৩৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি ডেল্টা লাইফের
jugantor
৩৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি ডেল্টা লাইফের
চার মাসেই প্রশাসক পরিবর্তন * নতুন প্রশাসক রফিকুল ইসলাম

  মনির হোসেন  

১১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

৩৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি ডেল্টা লাইফের

দশ বছরে ৩৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। সম্প্রতি এই কর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এদিকে চার মাসের ব্যবধানে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিল এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)। বর্তমান প্রশাসক সুলতানুল আবেদীন মোল্লাকে সরিয়ে বৃহস্পতিবার মো. রফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সীমাহীন অনিয়ম এবং গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে আইডিআরএ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানতে চাইলে ডেল্টা লাইফের প্রশাসক সুলতানুল আবেদীন মোল্লা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, কী কারণে আমাকে সরানো হলো জানি না। বিষয়টি আইডিআরের লোকজন বলতে পারবে। তবে এ ব্যাপারে আইডিআরের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এনবিআরের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১০ বছরে ৩৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে ডেল্টা লাইফ। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ১৯ লাখ, ২০১৮-১৯ সালে ২৩ কোটি ৯৬ লাখ, ২০১৭-১৮ সালে ১৭ কোটি ৮০ লাখ, ২০১৬-১৭ সালে ৫১ কোটি ৬৮ লাখ, ২০১৫-১৬ সালে ৪৭ কোটি ১১ লাখ, ২০১৪-১৫ সালে ৫৩ কোটি ৩৮ লাখ, ২০১৩-১৪ সালে ৪৭ কোটি ৬ লাখ, ২০১২-১৩ সালে ১০ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১১-১২ সালে ১১ কোটি ২ লাখ, ২০১০-১১ সালে ১০ কোটি ৭৮ লাখ এবং ২০০৭-০৮ সালে ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। টাকা দ্রুত পরিশোধ না করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে জানানো হয়।

জানা যায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতের কোম্পানিটি ব্যাপক অনিয়ম করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহককে পলিসির টাকা না দেওয়া, তহবিল বাড়িয়ে দেখানো এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি।

এছাড়া ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে টাকা আদায় হলেও তা কোম্পানির হিসাবে দেখানো হয়নি। ব্যাংক হিসাবে ব্যাপক গরমিল। কোম্পানির আর্থিক রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও মানদণ্ড মানা হয়নি।

সব মিলিয়ে আইডিআরএ-এর নিয়োগকৃত দুটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্তে ডেল্টা লাইফের ৪৭টি অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অনিয়মকে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এই কোম্পানি গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিজেদেরও ক্ষতি করেছে।

আর এসব অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আবিদা রহমানের পুনঃনিয়োগের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এরপর প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আইডিআরের নিয়োগ দেওয়া দুটি অডিট ফার্ম হলো এমএস হাওলাদার ইউনূস অ্যান্ড কো. এবং এমএস ফেমাস অ্যান্ড আর। এর একটি ফার্ম নিরীক্ষা এবং অন্যটি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি অডিট আপত্তির ক্ষেত্রে বিমা আইন ও বিধির লঙ্ঘন হয়েছে। ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এই নিরীক্ষা করা হয়।

প্রতিবেদনে ১০টি বিষয়ে অধিকতর তদন্তের কথা বলা হয়েছে। তদন্ত করতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আরও ২৫টি অনিয়ম পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় স্বীকার করে নিয়েছে কোম্পানিটি। কিন্তু এসব বিষয় সংশোধন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে, এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

আইডিআরএ সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে কোম্পানির প্রচুর পরিমাণ পলিসি তামাদি হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৮০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম বঞ্চিত হয়েছে কোম্পানিটি। ফলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আলোচ্য সময়ে ২২১ কোটি টাকার ব্যাংক বিবরণী পাওয়া যায়নি। ২১৮ কোটি টাকা ব্যাংকে যথাযথভাবে জমা হয়নি।

আইডিআরের নির্দেশনা রয়েছে, ৫ হাজার টাকার বেশি নগদ লেনদেন করা যাবে না। কিন্তু তা আমলে নেয়নি কোম্পানিটি। আলোচ্য সময়ে ব্যাপক নগদ লেনদেন করেছে এ প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই ১০০ কোটির বেশি নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মুনাফায় বড় অংশের কমিশন দেখানো হয়েছে। ব্যাংকের যে বিবরণী দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সুদ ও লভ্যাংশের তথ্য ভেরিফাইড নয়।

এর আগে ৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে ডেল্টা লাইফের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এর মধ্যে প্রকৃত ফাঁকি ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং এরপর সুদ বাবদ ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

৩৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি ডেল্টা লাইফের

চার মাসেই প্রশাসক পরিবর্তন * নতুন প্রশাসক রফিকুল ইসলাম
 মনির হোসেন 
১১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
৩৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি ডেল্টা লাইফের
ফাইল ছবি

দশ বছরে ৩৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। সম্প্রতি এই কর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এদিকে চার মাসের ব্যবধানে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিল এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)। বর্তমান প্রশাসক সুলতানুল আবেদীন মোল্লাকে সরিয়ে বৃহস্পতিবার মো. রফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সীমাহীন অনিয়ম এবং গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে আইডিআরএ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানতে চাইলে ডেল্টা লাইফের প্রশাসক সুলতানুল আবেদীন মোল্লা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, কী কারণে আমাকে সরানো হলো জানি না। বিষয়টি আইডিআরের লোকজন বলতে পারবে। তবে এ ব্যাপারে আইডিআরের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এনবিআরের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১০ বছরে ৩৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে ডেল্টা লাইফ। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ১৯ লাখ, ২০১৮-১৯ সালে ২৩ কোটি ৯৬ লাখ, ২০১৭-১৮ সালে ১৭ কোটি ৮০ লাখ, ২০১৬-১৭ সালে ৫১ কোটি ৬৮ লাখ, ২০১৫-১৬ সালে ৪৭ কোটি ১১ লাখ, ২০১৪-১৫ সালে ৫৩ কোটি ৩৮ লাখ, ২০১৩-১৪ সালে ৪৭ কোটি ৬ লাখ, ২০১২-১৩ সালে ১০ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১১-১২ সালে ১১ কোটি ২ লাখ, ২০১০-১১ সালে ১০ কোটি ৭৮ লাখ এবং ২০০৭-০৮ সালে ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। টাকা দ্রুত পরিশোধ না করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে জানানো হয়।

জানা যায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতের কোম্পানিটি ব্যাপক অনিয়ম করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহককে পলিসির টাকা না দেওয়া, তহবিল বাড়িয়ে দেখানো এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি।

এছাড়া ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে টাকা আদায় হলেও তা কোম্পানির হিসাবে দেখানো হয়নি। ব্যাংক হিসাবে ব্যাপক গরমিল। কোম্পানির আর্থিক রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও মানদণ্ড মানা হয়নি।

সব মিলিয়ে আইডিআরএ-এর নিয়োগকৃত দুটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্তে ডেল্টা লাইফের ৪৭টি অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অনিয়মকে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এই কোম্পানি গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিজেদেরও ক্ষতি করেছে।

আর এসব অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আবিদা রহমানের পুনঃনিয়োগের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এরপর প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আইডিআরের নিয়োগ দেওয়া দুটি অডিট ফার্ম হলো এমএস হাওলাদার ইউনূস অ্যান্ড কো. এবং এমএস ফেমাস অ্যান্ড আর। এর একটি ফার্ম নিরীক্ষা এবং অন্যটি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি অডিট আপত্তির ক্ষেত্রে বিমা আইন ও বিধির লঙ্ঘন হয়েছে। ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এই নিরীক্ষা করা হয়।

প্রতিবেদনে ১০টি বিষয়ে অধিকতর তদন্তের কথা বলা হয়েছে। তদন্ত করতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আরও ২৫টি অনিয়ম পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় স্বীকার করে নিয়েছে কোম্পানিটি। কিন্তু এসব বিষয় সংশোধন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে, এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

আইডিআরএ সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে কোম্পানির প্রচুর পরিমাণ পলিসি তামাদি হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৮০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম বঞ্চিত হয়েছে কোম্পানিটি। ফলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আলোচ্য সময়ে ২২১ কোটি টাকার ব্যাংক বিবরণী পাওয়া যায়নি। ২১৮ কোটি টাকা ব্যাংকে যথাযথভাবে জমা হয়নি।

আইডিআরের নির্দেশনা রয়েছে, ৫ হাজার টাকার বেশি নগদ লেনদেন করা যাবে না। কিন্তু তা আমলে নেয়নি কোম্পানিটি। আলোচ্য সময়ে ব্যাপক নগদ লেনদেন করেছে এ প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই ১০০ কোটির বেশি নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মুনাফায় বড় অংশের কমিশন দেখানো হয়েছে। ব্যাংকের যে বিবরণী দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সুদ ও লভ্যাংশের তথ্য ভেরিফাইড নয়।

এর আগে ৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে ডেল্টা লাইফের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এর মধ্যে প্রকৃত ফাঁকি ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং এরপর সুদ বাবদ ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন