মহাসড়কের চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় গাজীপুরে
jugantor
মহাসড়কের চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় গাজীপুরে

  শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চোর সিন্ডিকেট গাজীপুরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গাড়ির তেল, নানা ধরনের পণ্য, যন্ত্রাংশ, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক পর্যন্ত চুরি করছে চক্রের সদস্যরা। দু-একটি ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান উদ্ধার হলেও অন্যগুলোর সন্ধান মেলে না। চক্রটি দিনে প্রায় একশ ড্রাম তেল চুরি করে বিক্রি করছে বিভিন্ন স্থানে।

গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৫০টির মতো আস্তানা আছে। এগুলোতে ভুট্টা, ফিডমিল, কারখানার কাপড়, স্পিনিং মিলের সুতা, সয়াবিন তেলসহ নানান চোরাই পণ্য কেনাবেচা হয়। চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান মালামালসহ কেনাবেচা চলে এগুলোতে।

এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ম্যানেজ করে চলে বরিশাইল্যা জামান, আয়নাল এবং হোতাপাড়ায় মাসুদসহ সিন্ডিকেটের প্রধানরা। এদের প্রত্যেকের আলাদা দল আছে।

চোরাই তেল কেনাবেচাই দিয়ে চক্রের যাত্রা শুরু। এরপর ধাপে ধাপে যোগ হয়েছে অন্য সব। গাজীপুরে দশ বাইআট ফুটের খুপরি ঘর। সামনে রাখা দুটি তেলের ড্রাম। একটু সামনেই তেল, মবিলের ডিব্বা বা গ্যালনের মালা গেঁথে একটি বাঁশের খুঁটিতে ঝুলানো। খুপরির ভেতর একটি টেবিলে টালি খাতা নিয়ে বসেন একজন পুরুষ। রাত যাপনের জন্য এ খুপরিতেই আছে একটি সিঙ্গেল খাট, বালিশ, তোশক ও মশারি। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুখে গাজীপুরে এই ছোট্ট ঘর কেন্দ্র করেই চলে লাখ লাখ টাকার চোরাই তেল বাণিজ্য।

গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা থেকে হোতাপাড়া পর্যন্ত দুপাশে এ ধরনের প্রায় ২৫টি আখড়া আছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোর, কড্ডা, কোনাবাড়ী, ঢাকা বাইপাসের মীরেরবাজার পর্যন্ত ও টঙ্গী চেরাগ আলীসহ আছে আর ২৫ আস্তানা। এগুলোতে অবাধে চলছে কেনাবেচা।

এদের সম্পর্কে গাজীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, চোরাই দোকান চলার কথা তিনিও শুনেছেন। শিগগিরই সেখানে অভিযান চালানো হবে।

গাজীপুর জেলা ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং শিলা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক দ্বীন মোহাম্মদ নীল মিয়া জানান, চোরাই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম‌্যযে অনেক ব্যবসায়ী পথের ফকির হয়েছে। কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও গাড়ির মালিক লাভের মুখ দেখে না। অথচ সামান্য লাভের আশায় গাড়ির চালকরা চুরি করে তেল বিক্রি করে। ওই তেল কেনাবেচা করে চোরাকারবারিরা বছর না ঘুরতেই কোটিপতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি লিভার ব্রাদার্সের ২০ টন হুইল পাউডারসহ তার একটি ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলমডাঙ্গা থেকে হুইল পাউডার উদ্ধার হয়। তবে প্রায় ২০ লাখ টাকার ট্রাকটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই চোরাই সিন্ডিকেট দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক এবং সারা দেশে জাল বিস্তার করেছে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমানত শাহ গ্র“পের শাড়ি ও লুঙ্গি বোঝাই একটি কাভার্ডভ্যান টঙ্গী থেকে ছিনতাই হয়। পরে মালামালসহ খিলগাঁও থেকে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। তবে ছিনতাই চক্রের সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

চোরাকারবারি সোহেল নিজে ওই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি যুগান্তরকে জানান, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই এসব চোরাই তেল বিক্রির খুপরি ঘরগুলো খোলা থাকে। দিন-রাত গাড়ির চালকরা পিকআপভ্যান, বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান থামিয়ে তেল বিক্রি করে। ফিড কোম্পানির ভুট্টা এবং ফিডমিলও নিয়মিত বেচাকেনা হয়। তবে তার চেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে সারা দেশ থেকে চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক কাভার্ড ভ্যানের মালামাল জামান-মাসুদ-আয়নাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেচাকেনা হয় বলে দাবি করে সোহেল।

সোহেলসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালকের কাছ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল কেনা হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। আর বিক্রি করেন ৬৩ টাকায়। লিটারে মাত্র ৩-১৩ টাকা লাভের জন্য এত বড় ঝুঁকি কেন? সোহেলের ভাষায় গাড়ির চালক তেল বিক্রি করতে আসলে চোরাই সিন্ডিকেট তাদের ওপর বাটপারি করে। ট্যাংকি থেকে তেল নামানোর সময় ২ থেকে ৩ লিটার বেশি নিয়ে নেয়। অর্থাৎ ১০ লিটারের জায়গায় ১৩ লিটার। এতে লাভ প্রায় দ্বিগুণ হয়।

কারা আছে চোরাই সিন্ডিকেটে : মহাসড়কের এই ভয়ংকর চোরাই সিন্ডিকেটের মালামাল ৪টি হাতবদল হয়। প্রথম হাত হলো গাড়ির চালক। বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান মালিকের অগোচরে চালক নিয়মিত তেল বিক্রি করে। চালকদের যোগসাজশে মালামালসহ গাড়ি ছিনতাইকারী অপর একটি চক্র। এরা সারা দেশ থেকে আসে। দ্বিতীয় হাত হিসাবে মহাসড়কের পাশে চোরাই সিন্ডিকেটের আখড়া মালিকরা ২৪ ঘণ্টা দোকান খোলা রাখে। তারা অর্ধেক কখনো কখনো আরও কম দামে কিনে নেয় চোরাই পণ্য।

তৃতীয় ধাপে পাইকার। আখড়া থেকে ৮-১০ জন পাইকার তেল বা অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে। চতুর্থ ও শেষ ধাপের সদস্য হলো সারা দেশে চোরাই পণ্য বিক্রির খুচরা দোকানদার। পাইকারের মাধ্যমে এ ধরনের তেল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চোরাই পণ্য বা তেলের নির্দিষ্ট দোকানে সরবরাহ করা হয়।

শিল্প-কারখানায় জেনারেটর বা বয়লার চালানোর তেল হিসাবেও এগুলো সাপ্লাই দেওয়া হয়। অপরদিকে কারখানার কাপড়, পোশাক বা সুতা জাতীয় চোরাই পণ্য কেনাবেচার চক্রও রয়েছে আলাদা।

মহাসড়কে চোরাই সিন্ডিকেট সদস্যরা : পোড়াবাড়ী এলাকায় বরিশাইল্যা জামান, আয়নাল এবং হোতাপাড়ায় মাসুদ হচ্ছে সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এদের সহযোগী হিসাবে কাজ করে সিন্ডিকেটের সদস্য চালক, পাইকার। তাছাড়া সেলিম, রাজ্জাক, বাদশা, আবুল কাশেম, ফিরোজসহ প্রায় ৩৫ জনের একটি চক্র সক্রিয়।

টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় রুবেল তেল চোরাকারবারি। আর প্রতিটি আখড়ায় সহযোগী হিসাবে ৫০০ টাকা রোজে খাটে আরও কয়েকজন যুবক। এরা গাড়ি থামানো, পাহারা দেওয়ার কাজ করে।

সরেজমিন একদিন : বিভিন্ন সূত্রে চোরাই সিন্ডিকেটের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে যুগান্তরের প্রতিনিধি ১৪ সেপ্টেম্বর সারা দিন সালনা থেকে হোতাপাড়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে। দুপুর ১২টার দিকে পোড়াবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের পূর্বপাশে রাজ্জাকের আখড়া থেকে একটি পিকআপ ভ্যানে ৫টি তেলের ড্রাম উঠাতে দেখা যায়। ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে আখড়ার কর্মচারী বাধা দেয়। এ সময় তাদের সঙ্গে পাহারাদার আরও ৪-৫ জন যুবককে দেখা গেছে।

দুপুর ১টার দিকে পোড়াবাড়ী এলাকায় আবুল কাশেমের আখড়ায় একজন যুবককে একটি তেলভরা ড্রাম লুকাতে দেখা গেছে। দুপুর ২টায় ফের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা। সেখানে কথা হয় চোরাকারবারি মো. সোহেলের সঙ্গে। নিজেকে সাধু সাজাতে সব কথা বলতে রাজি হয়। তার কাছ থেকে আদ্যোপান্ত অনেক কিছু নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বেসরকারি একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কাভার্ডভ্যানের চালক আনিছ (ছদ্মনাম) ১০ লিটার ডিজেল ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এ সময় যুগান্তর প্রতিনিধি ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। চোরাকারবারি জামানের কর্মচারী ভিডিও ধারণে বাধা দিতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ততক্ষণে সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য সেখানে হাজির হয়। জামানের আখড়ার ভেতরে রাখা একটি মোটরবাইকের পেছনে চ্যানেল-৬ নামের একটি স্টিকারও লাগানো দেখা গেছে।

সেখান থেকে পোড়াবাড়ী এলাকায় তালুকদার সিএনজির পাশে আয়নালের আখড়ায় একটি কাভার্ডভ্যান বের হতে দেখা যায়। কাভার্ডভ্যান থামিয়ে চালকের কাছ থেকে জানা যায়, অভিযান চলছে তাই আজ তেল কিনবে না। আখড়ার ভেতরে আরও একটি কাভার্ডভ্যান দেখা যায়। সেটি থেকে ভুট্টা নামানো হয়েছে। আয়নালের কাছে চোরাকারবারের কথা জানতে চাইলে তার ভাষ্য হলো, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সে ব্যবসা করে।

মহাসড়কের চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় গাজীপুরে

 শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চোর সিন্ডিকেট গাজীপুরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গাড়ির তেল, নানা ধরনের পণ্য, যন্ত্রাংশ, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক পর্যন্ত চুরি করছে চক্রের সদস্যরা। দু-একটি ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান উদ্ধার হলেও অন্যগুলোর সন্ধান মেলে না। চক্রটি দিনে প্রায় একশ ড্রাম তেল চুরি করে বিক্রি করছে বিভিন্ন স্থানে।

গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৫০টির মতো আস্তানা আছে। এগুলোতে ভুট্টা, ফিডমিল, কারখানার কাপড়, স্পিনিং মিলের সুতা, সয়াবিন তেলসহ নানান চোরাই পণ্য কেনাবেচা হয়। চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান মালামালসহ কেনাবেচা চলে এগুলোতে।

এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ম্যানেজ করে চলে বরিশাইল্যা জামান, আয়নাল এবং হোতাপাড়ায় মাসুদসহ সিন্ডিকেটের প্রধানরা। এদের প্রত্যেকের আলাদা দল আছে।

চোরাই তেল কেনাবেচাই দিয়ে চক্রের যাত্রা শুরু। এরপর ধাপে ধাপে যোগ হয়েছে অন্য সব। গাজীপুরে দশ বাই আট ফুটের খুপরি ঘর। সামনে রাখা দুটি তেলের ড্রাম। একটু সামনেই তেল, মবিলের ডিব্বা বা গ্যালনের মালা গেঁথে একটি বাঁশের খুঁটিতে ঝুলানো। খুপরির ভেতর একটি টেবিলে টালি খাতা নিয়ে বসেন একজন পুরুষ। রাত যাপনের জন্য এ খুপরিতেই আছে একটি সিঙ্গেল খাট, বালিশ, তোশক ও মশারি। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুখে গাজীপুরে এই ছোট্ট ঘর কেন্দ্র করেই চলে লাখ লাখ টাকার চোরাই তেল বাণিজ্য।

গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা থেকে হোতাপাড়া পর্যন্ত দুপাশে এ ধরনের প্রায় ২৫টি আখড়া আছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোর, কড্ডা, কোনাবাড়ী, ঢাকা বাইপাসের মীরেরবাজার পর্যন্ত ও টঙ্গী চেরাগ আলীসহ আছে আর ২৫ আস্তানা। এগুলোতে অবাধে চলছে কেনাবেচা।

এদের সম্পর্কে গাজীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, চোরাই দোকান চলার কথা তিনিও শুনেছেন। শিগগিরই সেখানে অভিযান চালানো হবে।

গাজীপুর জেলা ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং শিলা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক দ্বীন মোহাম্মদ নীল মিয়া জানান, চোরাই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম‌্যযে অনেক ব্যবসায়ী পথের ফকির হয়েছে। কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও গাড়ির মালিক লাভের মুখ দেখে না। অথচ সামান্য লাভের আশায় গাড়ির চালকরা চুরি করে তেল বিক্রি করে। ওই তেল কেনাবেচা করে চোরাকারবারিরা বছর না ঘুরতেই কোটিপতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি লিভার ব্রাদার্সের ২০ টন হুইল পাউডারসহ তার একটি ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলমডাঙ্গা থেকে হুইল পাউডার উদ্ধার হয়। তবে প্রায় ২০ লাখ টাকার ট্রাকটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই চোরাই সিন্ডিকেট দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক এবং সারা দেশে জাল বিস্তার করেছে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমানত শাহ গ্র“পের শাড়ি ও লুঙ্গি বোঝাই একটি কাভার্ডভ্যান টঙ্গী থেকে ছিনতাই হয়। পরে মালামালসহ খিলগাঁও থেকে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। তবে ছিনতাই চক্রের সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

চোরাকারবারি সোহেল নিজে ওই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি যুগান্তরকে জানান, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই এসব চোরাই তেল বিক্রির খুপরি ঘরগুলো খোলা থাকে। দিন-রাত গাড়ির চালকরা পিকআপভ্যান, বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান থামিয়ে তেল বিক্রি করে। ফিড কোম্পানির ভুট্টা এবং ফিডমিলও নিয়মিত বেচাকেনা হয়। তবে তার চেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে সারা দেশ থেকে চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক কাভার্ড ভ্যানের মালামাল জামান-মাসুদ-আয়নাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেচাকেনা হয় বলে দাবি করে সোহেল।

সোহেলসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালকের কাছ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল কেনা হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। আর বিক্রি করেন ৬৩ টাকায়। লিটারে মাত্র ৩-১৩ টাকা লাভের জন্য এত বড় ঝুঁকি কেন? সোহেলের ভাষায় গাড়ির চালক তেল বিক্রি করতে আসলে চোরাই সিন্ডিকেট তাদের ওপর বাটপারি করে। ট্যাংকি থেকে তেল নামানোর সময় ২ থেকে ৩ লিটার বেশি নিয়ে নেয়। অর্থাৎ ১০ লিটারের জায়গায় ১৩ লিটার। এতে লাভ প্রায় দ্বিগুণ হয়।

কারা আছে চোরাই সিন্ডিকেটে : মহাসড়কের এই ভয়ংকর চোরাই সিন্ডিকেটের মালামাল ৪টি হাতবদল হয়। প্রথম হাত হলো গাড়ির চালক। বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান মালিকের অগোচরে চালক নিয়মিত তেল বিক্রি করে। চালকদের যোগসাজশে মালামালসহ গাড়ি ছিনতাইকারী অপর একটি চক্র। এরা সারা দেশ থেকে আসে। দ্বিতীয় হাত হিসাবে মহাসড়কের পাশে চোরাই সিন্ডিকেটের আখড়া মালিকরা ২৪ ঘণ্টা দোকান খোলা রাখে। তারা অর্ধেক কখনো কখনো আরও কম দামে কিনে নেয় চোরাই পণ্য।

তৃতীয় ধাপে পাইকার। আখড়া থেকে ৮-১০ জন পাইকার তেল বা অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে। চতুর্থ ও শেষ ধাপের সদস্য হলো সারা দেশে চোরাই পণ্য বিক্রির খুচরা দোকানদার। পাইকারের মাধ্যমে এ ধরনের তেল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চোরাই পণ্য বা তেলের নির্দিষ্ট দোকানে সরবরাহ করা হয়।

শিল্প-কারখানায় জেনারেটর বা বয়লার চালানোর তেল হিসাবেও এগুলো সাপ্লাই দেওয়া হয়। অপরদিকে কারখানার কাপড়, পোশাক বা সুতা জাতীয় চোরাই পণ্য কেনাবেচার চক্রও রয়েছে আলাদা।

মহাসড়কে চোরাই সিন্ডিকেট সদস্যরা : পোড়াবাড়ী এলাকায় বরিশাইল্যা জামান, আয়নাল এবং হোতাপাড়ায় মাসুদ হচ্ছে সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এদের সহযোগী হিসাবে কাজ করে সিন্ডিকেটের সদস্য চালক, পাইকার। তাছাড়া সেলিম, রাজ্জাক, বাদশা, আবুল কাশেম, ফিরোজসহ প্রায় ৩৫ জনের একটি চক্র সক্রিয়।

টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় রুবেল তেল চোরাকারবারি। আর প্রতিটি আখড়ায় সহযোগী হিসাবে ৫০০ টাকা রোজে খাটে আরও কয়েকজন যুবক। এরা গাড়ি থামানো, পাহারা দেওয়ার কাজ করে।

সরেজমিন একদিন : বিভিন্ন সূত্রে চোরাই সিন্ডিকেটের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে যুগান্তরের প্রতিনিধি ১৪ সেপ্টেম্বর সারা দিন সালনা থেকে হোতাপাড়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে। দুপুর ১২টার দিকে পোড়াবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের পূর্বপাশে রাজ্জাকের আখড়া থেকে একটি পিকআপ ভ্যানে ৫টি তেলের ড্রাম উঠাতে দেখা যায়। ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে আখড়ার কর্মচারী বাধা দেয়। এ সময় তাদের সঙ্গে পাহারাদার আরও ৪-৫ জন যুবককে দেখা গেছে।

দুপুর ১টার দিকে পোড়াবাড়ী এলাকায় আবুল কাশেমের আখড়ায় একজন যুবককে একটি তেলভরা ড্রাম লুকাতে দেখা গেছে। দুপুর ২টায় ফের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা। সেখানে কথা হয় চোরাকারবারি মো. সোহেলের সঙ্গে। নিজেকে সাধু সাজাতে সব কথা বলতে রাজি হয়। তার কাছ থেকে আদ্যোপান্ত অনেক কিছু নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বেসরকারি একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কাভার্ডভ্যানের চালক আনিছ (ছদ্মনাম) ১০ লিটার ডিজেল ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এ সময় যুগান্তর প্রতিনিধি ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। চোরাকারবারি জামানের কর্মচারী ভিডিও ধারণে বাধা দিতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ততক্ষণে সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য সেখানে হাজির হয়। জামানের আখড়ার ভেতরে রাখা একটি মোটরবাইকের পেছনে চ্যানেল-৬ নামের একটি স্টিকারও লাগানো দেখা গেছে।

সেখান থেকে পোড়াবাড়ী এলাকায় তালুকদার সিএনজির পাশে আয়নালের আখড়ায় একটি কাভার্ডভ্যান বের হতে দেখা যায়। কাভার্ডভ্যান থামিয়ে চালকের কাছ থেকে জানা যায়, অভিযান চলছে তাই আজ তেল কিনবে না। আখড়ার ভেতরে আরও একটি কাভার্ডভ্যান দেখা যায়। সেটি থেকে ভুট্টা নামানো হয়েছে। আয়নালের কাছে চোরাকারবারের কথা জানতে চাইলে তার ভাষ্য হলো, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সে ব্যবসা করে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন