চাপে কৌশলী বিএনপি নির্ভার আওয়ামী লীগ

  কাজী জেবেল ও শাহ সামছুল হক রিপন ০৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাপে কৌশলী বিএনপি নির্ভার আওয়ামী লীগ

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচার চালাতে গিয়ে নানামুখী চাপে রয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নানা শঙ্কাও কাজ করছে তাদের মধ্যে। রয়েছে গ্রেফতার আতঙ্কও।

সব চাপ মোকাবেলা করে নেতাকর্মীদের মাঠে রাখতে কৌশলী ভূমিকায় রয়েছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীরা দিনে মাঠ চষে বেড়ালেও রাতে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন না। সম্প্রতি পুলিশ কয়েকজন নেতারা বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নেয়ায় গ্রেফতার আতঙ্ক ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে তারা নানামুখী চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, বিএনপির মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে প্রচারে গেলে পুলিশ ও মোবাইল কোর্ট তাদের অনুসরণ করছে। এটিও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা বলছেন, সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও সেটি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিতে আসছে না। বিএনপির নেতারা জানান, বুধবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নির্বাচন মনিটরিং কমিটির সভায় এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

অপরদিকে মেয়র পদে নির্বাচন নিয়ে অনেকটাই নির্ভার আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরই মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দূরত্ব কমতে শুরু করেছে।

সিনিয়ররা মাঠে নেমেছেন। কর্মীরাও বাধাহীনভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। আ’লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরে বিএনপির বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতার প্রচারে যোগ দেয়াকে ভালো চোখে দেখছে না আ’লীগ। তারা বলছেন, এসব করে বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় চরিত্রে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে।

এদিকে বুধবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নির্বাচন মনিটরিং কমিটির বৈঠকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাত ও প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার।

অপরদিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গারী আলম বলেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। ছোটখাটো অভিযোগ আমলে নেয়ার মতো নয়। তবে মেয়র প্রার্থীরা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, মেয়র প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। অনেকে অনেক ধরনের অভিযোগও করেছেন, আবার অনেকেই নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে সে বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিএনপির যত শঙ্কা : গত এক সপ্তাহে বিএনপির কয়েকজন নেতার বাড়িতে যান পুলিশ সদস্যরা। রোববার বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার হাড়িনাল ঈদগাহ মাঠে পথসভার ঘোষণা দে।

একই সময়ে আ’লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমও একই স্থানে পথসভার ঘোষণা দেন। পরে বিএনপি প্রার্থী পাশের নোয়াগাঁও আফারখোলায় পথসভা করেন। জাহাঙ্গীর আলম ঈদগাহ মাঠেই পথসভা করেন। পথসভার পর বিএনপির মেয়র প্রার্থীর বহর থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাসিবুর রহমান মুন্নাকে আটক করা হয়। পরে হাসান সরকারের হস্তক্ষেপে তাকে ছেড়ে দেয়া হলেও বহরে থাকা টঙ্গী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস জিয়াউল হাসান স্বপনকে স্টিকার লাগানোর দায়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন মোবাইল কোর্ট।

সম্প্রতি হাড়িনাল এলাকার বাসিন্দা শ্রমিক দল নেতা নজরুল ইসলাম, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দোহা সরকার তাপস, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম টুটুল, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচন সমন্বয়কারী শাহাদাত হোসেন শাহীনসহ বিএনপির কয়েকজনের বাসায় হানা দেয় পুলিশ।

সূত্র জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে বিএনপি নির্বাচনী কমিটি গঠন ছাড়াও প্রতিটি ভোট কেন্দ্র পাহারা দেয়ার জন্যও পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির নামের তালিকা পুলিশ সংগ্রহ করছে। বিএনপি নেতাদের শঙ্কা, ভোটের আগে তাদের হয়রানি করা হতে পারে। ভোটের দিন কেন্দ্র পাহারার কৌশল নির্ধারণের কাজও শেষ করেছে বিএনপি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আ’লীগের জাহাঙ্গীর আলম শিক্ষা ফাউন্ডেশনের অধীনে তিন শতাধিক ‘ট্রাফিক সহকারী’ সড়কে কাজ করছে। তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

চিঠিতে হাসান সরকার বলেছেন, এসব ‘ট্রাফিক সহকারী’রা মূলত নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীর চলাচলের সময় রাস্তা যানজট মুক্ত রাখতে গিয়ে বিপরীত পাশে যানজট সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি এরা আমাদের নির্বাচনী প্রচারের সময় কৌশলে মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি করছেন।

তিনি বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বেতরভুক্ত এসব ‘ট্রাফিক সহকারী’ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। তারা ট্রাফিক সহকারীদের পোশাক পরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। এটি নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিতে মারাত্মক অন্তরায় এবং আচরণ বিধিমালার ৩নং বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি অবিলম্বে এসব ট্রাফিক সহকারী প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবদুস সালাম আজাদ বলেন, ৪২৫টি কেন্দ্রের দুই হাজার ৭৬১টি বুথে তাদের দলের এজেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

গাজীপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মো. সোহরাব উদ্দিন বলেন, আমাদের সঙ্গে প্রশাসন বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন।

বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরকারি দলের প্রার্থীর একাধিক ক্যাম্প থাকলেও সেগুলো অপসারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা জেনেছি, ওয়ার্ড ও কেন্দ্রভিত্তিক কমিটির নেতাদের নাম খুঁজছে পুলিশ। এ ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার রকিব উদ্দিন জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

মামলার আসামিদের গাজীপুরে নিয়ে আসছে বিএনপি : এদিকে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গাজীপুর সিটির গত নির্বাচনের তুলনায় এবার তারা ভালো অবস্থানে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও মাঠে নামতে শুরু করেছেন। এর সুফল পাচ্ছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রচারে নামার পরই মানুষের ঢল নামছে, যা ভোটারদের প্রভাবিত করছে। তবে এ নির্বাচন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হোক তা চান না আ’লীগ নেতারা। এরই মধ্যে আ’লীগ তাদের কেন্দ্র ভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ করেছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, আমি উন্নয়নের স্লোগান নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। মানুষ তা গ্রহণ করেছেন। এ কারণে আমার প্রচারে মানুষের ঢল নামছে।

এক্ষেত্রে আমার কিছুই করার নেই। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি বিভিন্ন জেলা থেকে মামলার আসামিদের গাজীপুরে নিয়ে আসছে। আমি চাই, স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে গাজীপুরের বাইরে কেউ যেন অংশ না নেন। এ নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনে রূপান্তর না করুক।

ঘটনাপ্রবাহ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×