করোনার দীর্ঘতর প্রভাবে অর্থনীতিতে শ্লথগতি
jugantor
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী
করোনার দীর্ঘতর প্রভাবে অর্থনীতিতে শ্লথগতি

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারির প্রভাব দীর্ঘতর হওয়া ও লকডাউনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথগতি বিরাজ করছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, আমদানি-রপ্তানিতেও কাক্সিক্ষত গতি ফিরে পায়নি। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ঠিক করা হয়েছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি হবে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। বাজেট বক্তৃতায় ৮০ শতাংশ নাগরিককে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে দেশের ক্রমাগত উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করোনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনার প্রভাব থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে ধরে নিয়ে চলতি অর্থবছরে বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথ অবস্থা এবং আমদানি-রপ্তানিতে গতি ফিরে না এলেও প্রবাসী আয়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সংশোধন করে ৬ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও উৎকর্ষ সাধন এবং প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতি ও সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, কোভিড-উত্তর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের মতো চলতি বছরেও বাজেট প্রণয়নে গতানুগতিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছি। আগামী বাজেটে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি হচ্ছে তৃতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত। তিনি বলেন, চতুর্থ অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন। পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজনকে আমরা পঞ্চম অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করাসহ গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে খাদ্য বিতরণের ওপরও অগ্রাধিকার দিয়েছি।

আগামী অর্থবছরে কর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার অব্যাহত রাখা হবে জানিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বছরে সব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেছি। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে আমরা সেগুলো সফলভাবে শেষ করতে পারিনি। সব সংস্কারমূলক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে আগামী অর্থবছরে অব্যাহত রাখতে চাই।

করোনার টিকা ক্রয়ে সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পেতে যাচ্ছি। পাশাপাশি করোনা টিকা কেনার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে যাচ্ছি। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এশিয়ান ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ওপেক ফান্ড প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। আমাদের ঋণ-জিডিপির হার কম থাকায় ও সার্বিকভাবে ঋণ সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কোনো সংশয় না থাকায় এ বিপুল বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া আমাদের জন্য অনেকটাই সহজ হবে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স ফেসিলিটিস থেকে দেশের শতকরা ২০ ভাগ তথা ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ পাওয়া যাবে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী-বঙ্গবন্ধুকে না হারালে জিডিপি হতো সোয়া লাখ কোটি ডলার : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, যদি আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে না হারাতাম তাহলে আজকে দেশের জিডিপির আকার হতো সোয়া লাখ কোটি ডলার। বাজেট বক্তৃতায় বারবার বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ ওঠে আসে।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল দেশের অর্থনীতি কিভাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়ে ওঠে সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের রোল মডেলে বাংলাদেশের পরিণত হওয়ার ইতিহাস তিনি তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ নয় মাসের নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো অবকাঠামো ও সম্পদ ছিল না। পুরো বাংলাদেশ ছিল একটি ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে ছিল শুধু হাহাকার। বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশ। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দরিদ্রতম ১০টি দেশের মধ্যে একটি। বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতাও ছিল শতকরা ৮৮ ভাগ।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অস্টিন রবিনসন ‘ইকোনমিক প্রসপেক্টাস অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে ম্যালথাসিয়ান স্ট্যাগনেশনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যার পরিণতি দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যু। তৎকালীন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেন। কিন্তু সে সময় বঙ্গবন্ধু দৃঢ় কণ্ঠে সবাইকে জানিয়ে দেন-‘বাংলাদেশ এসেছে বাংলাদেশ থাকবে’। বঙ্গবন্ধু সরকারের ৭১৯ কোটি টাকার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। দেশের উন্নয়নকে মাথায় রেখে বাজেটের ৬৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয় উন্নয়ন বাজেটে। বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলদেশের স্বাধীনতার প্রথম অর্থবছরে অর্থাৎ ১৯৭২-১৯৭৩ সালে ২.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। যার ফলে জিডিপির আকার হয় ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়ায় ৯৪ মার্কিন ডলারে।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আরও বলেন, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮)। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য হ্রাসকে প্রাধিকার লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। পুনর্গঠন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর এরপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। প্রতিবছর গড়ে ৫.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা, প্রতি বছর কমপক্ষে ২.৫ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি প্রভৃতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের বিস্তারিত কৌশলও সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ এগোচ্ছিল। পরিকল্পনা প্রণয়নের দ্বিতীয় বছরেই অর্থাৎ ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে ৫.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯.৫৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যদি আমরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে না হারাতাম আর একই ধারায় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতা তাহলে আমাদের জিডিপির আকার ৩৫ বছরে ৩০০ বিলিয়ন এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে উন্নত দেশের জিডিপির সমান হতো। কিন্তু দুর্ভাগা আমরা। স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী কিছু লোকের কারণে জাতির পিতা সেই সুযোগ পাননি। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশ ও দেশের অর্থনীতি এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। জাতির পিতার সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণ থেমে যায়।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী

করোনার দীর্ঘতর প্রভাবে অর্থনীতিতে শ্লথগতি

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারির প্রভাব দীর্ঘতর হওয়া ও লকডাউনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথগতি বিরাজ করছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, আমদানি-রপ্তানিতেও কাক্সিক্ষত গতি ফিরে পায়নি। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ঠিক করা হয়েছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি হবে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। বাজেট বক্তৃতায় ৮০ শতাংশ নাগরিককে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে দেশের ক্রমাগত উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করোনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনার প্রভাব থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে ধরে নিয়ে চলতি অর্থবছরে বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথ অবস্থা এবং আমদানি-রপ্তানিতে গতি ফিরে না এলেও প্রবাসী আয়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সংশোধন করে ৬ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও উৎকর্ষ সাধন এবং প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতি ও সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, কোভিড-উত্তর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের মতো চলতি বছরেও বাজেট প্রণয়নে গতানুগতিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছি। আগামী বাজেটে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি হচ্ছে তৃতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত। তিনি বলেন, চতুর্থ অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন। পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজনকে আমরা পঞ্চম অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সম্প্রসারণ করাসহ গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে খাদ্য বিতরণের ওপরও অগ্রাধিকার দিয়েছি।

আগামী অর্থবছরে কর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার অব্যাহত রাখা হবে জানিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বছরে সব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেছি। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে আমরা সেগুলো সফলভাবে শেষ করতে পারিনি। সব সংস্কারমূলক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে আগামী অর্থবছরে অব্যাহত রাখতে চাই।

করোনার টিকা ক্রয়ে সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পেতে যাচ্ছি। পাশাপাশি করোনা টিকা কেনার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে যাচ্ছি। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এশিয়ান ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ওপেক ফান্ড প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। আমাদের ঋণ-জিডিপির হার কম থাকায় ও সার্বিকভাবে ঋণ সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কোনো সংশয় না থাকায় এ বিপুল বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া আমাদের জন্য অনেকটাই সহজ হবে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স ফেসিলিটিস থেকে দেশের শতকরা ২০ ভাগ তথা ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ পাওয়া যাবে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী-বঙ্গবন্ধুকে না হারালে জিডিপি হতো সোয়া লাখ কোটি ডলার : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, যদি আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে না হারাতাম তাহলে আজকে দেশের জিডিপির আকার হতো সোয়া লাখ কোটি ডলার। বাজেট বক্তৃতায় বারবার বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ ওঠে আসে।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল দেশের অর্থনীতি কিভাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়ে ওঠে সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের রোল মডেলে বাংলাদেশের পরিণত হওয়ার ইতিহাস তিনি তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ নয় মাসের নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো অবকাঠামো ও সম্পদ ছিল না। পুরো বাংলাদেশ ছিল একটি ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে ছিল শুধু হাহাকার। বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশ। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দরিদ্রতম ১০টি দেশের মধ্যে একটি। বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতাও ছিল শতকরা ৮৮ ভাগ।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অস্টিন রবিনসন ‘ইকোনমিক প্রসপেক্টাস অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে ম্যালথাসিয়ান স্ট্যাগনেশনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যার পরিণতি দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যু। তৎকালীন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেন। কিন্তু সে সময় বঙ্গবন্ধু দৃঢ় কণ্ঠে সবাইকে জানিয়ে দেন-‘বাংলাদেশ এসেছে বাংলাদেশ থাকবে’। বঙ্গবন্ধু সরকারের ৭১৯ কোটি টাকার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। দেশের উন্নয়নকে মাথায় রেখে বাজেটের ৬৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয় উন্নয়ন বাজেটে। বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলদেশের স্বাধীনতার প্রথম অর্থবছরে অর্থাৎ ১৯৭২-১৯৭৩ সালে ২.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। যার ফলে জিডিপির আকার হয় ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়ায় ৯৪ মার্কিন ডলারে।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আরও বলেন, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮)। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য হ্রাসকে প্রাধিকার লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। পুনর্গঠন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর এরপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। প্রতিবছর গড়ে ৫.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা, প্রতি বছর কমপক্ষে ২.৫ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি প্রভৃতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের বিস্তারিত কৌশলও সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ এগোচ্ছিল। পরিকল্পনা প্রণয়নের দ্বিতীয় বছরেই অর্থাৎ ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে ৫.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯.৫৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যদি আমরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে না হারাতাম আর একই ধারায় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতা তাহলে আমাদের জিডিপির আকার ৩৫ বছরে ৩০০ বিলিয়ন এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে উন্নত দেশের জিডিপির সমান হতো। কিন্তু দুর্ভাগা আমরা। স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী কিছু লোকের কারণে জাতির পিতা সেই সুযোগ পাননি। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশ ও দেশের অর্থনীতি এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। জাতির পিতার সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণ থেমে যায়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০২১-২২