পাহাড়ের উত্তরে সংঘাত দক্ষিণে সম্প্রীতি

রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধিপত্য বিস্তারে ঝরছে রক্ত * বান্দরবানে ১৪টি জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান

  আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে দুটি জেলা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে অশান্ত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ঝরছে রক্ত। তবে এ সময় বান্দরবানে বইছে সম্প্রীতির সুবাতাস। আঞ্চলিক দলগুলোর নেতৃত্বের সংঘাতে দুই জেলায় এ পর্যন্ত জেএসএসের (সন্তু লারমা) ৩৮৩ জন, ইউপিডিএফের ২৪৬ জন ও জেএসএসের (এমএন লারমা) ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু বান্দরবানে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নেই বললেই চলে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এখানে শক্তিশালী। অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর অস্তিত্ব নেই।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে দক্ষিণে বান্দরবান আর উত্তরে খাগড়াছড়ি। মাঝখানে রাঙ্গামাটি জেলার অবস্থান। ভূমি নিয়ে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি-বাঙালি মতবিরোধ রয়েছে। এর ওপর আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মতাদর্শ ও আধিপত্য নিয়ে সংঘাতে একের পর এক জনপ্রতিনিধিসহ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের রক্ত ঝড়ছে। অশান্ত রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে বাঙালিসহ ৯-১০টি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। অথচ বান্দরবানে মারমা, ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা, চাক, খুমী, লুসাই, খেয়াং, পাঙ্খোয়া ও ত্রিপুরাসহ পাহাড়ি-বাঙালি ১৪টি জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করছে। এখানে কোনো উত্তাপ নেই, সংঘাত নেই। এ সহাবস্থানের সম্প্রীতি নজর কেড়েছে পর্যটকসহ বিশ্ববাসীর।

চলমান সংঘাতে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ভীতসন্ত্রস্ত দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। পর্যটন স্পটগুলোয় প্রভাব পড়েছে। কিন্তু বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি ওটুট থাকায় আকর্ষণীয় নীলাচল, স্বপ্নীল নীলগিরি, চিম্বুক ও মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে পর্যটকের আগমন কমেনি। স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পর্যটকরা। বান্দরবানে বেড়াতে আসা পর্যটক মিটু মোস্তাফিজ ও সাদিয়া আফরিন বলেন, বেড়াতে আসার সব প্রস্তুতি নিয়েছি অনেক আগে। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির সংঘাতের পরিস্থিতির খবর শুনে ভয় পেয়েছিলাম। ট্যুর প্রোগ্রাম বাতিল করার চিন্তুাও করেছিলাম। শান্ত পরিবেশের খবর পেয়ে বান্দরবানে বেড়াতে এসেছি। শান্ত পরিস্থিতি দেখে ভালো লাগছে।

পার্বত্য দুটি জেলায় মূলত রাজনৈতিক আদর্শগত ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধ থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে আসছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের বিভক্তির কারণে সংঘাত থামছে না। ওই সংগঠনটি ভেঙে বর্তমানে চারটি সংগঠন হয়েছে। ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর সন্দেহ-অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টে (ইউপিডিএফ) বিভক্তির সৃষ্টি হয়। জ্যোতিরেন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও আদর্শচ্যুতির অভিযোগ ওঠে। এরপর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ভেঙে ২০০৮ সালে জেএসএস-এমএন লারমা নামে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। নতুন সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন সন্তু লারমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও সাবেক গেরিলা নেতা সুধাসিন্ধু খীসা। এর আগে শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালে জেএসএস থেকে বের হয়ে প্রসীত বিকাশ খীসা ও সঞ্চয় চাকমা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন করেন। ১৯ বছর পর ইউপিডিএফ ভেঙে যায়। ইউপিডিএফের সাবেক সামরিক শাখার প্রধান তপন জ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পর রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় একাধিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা নিহত হন। এ দুই জেলায় এ পর্যন্ত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে তিনটি সংগঠনের ছয় শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

আঞ্চলিক চারটি সংগঠনের মধ্যে বান্দরবানে শুধু সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস শক্তিশালী। ইউপিডিএফের সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও আধিপত্য নেই। আর এখানে জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) অস্তিত্ব নেই। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্ক সহনশীল হওয়ায় এখানে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সম্প্রীতির শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, পাশের জেলায় সংঘাতের কারণে বান্দরবানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে এখানে কোনো ধরনের উত্তাপ নেই। সম্প্রীতির জেলা বান্দরবানের শান্তি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের’ বান্দরবানের সদস্য সচিব অংচ মং মারমা বলেন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত কখনও শান্তির পথ নয়। বরং প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার স্পৃহা বাড়বে এবং লাশের মিছিল দীর্ঘ হবে। তিনি বলেন, সংলাপ হল- শান্তির মূলমন্ত্র। পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে সংঘাত ছেড়ে সবার আলোচনার টেবিলে বসা দরকার।

রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো বান্দরবানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত না থাকলেও জাতীয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির কিছুটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর আগে এ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। ২০১৬ সালের ১৩ জুন জামছড়িপাড়া থেকে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মং পু মারমাকে অপহরণের পর গুম করা হয়। এ ঘটনায় অপহৃতের মেয়ের জামাই হ্লামংচিং বাদী হয়ে জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতাসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতাদের আরও কয়েকটি মামলায় জড়ানো হয়। বছরখানেক আত্মগোপনে ছিলেন জেএসএসের শীর্ষ নেতারা। কারাগারেও ছিলেন অনেকে। এর জের ধরে আওয়ামী লীগ এবং জনসংহতি সমিতির মধ্যে এখনও বিরোধ রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×