ইলিশের প্রবেশদ্বারে জাহাজ ভাঙা শিল্প
jugantor
ইলিশের প্রবেশদ্বারে জাহাজ ভাঙা শিল্প

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

১২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পায়রা-বলেশ্বর-বিশখালী-এই তিন নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চলছে জাহাজ নির্মাণ আর জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের জায়গা নির্ধারণের কাজ। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীসহ সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, এই তিন নদীর মোহনা দিয়েই দেশের নদনদীতে প্রবেশ করে শতকরা প্রায় ৫৪ ভাগ ইলিশ। অন্যান্য ছোট মাছের প্রবেশদ্বার ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসাবেও ব্যবহৃত হয় এই মোহনা।

এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জাহাজ ভাঙাগড়ার মতো ভারী শিল্প হলে নষ্ট হবে পরিবেশের ভারসাম্য। সেই সঙ্গে প্রজননক্ষেত্র আর অভ্যন্তরে প্রবেশের জায়গা হারিয়ে ফেলবে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ফলে মৎস্যশূন্য হবে পুরো অঞ্চল। বেকার হবে কয়েক লাখ মানুষ। মোহনা ঘেঁষে থাকা টেংরাগিরির সংরক্ষিত বনাঞ্চলও পড়বে হুমকির মুখে। এসব আশঙ্কা সামনে রেখেই জাহাজ ভাঙাগড়ার শিল্প স্থাপনের জায়গা পরিবর্তনের দাবি তুলছেন স্থানীয়রা।

বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থান বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা। এখানেই সাগরপাড়ে জাহাজ ভাঙাগড়ার শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় ২০১৭ সালে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ওই বছর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং পরিকল্পনা গৃহীত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এবং নৌপরিবহণমন্ত্রী শাহজাহান খান। শিল্প স্থাপনে প্রাথমিকভাবে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি প্রস্তাবনাও রয়েছে।

২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে ১০০টি শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে ঘোষণা দেন, তাতেও স্থান পায় তালতলীর জাহাজ ভাঙাগড়া শিল্প। এই ঘোষণা আর সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর সেখানে সফরে দারুণভাবে খুশি হয় তালতলীর মানুষ। শিল্পাঞ্চল স্থাপনে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভাগ্য বদলে যাবে-এমন স্বপ্নও দেখতে শুরু করে তারা। সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে যে স্থান নির্ধারণ হয়েছে, সেখানে হলে কপাল পুড়বে তালতলীবাসীর। দেশজুড়েও পড়বে এর ক্ষতিকর প্রভাব।

তালতলী ভূমি অফিস সূত্র জানায়, নৌবাহিনী এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এখানে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প রয়েছে দুটি। খুলনা শিপ ইয়ার্ডের সম্প্রসারিত অংশ তালতলীতে স্থাপন এবং এখানে একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড করা। এজন্য মোট ১৭২ দশমিক ৫০ একর জমি খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। সে অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সংরক্ষিত শ্বাসমূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল টেংরাগিরির কাছে পায়রা নদী সংলগ্ন আশারচর এলাকাকে নির্ধারণ করা হয় প্রাথমিকভাবে।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার আগেই জমি নির্ধারণবিষয়ক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। যতদূর জানি, এখানকার জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সম্ভাব্য একটি জায়গা পছন্দ করার জন্য। সে অনুযায়ী তারা আশারচরকে নির্ধারণ করেছেন। তবে এখনো জমি অধিগ্রহণ কিংবা পরবর্তী কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।’

তালতলীর বাসিন্দারা জানান, প্রাথমিকভাবে যে জায়গাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি একেবারে তিন নদীর মোহনায়। এখানে এই শিল্প স্থাপন হলে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মোহনায়। তাছাড়া সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে ১৬ হাজার একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চল টেংরাগিরির জীববৈচিত্র্য।

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের দেশে সমুদ্র থেকে যে ইলিশ অভ্যন্তরভাগের নদনদীতে ঢোকে, তার শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি প্রবেশ করে আলোচ্য তিন নদীর মোহনা দিয়ে। এটি ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের ব্রিডিং এবং মাইগ্রেটরি পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত। সেখানে জাহাজ ভাঙা কিংবা গড়ার মতো ভারী শিল্প হলে ইকো সিস্টেমে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। প্রজনন মৌসুমে ঘণ্টায় ৭৭ কিলোমিটার গতিতে সমুদ্র থেকে মিঠা পানির নদীতে প্রবেশ করে ইলিশ। তাছাড়া সমুদ্রের সিংহভাগ মাছ প্রজননের সময় চলে আসে অপেক্ষাকৃত কম গভীরতার পানি অর্থাৎ নদী মোহনায়। শত শত বছর এভাবেই ব্যবহার হয়ে আসছে ওই তিন নদীর মোহনা। সেখানে জাহাজ ভাঙা শিল্প হলে বহু জাহাজের আনাগোনা ও জাহাজ ভাঙার কার্যক্রমে মাছের স্বাভাবিক গমনাগমন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পুরো এলাকা। যার প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরভাগের নদনদীতেও।’

মৎস্যশূন্য হওয়ার পাশাপাশি জাহাজ ভাঙা শিল্পের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে এই মৎস্য বিজ্ঞানী বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্পে বর্জ্য হিসাবে নদীতে পড়া লেড, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থ মিশবে সেখানকার পানিতে। এসব পদার্থ মাছের শরীর হয়ে যখন মানুষের শরীরে ঢুকবে, তখন তা হবে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বরগুনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুশফিক আরিফ বলেন, ‘চরম অভাবের সময়ও আর কিছু না হোক অন্তত মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করতে পারে এই অঞ্চলের মানুষ। মৎস্য শিল্পের ওপর নির্ভর করে এখানে বেঁচে আছে লাখ লাখ পরিবার। তিন নদীর মোহনায় যদি জাহাজ ভাঙা শিল্প হয়, তাহলে সেই মাছ আর থাকবে না। সেক্ষেত্রে কর্মহীন হয়ে পড়বে সবাই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, জাহাজ ভাঙা কিংবা গড়া শিল্প হলে এখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই মাছ শিকার কিংবা মৎস্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষের তুলনায় কিছুই নয়। এ ধরনের শিল্প দেশের জিডিপিতে কতটুকু অবদান রাখবে? তার বিপরীতে মৎস্য খাত থেকে আসা জিডিপির পরিমাণ কী? এমনিতেই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে গিয়ে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে তালতলীকে। এখন যদি আবার জাহাজ ভাঙা শিল্প হয়, তাহলে টেংরাগিরির বনাঞ্চল ধ্বংস এবং মৎস্যসম্পদ বিলুপ্ত হওয়াসহ পরিবেশের ভারসাম্য বলতে আর কিছুই থাকবে না।’

তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছোট বগি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌফিকুজ্জামান তনু বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই। কিন্তু জায়গা নির্ধারণে আরও সতর্ক হতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আর যা-ই হোক, স্থানীয় মানুষের ক্ষতি করে কিছু করা যাবে না।’

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। জমি নির্ধারণ কিংবা অধিগ্রহণের কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যেসব বিষয়ে আপত্তি উঠেছে, সেগুলো মাথায় রেখেই স্থান নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হবে। পরিবেশ বা মৎস্যসম্পদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি অবশ্যই খেয়াল রাখা হবে।’

শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা। তবে এই শিল্প স্থাপন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেখানে জনস্বার্থই সবচেয়ে জরুরি। পরিবেশ রক্ষা করেই এই শিল্প স্থাপন হবে। কারও কোনো ক্ষতি করে নয়।’

ইলিশের প্রবেশদ্বারে জাহাজ ভাঙা শিল্প

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
১২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পায়রা-বলেশ্বর-বিশখালী-এই তিন নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চলছে জাহাজ নির্মাণ আর জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের জায়গা নির্ধারণের কাজ। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীসহ সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, এই তিন নদীর মোহনা দিয়েই দেশের নদনদীতে প্রবেশ করে শতকরা প্রায় ৫৪ ভাগ ইলিশ। অন্যান্য ছোট মাছের প্রবেশদ্বার ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসাবেও ব্যবহৃত হয় এই মোহনা।

এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জাহাজ ভাঙাগড়ার মতো ভারী শিল্প হলে নষ্ট হবে পরিবেশের ভারসাম্য। সেই সঙ্গে প্রজননক্ষেত্র আর অভ্যন্তরে প্রবেশের জায়গা হারিয়ে ফেলবে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ফলে মৎস্যশূন্য হবে পুরো অঞ্চল। বেকার হবে কয়েক লাখ মানুষ। মোহনা ঘেঁষে থাকা টেংরাগিরির সংরক্ষিত বনাঞ্চলও পড়বে হুমকির মুখে। এসব আশঙ্কা সামনে রেখেই জাহাজ ভাঙাগড়ার শিল্প স্থাপনের জায়গা পরিবর্তনের দাবি তুলছেন স্থানীয়রা।

বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থান বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা। এখানেই সাগরপাড়ে জাহাজ ভাঙাগড়ার শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় ২০১৭ সালে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ওই বছর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং পরিকল্পনা গৃহীত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এবং নৌপরিবহণমন্ত্রী শাহজাহান খান। শিল্প স্থাপনে প্রাথমিকভাবে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি প্রস্তাবনাও রয়েছে।

২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে ১০০টি শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে ঘোষণা দেন, তাতেও স্থান পায় তালতলীর জাহাজ ভাঙাগড়া শিল্প। এই ঘোষণা আর সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর সেখানে সফরে দারুণভাবে খুশি হয় তালতলীর মানুষ। শিল্পাঞ্চল স্থাপনে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভাগ্য বদলে যাবে-এমন স্বপ্নও দেখতে শুরু করে তারা। সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে যে স্থান নির্ধারণ হয়েছে, সেখানে হলে কপাল পুড়বে তালতলীবাসীর। দেশজুড়েও পড়বে এর ক্ষতিকর প্রভাব।

তালতলী ভূমি অফিস সূত্র জানায়, নৌবাহিনী এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এখানে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প রয়েছে দুটি। খুলনা শিপ ইয়ার্ডের সম্প্রসারিত অংশ তালতলীতে স্থাপন এবং এখানে একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড করা। এজন্য মোট ১৭২ দশমিক ৫০ একর জমি খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। সে অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সংরক্ষিত শ্বাসমূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল টেংরাগিরির কাছে পায়রা নদী সংলগ্ন আশারচর এলাকাকে নির্ধারণ করা হয় প্রাথমিকভাবে।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার আগেই জমি নির্ধারণবিষয়ক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। যতদূর জানি, এখানকার জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সম্ভাব্য একটি জায়গা পছন্দ করার জন্য। সে অনুযায়ী তারা আশারচরকে নির্ধারণ করেছেন। তবে এখনো জমি অধিগ্রহণ কিংবা পরবর্তী কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।’

তালতলীর বাসিন্দারা জানান, প্রাথমিকভাবে যে জায়গাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি একেবারে তিন নদীর মোহনায়। এখানে এই শিল্প স্থাপন হলে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মোহনায়। তাছাড়া সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে ১৬ হাজার একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চল টেংরাগিরির জীববৈচিত্র্য।

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের দেশে সমুদ্র থেকে যে ইলিশ অভ্যন্তরভাগের নদনদীতে ঢোকে, তার শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি প্রবেশ করে আলোচ্য তিন নদীর মোহনা দিয়ে। এটি ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের ব্রিডিং এবং মাইগ্রেটরি পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত। সেখানে জাহাজ ভাঙা কিংবা গড়ার মতো ভারী শিল্প হলে ইকো সিস্টেমে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। প্রজনন মৌসুমে ঘণ্টায় ৭৭ কিলোমিটার গতিতে সমুদ্র থেকে মিঠা পানির নদীতে প্রবেশ করে ইলিশ। তাছাড়া সমুদ্রের সিংহভাগ মাছ প্রজননের সময় চলে আসে অপেক্ষাকৃত কম গভীরতার পানি অর্থাৎ নদী মোহনায়। শত শত বছর এভাবেই ব্যবহার হয়ে আসছে ওই তিন নদীর মোহনা। সেখানে জাহাজ ভাঙা শিল্প হলে বহু জাহাজের আনাগোনা ও জাহাজ ভাঙার কার্যক্রমে মাছের স্বাভাবিক গমনাগমন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পুরো এলাকা। যার প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরভাগের নদনদীতেও।’

মৎস্যশূন্য হওয়ার পাশাপাশি জাহাজ ভাঙা শিল্পের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে এই মৎস্য বিজ্ঞানী বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্পে বর্জ্য হিসাবে নদীতে পড়া লেড, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থ মিশবে সেখানকার পানিতে। এসব পদার্থ মাছের শরীর হয়ে যখন মানুষের শরীরে ঢুকবে, তখন তা হবে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বরগুনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুশফিক আরিফ বলেন, ‘চরম অভাবের সময়ও আর কিছু না হোক অন্তত মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করতে পারে এই অঞ্চলের মানুষ। মৎস্য শিল্পের ওপর নির্ভর করে এখানে বেঁচে আছে লাখ লাখ পরিবার। তিন নদীর মোহনায় যদি জাহাজ ভাঙা শিল্প হয়, তাহলে সেই মাছ আর থাকবে না। সেক্ষেত্রে কর্মহীন হয়ে পড়বে সবাই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, জাহাজ ভাঙা কিংবা গড়া শিল্প হলে এখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই মাছ শিকার কিংবা মৎস্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষের তুলনায় কিছুই নয়। এ ধরনের শিল্প দেশের জিডিপিতে কতটুকু অবদান রাখবে? তার বিপরীতে মৎস্য খাত থেকে আসা জিডিপির পরিমাণ কী? এমনিতেই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে গিয়ে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে তালতলীকে। এখন যদি আবার জাহাজ ভাঙা শিল্প হয়, তাহলে টেংরাগিরির বনাঞ্চল ধ্বংস এবং মৎস্যসম্পদ বিলুপ্ত হওয়াসহ পরিবেশের ভারসাম্য বলতে আর কিছুই থাকবে না।’

তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছোট বগি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌফিকুজ্জামান তনু বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই। কিন্তু জায়গা নির্ধারণে আরও সতর্ক হতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আর যা-ই হোক, স্থানীয় মানুষের ক্ষতি করে কিছু করা যাবে না।’

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। জমি নির্ধারণ কিংবা অধিগ্রহণের কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যেসব বিষয়ে আপত্তি উঠেছে, সেগুলো মাথায় রেখেই স্থান নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হবে। পরিবেশ বা মৎস্যসম্পদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি অবশ্যই খেয়াল রাখা হবে।’

শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা। তবে এই শিল্প স্থাপন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেখানে জনস্বার্থই সবচেয়ে জরুরি। পরিবেশ রক্ষা করেই এই শিল্প স্থাপন হবে। কারও কোনো ক্ষতি করে নয়।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন