নিরাপত্তা ‘গাইডলাইন’ দিয়ে পুলিশের প্রতিবেদন
jugantor
মগবাজারে বিস্ফোরণ
নিরাপত্তা ‘গাইডলাইন’ দিয়ে পুলিশের প্রতিবেদন

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল জমে থাকা মিথেন গ্যাস থেকেই। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনা এড়াতে ‘নিরাপত্তা গাইডলাইন’ দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। যেখানে বিস্ফোরণের কারণ, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা ও ভবিষ্যৎ করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

মগবাজারে বিস্ফোরণের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধানকে সভাপতি ও সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) সদস্য সচিব করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কার্যালয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা হয় কমিটির সভাপতি ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামানের। প্রতিবেদনের বিষয়ে সিটিটিসি প্রধান যুগান্তরকে বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরে সিলগালা করে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বিস্ফোরণের পর দুর্ঘটনাস্থলে ৮-১২ শতাংশ পর্যন্ত মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছে তারা। পাইপলাইন লিকেজ হয়ে এ গ্যাস জমা হয়। আর এ গ্যাস থেকেই সেখানে বিস্ফোরণ হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি উঠে আসে।

পাশাপাশি এ ধরনের বিস্ফোরণের জন্য দায়ী আরও কিছু বিষয় সামনে নিয়ে আসা হয়। সেজন্য ‘নিরাপত্তা গাইডলাইন’ দিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। যেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও যে কোনো কারণে গ্যাসলাইন লিকেজ হলে করণীয় সম্পর্কে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইনের নিয়মিত তদারকি এবং যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বও তুলে ধরা হয়।

২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মগবাজারে তিনতলা একটি ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। রাতে হঠাৎ এ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল মগবাজারের কিছু এলাকা। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, রাস্তার অপরপ্রান্তের কয়েকটি ভবন ও রাস্তায় থাকা তিনটি বাসও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ঘটনায় ১২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ভবনটির আশপাশের শতাধিক মানুষ। বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৯ জুন মামলা করে রমনা থানার পুলিশ। পরে মামলাটি ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনা তদন্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটির বাইরেও একাধিক সংস্থা কাজ করছে।

এর আগে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি ১৩ জুলাই ছয় দফা সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। যেখানে বলা হয়, জায়গাটা ‘গ্যাস চেম্বার’ হয়ে যায়। সেখান থেকেই বিস্ফোরণ হয়। তাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল- ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের তিতাস গ্যাসের পুরনো লাইনগুলো পরিবর্তন করে নতুনভাবে বিন্যাস করা; ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের সময় ভূগর্ভে কোনো গ্যাসলাইন নেই মর্মে তিতাস গ্যাস থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ ও তা নিয়মিত তদারকি; ড্রেন মেরামতের সময় খুব সাবধানে কাজ করা, যাতে গ্যাসের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; স্থাপনায় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।

বিভিন্ন সংস্থার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিনতলা ভবনটিতে ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ছিল। কোনো বদ্ধ জায়গায় ৫ শতাংশ মিথেন গ্যাস থাকলে সেখানে স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) হলেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। সেখানে ওই ভবনটিতে বিস্ফোরণের পরেও ৮-৯ শতাংশ মিথেন গ্যাস ছিল। বিস্ফোরণের আগে এই পরিমাণ ছিল আরও অনেক বেশি। মিথেনের পাশাপাশি ছিল হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতিও। বদ্ধ কক্ষে জমে থাকা গ্যাসে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা যে কোনো ধরনের স্পার্ক থেকে বিস্ফোরণটি হতে পারে। মিথেন গ্যাসের সহনীয় মাত্রা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এএস মাকসুদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, বদ্ধরুমে বাতাসে ৫-১৫ শতাংশ মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এ গ্যাস দাহ্য পদার্থ। সেখানে কোনো আগুনের উৎস থাকলে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটবে। তা হোক স্পার্ক, ম্যাচের কাঠি বা অন্যকিছু। আর হাইড্রোজেন সালফাইড নিজে দাহ্য না হলেও অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এটি দাহ্য হয়। মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইড একসঙ্গে থাকলে এর দাহ্যতা বেড়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে।

মগবাজারে বিস্ফোরণ

নিরাপত্তা ‘গাইডলাইন’ দিয়ে পুলিশের প্রতিবেদন

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল জমে থাকা মিথেন গ্যাস থেকেই। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনা এড়াতে ‘নিরাপত্তা গাইডলাইন’ দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। যেখানে বিস্ফোরণের কারণ, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা ও ভবিষ্যৎ করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

মগবাজারে বিস্ফোরণের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধানকে সভাপতি ও সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) সদস্য সচিব করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কার্যালয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা হয় কমিটির সভাপতি ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামানের। প্রতিবেদনের বিষয়ে সিটিটিসি প্রধান যুগান্তরকে বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরে সিলগালা করে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বিস্ফোরণের পর দুর্ঘটনাস্থলে ৮-১২ শতাংশ পর্যন্ত মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছে তারা। পাইপলাইন লিকেজ হয়ে এ গ্যাস জমা হয়। আর এ গ্যাস থেকেই সেখানে বিস্ফোরণ হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি উঠে আসে।

পাশাপাশি এ ধরনের বিস্ফোরণের জন্য দায়ী আরও কিছু বিষয় সামনে নিয়ে আসা হয়। সেজন্য ‘নিরাপত্তা গাইডলাইন’ দিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। যেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও যে কোনো কারণে গ্যাসলাইন লিকেজ হলে করণীয় সম্পর্কে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইনের নিয়মিত তদারকি এবং যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বও তুলে ধরা হয়।

২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মগবাজারে তিনতলা একটি ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। রাতে হঠাৎ এ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল মগবাজারের কিছু এলাকা। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, রাস্তার অপরপ্রান্তের কয়েকটি ভবন ও রাস্তায় থাকা তিনটি বাসও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ঘটনায় ১২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ভবনটির আশপাশের শতাধিক মানুষ। বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৯ জুন মামলা করে রমনা থানার পুলিশ। পরে মামলাটি ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনা তদন্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটির বাইরেও একাধিক সংস্থা কাজ করছে।

এর আগে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি ১৩ জুলাই ছয় দফা সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। যেখানে বলা হয়, জায়গাটা ‘গ্যাস চেম্বার’ হয়ে যায়। সেখান থেকেই বিস্ফোরণ হয়। তাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল- ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের তিতাস গ্যাসের পুরনো লাইনগুলো পরিবর্তন করে নতুনভাবে বিন্যাস করা; ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের সময় ভূগর্ভে কোনো গ্যাসলাইন নেই মর্মে তিতাস গ্যাস থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ ও তা নিয়মিত তদারকি; ড্রেন মেরামতের সময় খুব সাবধানে কাজ করা, যাতে গ্যাসের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; স্থাপনায় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।

বিভিন্ন সংস্থার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিনতলা ভবনটিতে ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ছিল। কোনো বদ্ধ জায়গায় ৫ শতাংশ মিথেন গ্যাস থাকলে সেখানে স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) হলেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। সেখানে ওই ভবনটিতে বিস্ফোরণের পরেও ৮-৯ শতাংশ মিথেন গ্যাস ছিল। বিস্ফোরণের আগে এই পরিমাণ ছিল আরও অনেক বেশি। মিথেনের পাশাপাশি ছিল হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতিও। বদ্ধ কক্ষে জমে থাকা গ্যাসে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা যে কোনো ধরনের স্পার্ক থেকে বিস্ফোরণটি হতে পারে। মিথেন গ্যাসের সহনীয় মাত্রা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এএস মাকসুদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, বদ্ধরুমে বাতাসে ৫-১৫ শতাংশ মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এ গ্যাস দাহ্য পদার্থ। সেখানে কোনো আগুনের উৎস থাকলে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটবে। তা হোক স্পার্ক, ম্যাচের কাঠি বা অন্যকিছু। আর হাইড্রোজেন সালফাইড নিজে দাহ্য না হলেও অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এটি দাহ্য হয়। মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইড একসঙ্গে থাকলে এর দাহ্যতা বেড়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন