হাত ধরে আনা ফারুককে নিয়ে বিব্রত সরোয়ার
jugantor
হাত ধরে আনা ফারুককে নিয়ে বিব্রত সরোয়ার
বরিশাল বিএনপির ভাঙন তদন্তে কেন্দ্রের চিঠি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার তার এক সময়ের আস্থাভাজন মনিরুজ্জামান ফারুককে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। ফারুককে সামনে রেখে সরোয়ারবিরোধীরা জোট বেঁধেছেন।

শুধু জোট বাঁধাই নয়, সরোয়ারকে চ্যালেঞ্জ করে পালটা দলীয় কর্মসূচিও পালন শুরু করেছেন। অথচ এক সময় সরোয়ারের হাত ধরেই দলে এসেছিলেন ফারুক।

১৭ থেকে ১৮ বছর আগের কথা। তখন ফারুক ছিলেন নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতা। তখন সরোয়ার ছিলেন সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র ও জাতীয় সংসদের হুইপ। সে সময় জাতীয় পার্টি থেকে ফারুককে হাত ধরে বিএনপিতে আনেন সরোয়ার। শুধু দলে আনাই নয়, বছর খানেকের মধ্যে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতিও করেন তাকে।

আর সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন সরোয়ার নিজে। এখন মহানগর বিএনপির সভাপতি সরোয়ার আর সহ-সভাপতি ফারুক। কয়েক মাস আগেও সরোয়ারের একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন ফারুক। কিন্তু এখন তাকে নিয়ে সরোয়ার বিব্রত।

ফারুককে ঘিরে গড়ে উঠা জোট সম্পর্কে সরোয়ার বলেন, এটি বছরের পর বছর দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করা নিষ্ক্রিয়দের জোট। কিন্তু বিষয়টি যে অনেক দূর গড়িয়েছে তার প্রমাণ কেন্দ্রের চিঠি। ১৬ জুন পাঠানো চিঠিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৩০ মে মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ্যে আসে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালনে বরিশালে পালটা-পালটি কর্মসূচি পালিত হয়। এর একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন সরোয়ার অনুসারীরা। অপর অংশে ছিলেন ফারুক। এর আগেও ঘরোয়া এবং প্রকাশ্যে নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছিল সরোয়ার বিরোধীরা।

এসব আয়োজনে ফারুক ছাড়াও উপস্থিত থাকতেন মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মনিরুল আহসান মনির, আকতার হোসেন মেবুল, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আহসান আজিম, মীর জাহিদুল করিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আলতাফ মাহমুদ সিকদার, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক আবুল হাসান লিমন এবং তথ্য গবেষণা সম্পাদক মো. কাজলসহ জেলা-মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের সভাপতি-সম্পাদকরা।

জানা গেছে, মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তির পাশাপাশি অস্বস্তি থাকলেও ৩০ মে বিভাজন রেখা পরিষ্কার হয়। এরই মধ্যে মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা কেন্দ্রে চিঠি পাঠান। মহানগর কমিটি থাকতেও আলাদাভাবে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে- ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে শাহজাহানকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে চিঠিটি দিয়েছে কেন্দ্র।

বরিশাল মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুকের সঙ্গে কথা হয়। শুরুতেই তিনি সরোয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ আনেন। যুগান্তরকে ফারুক বলেন, ২০১৩ সালে তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সরোয়ার। কিন্তু তা ভঙ্গ করা হয়। মাঝে একবার কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেয় কোনো নেতা একসঙ্গে দুটি পদে থাকতে পারবেন না। তখন তিনি বলেছিলেন তাকে (ফারুক) মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রতিও রক্ষা করা হয়নি।

কেন্দ্রের মতামত ছাড়া সরোয়ার কি পদ দিতে পারতেন- এমন প্রশ্নে ফারুক বলেন, ২০ থেকে ২৫ বছরের ইতিহাস দেখুন। সাবেক এমপি সরোয়ারের ইচ্ছার বাইরে বরিশাল বিএনপিতে কী কিছু হয়েছে? একনায়কতান্ত্রিকভাবে তিনি দল চালাচ্ছেন। তার স্বৈরতান্ত্রিকতায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা আজ অবহেলিত। নিজের পথ পরিষ্কার রাখার জন্য সরোয়ার তাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কেন্দ্রও অনেক কিছু বুঝতে পারছে। এ কারণে সরোয়ারের অগঠনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।

তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন- সরোয়ারের বিরুদ্ধে দলের শতকরা ৮০ ভাগ নেতাকর্মী।

৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকের চিঠি প্রসঙ্গে ফারুক বলেন, অনেককে ভয় দেখিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। অন্যগুলোর মতো এসব কমিটিও সরোয়ার ঘরে বসে গঠন করে নিজেই অনুমোদন দিয়েছেন। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া শাহজাহানের কাছে আমরা সরোয়ারের সব অনিয়ম ও গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ দেব।

ফারুকের নেতৃত্বে জোট বাঁধা অন্য নেতারাও মহানগর বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরোয়ারকে দায়ী করেছেন।

মহানগর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক সাইফুল আহসান আজিম বলেন, শুধু ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মী নয়, যারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ-যোগ্য তারাই যেন সরোয়ারের শত্রু। আজিমের দাবি- এসব ব্যক্তি নেতৃত্বে এলে নেতৃত্ব শেষ হয়ে যাবে এমনটাই মনে করেন সরোয়ার। এ কারণে সব সময় দেখেছি তিনি অযোগ্যদের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। এখানে দল মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ পরিষ্কার রাখা। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন যারা ‘জি হুজুর’ ছাড়া কোনোকিছু বলা বা করার যোগ্যতা রাখে না। আগের কয়েকটি কমিটি দেখলে বোঝা যায়- তিনি কাদের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন? কাদের দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো? যারা বিএনপির রাজনীতিতে গতি আনতে পারেন তাদেরই সরোয়ার কোণঠাসা করে রেখেছেন।

মহানগর বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আবুল হাসান লিমন বলেন, শুধু যে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এমন নয়- আমরা যাতে বিএনপিতে না থাকি তারও নানা কৌশল করেছেন সরোয়ার। কর্মসূচিতে অংশ নিতে আমরা দলীয় কার্যালয়ে গেলে জুনিয়রদের দিয়ে চেয়ার দখল করিয়ে রাখা হয়। এ সময় আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শুধু মোসাহেবির যোগ্যতায় যখন একজন ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকে আমাদের মাথার উপর বসিয়ে দেওয়া হয় তখন ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর কি-ই বা করার থাকে?

লিমন বলেন, ৫ বছর আগে মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কেন্দ্র বলেছে এক নেতা দুই পদে থাকতে পারবেন না। আমরা চাই গঠনতান্ত্রিক পন্থায় নতুন কমিটি এবং যোগ্যদের সঠিক মূল্যায়ন করা হোক।

পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, এটা আসলে বছরের পর বছর দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়দের জোট। এ জোটের কারও কারও বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে চলার অভিযোগ রয়েছে। যোগ্যদের অবমূল্যায়ন করার কোনো ঘটনা নেই। অবমূল্যায়ন হলে তারা পদ পেলেন কি করে? ফারুক যিনি জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে এসেছেন তিনিও তো মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি।

ফারুককে তো আপনিই দলে এনেছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে সরোয়ার বলেন, শুধু ফারুক নয়, তখন অনেকেই বিভিন্ন দল থেকে বিএনপিতে এসেছেন। যারা জটিলতা করছেন তাদের ক্ষোভ মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিনকে নিয়ে। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে, এক্ষেত্রে আমার কিছুই করার নেই। সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহিনের মৃত্যুর পর গঠনতান্ত্রিকভাবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এটা তো আমি করিনি। কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কাউন্সিল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আটকে গেছে। তাদের কিছু বলার থাকলে বা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তারা তা দলীয় ফোরামে বলতে পারেন। দলীয় ফোরামের ওপর তাদের ভরসা না থাকলে কেন্দ্রে অভিযোগ দিতে পারেন। কিন্তু সেসব না করে এভাবে পালটা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে তারা দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছেন। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। এভাবে তো দল চলতে পারে না। তাদের সঙ্গে ৩০টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা নেই- এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব নেতার বিরুদ্ধে ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকরাই ঢাকায় চিঠি দিয়েছেন। কেন্দ্র তদন্ত কমিটি করে দিয়েছে। এখন তদন্তে যা পাওয়া যাবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্র।

হাত ধরে আনা ফারুককে নিয়ে বিব্রত সরোয়ার

বরিশাল বিএনপির ভাঙন তদন্তে কেন্দ্রের চিঠি
 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার তার এক সময়ের আস্থাভাজন মনিরুজ্জামান ফারুককে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। ফারুককে সামনে রেখে সরোয়ারবিরোধীরা জোট বেঁধেছেন।

শুধু জোট বাঁধাই নয়, সরোয়ারকে চ্যালেঞ্জ করে পালটা দলীয় কর্মসূচিও পালন শুরু করেছেন। অথচ এক সময় সরোয়ারের হাত ধরেই দলে এসেছিলেন ফারুক।

১৭ থেকে ১৮ বছর আগের কথা। তখন ফারুক ছিলেন নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতা। তখন সরোয়ার ছিলেন সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র ও জাতীয় সংসদের হুইপ। সে সময় জাতীয় পার্টি থেকে ফারুককে হাত ধরে বিএনপিতে আনেন সরোয়ার। শুধু দলে আনাই নয়, বছর খানেকের মধ্যে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতিও করেন তাকে।

আর সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন সরোয়ার নিজে। এখন মহানগর বিএনপির সভাপতি সরোয়ার আর সহ-সভাপতি ফারুক। কয়েক মাস আগেও সরোয়ারের একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন ফারুক। কিন্তু এখন তাকে নিয়ে সরোয়ার বিব্রত।

ফারুককে ঘিরে গড়ে উঠা জোট সম্পর্কে সরোয়ার বলেন, এটি বছরের পর বছর দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করা নিষ্ক্রিয়দের জোট। কিন্তু বিষয়টি যে অনেক দূর গড়িয়েছে তার প্রমাণ কেন্দ্রের চিঠি। ১৬ জুন পাঠানো চিঠিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৩০ মে মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ্যে আসে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালনে বরিশালে পালটা-পালটি কর্মসূচি পালিত হয়। এর একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন সরোয়ার অনুসারীরা। অপর অংশে ছিলেন ফারুক। এর আগেও ঘরোয়া এবং প্রকাশ্যে নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছিল সরোয়ার বিরোধীরা।

এসব আয়োজনে ফারুক ছাড়াও উপস্থিত থাকতেন মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মনিরুল আহসান মনির, আকতার হোসেন মেবুল, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আহসান আজিম, মীর জাহিদুল করিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আলতাফ মাহমুদ সিকদার, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক আবুল হাসান লিমন এবং তথ্য গবেষণা সম্পাদক মো. কাজলসহ জেলা-মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের সভাপতি-সম্পাদকরা।

জানা গেছে, মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তির পাশাপাশি অস্বস্তি থাকলেও ৩০ মে বিভাজন রেখা পরিষ্কার হয়। এরই মধ্যে মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা কেন্দ্রে চিঠি পাঠান। মহানগর কমিটি থাকতেও আলাদাভাবে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে- ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে শাহজাহানকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে চিঠিটি দিয়েছে কেন্দ্র।

বরিশাল মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুকের সঙ্গে কথা হয়। শুরুতেই তিনি সরোয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ আনেন। যুগান্তরকে ফারুক বলেন, ২০১৩ সালে তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সরোয়ার। কিন্তু তা ভঙ্গ করা হয়। মাঝে একবার কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেয় কোনো নেতা একসঙ্গে দুটি পদে থাকতে পারবেন না। তখন তিনি বলেছিলেন তাকে (ফারুক) মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রতিও রক্ষা করা হয়নি।

কেন্দ্রের মতামত ছাড়া সরোয়ার কি পদ দিতে পারতেন- এমন প্রশ্নে ফারুক বলেন, ২০ থেকে ২৫ বছরের ইতিহাস দেখুন। সাবেক এমপি সরোয়ারের ইচ্ছার বাইরে বরিশাল বিএনপিতে কী কিছু হয়েছে? একনায়কতান্ত্রিকভাবে তিনি দল চালাচ্ছেন। তার স্বৈরতান্ত্রিকতায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা আজ অবহেলিত। নিজের পথ পরিষ্কার রাখার জন্য সরোয়ার তাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কেন্দ্রও অনেক কিছু বুঝতে পারছে। এ কারণে সরোয়ারের অগঠনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।

তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন- সরোয়ারের বিরুদ্ধে দলের শতকরা ৮০ ভাগ নেতাকর্মী।

৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকের চিঠি প্রসঙ্গে ফারুক বলেন, অনেককে ভয় দেখিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। অন্যগুলোর মতো এসব কমিটিও সরোয়ার ঘরে বসে গঠন করে নিজেই অনুমোদন দিয়েছেন। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া শাহজাহানের কাছে আমরা সরোয়ারের সব অনিয়ম ও গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ দেব।

ফারুকের নেতৃত্বে জোট বাঁধা অন্য নেতারাও মহানগর বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরোয়ারকে দায়ী করেছেন।

মহানগর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক সাইফুল আহসান আজিম বলেন, শুধু ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মী নয়, যারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ-যোগ্য তারাই যেন সরোয়ারের শত্রু। আজিমের দাবি- এসব ব্যক্তি নেতৃত্বে এলে নেতৃত্ব শেষ হয়ে যাবে এমনটাই মনে করেন সরোয়ার। এ কারণে সব সময় দেখেছি তিনি অযোগ্যদের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান। এখানে দল মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ পরিষ্কার রাখা। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন যারা ‘জি হুজুর’ ছাড়া কোনোকিছু বলা বা করার যোগ্যতা রাখে না। আগের কয়েকটি কমিটি দেখলে বোঝা যায়- তিনি কাদের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন? কাদের দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো? যারা বিএনপির রাজনীতিতে গতি আনতে পারেন তাদেরই সরোয়ার কোণঠাসা করে রেখেছেন।

মহানগর বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আবুল হাসান লিমন বলেন, শুধু যে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এমন নয়- আমরা যাতে বিএনপিতে না থাকি তারও নানা কৌশল করেছেন সরোয়ার। কর্মসূচিতে অংশ নিতে আমরা দলীয় কার্যালয়ে গেলে জুনিয়রদের দিয়ে চেয়ার দখল করিয়ে রাখা হয়। এ সময় আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শুধু মোসাহেবির যোগ্যতায় যখন একজন ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকে আমাদের মাথার উপর বসিয়ে দেওয়া হয় তখন ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর কি-ই বা করার থাকে?

লিমন বলেন, ৫ বছর আগে মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কেন্দ্র বলেছে এক নেতা দুই পদে থাকতে পারবেন না। আমরা চাই গঠনতান্ত্রিক পন্থায় নতুন কমিটি এবং যোগ্যদের সঠিক মূল্যায়ন করা হোক।

পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, এটা আসলে বছরের পর বছর দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়দের জোট। এ জোটের কারও কারও বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে চলার অভিযোগ রয়েছে। যোগ্যদের অবমূল্যায়ন করার কোনো ঘটনা নেই। অবমূল্যায়ন হলে তারা পদ পেলেন কি করে? ফারুক যিনি জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে এসেছেন তিনিও তো মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি।

ফারুককে তো আপনিই দলে এনেছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে সরোয়ার বলেন, শুধু ফারুক নয়, তখন অনেকেই বিভিন্ন দল থেকে বিএনপিতে এসেছেন। যারা জটিলতা করছেন তাদের ক্ষোভ মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিনকে নিয়ে। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে, এক্ষেত্রে আমার কিছুই করার নেই। সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহিনের মৃত্যুর পর গঠনতান্ত্রিকভাবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এটা তো আমি করিনি। কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কাউন্সিল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আটকে গেছে। তাদের কিছু বলার থাকলে বা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তারা তা দলীয় ফোরামে বলতে পারেন। দলীয় ফোরামের ওপর তাদের ভরসা না থাকলে কেন্দ্রে অভিযোগ দিতে পারেন। কিন্তু সেসব না করে এভাবে পালটা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে তারা দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছেন। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। এভাবে তো দল চলতে পারে না। তাদের সঙ্গে ৩০টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা নেই- এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব নেতার বিরুদ্ধে ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকরাই ঢাকায় চিঠি দিয়েছেন। কেন্দ্র তদন্ত কমিটি করে দিয়েছে। এখন তদন্তে যা পাওয়া যাবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্র।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন