নকশায় ত্রুটিতে প্রকল্পের সুফল নিয়ে সংশয়
jugantor
কপোতাক্ষ নদে ৬ লেনের সেতু
নকশায় ত্রুটিতে প্রকল্পের সুফল নিয়ে সংশয়

  ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর  

২৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যশোরে-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা বাজার এলাকায় ছয় লেন সেতুর নির্মাণ ত্রুটিতে কপোতাক্ষ নদ ‘গলা টিপে হত্যা’র আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

ইতোমধ্যে সেতুর একাংশের নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নির্মিত গার্ডার নদের তলদেশ ছুঁইছুঁই অবস্থা। অল্প পানিতেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ নকশায় সেতুটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে কপোতাক্ষ নদ গলাটিপে হত্যা করা হবে। হুমকির মুখে পড়বে নৌ-চলাচল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, একটি সেতুর নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নদীর গত একশ বছরের সর্বোচ্চ পানির উচ্চতা ও গত ৫০ বছরের স্বাভাবিক পানির উচ্চতা বিবেচনা করা হয়। ঝিকরগাছা সেতু নির্মাণে গত একশ বছরের পানির উচ্চতার চেয়ে এক মিটার উঁচু ও গত ৫০ বছরের স্বাভাবিক পানির উচ্চতার চেয়ে সাড়ে তিন মিটার উচ্চতায় সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে। আর পুরাতন সেতুকে ভিত্তি ধরে বটম লেভেল থেকে ১০ ইঞ্চি উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে যখন সেতুর নকশা করা হয় তখন বিআইডব্লিউটিএর গেজেট ছিল না। দাতা সংস্থা জাইকা পরামর্শক নিয়োগ করে নৌযান চলাচলের বিষয়ে গাইডলাইন নিয়ে প্রকল্পের নকশা তৈরি করেছে। পরে বিআইডব্লিউটিএ গেজেট প্রকাশ করেছে।

জানা যায়, দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলে যাতায়াতের একমাত্র পথ এই মহাসড়ক। এটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ে। এ সড়কের ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর অর্ধশত বছর আগে নির্মিত সরু সেতুটি ছিল এ পথের বিড়ম্বনা। দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ছয় লেনের সেতুটির নির্মাণ চলছে।

ইতোমধ্যে সেতুর একাংশের কাজ শেষ হয়েছে। শিগগিরই অপর পাশের কাজ শুরু হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিকো এবং ডেনকো। সেতুর নির্মাণকাজে হতাশ এলাকাবাসী। পুরাতন সরু সেতুর নিচ অংশ বা তলদেশ কখনো নদের পানি স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ, বৃষ্টিতে নদে পানি সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণাধীন সেতুর নিচের অংশ বা তলদেশ স্পর্শ করতে যাচ্ছে।

সেতুর উচ্চতা যথাযথ নির্ধারণ হয়নি। ফলে সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে কপোতাক্ষ নদকে গলাটিপে হত্যা করা হবে। স্থানীয়রা জানান, নতুন সেতু অনেক নিচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এই সেতুর কারণে কপোতাক্ষ নদ আরও মরে গেল। নতুন সেতু আমাদের আশাহত করেছে। সেতুর নকশা ঠিক হয়নি।

কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, নদীর উপর সেতু করতে হলে অবশ্যই বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশা অনুমোদন করতে হয়। কিন্তু ভুল নকশায় সওজ ব্রিজ নির্মাণ করছে ব্রিজের নিচ দিয়ে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। সরকারের যে নদী খননকাজ করছে ব্রিজটি তার গলার কাঁটা হিসাবে দাঁড়াবে।

সওজ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যতদূর জানি, পাশের রেল সেতুর বটমের সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন সেতুর উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ রেলসেতু উঁচু না করে এই সেতু উঁচু করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। রেলসেতু যেহেতু উঁচু কিংবা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সেজন্য পার্মানেন্ট সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আর নতুন সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি করলে খরচও বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সরকারকে অনেক কিছুই বিবেচনা করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহিদুল ইসলাম বলেন, ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের উপর নির্মাণাধীন সেতুটির বিষয়ে সওজ নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। তার কাছে সেতুর নকশা চেয়েছি। খুব তাড়াতাড়ি সাইট পরিদর্শন করব। খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। তিনি আরও বলেন, নদী খননের পর নৌ যোগাযোগ চালু হবে। সেতুর নির্মাণ ত্রুটিতে নৌ-চলাচল বিঘ্নিত হবে কিনা, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। নদী বাঁচিয়ে উন্নয়ন কাজ করতে হবে।

কপোতাক্ষ নদে ৬ লেনের সেতু

নকশায় ত্রুটিতে প্রকল্পের সুফল নিয়ে সংশয়

 ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর 
২৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যশোরে-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা বাজার এলাকায় ছয় লেন সেতুর নির্মাণ ত্রুটিতে কপোতাক্ষ নদ ‘গলা টিপে হত্যা’র আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

ইতোমধ্যে সেতুর একাংশের নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নির্মিত গার্ডার নদের তলদেশ ছুঁইছুঁই অবস্থা। অল্প পানিতেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ নকশায় সেতুটি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে কপোতাক্ষ নদ গলাটিপে হত্যা করা হবে। হুমকির মুখে পড়বে নৌ-চলাচল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, একটি সেতুর নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নদীর গত একশ বছরের সর্বোচ্চ পানির উচ্চতা ও গত ৫০ বছরের স্বাভাবিক পানির উচ্চতা বিবেচনা করা হয়। ঝিকরগাছা সেতু নির্মাণে গত একশ বছরের পানির উচ্চতার চেয়ে এক মিটার উঁচু ও গত ৫০ বছরের স্বাভাবিক পানির উচ্চতার চেয়ে সাড়ে তিন মিটার উচ্চতায় সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে। আর পুরাতন সেতুকে ভিত্তি ধরে বটম লেভেল থেকে ১০ ইঞ্চি উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে যখন সেতুর নকশা করা হয় তখন বিআইডব্লিউটিএর গেজেট ছিল না। দাতা সংস্থা জাইকা পরামর্শক নিয়োগ করে নৌযান চলাচলের বিষয়ে গাইডলাইন নিয়ে প্রকল্পের নকশা তৈরি করেছে। পরে বিআইডব্লিউটিএ গেজেট প্রকাশ করেছে।

জানা যায়, দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলে যাতায়াতের একমাত্র পথ এই মহাসড়ক। এটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ে। এ সড়কের ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর অর্ধশত বছর আগে নির্মিত সরু সেতুটি ছিল এ পথের বিড়ম্বনা। দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ছয় লেনের সেতুটির নির্মাণ চলছে।

ইতোমধ্যে সেতুর একাংশের কাজ শেষ হয়েছে। শিগগিরই অপর পাশের কাজ শুরু হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিকো এবং ডেনকো। সেতুর নির্মাণকাজে হতাশ এলাকাবাসী। পুরাতন সরু সেতুর নিচ অংশ বা তলদেশ কখনো নদের পানি স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ, বৃষ্টিতে নদে পানি সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণাধীন সেতুর নিচের অংশ বা তলদেশ স্পর্শ করতে যাচ্ছে।

সেতুর উচ্চতা যথাযথ নির্ধারণ হয়নি। ফলে সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে কপোতাক্ষ নদকে গলাটিপে হত্যা করা হবে। স্থানীয়রা জানান, নতুন সেতু অনেক নিচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এই সেতুর কারণে কপোতাক্ষ নদ আরও মরে গেল। নতুন সেতু আমাদের আশাহত করেছে। সেতুর নকশা ঠিক হয়নি।

কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, নদীর উপর সেতু করতে হলে অবশ্যই বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশা অনুমোদন করতে হয়। কিন্তু ভুল নকশায় সওজ ব্রিজ নির্মাণ করছে ব্রিজের নিচ দিয়ে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। সরকারের যে নদী খননকাজ করছে ব্রিজটি তার গলার কাঁটা হিসাবে দাঁড়াবে।

সওজ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যতদূর জানি, পাশের রেল সেতুর বটমের সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন সেতুর উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ রেলসেতু উঁচু না করে এই সেতু উঁচু করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। রেলসেতু যেহেতু উঁচু কিংবা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সেজন্য পার্মানেন্ট সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আর নতুন সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি করলে খরচও বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সরকারকে অনেক কিছুই বিবেচনা করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহিদুল ইসলাম বলেন, ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের উপর নির্মাণাধীন সেতুটির বিষয়ে সওজ নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। তার কাছে সেতুর নকশা চেয়েছি। খুব তাড়াতাড়ি সাইট পরিদর্শন করব। খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। তিনি আরও বলেন, নদী খননের পর নৌ যোগাযোগ চালু হবে। সেতুর নির্মাণ ত্রুটিতে নৌ-চলাচল বিঘ্নিত হবে কিনা, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। নদী বাঁচিয়ে উন্নয়ন কাজ করতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন