দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার আলোয় সন্তানদের পথচলা
jugantor
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার আলোয় সন্তানদের পথচলা

  মো. রইছ উদ্দিন, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)  

২০ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জন্মের পর থেকে হাফেজ মো. আবুল কাসেম পৃথিবীর আলো দেখতে পাননি। তবে তিনিই আজীবন আশপাশের মানুষজনকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছেন। ছয় ছেলে ও তিন মেয়েকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সন্তানরা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ‘সাদা মনের মানুষ’ হাফেজ আবুল কাসেম শত বছর ছুঁই ছুঁই বয়েসেও আলো ছড়াচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে তার একটাই আকুতি- যাদের দৃষ্টি আছে তারা যেন অপদৃষ্টি নিয়ে সমাজে অপকর্ম না করেন। অতীতের স্মৃতিচারণ করে হাফেজ কাসেম বলেন, ছোটবেলায় আমার বয়সি শিশুরা যখন স্কুল যেত তখন আমি গৌরীপুরের শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশনে বসে থাকতাম। মনে মনে খুব কষ্টও পেতাম। ১৯৪৯ সালে ময়মনসিংহ বাস স্টেশনের মোড়ে একতলা মাদ্রাসার হেফজখানায় বাবা আমাকে ভর্তি করে দেন। মাদ্রাসার প্রধান হাফেজ মো. আব্দুল আউয়ালের বাসায় ৪ বছর থেকে আমি হেফজ শেষ করি। এরপর ঢাকার বড়কাটরা আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা, লালবাগ শাহী মসজিদ মাদ্রাসায় পড়েছি। সর্বশেষ মাওলানা আব্দুল কাদেরের বংশাল মাদ্রাসায় পড়েছি।

হাফেজ কাসেম জানান, ১৯৫৪ সালে কিশোরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএলএ নেজামী ইসলামির সভাপতি মাওলানা আতাহার আলী আমাকে তার জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসায় নিয়ে যান। সেখানে তার ছেলেকে আমি পড়াই। ১৯৫৮ সালে শ্যামগঞ্জ বড় মসজিদের বারান্দায় হাফেজিয়া ফুরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে মাদ্রাসাটিতে ৪২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। ৬৪ বছরে এ মাদ্রাসা থেকে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী কুরআনে হাফেজ হয়েছেন। এ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শুধু দেশে নয় সৌদি আরব, বাহরাইন, মালয়েশিয়াসহ ১৬টি দেশে ইমাম ও মুয়াজ্জিন হিসাবে কর্মরত। মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি আবুল মুনসুর সরকার জানান, এখনো হাফেজ আবুল কাসেম মাদ্রাসা তদারকি করেন। সঠিক উচ্চারণ ও পড়াশোনা জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের তাগিদ দেন।

১৯৫৬ সালে নেত্রকোনার আটপাড়া থানার কাচুটিয়া গ্রামের আফতাবের নেছার সঙ্গে হাফেজ কাসেম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার বড় মেয়ে মোমেনা বেগম গৃহিণী। মেজ মেয়ে ড. আশরাফুন নেছা মদিনা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসাবে পিআরএলে গেছেন। বড় ছেলে হারুন অর রশিদ শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শ্যামগঞ্জ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সভাপতি মামুন অর রশিদ ব্যবসায়ী। জামিলুর রহমান পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর। আব্দুল্লাহ আল নোমান মইলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত ইউপি সদস্য। ছোট মেয়ে নাসরিন সুলতানা পান্না জয়িতা ফাউন্ডেশনে কর্মরত। আবু সায়েম সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এবং ছোট ছেলে মাহমুদুল হাসান রানা বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

হাফেজ কাসেম বলেন, পার্শ্ববর্তী ডা. আফতাব উদ্দিনকে দেখে আমার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল সন্তানকে চিকিৎসক বানাবেন। কিন্তু আমি জন্ম থেকে দৃষ্টিহীন হওয়ায় তিনি শুধু আফসোস করতেন। আমিও তা অনুভব করতাম। এরপর আমি যখন বাবা হলাম তখন ইচ্ছে হলো আমার সন্তানকে চিকিৎসক বানাব। কিন্তু আমার সেই ইচ্ছেও পূরণ হয়নি। মেজ মেয়ে মদিনাকে নিয়ে আমি মুমিনুন্নেসা কলেজে গিয়েছিলাম বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি করতে। কিন্তু তখনকার অধ্যক্ষের কথায় মনঃক্ষুণ্ন হয়ে শ্যামগঞ্জের হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি করি। সেই মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মুমিনুন্নেসা কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছে। আবার সে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হয়েছে। হাফেজ কাসেম বলেন, ‘আমার মেয়ে ডাক্তার হতে পারেনি। ডাক্তারদের অভিভাবক হওয়ায় আমি আল্লাহপার্কের নিকট শুকরিয়া আদায় করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ৩০ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছি কিন্তু কর্তব্য থেকে পিছুপা হইনি।

পৃথিবীর সব বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ড. আশরাফুননেছা মদিনা বলেন, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত বাবা দিবস। আমার বাবাও আমার কাছে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা’। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সেই সময়ে সমাজের প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আমার বাবা আমাকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আমাদের সব ভাই-বোনকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, তার বাবার কখনো ঘড়ির প্রয়োজন হয়নি। তাকে বাড়িতে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে বাবা রেলস্টেশনে ছুটে এসেছেন। ট্রেন থেকে নেমে বাবাকে দেখেননি এমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি। ড. মদিনা আরও বলেন, বাবা আমাদের চোখ দিয়ে দেখতে পারেননি। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন। আমার বাবাকে নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত।

মামুন অর রশিদ বলেন, বাবা আমাদের প্রেরণার উৎস। বাবাকে দেখেই আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানো শিখেছি। সাংবাদিক তিলক রায় টুলু বলেন, ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসাবে হাফেজ আবুল কাসেম এ অঞ্চলে সবার কাছে সমাদৃত।

১৯৩০ সালে গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের মইলাকান্দা গ্রামে হাফেজ আবুল কাসেম জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কলিম উদ্দিন আহম্মেদ। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার আলোয় সন্তানদের পথচলা

 মো. রইছ উদ্দিন, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) 
২০ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জন্মের পর থেকে হাফেজ মো. আবুল কাসেম পৃথিবীর আলো দেখতে পাননি। তবে তিনিই আজীবন আশপাশের মানুষজনকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছেন। ছয় ছেলে ও তিন মেয়েকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সন্তানরা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ‘সাদা মনের মানুষ’ হাফেজ আবুল কাসেম শত বছর ছুঁই ছুঁই বয়েসেও আলো ছড়াচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে তার একটাই আকুতি- যাদের দৃষ্টি আছে তারা যেন অপদৃষ্টি নিয়ে সমাজে অপকর্ম না করেন। অতীতের স্মৃতিচারণ করে হাফেজ কাসেম বলেন, ছোটবেলায় আমার বয়সি শিশুরা যখন স্কুল যেত তখন আমি গৌরীপুরের শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশনে বসে থাকতাম। মনে মনে খুব কষ্টও পেতাম। ১৯৪৯ সালে ময়মনসিংহ বাস স্টেশনের মোড়ে একতলা মাদ্রাসার হেফজখানায় বাবা আমাকে ভর্তি করে দেন। মাদ্রাসার প্রধান হাফেজ মো. আব্দুল আউয়ালের বাসায় ৪ বছর থেকে আমি হেফজ শেষ করি। এরপর ঢাকার বড়কাটরা আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা, লালবাগ শাহী মসজিদ মাদ্রাসায় পড়েছি। সর্বশেষ মাওলানা আব্দুল কাদেরের বংশাল মাদ্রাসায় পড়েছি।

হাফেজ কাসেম জানান, ১৯৫৪ সালে কিশোরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএলএ নেজামী ইসলামির সভাপতি মাওলানা আতাহার আলী আমাকে তার জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসায় নিয়ে যান। সেখানে তার ছেলেকে আমি পড়াই। ১৯৫৮ সালে শ্যামগঞ্জ বড় মসজিদের বারান্দায় হাফেজিয়া ফুরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে মাদ্রাসাটিতে ৪২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। ৬৪ বছরে এ মাদ্রাসা থেকে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী কুরআনে হাফেজ হয়েছেন। এ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শুধু দেশে নয় সৌদি আরব, বাহরাইন, মালয়েশিয়াসহ ১৬টি দেশে ইমাম ও মুয়াজ্জিন হিসাবে কর্মরত। মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি আবুল মুনসুর সরকার জানান, এখনো হাফেজ আবুল কাসেম মাদ্রাসা তদারকি করেন। সঠিক উচ্চারণ ও পড়াশোনা জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের তাগিদ দেন।

১৯৫৬ সালে নেত্রকোনার আটপাড়া থানার কাচুটিয়া গ্রামের আফতাবের নেছার সঙ্গে হাফেজ কাসেম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার বড় মেয়ে মোমেনা বেগম গৃহিণী। মেজ মেয়ে ড. আশরাফুন নেছা মদিনা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসাবে পিআরএলে গেছেন। বড় ছেলে হারুন অর রশিদ শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শ্যামগঞ্জ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সভাপতি মামুন অর রশিদ ব্যবসায়ী। জামিলুর রহমান পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর। আব্দুল্লাহ আল নোমান মইলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত ইউপি সদস্য। ছোট মেয়ে নাসরিন সুলতানা পান্না জয়িতা ফাউন্ডেশনে কর্মরত। আবু সায়েম সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এবং ছোট ছেলে মাহমুদুল হাসান রানা বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

হাফেজ কাসেম বলেন, পার্শ্ববর্তী ডা. আফতাব উদ্দিনকে দেখে আমার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল সন্তানকে চিকিৎসক বানাবেন। কিন্তু আমি জন্ম থেকে দৃষ্টিহীন হওয়ায় তিনি শুধু আফসোস করতেন। আমিও তা অনুভব করতাম। এরপর আমি যখন বাবা হলাম তখন ইচ্ছে হলো আমার সন্তানকে চিকিৎসক বানাব। কিন্তু আমার সেই ইচ্ছেও পূরণ হয়নি। মেজ মেয়ে মদিনাকে নিয়ে আমি মুমিনুন্নেসা কলেজে গিয়েছিলাম বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি করতে। কিন্তু তখনকার অধ্যক্ষের কথায় মনঃক্ষুণ্ন হয়ে শ্যামগঞ্জের হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি করি। সেই মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মুমিনুন্নেসা কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছে। আবার সে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হয়েছে। হাফেজ কাসেম বলেন, ‘আমার মেয়ে ডাক্তার হতে পারেনি। ডাক্তারদের অভিভাবক হওয়ায় আমি আল্লাহপার্কের নিকট শুকরিয়া আদায় করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ৩০ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছি কিন্তু কর্তব্য থেকে পিছুপা হইনি।

পৃথিবীর সব বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ড. আশরাফুননেছা মদিনা বলেন, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত বাবা দিবস। আমার বাবাও আমার কাছে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা’। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সেই সময়ে সমাজের প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আমার বাবা আমাকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আমাদের সব ভাই-বোনকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, তার বাবার কখনো ঘড়ির প্রয়োজন হয়নি। তাকে বাড়িতে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে বাবা রেলস্টেশনে ছুটে এসেছেন। ট্রেন থেকে নেমে বাবাকে দেখেননি এমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি। ড. মদিনা আরও বলেন, বাবা আমাদের চোখ দিয়ে দেখতে পারেননি। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন। আমার বাবাকে নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত।

মামুন অর রশিদ বলেন, বাবা আমাদের প্রেরণার উৎস। বাবাকে দেখেই আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানো শিখেছি। সাংবাদিক তিলক রায় টুলু বলেন, ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসাবে হাফেজ আবুল কাসেম এ অঞ্চলে সবার কাছে সমাদৃত।

১৯৩০ সালে গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের মইলাকান্দা গ্রামে হাফেজ আবুল কাসেম জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কলিম উদ্দিন আহম্মেদ। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন