কোটা সংস্কার

১০ বছর ফাইলবন্দি পিএসসির সুপারিশ

আগামী সপ্তাহে নতুন কমিটি

  উবায়দুল্লাহ বাদল ১২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১০ বছর ফাইলবন্দি পিএসসির সুপারিশ

সরকারি চাকরিতে মেধা কোটা ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ২০০৮ সালের ২০ জুলাই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমাও দেয়া হয়। ১০ বছর ধরে তা ফাইলবন্দি হয়ে আছে ওই মন্ত্রণালয়ে। অবশেষে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটা বাতিলের ঘোষণার এক মাস পর এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কমিটি হতে যাচ্ছে।

আগামী সপ্তাহে কমিটি গঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে এবং ওই কমিটি পিএসসির কোটাসংক্রান্ত সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পিএসসির ফাইলবন্দি সুপারিশ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান যুগান্তরকে বলেন, ‘কোটা পদ্ধতি সংস্কার নিয়ে পিএসসির সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো নির্দেশনা নেই।

দু’এক দিনের মধ্যেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এ সংক্রান্ত কমিটি হবে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।’ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, প্রস্তাবিত কমিটি কোটাসংক্রান্ত সরকারি সব প্রতিবেদন, বিধি, নির্বাহী আদেশ, পরিপত্র পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে পিএসসির ও শামসুল হক কমিশনের সুপারিশগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি, নারী, জেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি), প্রতিবন্ধী, আনসার ও ভিডিপি, পোষ্য এবং খেলোয়াড়সহ ২৫৭ ধরনের কোটা বিদ্যমান।

এসব কোটা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসসহ (বিসিএস) সরকারি চাকরি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতেও প্রয়োগ করা হয়। বিসিএসে মেধাতালিকা থেকে ৪৪ শতাংশ নিয়োগ হয়। বাকি ৫৬ শতাংশ আসে কোটা থেকে।

এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্য (ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি) ৩০, মহিলা ১০, জেলা ১০ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি) ৫। এসব কোটা পূরণ না হলে সেখানে ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রতিবন্ধীর জন্য।

আর যদি সংশ্লিষ্ট চাকরির ক্ষেত্রে এসব প্রাধিকার কোটা পূরণ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে মেধাতালিকা থেকে প্রতিবন্ধীর কোটা পূরণ করা হয়। এছাড়া নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শতভাগ কোটায় নিয়োগ হচ্ছে। অনাথ ও প্রতিবন্ধী ১০ শতাংশ কোটা ছাড়া বাকি ৯০ শতাংশই জেলা কোটা। এ ৯০ শতাংশের মধ্যে আবার মুক্তিযোদ্ধা ৩০, মহিলা ১৫, আনসার ও ভিডিপি ১০ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫। সাধারণ প্রার্থীর জন্য মাত্র ৩০ শতাংশ।

এসব অসঙ্গতি দূর করতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ‘কোটা সিস্টেম ফর সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সমীক্ষা চালায় পিএসসি। তা পরিচালনা করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ।

২০০৮ সালের ৬ মার্চ সমীক্ষা প্রতিবেদনটি তৎকালীন পিএসসির চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইনের কাছে জমা দেয়া হয়। এর ওপর জনমত নিতে ওই বছরের ২৯ মার্চ ঢাকা বিভাগ, ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগ, ২১ মে খুলনা বিভাগ এবং ৪ জুন রাজশাহী বিভাগে সেমিনার করে পিএসসি।

২০০৮ সালের ৩০ জুন রাজধানীর স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে ‘সরকারি চাকরিতে কোটা’ শীর্ষক সমাপনী সেমিনার হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, বিসিএসসহ সর্বোচ্চ চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা এক সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। কোটার মাধ্যমে বৈষম্য তৈরির কোনো সুযোগ নেই- হলে রাষ্ট্রযন্ত্র মেধাহীন হয়ে পড়বে। তাই কোটা পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন।

সংবিধানও কোটা পদ্ধতি সমর্থন করে না। তা সত্ত্বেও বক্তারা কোটা তুলে না দিয়ে মেধা কোটা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। শেষ পর্যন্ত মেধা কোটা পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং জেলা কোটার পরিবর্তে বিভাগীয় কোটা প্রবর্তনের সুপারিশ করে পিএসসি।

ওই সুপারিশে বাকি ৫০ শতাংশ প্রাধিকার কোটার জন্য সংরক্ষিত রাখতে বলা হয়। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা, নারী, বিভাগীয় বা আঞ্চলিক ও উপজাতীয় প্রার্থীরা মেধার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ পদে নিয়োগ পাবেন।

এ হিসাবে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত কোটা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ, বিভাগীয় কোটা পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং নারী ও উপজাতি কোটা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়।

কোটাবিরোধী আন্দোলন এর আগেও হয়েছে। তবে ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে কোটা সংস্কারে আন্দোলনে নামে। ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেন তারা। আন্দোলন ধীরে ধীরে গতি লাভ করতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি ওই দিন সারা দেশে কর্মসূচি দেয়া হয়। কিন্তু ঢাকায় শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে ১৬ জন আহত হয় এবং ৬৩ জনকে আটক করা হয়।

পরে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভের মুখে রাত ৯টার দিকে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ১৮ মার্চ কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।

সারা দেশে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১ থেকে ৭ এপ্রিল পালিত হয় ‘কোটা সংস্কার সচেতনতা সপ্তাহ।’ ৮ এপ্রিল রাতে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিলে ছাত্র-পুলিশের মধ্যে রাতব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলন চলে পরবর্তী কয়েক দিন। এ অবস্থায় ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের আশ্বাস দিলে বাড়ি ফেরেন আন্দোলনকারীরা।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার এক মাস পার হলেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১০ মে’র মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির আলটিমেটাম দেয়া হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter