দুই সিটির পুলিশ প্রধান প্রত্যাহার চায় বিএনপি

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রচারে বাধা, হয়রানি ও নেতাকর্মীদের পুলিশ গ্রেফতার করছে বলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগ করেছে বিএনপি। ওই নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির স্বার্থে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির ও গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহার করতে ইসিকে অনুরোধ জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বৃহস্পতিবার বিকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করে এ দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিইসি কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহারের বিষয়ে কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করব। তবে বিএনপির প্রচারে বাধা দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।’

এদিকে ইসি থেকে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে প্রার্থীদের অতিরিক্ত ক্যাম্প রোববারের মধ্যে অপসারণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, একটি থানায় একজন মেয়র প্রার্থী একটি ক্যাম্প ও কাউন্সিলর প্রার্থী ৩০ হাজার ভোটারের হারে একের অধিক, তবে সর্বোচ্চ তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন।

বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দল বিকাল সোয়া ৩টায় সিইসির সঙ্গে সাক্ষাত করতে তার কার্যালয়ে যান। প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠকে সিইসি ছাড়াও অন্য তিন কমিশনার ও ইসির অতিরিক্ত সচিব অংশ নেন। বিএনপির প্রতিনিধি দল বেরিয়ে যাওয়ার পর সিইসির সঙ্গে বৈঠক করেন কমিশনাররা। জানা গেছে, বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য-উপাত্তসহ দুটি চিঠি সিইসিকে দেয়া হয়। এতে খুলনায় বুধবার রাত ৮টা থেকে শুরু হওয়া পুলিশের অভিযানে বিএনপির ১৯ জনকে আটক করার অভিযোগ আনা হয়। অপরদিকে গাজীপুরে বিএনপি নেতাদের প্রচারে পুলিশ বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। বৈঠক শেষে ড. মঈন বলেন, খুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার অজুহাতে নির্বাচনী কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। বুধবার রাতে বিভিন্ন স্থানে হানা দিয়ে ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিএনপির দু’জন স্থায়ী কমিটির সদস্য খুলনার যে হোটেলে রাতে অবস্থান করছিলেন সেখানেও তারা হানা দিয়েছিল। হোটেলের বাইরে পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। ভেতরেও পুলিশ অবস্থান নেয়। নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন অজুহাতে বিরোধীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে পুলিশ। নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পুলিশ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে যেন তারা পালাতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, খুলনার যে কোনো পরিস্থিতির জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে দায়দায়িত্ব নিতে হবে। তাকে প্রত্যাহার করে সুষ্ঠু পরিবেশ আনার দাবি জানিয়েছি। গাজীপুর সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির এ নেতা বলেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় শান্তিপূর্ণ প্রচার চলছিল। সেখানে ৫৭টি ওয়ার্ডের কমিটি কাজ করছে। কিন্তু দু’দিন ধরে সেখানে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ প্রচারে বাধা দিচ্ছে। আমাদের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলছে, তাদের নেতাকর্মীদের বহিরাগত আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এ সময় তিনি গাজীপুরের এসপিকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, এর আগে ইউপি নির্বাচনেও তাকে প্রত্যাহার করেছিল ইসি। বিএনপির এ নেতা বলেন, এ নির্বাচনে বাধাগ্রস্ত করলে বিরোধী দল বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও সরকার।

বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে সিইসি সাংবাদিকদের আরও বলেন, বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তাদের ভাষায়, গতকাল খুলনায় পুলিশের অভিযানে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা বলেছেন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও গাজীপুরের এসপি বদলি করলে ভালো হয়। তাদের এ দাবির জবাবে আমি বলেছি, বিষয়টি নিয়ে কমিশনারদের সঙ্গে আলাদাভাবে বসতে হবে, তাদের মতামত নিতে হবে। নির্বাচনের আগে এ অল্প সময়ে বদলি করা সঙ্গত মনে হলে আমরা তা করব। আর যদি কমিশন মনে করে দরকার নেই তাহলে বদলি নাও করতে পারি।

বিএনপি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনারদের সঙ্গে বসেছেন। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে- এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, হ্যাঁ, আমরা বসেছি। পুলিশের দুই কর্মকর্তা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, খোঁজ নিয়ে দেখব তাদের অভিযোগ সত্য কিনা। তাদেরকে আরও অবজারভ (পর্যবেক্ষণ) করব।

বিএনপির নেতাকর্মীকে প্রচারে বাধা দিয়েছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে সিইসি বলেন, এটা সঠিক নয়। তাদের নির্বাচনী কাজে বাধা দিচ্ছে বা দিয়েছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি। তারা কিসের ভিত্তিতে অভিযোগ করেছেন তা আমি কী করে বলব। খুলনায় একটি হোটেলে পুলিশ ঘেরাওয়ের বিষয়ে সিইসি বলেন, ওই হোটেলে বিদেশি কিছু লোকজন ছিলেন। তাদের নিরাপত্তায় পুলিশ সেখানে ছিল, ঘটনাচক্রে বিএনপির নেতারা সেখানে রাতে ছিলেন।

বিএনপির আরেক অভিযোগ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, একজন মেয়র একটি থানায় একটি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারেন। তাদের মতে, কোথাও কোথাও একাধিক ক্যাম্প রয়েছে। সেটা আমরা দেখব বলছি। অতিরিক্ত ক্যাম্প থাকলে তা অপসারণ করতে চিঠি দিয়েছি।

বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে সিইসি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম ও কবিতা খানম, ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখালেসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে বিএনপির পক্ষে ড. আবদুল মঈন খান ছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও বরকতউল্লাহ বুলু, যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন অংশ নেন।

একই দাবি সংবাদ সম্মেলনেও : এর আগে দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। সেখানে দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, অবিলম্বে গাজীপুর ও খুলনার পুলিশ প্রধানকে প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় দুই সিটি কর্পোরেশনেই ভোট হরণের নির্বাচন হবে। দুই সিটিতে ভোটারদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে সেনা মোতায়েনের দাবিও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন, শওকত মাহমুদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন, কেন্দ্রীয় নেতা এবিএম মোশাররফ হোসেন, মুনির হোসেন প্রমুখ।

দুই সিটিতে মন্ত্রী-এমপিরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সভা করছে বলে অভিযোগ করেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় শেখ হেলাল এমপি ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ খুলনায় দু’বার এসে প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী ওই দুই ব্যক্তির নির্দেশনাতেই পুলিশ প্রশাসন নগরজুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দুই সিটিতে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রধারীরা নির্বিঘ্নে অবস্থান নিয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আগামী সংসদ নির্বাচন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে বুধবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের সমালোচনা করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিকারগ্রস্ত মনেরই বহিঃপ্রকাশ। এটা স্বৈরতন্ত্রের কণ্ঠস্বর। কোটা পদ্ধতি ও আন্দোলনকারীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তরুণদের প্রতি ঈর্শার প্রতিফলন ঘটেছে।’

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রিজভী বলেন, ‘আপনি ১৯৮১ সালে দলের সভাপতি কীভাবে এবং কোন দেশে থেকে হয়েছিলেন সেটা কি মনে আছে? তখন আওয়ামী লীগে অনেক বর্ষীয়ান নেতা ছিলেন। তাদের ডিঙিয়ে আপনি কিভাবে দলের সভাপতি হয়েছিলেন? আপনি তো আওয়ামী লীগের সদস্যও ছিলেন না।’

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.