অধিকাংশ লঞ্চ যে কারণে চলেনি
jugantor
ঢাকা-বরিশাল নৌরুট
অধিকাংশ লঞ্চ যে কারণে চলেনি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

০২ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অধিকাংশ লঞ্চ যে কারণে চলেনি

ঢাকা-বরিশাল রুটে লঞ্চ চালানো থেকে বিরত রয়েছেন অধিকাংশ মালিক। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এ রুটে লঞ্চ না চালানোর পেছনে তারা বিভ্রান্তিমূলক সরকারি নির্দেশনাকে দায়ী করছেন। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন এ রুটে উভয় প্রান্ত থেকে ২৩-২৪টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। কিন্তু রোববার বরিশাল থেকে মাত্র ৩টি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আর ঢাকা থেকে ছেড়ে আসে একটি।

মালিকরা জানান, ‘মাত্র ১ দিনের জন্য লঞ্চ চালাতে গেলে একদিকে যেমন বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি এমন একটা সময়ে লঞ্চ চালানোর নির্দেশনা এসেছে যখন শিল্প-কলকারখানার অধিকাংশ শ্রমিক আগেই নানা উপায়ে ঢাকা পৌঁছে গেছেন। ফলে যাত্রীর সংখ্যা হাতেগোনা। তাছাড়া মাত্র ১ দিন লঞ্চ চললেও পুরো মাসের বেতন-ভাতা দিতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের। তাই পরিস্থিতি না বুঝে লঞ্চ চালাতে চাইছি না আমরা।’

চলমান লকডাউনের মধ্যে ৩০ জুলাই জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ১ আগস্ট থেকে রপ্তানিমুখী সব শিল্প-কলকারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকার। যেসব শর্তে কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তার মধ্যে অন্যতম বর্তমানে রাজধানীতে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের দিয়েই কাজ শুরু হবে। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা শ্রমিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন কারখানা মালিকরা। সরকারের এ শর্ত কাগজে-কলমে মেনে নেওয়া হলেও বাস্তবে ঘটে ভিন্ন ঘটনা। গার্মেন্ট-কারখানা খোলার অনুমতি পাওয়ার পরপরই সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের ফোন করে রোববার সকাল ৮টার মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। যথাসময়ে কাজে যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না এমন হুমকিও দেওয়া হয়। গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানায় শ্রমিকদের দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার-লাইনম্যানরা ফোনগুলো করেন। ঝালকাঠী জেলার নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, ‘শুক্রবার বিকালে ফোন আসে আমার কাছে। লাইনম্যান ফরিদুল ফোন করে রোববার সকালের মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলেন।’ একইভাবে ফোন পাওয়ার কথা জানান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আব্দুস সালাম, বরগুনার আয়লা পাতাকাটার শাহিন হাওলাদার এবং ভোলার মনপুরার জুয়েল তালুকদারসহ আরও অনেকে। ফোন পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ঢাকামুখী মানুষের ভিড়। শুক্রবার এ ভিড় কিছুটা কম থাকলেও শনিবার ভোর রাত থেকে রাজধানীমুখী সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। যে যেভাবে পারেন ছুটতে থাকেন ঢাকার উদ্দেশে। মহাসড়ক-ফেরি সবকিছুই উপচে পড়ে মানুষের ভিড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, লকডাউন মানাতে সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্বে থাকা পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও একপর্যায়ে পিছু হটেন দায়িত্ব পালন থেকে। রাজধানীমুখী মানুষের এ ঢলের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। শনিবার রাত ৮টা নাগাদ আসে লঞ্চ-বাস ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা। নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশালের দুটি বাস টার্মিনাল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাস চললেও বন্ধ থাকে লঞ্চ চলাচল। যাত্রী নেই এমন যুক্তি দিয়ে ঢাকা-বরিশাল রুটে লঞ্চ চালানো বন্ধ রাখেন মালিকরা। রোববারও অব্যাহত ছিল এ পরিস্থিতি।

ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সুরভীর পরিচালক রিয়াজ উল কবির বলেন, ‘শনিবার রাত ৯টার দিকে আমাদের বলা হয় লঞ্চ ছাড়তে। কিন্তু তখন লঞ্চ ছাড়ার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। আমাদের লঞ্চগুলো মাস্টার ভেহিক্যাল। এ লঞ্চ চালাতে আইন অনুযায়ী ২ জন করে প্রথম শ্রেণির মাস্টার, সুকানি এবং গ্রিজার লাগে। তাছাড়া সবমিলিয়ে কর্মচারী লাগে ২০-২৫ জন। টানা লকডাউনে এসব কর্মচারীর প্রায় সবাই অবস্থান করছেন গ্রামের বাড়িতে। হঠাৎ বললেই তো আর এদের পাওয়া যাবে না।’ সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক আকতার হোসেন আকেজ বলেন, ‘বরিশাল থেকে ঢাকায় যেতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার তেল লাগে। রাত ৯টায় হঠাৎ বললেই তো আর এই তেল পাওয়া যাবে না। মাঝে ঈদের ক’দিন বাদে টানা প্রায় ১ মাস ধরে বন্ধ লঞ্চ। ২-১ ঘণ্টা চলার মতো তেল লঞ্চে থাকতে পারে। তা দিয়ে তো আর ঢাকা যাওয়া যাবে না। তাই শনিবার রাতে বরিশাল ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়া সম্ভব হয়নি।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ যাত্রী পরিবহণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক সাঈদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘রাত ৯টায় বলা হলো লঞ্চ ছাড়তে। সময় বেঁধে দেওয়া হলো রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত। খানিকক্ষণ পর আবার বলা হলো- ভোর ৬টা নয় দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে লঞ্চ। এরপর রোববার সকালে বলা হয় সোমবার ভোর পর্যন্ত লঞ্চ চালাতে পারব আমরা। এখন আপনারাই বলুন, ১০-১১ ঘণ্টার মধ্যে যদি ৩ বার ৩ রকম নির্দেশনা আসে তো আমরা কোথায় যাব? বিআইডব্লিউটিএর বেঁধে দেওয়া টাইম-টেবিল অনুযায়ী লঞ্চ চালাতে হয় আমাদের। যেদিন লঞ্চ ছাড়তে বলা হলো সেদিন যদি ঢাকা কিংবা বরিশালে যাই তো লকডাউন ভাঙার দিন হয়তো দেখা যাবে টাইম-টেবিল নেই বলে লঞ্চ ছাড়তে পারছি না। আবার বরিশাল থেকে ছেড়ে ঢাকায় গিয়েও ফিরে আসার সুযোগ নেই। তাহলে কিভাবে লঞ্চ ছাড়ব? যে সেক্টর সম্বন্ধে যাদের কোনো ধারণা নেই তারাই পারে এভাবে হুটহাট সিদ্ধান্ত দিতে। এতে করে যাত্রীদের কোনো উপকার তো হয়ই না বরঞ্চ লঞ্চ ছাড়ার খবর শুনে ঘাটে এসে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়।’

রোববার রাতে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া অ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের মালিক এফবিসিসিআইর পরিচালক নিজামউদ্দিন বলেন, ‘লোকসান হবে জেনেও সাধারণ যাত্রীদের অসুবিধার কথা ভেবে লঞ্চ ছেড়েছি আমরা। তবে লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা একেবারেই সামান্য। সিদ্ধান্তটি আরও আগে এলে একদিকে যেমন মানুষের কষ্ট হতো না, তেমনি আমরাও নিয়ম-বিধি মেনে লঞ্চ ছাড়তে পারতাম। তাছাড়া সিদ্ধান্তটি এমন সময় এসেছে যখন গার্মেন্ট কারখানার অধিকাংশ শ্রমিক ঢাকায় পৌঁছে গেছেন। মহাসড়ক এবং ফেরি ঘাটগুলোতে জনতার ঢলের যেসব ছবি রোববারের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোই এর প্রমাণ। লঞ্চ ছাড়ার অনুমতি যখন দেওয়া হলো তখন ঘাটে যাত্রী নেই বললেই চলে।’ বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা আসলেই ঠিক যে, ঘাটে খুব একটা যাত্রী নেই। তাছাড়া শনিবার রাতে লঞ্চ চলার অনুমতি দেওয়ার পর অনেক যাত্রী ঘাটে এসে ফিরে যাওয়ার কারণেও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে এ সমস্যা থাকবে না।’ বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শুধু এবারই নয়, করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখছি একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা। পরিস্থিতি দেখতে শনি ও রোববার লঞ্চঘাট আর বাস টার্মিনালে গিয়েছিলাম। বাস-লঞ্চে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো চিত্র আমার চোখে পড়েনি, তেমনি যাত্রী হিসাবে যাদের দেখেছি তারা প্রায় কেউই কল-কারখানার শ্রমিক নন। শ্রমিকরা মূলত শনিবার দিনের মধ্যেই যে যেভাবে পেরেছেন ঢাকায় চলে গেছেন। যারা এখন লঞ্চ-বাসে করে ঢাকায় যাচ্ছেন তারা ঈদ করতে গ্রামে এসে আটকা পড়া বিভিন্ন পেশার মানুষ। লঞ্চ বাস ছাড়ার সুযোগে এরাই মূলত ঢাকায় ফিরছেন। আর কল-কারখানার শ্রমিকরা ঢাকায় পৌঁছেছে অসহনীয় সব কষ্ট সহ্য করে।’

ঢাকা-বরিশাল নৌরুট

অধিকাংশ লঞ্চ যে কারণে চলেনি

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
০২ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অধিকাংশ লঞ্চ যে কারণে চলেনি
ফাইল ছবি

ঢাকা-বরিশাল রুটে লঞ্চ চালানো থেকে বিরত রয়েছেন অধিকাংশ মালিক। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এ রুটে লঞ্চ না চালানোর পেছনে তারা বিভ্রান্তিমূলক সরকারি নির্দেশনাকে দায়ী করছেন। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন এ রুটে উভয় প্রান্ত থেকে ২৩-২৪টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। কিন্তু রোববার বরিশাল থেকে মাত্র ৩টি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আর ঢাকা থেকে ছেড়ে আসে একটি।

মালিকরা জানান, ‘মাত্র ১ দিনের জন্য লঞ্চ চালাতে গেলে একদিকে যেমন বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি এমন একটা সময়ে লঞ্চ চালানোর নির্দেশনা এসেছে যখন শিল্প-কলকারখানার অধিকাংশ শ্রমিক আগেই নানা উপায়ে ঢাকা পৌঁছে গেছেন। ফলে যাত্রীর সংখ্যা হাতেগোনা। তাছাড়া মাত্র ১ দিন লঞ্চ চললেও পুরো মাসের বেতন-ভাতা দিতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের। তাই পরিস্থিতি না বুঝে লঞ্চ চালাতে চাইছি না আমরা।’

চলমান লকডাউনের মধ্যে ৩০ জুলাই জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ১ আগস্ট থেকে রপ্তানিমুখী সব শিল্প-কলকারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকার। যেসব শর্তে কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তার মধ্যে অন্যতম বর্তমানে রাজধানীতে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের দিয়েই কাজ শুরু হবে। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা শ্রমিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন কারখানা মালিকরা। সরকারের এ শর্ত কাগজে-কলমে মেনে নেওয়া হলেও বাস্তবে ঘটে ভিন্ন ঘটনা। গার্মেন্ট-কারখানা খোলার অনুমতি পাওয়ার পরপরই সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীদের ফোন করে রোববার সকাল ৮টার মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। যথাসময়ে কাজে যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না এমন হুমকিও দেওয়া হয়। গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানায় শ্রমিকদের দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার-লাইনম্যানরা ফোনগুলো করেন। ঝালকাঠী জেলার নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, ‘শুক্রবার বিকালে ফোন আসে আমার কাছে। লাইনম্যান ফরিদুল ফোন করে রোববার সকালের মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলেন।’ একইভাবে ফোন পাওয়ার কথা জানান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আব্দুস সালাম, বরগুনার আয়লা পাতাকাটার শাহিন হাওলাদার এবং ভোলার মনপুরার জুয়েল তালুকদারসহ আরও অনেকে। ফোন পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ঢাকামুখী মানুষের ভিড়। শুক্রবার এ ভিড় কিছুটা কম থাকলেও শনিবার ভোর রাত থেকে রাজধানীমুখী সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। যে যেভাবে পারেন ছুটতে থাকেন ঢাকার উদ্দেশে। মহাসড়ক-ফেরি সবকিছুই উপচে পড়ে মানুষের ভিড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, লকডাউন মানাতে সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্বে থাকা পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও একপর্যায়ে পিছু হটেন দায়িত্ব পালন থেকে। রাজধানীমুখী মানুষের এ ঢলের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। শনিবার রাত ৮টা নাগাদ আসে লঞ্চ-বাস ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা। নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশালের দুটি বাস টার্মিনাল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাস চললেও বন্ধ থাকে লঞ্চ চলাচল। যাত্রী নেই এমন যুক্তি দিয়ে ঢাকা-বরিশাল রুটে লঞ্চ চালানো বন্ধ রাখেন মালিকরা। রোববারও অব্যাহত ছিল এ পরিস্থিতি।

ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সুরভীর পরিচালক রিয়াজ উল কবির বলেন, ‘শনিবার রাত ৯টার দিকে আমাদের বলা হয় লঞ্চ ছাড়তে। কিন্তু তখন লঞ্চ ছাড়ার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। আমাদের লঞ্চগুলো মাস্টার ভেহিক্যাল। এ লঞ্চ চালাতে আইন অনুযায়ী ২ জন করে প্রথম শ্রেণির মাস্টার, সুকানি এবং গ্রিজার লাগে। তাছাড়া সবমিলিয়ে কর্মচারী লাগে ২০-২৫ জন। টানা লকডাউনে এসব কর্মচারীর প্রায় সবাই অবস্থান করছেন গ্রামের বাড়িতে। হঠাৎ বললেই তো আর এদের পাওয়া যাবে না।’ সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক আকতার হোসেন আকেজ বলেন, ‘বরিশাল থেকে ঢাকায় যেতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার তেল লাগে। রাত ৯টায় হঠাৎ বললেই তো আর এই তেল পাওয়া যাবে না। মাঝে ঈদের ক’দিন বাদে টানা প্রায় ১ মাস ধরে বন্ধ লঞ্চ। ২-১ ঘণ্টা চলার মতো তেল লঞ্চে থাকতে পারে। তা দিয়ে তো আর ঢাকা যাওয়া যাবে না। তাই শনিবার রাতে বরিশাল ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়া সম্ভব হয়নি।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ যাত্রী পরিবহণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক সাঈদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘রাত ৯টায় বলা হলো লঞ্চ ছাড়তে। সময় বেঁধে দেওয়া হলো রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত। খানিকক্ষণ পর আবার বলা হলো- ভোর ৬টা নয় দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে লঞ্চ। এরপর রোববার সকালে বলা হয় সোমবার ভোর পর্যন্ত লঞ্চ চালাতে পারব আমরা। এখন আপনারাই বলুন, ১০-১১ ঘণ্টার মধ্যে যদি ৩ বার ৩ রকম নির্দেশনা আসে তো আমরা কোথায় যাব? বিআইডব্লিউটিএর বেঁধে দেওয়া টাইম-টেবিল অনুযায়ী লঞ্চ চালাতে হয় আমাদের। যেদিন লঞ্চ ছাড়তে বলা হলো সেদিন যদি ঢাকা কিংবা বরিশালে যাই তো লকডাউন ভাঙার দিন হয়তো দেখা যাবে টাইম-টেবিল নেই বলে লঞ্চ ছাড়তে পারছি না। আবার বরিশাল থেকে ছেড়ে ঢাকায় গিয়েও ফিরে আসার সুযোগ নেই। তাহলে কিভাবে লঞ্চ ছাড়ব? যে সেক্টর সম্বন্ধে যাদের কোনো ধারণা নেই তারাই পারে এভাবে হুটহাট সিদ্ধান্ত দিতে। এতে করে যাত্রীদের কোনো উপকার তো হয়ই না বরঞ্চ লঞ্চ ছাড়ার খবর শুনে ঘাটে এসে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়।’

রোববার রাতে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া অ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের মালিক এফবিসিসিআইর পরিচালক নিজামউদ্দিন বলেন, ‘লোকসান হবে জেনেও সাধারণ যাত্রীদের অসুবিধার কথা ভেবে লঞ্চ ছেড়েছি আমরা। তবে লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা একেবারেই সামান্য। সিদ্ধান্তটি আরও আগে এলে একদিকে যেমন মানুষের কষ্ট হতো না, তেমনি আমরাও নিয়ম-বিধি মেনে লঞ্চ ছাড়তে পারতাম। তাছাড়া সিদ্ধান্তটি এমন সময় এসেছে যখন গার্মেন্ট কারখানার অধিকাংশ শ্রমিক ঢাকায় পৌঁছে গেছেন। মহাসড়ক এবং ফেরি ঘাটগুলোতে জনতার ঢলের যেসব ছবি রোববারের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোই এর প্রমাণ। লঞ্চ ছাড়ার অনুমতি যখন দেওয়া হলো তখন ঘাটে যাত্রী নেই বললেই চলে।’ বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা আসলেই ঠিক যে, ঘাটে খুব একটা যাত্রী নেই। তাছাড়া শনিবার রাতে লঞ্চ চলার অনুমতি দেওয়ার পর অনেক যাত্রী ঘাটে এসে ফিরে যাওয়ার কারণেও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে এ সমস্যা থাকবে না।’ বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শুধু এবারই নয়, করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখছি একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা। পরিস্থিতি দেখতে শনি ও রোববার লঞ্চঘাট আর বাস টার্মিনালে গিয়েছিলাম। বাস-লঞ্চে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো চিত্র আমার চোখে পড়েনি, তেমনি যাত্রী হিসাবে যাদের দেখেছি তারা প্রায় কেউই কল-কারখানার শ্রমিক নন। শ্রমিকরা মূলত শনিবার দিনের মধ্যেই যে যেভাবে পেরেছেন ঢাকায় চলে গেছেন। যারা এখন লঞ্চ-বাসে করে ঢাকায় যাচ্ছেন তারা ঈদ করতে গ্রামে এসে আটকা পড়া বিভিন্ন পেশার মানুষ। লঞ্চ বাস ছাড়ার সুযোগে এরাই মূলত ঢাকায় ফিরছেন। আর কল-কারখানার শ্রমিকরা ঢাকায় পৌঁছেছে অসহনীয় সব কষ্ট সহ্য করে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন