তিন হাজার কোটি টাকা বিদেশে বিনিয়োগ
jugantor
বাংলাদেশি উদ্যোক্তা
তিন হাজার কোটি টাকা বিদেশে বিনিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন : বিদেশে বৈধভাবে পুঁজি নেওয়ার চেয়ে পাচার হয়েছে অনেক বেশি * দেশে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ালে কর্মসংস্থান বাড়বে, দরিদ্রতা কমবে -ড. মইনুল ইসলাম

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আগে বিদেশ থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) আকর্ষণে নানামুখী উদ্যোগ নিত।

এর আলোকে বেশকিছু এফডিআই দেশে আসত। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও বিভিন্ন দেশে এফডিআই করা শুরু করেছেন।

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দেশে এফডিআই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার (২ হাজার ৮২৮) কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ নিয়ে যাওয়া ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ দেশে আনা এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে ঋণ নেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আলোচ্য তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিদেশে নেওয়া পুঁজির পরিমাণ। এর বাইরেও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে, যেগুলোর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই।

কেননা ওইসব উদ্যোক্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিদেশে পুঁজি স্থানান্তর করেননি। তারা দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলেন, দেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার পরিমাণ খুবই কম। পাচার করেই বেশি পুঁজি নেওয়া হয়েছে। বৈধভাবে নেওয়া পুঁজির বিপরীতে যৎসামান্য মুনাফা এলেও পাচার করা পুঁজি থেকে কোনো মুনাফা আসছে না। দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ করতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে থেকে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার পরিবর্তে তা দেশেই বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা করলে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দরিদ্রতা কমবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বৈধভাবে বিদেশে কোনো পুঁজি নেওয়ার সুযোগ নেই। বৈধভাবে যারা বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে করেছেন। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের কোনো অনুমোদন দিত না। কেননা আগে রিজার্ভ ছিল কম এবং এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ত।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ বাড়ার গতি অব্যাহত রয়েছে। রিজার্ভ বাড়ার কারণে সরকার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ২০১৫ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া শুরু করে সীমিত পরিসরে। ইতোমধ্যে সবচেয়ে বেশি পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার জন্য। এরপরই রয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য।

এদিকে দেশ থেকে বিদেশে নেওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এর একটি খসড়া তৈরি করে বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে মতামতের জন্য। এর আলোকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হবে।

সংশোধিত আইনে বলা হয়, দেশের উদ্যোক্তাদের বিদেশে রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর বাইরে সীমিত পরিসরে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার জন্য পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অবশ্য এর আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউস খোলার জন্য পুঁজি নেওয়া হতো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ছোট অঙ্কের পুঁজি বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের পুঁজির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বিদেশে বিনিয়োগের নীতিমালা চূড়ান্ত হলে তখনো প্রথমদিকে ছোট অঙ্কের পুঁজি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। সেগুলো দেশে মুনাফা আসা শুরু করলে তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কমবে। তখন বড় অঙ্কের পুঁজির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সালে বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ২১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। যা ২০১৫ সালের তুলনায় ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে ছিল ৩৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৫৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে ছিল ৩১ কোটি ৮ লাখ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম ছিল। ২০১৯ সালে ছিল ৩২ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩২ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। যা আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।

২০১৯ সালে দেশ থেকে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল ৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে আগের বিনিয়োগ থেকে মুনাফাবাবদ ফেরত এসেছিল ২ কোটি ১১ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে মূলধন হিসাবে নেওয়া হয়েছে ৯৭ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করা হয় ২ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি (আন্তঃকোম্পানি) কোনো নতুন ঋণ নেয়নি। বরং আগের ঋণ বাবদ ৬২ লাখ ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে।

২০২০ সালে দেশ থেকে মোট বিনিয়োগ নেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা বাবদ ফেরত আনা হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ করা হয় ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে পুঁজি হিসাবে নেওয়া হয়েছে ৯২ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির নেওয়া ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোট বিনিয়োগ নেওয়া কমেছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। মুনাফা আনার পরিমাণ কমেছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। দেশ থেকে মূলধন নেওয়া কমেছে ৫ লাখ ডলার। মুনাফার অংশ থেকে পুনরায় বিনিয়োগ কমেছে ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ কমেছে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশ থেকে নতুন বিনিয়োগ নেওয়া যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে বিদেশ থেকে অর্জিত মুনাফা দেশে আনার পরিমাণ। তবে শর্ত অনুযায়ী এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির ঋণ পরিশোধ বেড়েছে। বিদেশে বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসার হার এখনো অনেক কম। যেসব মুনাফা আসছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর্থিক খাত থেকে। অন্য খাত থেকে এখনো মুনাফা তেমন একটা আসছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, দেশ-বিদেশে বৈধভাবে পুঁজি নেওয়ার পরিমাণ খুবই কম। বিনিয়োগের পরিবেশ আরও ভালো করলে দেশেই বাড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হতে হবে। এতে কর্মসংস্থান, জিডিপি ও রপ্তানি বাড়বে।

প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মোট বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গিয়েছে নেপালে ৭১ লাখ ডলার। ওই দেশ থেকে মুনাফা বাবদ ফেরত এসেছে ৬০ হাজার ডলার।

কেনিয়াতে বিনিয়োগ হয়েছে ৫৮ লাখ ডলার, ভারতে ৪৪ লাখ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। এসব দেশ থেকে এখনো কোনো মুনাফা ফেরত আসেনি। ওমানে বিনিয়োগ হয়েছে ২৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। মুনাফা এসেছে ৩ লাখ ডলার।

আলোচ্য পাঁচ দেশে মোট বিনিয়োগ করা হয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। মুনাফা এসেছে ৩ লাখ ডলার।

দেশ থেকে নেওয়া পুঁজি সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে আর্থিক খাতে ২ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। এ খাত থেকে মুনাফা এসেছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এছাড়া রাসায়নিক ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে ৫৮ লাখ ডলার। খনিজসম্পদ অনুসন্ধান খাতে ৪৪ লাখ ডলার। গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে বিনিয়োগ ৭০ হাজার ডলার। এসব খাত থেকে কোনো মুনাফা আসেনি।

বাংলাদেশি উদ্যোক্তা

তিন হাজার কোটি টাকা বিদেশে বিনিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন : বিদেশে বৈধভাবে পুঁজি নেওয়ার চেয়ে পাচার হয়েছে অনেক বেশি * দেশে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ালে কর্মসংস্থান বাড়বে, দরিদ্রতা কমবে -ড. মইনুল ইসলাম
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আগে বিদেশ থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) আকর্ষণে নানামুখী উদ্যোগ নিত।

এর আলোকে বেশকিছু এফডিআই দেশে আসত। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও বিভিন্ন দেশে এফডিআই করা শুরু করেছেন।

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দেশে এফডিআই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার (২ হাজার ৮২৮) কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ নিয়ে যাওয়া ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ দেশে আনা এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে ঋণ নেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আলোচ্য তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিদেশে নেওয়া পুঁজির পরিমাণ। এর বাইরেও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে, যেগুলোর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই।

কেননা ওইসব উদ্যোক্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিদেশে পুঁজি স্থানান্তর করেননি। তারা দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলেন, দেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার পরিমাণ খুবই কম। পাচার করেই বেশি পুঁজি নেওয়া হয়েছে। বৈধভাবে নেওয়া পুঁজির বিপরীতে যৎসামান্য মুনাফা এলেও পাচার করা পুঁজি থেকে কোনো মুনাফা আসছে না। দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ করতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে থেকে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার পরিবর্তে তা দেশেই বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা করলে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দরিদ্রতা কমবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বৈধভাবে বিদেশে কোনো পুঁজি নেওয়ার সুযোগ নেই। বৈধভাবে যারা বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে করেছেন। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের কোনো অনুমোদন দিত না। কেননা আগে রিজার্ভ ছিল কম এবং এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ত।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ বাড়ার গতি অব্যাহত রয়েছে। রিজার্ভ বাড়ার কারণে সরকার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ২০১৫ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া শুরু করে সীমিত পরিসরে। ইতোমধ্যে সবচেয়ে বেশি পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার জন্য। এরপরই রয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য।

এদিকে দেশ থেকে বিদেশে নেওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এর একটি খসড়া তৈরি করে বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে মতামতের জন্য। এর আলোকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হবে।

সংশোধিত আইনে বলা হয়, দেশের উদ্যোক্তাদের বিদেশে রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর বাইরে সীমিত পরিসরে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার জন্য পুঁজি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অবশ্য এর আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউস খোলার জন্য পুঁজি নেওয়া হতো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ছোট অঙ্কের পুঁজি বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের পুঁজির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বিদেশে বিনিয়োগের নীতিমালা চূড়ান্ত হলে তখনো প্রথমদিকে ছোট অঙ্কের পুঁজি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। সেগুলো দেশে মুনাফা আসা শুরু করলে তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কমবে। তখন বড় অঙ্কের পুঁজির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সালে বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ২১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। যা ২০১৫ সালের তুলনায় ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে ছিল ৩৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৫৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে ছিল ৩১ কোটি ৮ লাখ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম ছিল। ২০১৯ সালে ছিল ৩২ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩২ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। যা আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।

২০১৯ সালে দেশ থেকে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল ৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে আগের বিনিয়োগ থেকে মুনাফাবাবদ ফেরত এসেছিল ২ কোটি ১১ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে মূলধন হিসাবে নেওয়া হয়েছে ৯৭ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করা হয় ২ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি (আন্তঃকোম্পানি) কোনো নতুন ঋণ নেয়নি। বরং আগের ঋণ বাবদ ৬২ লাখ ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে।

২০২০ সালে দেশ থেকে মোট বিনিয়োগ নেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা বাবদ ফেরত আনা হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ করা হয় ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে পুঁজি হিসাবে নেওয়া হয়েছে ৯২ লাখ ডলার। আগের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির নেওয়া ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোট বিনিয়োগ নেওয়া কমেছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। মুনাফা আনার পরিমাণ কমেছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। দেশ থেকে মূলধন নেওয়া কমেছে ৫ লাখ ডলার। মুনাফার অংশ থেকে পুনরায় বিনিয়োগ কমেছে ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ডলার। নিট বিনিয়োগ কমেছে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশ থেকে নতুন বিনিয়োগ নেওয়া যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে বিদেশ থেকে অর্জিত মুনাফা দেশে আনার পরিমাণ। তবে শর্ত অনুযায়ী এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির ঋণ পরিশোধ বেড়েছে। বিদেশে বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসার হার এখনো অনেক কম। যেসব মুনাফা আসছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর্থিক খাত থেকে। অন্য খাত থেকে এখনো মুনাফা তেমন একটা আসছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, দেশ-বিদেশে বৈধভাবে পুঁজি নেওয়ার পরিমাণ খুবই কম। বিনিয়োগের পরিবেশ আরও ভালো করলে দেশেই বাড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হতে হবে। এতে কর্মসংস্থান, জিডিপি ও রপ্তানি বাড়বে।

প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মোট বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গিয়েছে নেপালে ৭১ লাখ ডলার। ওই দেশ থেকে মুনাফা বাবদ ফেরত এসেছে ৬০ হাজার ডলার।

কেনিয়াতে বিনিয়োগ হয়েছে ৫৮ লাখ ডলার, ভারতে ৪৪ লাখ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। এসব দেশ থেকে এখনো কোনো মুনাফা ফেরত আসেনি। ওমানে বিনিয়োগ হয়েছে ২৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। মুনাফা এসেছে ৩ লাখ ডলার।

আলোচ্য পাঁচ দেশে মোট বিনিয়োগ করা হয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। মুনাফা এসেছে ৩ লাখ ডলার।

দেশ থেকে নেওয়া পুঁজি সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে আর্থিক খাতে ২ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। এ খাত থেকে মুনাফা এসেছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এছাড়া রাসায়নিক ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে ৫৮ লাখ ডলার। খনিজসম্পদ অনুসন্ধান খাতে ৪৪ লাখ ডলার। গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে বিনিয়োগ ৭০ হাজার ডলার। এসব খাত থেকে কোনো মুনাফা আসেনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন