আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি
jugantor
লকডাউনের দ্বিতীয় দিন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি

  যুগান্তর প্রতিবেদন   

২৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউন

ঈদের পর শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনের (বিধিনিষেধ) দ্বিতীয় দিন শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। কেউ বাইরে বের হলে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চেকপোস্টগুলোতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল ছিল। অযান্ত্রিক যানবাহন হিসেবে রিকশা চলার অনুমতি থাকলেও অনেক জায়গায় রিকশা চলাচলেও বাধা দিয়েছে পুলিশ। মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর তদারকির কারণে কার্যত প্রায় অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ। এদিকে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষ অন্তহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাইরে বের হওয়ায় শনিবার ডিএমপি ৩৮৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৩৭ জনকে ৯৫ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া ৪৪১টি গাড়িকে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) তথ্যমতে, লকডাউনের দ্বিতীয়দিন শনিবার সারা দেশে ১৮০টি টহল ও ১৮৬টি চেকপোস্ট পরিচালনা করেছে র‌্যাব। সারা দেশে পরিচালিত ২৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১২ জনকে ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৭০ টাকা জরিমানা করেছে।
সরেজমিন শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের কঠোর অবস্থান। ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরবাইক এলে সেগুলো থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারলে ছেড়ে দেওয়া হয়। যারা পারছেন না, তাদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো চেকপোস্টে যৌক্তিক কারণ দেখানোর পরও শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অযান্ত্রিক যান রিকশার চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ রকম আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ভুক্তভোগীরা।
ঢাকার মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, ধানমণ্ডি, তেজগাঁও, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, পুরান ঢাকা, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, ডুমনি, বনশ্রী এলাকার প্রধান সড়কগুলোয় গাড়ি চলাচল তেমন চোখে পড়েনি। কিছু সময় পরপর জরুরি সেবায় নিয়োজিত দু-একটা গাড়ি চলাচল করেছে।
কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকার বাসিন্দা আবদুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, জরুরি সেবায় নিয়োজিত তেজগাঁওয়ের একটি সেবা প্রতিষ্ঠানে (ওষুধ কোম্পানি) চাকরি করি। করোনার বিধিনিষেধের আওতামুক্ত থাকায় নিয়মিত অফিস করতে হচ্ছে। ঈদের আগের বিধিনিষেধের সময় চলাচলে তেমন অসুবিধা হয়নি। তবে শনিবার প্রথম অফিস দিনে চেকপোস্টগুলোতে মারাত্মক হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, বছিলা ব্রিজ পার হতেই বড় চেকপোস্ট। মোটরবাইকে আসার সময় কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলাম। আইডি কার্ড এবং মোটরবাইকের কাগজপত্র দেখানোর পরও পুলিশ আমাকে সন্দেহ করে। নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে।
টঙ্গীর বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে জানান, তিনি একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার অফিস বারিধারা এলাকায়। রিকশায় চড়ে টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাপুর পর্যন্ত আসেন। পথে পথে পুলিশের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, আব্দুল্লাপুর থেকে কুড়িল পর্যন্ত একটি রিকশা ভাড়া করি। উত্তরা আজমপুর পর্যন্ত এলে পুলিশ আমাকে রিকশা থেকে নামিয়ে চাকার পাম্পআউট করে দেয়। ওই সময় করোনার টিকা নিতে যাওয়া, হাসপাতালমুখো যাত্রীদের রিকশার চাকারও পাম্পআউট করে দিতে দেখা যায়।
পুরান ঢাকার দনিয়া, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি দেখা যায়। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার ও নগর পরিবহণের কোনো বাস ছাড়েনি। যাত্রাবাড়ী গোলচত্বর, দোলাইরপাড়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়া, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে রিকশার যাত্রী, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
যৌক্তিক কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে যাত্রাবাড়ী গোলচত্বরে ২টি গাড়ি ও যাত্রীদের জরিমানা করেন বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। মাস্ক পরিধান না করায় ৮ জনকে ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া পিকআপ, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার চালক ও যাত্রীদের বিরুদ্ধে সামাজিক দূরত্ব না মানা, যাত্রী বহন এবং যৌক্তিক কারণ ছাড়া বের হওয়ার অপরাধে ১৫টি মামলায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে অনেকে করোনার টিকা নিতে ভোগান্তি সঙ্গী করে ঢাকায় এসেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা মেডিকেলে আসা জাহাঙ্গীর কবির যুগান্তরকে বলেন, আমি করোনার টিকা নিতে চট্টগ্রাম থেকে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করি। আমাকে দেওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল। আজ (শনিবার) আমার টিকা নেওয়ার তারিখ। তাই অনেক কষ্ট করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছি।
বেলা ১১টায় গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসে লোকজন গাবতলী থেকে ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন। পুলিশ ঢাকা ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে অনেকেই করোনা টিকার কার্ড প্রদর্শন করেন। রাকিব নামের এক যাত্রী বলেন, আমি শুক্রবার গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসেছি। আজ (শনিবার) টিকা দিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি। অনলাইনে টিকার জন্য আবেদন করার পর শিশু হাসপাতালে টিকা নেওয়ার তারিখ পড়েছিল। সেজন্য ঢাকায় আসতে হয়েছে।
জানতে চাইলে গাবতলীর ট্রাফিক সার্জেন্ট আলী আহমদ বলেন, গাবতলী থেকে যারা ঢাকার বাহিরে যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই টিকার কার্ড দেখাচ্ছেন। তারা টিকা দিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়ক ফাঁকা থাকলেও অলিগলির চায়ের দোকানগুলোতে জমজমাট আড্ডা। পুলিশের উপস্থিতিতে আড্ডাবাজরা ছত্রভঙ্গ হলেও পরক্ষণেই আবারও আড্ডা জমাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করায় ডিএমপির লালবাগ বিভাগ ২৩ জনকে আটক করেছে। এছাড়া ৪৭ জনকে ১২ হাজার ৮০ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জানতে চাইলে ডিএমপি লালবাগের ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমরা মানুষকে করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সচেতন করছি। ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছি।
ব্যুরোর পাঠানো খবর-
বরিশাল : নগরী ও মহাসড়কে কোনো ধরনের গণপরিবহণ চলাচল করেনি। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর দোকানপাটও বন্ধ ছিল। তবে অলিগলির অধিকাংশ দোকান অর্ধেক খুলে বেচাবিক্রি করতে দেখা গেছে। বাজারগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব ছিল পুরোপুরি উপেক্ষিত।
সিলেট : মূল সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় ফাঁকা থাকলেও নগরীর পাড়া-মহল্লা ছিল জনমুখর। অনেকের মুখে মাস্কও ছিল না। পাড়ার চায়ের দোকান কিংবা গলির হোটেলে চলে আড্ডা। নগরীর লোহারপাড়া, কাজীটুলা, বড়বাজার, শেখঘাট, দাড়িয়াপাড়া, বাগবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : শনিবার ভোর থেকে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ ছিল। এসব যাত্রী অটোরিকশা, থ্রিহুইলারসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছেন। অনেক শ্রমজীবী মানুষ ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে হেঁটে ফেরিঘাটে আসেন।
রাজশাহী : শনিবার দ্বিতীয় দিনের লকডাউনেও রাজশাহী মহানগরী ছিল ফাঁকা। রাস্তায় হাতেগোন দু-একটি রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও জরুরি সেবার গাড়ি চলাচল করেছে। এতে যাতায়াতে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন জরুরি প্রয়োজনে বাইরে আসা মানুষ। যাতায়াতে খরচ বেড়েছে পাঁচ থেকে দশগুণ।
নবাবগঞ্জ (ঢাকা) : দোহার ও নবাবগঞ্জের অধিকাংশ সড়ক ছিল ফাঁকা। এসব সড়কে, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে দু-একটি রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলতে দেখা গেছে। বিধি অমান্য করায় ৩০টি মামলা ও ৩০ জনকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
টঙ্গী পূর্ব থানা : টঙ্গীতে কারখানা চালু রাখায় এ ওয়ান পলিমার লিমিটেডকে শনিবার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) : মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কমফিট কম্পোজিট নিট লিমিটেড ফ্যাক্টরি’ চালু রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার বিকালে সরেজমিন এর সত্যতা পাওয়া যায়। জানা যায়, ফ্যাক্টরির টেক্সটাইল বিভাগের ডাইং, নিটিং, ফিনিশিং ও মেনটেইন সেকশনে ১২ ঘণ্টা করে পৃথক তিন শিফটে প্রায় তিন শতাধিক শ্রমিককে কাজে লাগানো হচ্ছে।

লকডাউনের দ্বিতীয় দিন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি

 যুগান্তর প্রতিবেদন  
২৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
লকডাউন
কঠোর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছে অনেক যানবাহন। এতে সৃষ্টি হয়েছে যানজট। শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় -যুগান্তর

ঈদের পর শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনের (বিধিনিষেধ) দ্বিতীয় দিন শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। কেউ বাইরে বের হলে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চেকপোস্টগুলোতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল ছিল। অযান্ত্রিক যানবাহন হিসেবে রিকশা চলার অনুমতি থাকলেও অনেক জায়গায় রিকশা চলাচলেও বাধা দিয়েছে পুলিশ। মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর তদারকির কারণে কার্যত প্রায় অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ। এদিকে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষ অন্তহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। 
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাইরে বের হওয়ায় শনিবার ডিএমপি ৩৮৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৩৭ জনকে ৯৫ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া ৪৪১টি গাড়িকে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) তথ্যমতে, লকডাউনের দ্বিতীয়দিন শনিবার সারা দেশে ১৮০টি টহল ও ১৮৬টি চেকপোস্ট পরিচালনা করেছে র‌্যাব। সারা দেশে পরিচালিত ২৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১২ জনকে ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৭০ টাকা জরিমানা করেছে। 
সরেজমিন শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের কঠোর অবস্থান। ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরবাইক এলে সেগুলো থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারলে ছেড়ে দেওয়া হয়। যারা পারছেন না, তাদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো চেকপোস্টে যৌক্তিক কারণ দেখানোর পরও শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অযান্ত্রিক যান রিকশার চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ রকম আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ভুক্তভোগীরা। 
ঢাকার মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, ধানমণ্ডি, তেজগাঁও, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, পুরান ঢাকা, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, ডুমনি, বনশ্রী এলাকার প্রধান সড়কগুলোয় গাড়ি চলাচল তেমন চোখে পড়েনি। কিছু সময় পরপর জরুরি সেবায় নিয়োজিত দু-একটা গাড়ি চলাচল করেছে।
কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকার বাসিন্দা আবদুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, জরুরি সেবায় নিয়োজিত তেজগাঁওয়ের একটি সেবা প্রতিষ্ঠানে (ওষুধ কোম্পানি) চাকরি করি। করোনার বিধিনিষেধের আওতামুক্ত থাকায় নিয়মিত অফিস করতে হচ্ছে। ঈদের আগের বিধিনিষেধের সময় চলাচলে তেমন অসুবিধা হয়নি। তবে শনিবার প্রথম অফিস দিনে চেকপোস্টগুলোতে মারাত্মক হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, বছিলা ব্রিজ পার হতেই বড় চেকপোস্ট। মোটরবাইকে আসার সময় কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলাম। আইডি কার্ড এবং মোটরবাইকের কাগজপত্র দেখানোর পরও পুলিশ আমাকে সন্দেহ করে। নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে।
টঙ্গীর বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে জানান, তিনি একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার অফিস বারিধারা এলাকায়। রিকশায় চড়ে টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাপুর পর্যন্ত আসেন। পথে পথে পুলিশের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, আব্দুল্লাপুর থেকে কুড়িল পর্যন্ত একটি রিকশা ভাড়া করি। উত্তরা আজমপুর পর্যন্ত এলে পুলিশ আমাকে রিকশা থেকে নামিয়ে চাকার পাম্পআউট করে দেয়। ওই সময় করোনার টিকা নিতে যাওয়া, হাসপাতালমুখো যাত্রীদের রিকশার চাকারও পাম্পআউট করে দিতে দেখা যায়। 
পুরান ঢাকার দনিয়া, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি দেখা যায়। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার ও নগর পরিবহণের কোনো বাস ছাড়েনি। যাত্রাবাড়ী গোলচত্বর, দোলাইরপাড়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়া, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে রিকশার যাত্রী, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। 
যৌক্তিক কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে যাত্রাবাড়ী গোলচত্বরে ২টি গাড়ি ও যাত্রীদের জরিমানা করেন বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। মাস্ক পরিধান না করায় ৮ জনকে ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া পিকআপ, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার চালক ও যাত্রীদের বিরুদ্ধে সামাজিক দূরত্ব না মানা, যাত্রী বহন এবং যৌক্তিক কারণ ছাড়া বের হওয়ার অপরাধে ১৫টি মামলায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 
এদিকে অনেকে করোনার টিকা নিতে ভোগান্তি সঙ্গী করে ঢাকায় এসেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা মেডিকেলে আসা জাহাঙ্গীর কবির যুগান্তরকে বলেন, আমি করোনার টিকা নিতে চট্টগ্রাম থেকে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করি। আমাকে দেওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল। আজ (শনিবার) আমার টিকা নেওয়ার তারিখ। তাই অনেক কষ্ট করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছি। 
বেলা ১১টায় গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসে লোকজন গাবতলী থেকে ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন। পুলিশ ঢাকা ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে অনেকেই করোনা টিকার কার্ড প্রদর্শন করেন। রাকিব নামের এক যাত্রী বলেন, আমি শুক্রবার গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসেছি। আজ (শনিবার) টিকা দিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি। অনলাইনে টিকার জন্য আবেদন করার পর শিশু হাসপাতালে টিকা নেওয়ার তারিখ পড়েছিল। সেজন্য ঢাকায় আসতে হয়েছে।
জানতে চাইলে গাবতলীর ট্রাফিক সার্জেন্ট আলী আহমদ বলেন, গাবতলী থেকে যারা ঢাকার বাহিরে যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই টিকার কার্ড দেখাচ্ছেন। তারা টিকা দিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন। 
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়ক ফাঁকা থাকলেও অলিগলির চায়ের দোকানগুলোতে জমজমাট আড্ডা। পুলিশের উপস্থিতিতে আড্ডাবাজরা ছত্রভঙ্গ হলেও পরক্ষণেই আবারও আড্ডা জমাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করায় ডিএমপির লালবাগ বিভাগ ২৩ জনকে আটক করেছে। এছাড়া ৪৭ জনকে ১২ হাজার ৮০ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জানতে চাইলে ডিএমপি লালবাগের ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমরা মানুষকে করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সচেতন করছি। ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। 
ব্যুরোর পাঠানো খবর- 
বরিশাল : নগরী ও মহাসড়কে কোনো ধরনের গণপরিবহণ চলাচল করেনি। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর দোকানপাটও বন্ধ ছিল। তবে অলিগলির অধিকাংশ দোকান অর্ধেক খুলে বেচাবিক্রি করতে দেখা গেছে। বাজারগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব ছিল পুরোপুরি উপেক্ষিত। 
সিলেট : মূল সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় ফাঁকা থাকলেও নগরীর পাড়া-মহল্লা ছিল জনমুখর। অনেকের মুখে মাস্কও ছিল না। পাড়ার চায়ের দোকান কিংবা গলির হোটেলে চলে আড্ডা। নগরীর লোহারপাড়া, কাজীটুলা, বড়বাজার, শেখঘাট, দাড়িয়াপাড়া, বাগবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। 
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : শনিবার ভোর থেকে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ ছিল। এসব যাত্রী অটোরিকশা, থ্রিহুইলারসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছেন। অনেক শ্রমজীবী মানুষ ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে হেঁটে ফেরিঘাটে আসেন। 
রাজশাহী : শনিবার দ্বিতীয় দিনের লকডাউনেও রাজশাহী মহানগরী ছিল ফাঁকা। রাস্তায় হাতেগোন দু-একটি রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও জরুরি সেবার গাড়ি চলাচল করেছে। এতে যাতায়াতে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন জরুরি প্রয়োজনে বাইরে আসা মানুষ। যাতায়াতে খরচ বেড়েছে পাঁচ থেকে দশগুণ।
নবাবগঞ্জ (ঢাকা) : দোহার ও নবাবগঞ্জের অধিকাংশ সড়ক ছিল ফাঁকা। এসব সড়কে, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। মাঝে মধ্যে দু-একটি রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলতে দেখা গেছে। বিধি অমান্য করায় ৩০টি মামলা ও ৩০ জনকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।  
টঙ্গী পূর্ব থানা : টঙ্গীতে কারখানা চালু রাখায় এ ওয়ান পলিমার লিমিটেডকে শনিবার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) : মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কমফিট কম্পোজিট নিট লিমিটেড ফ্যাক্টরি’ চালু রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার বিকালে সরেজমিন এর সত্যতা পাওয়া যায়। জানা যায়, ফ্যাক্টরির টেক্সটাইল বিভাগের ডাইং, নিটিং, ফিনিশিং ও মেনটেইন সেকশনে ১২ ঘণ্টা করে পৃথক তিন শিফটে প্রায় তিন শতাধিক শ্রমিককে কাজে লাগানো হচ্ছে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন