দোষারোপের রাজনীতি আ.লীগ-বিএনপিতে
jugantor
সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ নানা ইস্যু
দোষারোপের রাজনীতি আ.লীগ-বিএনপিতে
প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে-শঙ্কা রাজনীতিবিদদের * দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

  হাবিবুর রহমান খান  

২০ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দোষারোপের রাজনীতি করা যেন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কোনো একটি ঘটনার পরপরই একে অপরকে ঘায়েলের প্রতিযোগিতায় নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সর্বশেষ কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করে প্রতিদিনই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন দল দুটির নেতারা। ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজছেন তারা। এর আগে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরও একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের অনেকেই পার পেয়ে গেছে। এবারও এমন আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।

তারা আরও মনে করেন, তদন্তের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই স্পর্শকাতর এ ইস্যুতে একে অপরকে দোষারোপ না করে এসব দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে তাদের।

সম্প্রতি কুমিল্লার ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েক জেলায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়। এতে ঘটে প্রাণহানিও। সবশেষ রংপুরের পীরগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো উত্তপ্ত নোয়াখালীর চৌমুহনী, ফেনী, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলা।

সাম্প্রদায়িক এ সহিংসতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বেশ উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে বিষোদ্গারে ব্যস্ত। ঘটনার পর এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দল দুটি পরস্পরকে দায়ী করেছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘটনার পর থেকে প্রতিটি অনুষ্ঠানে বলে আসছেন, বিএনপি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির পৃষ্ঠপোষক। দেশের সব অপকর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার জনক হচ্ছে এই দল। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ‘সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রায়’ অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর-এগুলো ২০০১ সালে বিএনপি সরকার যে নির্যাতন চালিয়েছিল, এর পুনরাবৃত্তি। আন্দোলনে ব্যর্থ, নির্বাচনে ব্যর্থ বিএনপি আজ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।’ অপরদিকে এ ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীনদের দায়ী করা হচ্ছে। সোমবার রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা বারবার বলছি-দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা ক্ষমতাসীনদের মদদ ছাড়া সম্ভব নয়। নিঃসন্দেহে যারা আক্রমণ চালিয়েছে, তারা কোনো বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী নয়।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে এসব অপকর্ম করছে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে যাতে তারা পার পেয়ে যেতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন রকমের অপকৌশল গ্রহণ করতে শুরু করেছে-এটা তারই একটা প্রমাণ।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দলগুলোর মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে জনগণের স্বার্থে। কিন্তু আমরা বারবার দেখছি দেশের প্রধান দুটি দল সব সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের মাধ্যমে নিজেদের দায় এড়াতে ব্যস্ত। যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা দোষারোপের রাজনীতি চাই না। আমরা এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।

প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কুমিল্লার ঘটনার পরপরই আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, তারা প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে চায় না। প্রতিপক্ষ বিশেষ করে বিএনপিকে ঘায়েলই তাদের মূল লক্ষ্য। ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় সহিংসতা হয়েছে সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা এমনকি তাদের আটক করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কিছু ঘটলেই সরকার বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করে।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর থেকেই সরকার বিএনপিকে জড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। শুধু এখন নয়, যখনই দেশে কোনো ঘটনা ঘটে, তখনই সেখানে বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করে সরকার। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নীতি আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রদায়িকতার কাজই হচ্ছে সম্প্রীতির বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দিয়ে একটা ফায়দা হাসিল করা। দেশে এভাবে মানুষকে উসকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের সরকার সব সময় ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারও নিচ্ছে। আমি মনে করি, বিএনপি-জামায়াতের এ দুষ্টামি, চালাকি চলবে না। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ।

তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে জনগণকে সচেতন করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যা বর্তমান সরকার নিচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ যুগান্তরকে বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক। কোনো মুসলমানের পক্ষে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো উচিত নয়। আমাদের ইসলাম ধর্মেও এ ধরনের ঘটনার কোনো অনুমতি দেয় না। আমরা সবাই এক রক্তের সন্তান।

তিনি বলেন, যে বা যারা এ কাজ করেছে, তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। এটাকে নিয়ে রাজনীতি করার অর্থই হচ্ছে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার ষড়যন্ত্র। রাজনীতি বন্ধ করে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে, সত্যের পথে পরিচালিত করতে হবে। মিথ্যার আশ্রয় নিলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। মিথ্যা কখনো মানুষের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনেই লাভ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর বড় দুটি দল একে অপরকে দোষারোপ করছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব যুগান্তরকে বলেন, দোষারোপের রাজনীতি অনেকটা দলীয় সরকারের মানসিকতা। কাউকে দোষারোপ করা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটা প্রতিহিংসামূলক আচরণ। দেশের মানুষ সরকারের কাছ থেকে এমন দলীয় প্রতিহিংসামূলক আচরণ প্রত্যাশা করে না।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত দেশে সাম্প্রদায়িক যেসব সহিংসতা হয়েছে, এর কোনোটির সঠিক বিচায় হয়নি। বিচার না হওয়ার কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দোষারোপের রাজনীতির মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের রেহাই পাওয়ার একটা রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। যারা এ কাজ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে না। তারা একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যতটা আন্তরিক, এর চেয়ে বেশি পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে রাজনীতির ফায়দা লাভে বেশি উৎসাহী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এটাকে আমরা হিন্দুধর্মের ওপর আক্রমণ বলছি না। এটা মানবসভ্যতার ওপর আক্রমণ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ধ্বংস করার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে জাতিকে রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাধান্য হয়ে দাঁড়াচ্ছেন এখান থেকে কে কতটা ফায়দা তুলবে। ফলে তারা প্রত্যক্ষভাবে না হলে পরোক্ষভাবে এসব ঘটনার পেছনে উৎসাহ জোগায়।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ নানা ইস্যু

দোষারোপের রাজনীতি আ.লীগ-বিএনপিতে

প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে-শঙ্কা রাজনীতিবিদদের * দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
 হাবিবুর রহমান খান 
২০ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দোষারোপের রাজনীতি করা যেন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কোনো একটি ঘটনার পরপরই একে অপরকে ঘায়েলের প্রতিযোগিতায় নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সর্বশেষ কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করে প্রতিদিনই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন দল দুটির নেতারা। ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজছেন তারা। এর আগে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরও একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের অনেকেই পার পেয়ে গেছে। এবারও এমন আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।

তারা আরও মনে করেন, তদন্তের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই স্পর্শকাতর এ ইস্যুতে একে অপরকে দোষারোপ না করে এসব দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে তাদের।

সম্প্রতি কুমিল্লার ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েক জেলায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়। এতে ঘটে প্রাণহানিও। সবশেষ রংপুরের পীরগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো উত্তপ্ত নোয়াখালীর চৌমুহনী, ফেনী, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলা।

সাম্প্রদায়িক এ সহিংসতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বেশ উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে বিষোদ্গারে ব্যস্ত। ঘটনার পর এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দল দুটি পরস্পরকে দায়ী করেছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘটনার পর থেকে প্রতিটি অনুষ্ঠানে বলে আসছেন, বিএনপি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির পৃষ্ঠপোষক। দেশের সব অপকর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার জনক হচ্ছে এই দল। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ‘সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রায়’ অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর-এগুলো ২০০১ সালে বিএনপি সরকার যে নির্যাতন চালিয়েছিল, এর পুনরাবৃত্তি। আন্দোলনে ব্যর্থ, নির্বাচনে ব্যর্থ বিএনপি আজ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।’ অপরদিকে এ ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীনদের দায়ী করা হচ্ছে। সোমবার রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা বারবার বলছি-দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা ক্ষমতাসীনদের মদদ ছাড়া সম্ভব নয়। নিঃসন্দেহে যারা আক্রমণ চালিয়েছে, তারা কোনো বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী নয়।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে এসব অপকর্ম করছে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে যাতে তারা পার পেয়ে যেতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন রকমের অপকৌশল গ্রহণ করতে শুরু করেছে-এটা তারই একটা প্রমাণ।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দলগুলোর মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে জনগণের স্বার্থে। কিন্তু আমরা বারবার দেখছি দেশের প্রধান দুটি দল সব সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের মাধ্যমে নিজেদের দায় এড়াতে ব্যস্ত। যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমরা দোষারোপের রাজনীতি চাই না। আমরা এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।

প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কুমিল্লার ঘটনার পরপরই আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, তারা প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে চায় না। প্রতিপক্ষ বিশেষ করে বিএনপিকে ঘায়েলই তাদের মূল লক্ষ্য। ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় সহিংসতা হয়েছে সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা এমনকি তাদের আটক করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কিছু ঘটলেই সরকার বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করে।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর থেকেই সরকার বিএনপিকে জড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। শুধু এখন নয়, যখনই দেশে কোনো ঘটনা ঘটে, তখনই সেখানে বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করে সরকার। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নীতি আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রদায়িকতার কাজই হচ্ছে সম্প্রীতির বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দিয়ে একটা ফায়দা হাসিল করা। দেশে এভাবে মানুষকে উসকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের সরকার সব সময় ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারও নিচ্ছে। আমি মনে করি, বিএনপি-জামায়াতের এ দুষ্টামি, চালাকি চলবে না। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ।

তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে জনগণকে সচেতন করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যা বর্তমান সরকার নিচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ যুগান্তরকে বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক। কোনো মুসলমানের পক্ষে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো উচিত নয়। আমাদের ইসলাম ধর্মেও এ ধরনের ঘটনার কোনো অনুমতি দেয় না। আমরা সবাই এক রক্তের সন্তান।

তিনি বলেন, যে বা যারা এ কাজ করেছে, তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। এটাকে নিয়ে রাজনীতি করার অর্থই হচ্ছে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার ষড়যন্ত্র। রাজনীতি বন্ধ করে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে, সত্যের পথে পরিচালিত করতে হবে। মিথ্যার আশ্রয় নিলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। মিথ্যা কখনো মানুষের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনেই লাভ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর বড় দুটি দল একে অপরকে দোষারোপ করছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব যুগান্তরকে বলেন, দোষারোপের রাজনীতি অনেকটা দলীয় সরকারের মানসিকতা। কাউকে দোষারোপ করা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটা প্রতিহিংসামূলক আচরণ। দেশের মানুষ সরকারের কাছ থেকে এমন দলীয় প্রতিহিংসামূলক আচরণ প্রত্যাশা করে না।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত দেশে সাম্প্রদায়িক যেসব সহিংসতা হয়েছে, এর কোনোটির সঠিক বিচায় হয়নি। বিচার না হওয়ার কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দোষারোপের রাজনীতির মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের রেহাই পাওয়ার একটা রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। যারা এ কাজ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে না। তারা একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যতটা আন্তরিক, এর চেয়ে বেশি পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে রাজনীতির ফায়দা লাভে বেশি উৎসাহী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এটাকে আমরা হিন্দুধর্মের ওপর আক্রমণ বলছি না। এটা মানবসভ্যতার ওপর আক্রমণ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ধ্বংস করার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে জাতিকে রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাধান্য হয়ে দাঁড়াচ্ছেন এখান থেকে কে কতটা ফায়দা তুলবে। ফলে তারা প্রত্যক্ষভাবে না হলে পরোক্ষভাবে এসব ঘটনার পেছনে উৎসাহ জোগায়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন