বাণিজ্যিক আইন সম্মেলনে বক্তারা

সহজে ব্যবসা করতে আইনের সংস্কার জরুরি

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের সম্ভাবনায় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু বাণিজ্যিক আইনকানুনে দুর্বলতার জন্য এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে পদে পদে বাধা। চুক্তি আইনের দুর্বলতা, কর আইনে জটিলতা, নিবন্ধন পেতে বিলম্ব এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের হয়রানিতে পড়তে হয়। অন্যদিকে ঘুষ, দুর্নীতি, বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের নিয়মিত সমস্যা। এ কারণে সহজে ব্যবসা করার দিক থেকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। আর এ অবস্থার উত্তরণে দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও কর্পোরেট আইনে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। শনিবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক আইন সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। থিংক লিগ্যাল বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা সৈয়দ নাসিম মনজুর, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আর্বিটেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী এবং বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও আইন বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠানে বক্তারা যেসব আইনের সংস্কার নিয়ে কথা বলেন সেগুলো হল- অর্থঋণ আদালত আইন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ আইন, জ্বালানি আইন ও নীতিমালা, কর ও ভ্যাট আইন এবং টর্ট আইন। বক্তাদের মতে, সুশাসনই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম সমস্যা দুর্নীতি।

আইনজীবীদের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি মো. ইমান আলী বলেন, আইনজীবীদের কি সেই পেশাদারিত্ব আছে যে তার মক্কেলকে বলবে এ ক্ষেত্রে আইনজীবী নিয়োগ করা ঠিক হবে না? এটা সম্ভব নয়। আইনে এটা অনুমোদন করে না? এ ধরনের সঠিক উপদেশ একমাত্র ভালো আইনজীবীর কাছ থেকেই আসে। একটি মামলার দীর্ঘায়িত করার ইতিহাস তুলে ধরে বিচারপতি ইমান আলী বলেন, একজন আইনজীবী কৌশলে মামলা পরিচালনা দীর্ঘায়িত করায় বিরোধীপক্ষসহ পুরো বিচার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেজন্য আমি আইনজীবীদের সৎ হতে বলব। কারণ আইনজীবীরা আদালতেরই কর্মকর্তা। আইনজীবী ও বিচারক উভয়েরই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায় রয়েছে। নীতির মধ্যে থেকে পেশা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান এই জ্যেষ্ঠ বিচারপতি।

মারিকো বাংলাদেশের হেড অব লিগ্যাল ক্রিস্টাবেল র‌্যানলফ বলেন, বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস রিপোর্টে (সহজে ব্যবসা করার সূচক) ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭। অর্থাৎ বাংলাদেশে সহজে ব্যবসা করা যায় না। তার মতে, এখানে বড় কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানির নিবন্ধন নিতে দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নীতিমালা অত্যন্ত জটিল। বিদেশিরা বিনিয়োগ করলে তাদের শেয়ার হস্তান্তর এবং লভ্যাংশ বিদেশে নিতে অনেক সময় লাগে। অন্যদিকে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের (বাংলাদেশ স্ট্যাডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট) সার্টিফিকেট আন্তর্জাতিক মানের নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নীতিমালায় স্ববিরোধিতা রয়েছে। মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) জটিলতা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলছি। এতে ভ্যাট করের নীতি সবার জন্য সমান হতে হবে। তার মতে, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে দেশে ই-কমার্সের গুরুত্ব বেড়েছে। বর্তমানে মোট রাজস্বের ৬ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। কিন্তু এ খাতের নীতিমালা এখনও উন্নয়ন হয়নি। তার মতে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুর্নীতি রয়েছে। আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডেক্স অফিসাররা নানা ধরনের হয়রানি করছেন। এ ছাড়া আইনি কাঠামো দুর্বল। মামলা নিষ্পত্তিতে অনেক সময় লাগে। ফলে অর্থঋণ আদালতে হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে।

এ (রুমী) আলী বলেন, বাংলাদেশ সম্পদে গরিব দেশ নয়। সুশাসনে গরিব। তিনি বলেন, সব ধরনের ব্যবসাই চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে চুক্তির ব্যর্থতায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বাংলাদেশে চুক্তি আইনে দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসার উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে খরচ কমাতে ব্যবসা করার পদ্ধতি সহজ করতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যর্থতা বিনিয়োগকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ক্ষেত্রে আদালতে প্রতিকার পেতে সময় লাগে। কারণ হাজার হাজার মামলা ঝুলে আছে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। তার মতে, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার না হলে ব্যবসা সহজ করা যাবে না। নাসিম মনজুর বলেন, বিনিয়োগের মূল শর্ত হল সহজ ব্যবসা করার সুযোগ দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশে সহজে ব্যবসা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনকানুনে পরিবর্তন আনতে হবে। লিগ্যাল সার্কেলের কাউন্সিল কারিশমা জাহান বলেন, বিনিয়োগের অন্যতম শর্ত হল জ্বালানি। ২০২১ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এ ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন ছাড়া টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা যাবে না।

ড. কামাল হোসেন বলেন, জ্বালানির ক্ষেত্রে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এলএনজি বিকল্প ব্যবস্থা নয়। কারণ এর ব্যয় অত্যন্ত বেশি। ফলে সারা দেশে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ভুটানে হাইড্রো ইলেকট্রিকের বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা যায়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, এলএনজির জন্য ইতিমধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে এলএনজি আমদানির আগে আরও বিকল্প অপশন ছিল কিনা তা নিয়ে ভাবা উচিত ছিল। আইনজীবী সাকিব মাহবুব বলেন, বিনিয়োগের পুঁজির জন্য অন্যতম উৎস হল ব্যাংকিং খাত। বর্তমানে এ খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ খাতে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। এই খেলাপির কারণেই সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি। ফলে গত ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত জনগণের করের টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মূলধনের জোগান দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি, দূষিত ব্যবসা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারির কারণে খেলাপি বাড়ছে। বর্তমানে মোট ঋণের ১০ শতাংশ খেলাপি। আর অবলোপন এবং বিভিন্ন সিস্টেমে আটকে থাকা ঋণ যোগ করলে এই ঋণ আরও বাড়বে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং অর্থ আদালতকে আরও কার্যকর করতে হবে।

বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী বলেন, যে কারণে অর্থঋণ আদালত আইন তৈরি করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি। খেলাপিদের যোগসাজশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১২ সালে একটি ঋণ বিপরীতে বন্ধক রাখা জমি নিলাম ডাকা হল। এ ক্ষেত্রে মহাখালীতে ১০ কাঠা এবং উত্তরায় ৭ কাঠার জমির নিলামে দাম এলো মাত্র ৫০ লাখ টাকা। বিষয়টি অবাক করার মতো। তিনি আরও বলেন, অর্থঋণ আইন ঋণগ্রহীতা-বান্ধব হওয়া উচিত, ঋণখেলাপি-বান্ধব নয়। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে কোম্পানির পর্ষদে পরিবারতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে। একই পরিবার থেকে পরিচালক সংখ্যা বাড়িয়ে দু’জন থেকে চারজন করা হয়েছে। এ ছাড়াও পরিচালক টানা ৬ বছর থেকে বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিরোধী সত্ত্বেও এই সংশোধন করেছে সরকার। যা এ খাতে সুশাসন ব্যাহত করেছে। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ, বিচারপতি কাশেফা হুসাইন, বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান, বিচারপতি মির্জা হুসাইন হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ এবং সিনিয়র আইনজীবী ফিদা এম কামাল।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter