুধু দুর্নীতি পুনর্বাসনে সীমিত থাকবে না- কজ অ্যান্ড ইফেক্ট হিসাবে মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আয় বাড়াতে আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. মজিদ : পণ্যের বেচাকেনা বাড়লে ভ্যাট আদায় বাড়বে। আমদানি বাড়লে শুল্ক বাড়বে। মানুষ ও কোম্পানির আয় বাড়লে আয়কর বাড়বে। রাজস্ব আয়ের প্রধান এ তিনটি খাতেই কর্মতৎপরতা বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেই এ তিন খাত থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। এর বাইরে গিয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে, সব খাতকে ন্যায্য করের আওতায় ন্যায়সঙ্গতভাবে আনার জন্য অনলাইনিকরণ ও রাজস্ব আইনগুলো সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে এনবিআরকে আরও তৎপর হওয়ার বিকল্প দেখছি না।

যুগান্তর : লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে এর কী প্রভাব পড়বে বাজেটে?

ড. মজিদ : বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে বাস্তবতাবর্জিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে বাজেটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে না। এদিকে আদায় বাড়াতে চাপ বাড়ানো হবে ভোক্তার ওপর। এটি অযৌক্তিত হবে। বর্তমান অবস্থায় রাজস্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এটা বিবেচনায় নিয়েই বাজেট করতে হবে। রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

যুগান্তর : করোনা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কীভাবে এগুলো বাড়ানো যায়?

ড. মজিদ : মেগাপ্রকল্প ব্যতিরেকে সরকারি বিনিয়োগ কম হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ কম। অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে করতে পারছেন না। বিনিয়োগ সহায়ক উৎসাহ, উদ্যোগ বা পলিসি নেই। আছে নানা জটিলতা, অনিশ্চয়তা। করোনা নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট সব সেবা ও আইনি কাঠামো এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে এবং দ্রুত কার্যকর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যও করতে হবে।

১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আবাসন খাত ও পুঁজিবাজারে। এ দুটিই অনুৎপাদনশীল খাত, যা নতুন করে কর্মসৃজনও করতে পারে না। ফলে এর সুফল অর্থনীতি খুব একটা পাবে না। সরকার এখন বিনিয়োগ করছে মেগাপ্রকল্পে। এগুলোতে কর্মসৃজন খুবই কম। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দূর ভবিষ্যতে হয়তো ভালো কিছু হবে। কিন্তু এখন দরকার জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প, যেগুলোতে দ্রুত কর্মসৃজন হয়।

যুগান্তর : ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মজিদ : সবগুলো প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়নি। বড়রা টাকা ঠিকই নিয়েছে, পেয়েছে। অথচ ছোটদের টাকা জরুরি ছিল। কিন্তু তারা পায়নি। এ খাতের জন্য সহজ শর্তে ও পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়া দরকার। কারণ এতে অনেক বেশি কর্মসংস্থান হয়। ছোটরা মারা গেলে, হারিয়ে গেলে বড়দের অস্তিত্ব ও অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়তে বাধ্য।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. মজিদ : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

মানুষকে কাজে রাখার বাজেট দরকার

 দেলোয়ার হুসেন 
১৯ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, গুরুত্বহীন ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসৃজন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সরকারি খাতের বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য থাকতে হবে সহায়ক নীতি ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা। তাহলে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন বিনিয়োগে। আসন্ন বাজেটে সরকার এসব কৌশল নিলে কর্মসৃজন বাড়বে। তখন মানুষ কাজ পাবে।

এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা অর্থনীতির অচল চাকা সচল হতে প্রয়োজন এবং বাড়ার পথে থাকবে জিডিপি। এ কারণে মানুষকে কাজের মধ্যে রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় করোনা মহামারি থেকে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আগামী বাজেট হতে হবে মানুষকে কাজে রাখার বাজেট। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার হুসেন

যুগান্তর : করোনার কারণে গত দুই বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : করোনায় গত অর্থবছরের তিন মাস অর্থনীতি একেবারে স্থবির ছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের বড় বড় খরচগুলো ঠিকমতো হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ আগের চেয়ে তেমন বেশি দেওয়া হয়নি। পরে বাড়ানো হলেও তার ব্যবহার নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য কম থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় করতে পারেনি রাজস্ব। ব্যাংক, বিদেশ ও ব্যক্তি খাত থেকে কঠিন শর্তের ঋণ নিয়ে সরকারকে চলতে হয়েছে। মানুষ বেকার হয়েছে। কমেছে আয়।

সব মিলে একটি অস্থির পরিবেশ গেছে। করোনার চাপ কমায় চলতি অর্থবছরে একপর্যায়ে রাজস্ব আয়ে কিছুটা গতি এসেছিল। কিন্তু গত এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ আবার সবকিছু থমকে গেছে। পরিস্থিতি এখন আবার জটিল হতে চলেছে। গত বছরের ক্ষতি এখন পর্যন্ত কোনো খাতই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এলো দ্বিতীয় ঢেউয়ের হানা। আবার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

করোনা বর্গী নিকট প্রতিবেশী দেশে যেভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে, বাংলাদেশ এর অগ্রযাত্রাকে কতটা থামাতে পারবে সে নিয়ে শঙ্কা প্রবল হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক অনিশ্চিত পর্বে অবস্থান করছে, যা বিবেচনার অবশ্যই অবকাশ রয়েছে নতুন বাজেটে।

যুগান্তর : পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় কী?

ড. মজিদ : করোনার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোথায় কী সমস্যা হয়েছে, আগে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের বাস্তবায়ন হিসাব ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। এর মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কাজ করতে হবে। সমস্যা জানলে তার সমাধান ও উত্তরণের পথনকশা তৈরি করা সম্ভব হবে।

যুগান্তর : সংকট মোকাবিলায় আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করনে?

ড. মজিদ : বাজেটে অবশ্যই সংকট মোকাবিলার সুর্নির্দিষ্ট পথনকশা ও কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন থাকতে হবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো-কমানোর পরিসংখ্যান দিলে হবে না, কীভাবে তা ব্যবহার বা অর্জন সম্ভব হবে সে ব্যাপারে প্রেসক্রাইব করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বড় কথা নয়, অর্থনীতি ও পরিস্থিতি উত্তরণে এই বরাদ্দ কতটুকু প্রভাবক ভূমিকা পালন করতে পারবে, সেটাই বড় কথা। গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

গত বছর এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে খরচ করা যায়নি। কেন খরচ করা যায়নি সেটা দেখতে হবে। গুণগত মানের খরচ ও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়াটা এখন জরুরি। কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। এতে কর্মসৃজন হবে।

বেকারত্বের দুর্নাম ঘুচবে। সরকারের অনেক অগুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে, সেগুলো থেকে অর্থ কাটছাঁট করে কর্মসংস্থানমূলক খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে অর্থবহ করতে হবে, নইলে করোনারভাইরাস জাতির ভবিষ্যৎ সুস্থতাকে বিকলাঙ্গ করে দেবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আদায় তো এখন বড় চ্যালেঞ্জে। এ খাতে আয় বাড়াতে করণীয় কী?

ড. মজিদ : মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে না, এটা মনে রেখেই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনীতিকে সচল ও সক্রিয় করেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। মানুষকে কর্মমুখী করতে হবে। মানুষ কাজ করলে আয় হবে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কেনাকাটা করবে।

ফলে বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য। এতে বাড়বে রাজস্ব আয়। ব্যবসা না বাড়লে রাজস্ব আসবে না। চলতি অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অর্থনীতির মন্দাবস্থায় এটা অর্জন করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে যদি আগামী অর্থবছরে আরও বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, সেটিও অর্জিত হবে না। এ ধরনের বাজেট হবে অবাস্তব।

রাজস্ব আয়ের বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। রাজস্ব বোর্ডকে সেই মর্মে দায়িত্বশীল করতে হবে। তাহলে বাজেটের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে বাস্তবায়ন ও গ্রহণযোগ্যতাও। সবার আগে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতির চাকা থেমে থাকলে বাজার থেকে রাজস্ব আসবে না।

যুগান্তর : কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে বাজেটে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মজিদ : করোনার কারণে যেমন বিনিয়োগ কম হয়েছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে টাকা পাচারও কম হয়েছে। এসব টাকার কিছু অংশ এ বছর সরকার কর্তৃক কালো টাকা পোষণমূলক সুযোগ প্রদানের আওতায় সাদা হয়েছে। সে

ছে, সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের প্রতি কর-অবিচার করা হয়েছে এবং কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না বলার মাধ্যমে দুর্নীতিজাত অর্থ উপার্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংঘর্ষিক ও পরিপন্থি। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা শুধু দুর্নীতি পুনর্বাসনে সীমিত থাকবে না- কজ অ্যান্ড ইফেক্ট হিসাবে মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

যুগান্তর : রাজস্ব আয় বাড়াতে আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. মজিদ : পণ্যের বেচাকেনা বাড়লে ভ্যাট আদায় বাড়বে। আমদানি বাড়লে শুল্ক বাড়বে। মানুষ ও কোম্পানির আয় বাড়লে আয়কর বাড়বে। রাজস্ব আয়ের প্রধান এ তিনটি খাতেই কর্মতৎপরতা বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেই এ তিন খাত থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। এর বাইরে গিয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে, সব খাতকে ন্যায্য করের আওতায় ন্যায়সঙ্গতভাবে আনার জন্য অনলাইনিকরণ ও রাজস্ব আইনগুলো সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে এনবিআরকে আরও তৎপর হওয়ার বিকল্প দেখছি না।

যুগান্তর : লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে এর কী প্রভাব পড়বে বাজেটে?

ড. মজিদ : বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে বাস্তবতাবর্জিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে বাজেটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে না। এদিকে আদায় বাড়াতে চাপ বাড়ানো হবে ভোক্তার ওপর। এটি অযৌক্তিত হবে। বর্তমান অবস্থায় রাজস্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এটা বিবেচনায় নিয়েই বাজেট করতে হবে। রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

যুগান্তর : করোনা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কীভাবে এগুলো বাড়ানো যায়?

ড. মজিদ : মেগাপ্রকল্প ব্যতিরেকে সরকারি বিনিয়োগ কম হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ কম। অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে করতে পারছেন না। বিনিয়োগ সহায়ক উৎসাহ, উদ্যোগ বা পলিসি নেই। আছে নানা জটিলতা, অনিশ্চয়তা। করোনা নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট সব সেবা ও আইনি কাঠামো এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে এবং দ্রুত কার্যকর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যও করতে হবে।

১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আবাসন খাত ও পুঁজিবাজারে। এ দুটিই অনুৎপাদনশীল খাত, যা নতুন করে কর্মসৃজনও করতে পারে না। ফলে এর সুফল অর্থনীতি খুব একটা পাবে না। সরকার এখন বিনিয়োগ করছে মেগাপ্রকল্পে। এগুলোতে কর্মসৃজন খুবই কম। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দূর ভবিষ্যতে হয়তো ভালো কিছু হবে। কিন্তু এখন দরকার জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প, যেগুলোতে দ্রুত কর্মসৃজন হয়।

যুগান্তর : ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মজিদ : সবগুলো প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়নি। বড়রা টাকা ঠিকই নিয়েছে, পেয়েছে। অথচ ছোটদের টাকা জরুরি ছিল। কিন্তু তারা পায়নি। এ খাতের জন্য সহজ শর্তে ও পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়া দরকার। কারণ এতে অনেক বেশি কর্মসংস্থান হয়। ছোটরা মারা গেলে, হারিয়ে গেলে বড়দের অস্তিত্ব ও অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়তে বাধ্য।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. মজিদ : ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন