পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে স্বস্তি
jugantor
পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে স্বস্তি
সৈকত ও রবিউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

  পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি  

২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রান্নাঘরের চারপাশ খোলা। সেখানে বসেই বিকালের নাস্তার জন্য পিঠা ভাজছিলেন শ্রীমতি পুতুল রানী। কাছে যেতেই হাসিমুখে বসার জন্য টুল বাড়িয়ে দিলেন। ঘরে আগুন দেয়ার প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘হ, সেদিন কি যে একটা রাত গেচে। কবার পাবো না। ভয়ে জীবনটা শ্যাষ হবার ধচ্চিলো। কোনো মোতে জীবন বাঁচি গ্যাচে। ওংক্যা ঘটনা জানি মান্সের উপোর না হয়। একন খুব ভালো নাগোচে। সবাই হামার খোঁজ ন্যাওচে।’

পুতুল রানী পীরগঞ্জের বড় করিমপুর কসবা হিন্দুপল্লি মাঝিপাড়ার সুদাসন চন্দ্রের স্ত্রী। প্রায় বছরখানেক আগে পুতুলের বিয়ে হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এখানে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছিল। ধীরে ধীরে বাসিন্দাদের আতঙ্ক কেটেছে। স্বস্তি ফিরেছে হিন্দুপল্লিতে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা, মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান খাদ্য, বস্ত্র ও লাখ লাখ টাকার আর্থিক সহযোগিতা করছে।

রোববার পুতুল রানীর সঙ্গে কথা বলার পর কথা হয় পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা ননী গোপালের সঙ্গেও। তিনি বলেন, ‘সরকার আর অন্যরা হামাক নগদ ট্যাকা, খাবার, কাপড়-চোপড় দিয়া সাহায্য করছে। হামরা একন ভালো আচি। ৪ দিন পর বাড়ির চুলাত রান্না করা ভাত খাচি। খুব ভালো লাগছে।’

ননী গোপালের মতোই অনুভূতি ব্যক্ত করলেন মাঝিপাড়ার বাসিন্দা সুবর্ণ চন্দ্র, শহিবা রানী, অর্জুন চন্দ্র, রমেন ও নিখিল চন্দ্র। তারা জানান, ওই দিনের ঘটনার পর তারা মনে করেছিলেন তারা আর এখানে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এখন সব ভয় কেটে গেছে তাদের। তারা এখন শান্তিতে বসবাস করছেন।

১৭ অক্টোবরের ওই আগুনের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া ১০০ বান্ডিল টিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামত প্রায় শেষের দিকে। প্রতিটি বাড়িতেই এখন লোকজন বসবাস করছেন। তিন দিন আগেই রেডক্রিসেন্টের দেয়া ৪টি তাঁবু গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা এখন নিজ ঘরেই চুলায় রান্না করে খাচ্ছেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের সূত্রে জানা গেছে, তারা অনেক সাহায্য পেয়েছেন। এরমধ্যে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন নগদ ৩১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পুলিশ ১১ লাখ টাকা, স্থানীয় সংসদ সদস্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ৩ লাখ টাকা ও ১০০ বান্ডিল টিন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ৫০ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অন্তত ১ লাখ টাকা সহযোগিতা করেছেন। এভাবে প্রায় ১ কোটি টাকা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন তারা।

পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, হামলার শিকার পরিবারগুলোতে স্বস্তি ফিরেছে। তারা এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিরোদা রানী রায় বলেন, হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। আবার কোনোটা মেরামত করে দেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তরা যেভাবে চাইছেন, সেভাবেই ঘর করে দেয়া হচ্ছে।

সৈকত-রবিউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা : পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে আগুনের ঘটনায় প্রধান উসকানিদাতা সৈকত মণ্ডল ও রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। শনিবার রাতে পীরগঞ্জ থানায় এ মামলা হয়। রোববার তাদের কোর্ট হাজতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শুক্রবার রাতে টঙ্গী থেকে র‌্যাব তাদের আটক করেছিল।

এদিকে ওই ঘটনায় পুলিশের করা চার মামলায় ৬২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৭ আসামিকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রোববার দুপুরে রিমান্ড শেষে এসব আসামিকে আদালতের মাধ্যমে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, রিমান্ডে নেয়া আসামিরা ঘটনার ব্যাপারে যেসব তথ্য দিয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কেউ সরাসরি হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। এছাড়া সৈকত ও রবিউল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।

পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে স্বস্তি

সৈকত ও রবিউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা
 পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি 
২৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রান্নাঘরের চারপাশ খোলা। সেখানে বসেই বিকালের নাস্তার জন্য পিঠা ভাজছিলেন শ্রীমতি পুতুল রানী। কাছে যেতেই হাসিমুখে বসার জন্য টুল বাড়িয়ে দিলেন। ঘরে আগুন দেয়ার প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘হ, সেদিন কি যে একটা রাত গেচে। কবার পাবো না। ভয়ে জীবনটা শ্যাষ হবার ধচ্চিলো। কোনো মোতে জীবন বাঁচি গ্যাচে। ওংক্যা ঘটনা জানি মান্সের উপোর না হয়। একন খুব ভালো নাগোচে। সবাই হামার খোঁজ ন্যাওচে।’

পুতুল রানী পীরগঞ্জের বড় করিমপুর কসবা হিন্দুপল্লি মাঝিপাড়ার সুদাসন চন্দ্রের স্ত্রী। প্রায় বছরখানেক আগে পুতুলের বিয়ে হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এখানে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়েছিল। ধীরে ধীরে বাসিন্দাদের আতঙ্ক কেটেছে। স্বস্তি ফিরেছে হিন্দুপল্লিতে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা, মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান খাদ্য, বস্ত্র ও লাখ লাখ টাকার আর্থিক সহযোগিতা করছে।

রোববার পুতুল রানীর সঙ্গে কথা বলার পর কথা হয় পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা ননী গোপালের সঙ্গেও। তিনি বলেন, ‘সরকার আর অন্যরা হামাক নগদ ট্যাকা, খাবার, কাপড়-চোপড় দিয়া সাহায্য করছে। হামরা একন ভালো আচি। ৪ দিন পর বাড়ির চুলাত রান্না করা ভাত খাচি। খুব ভালো লাগছে।’

ননী গোপালের মতোই অনুভূতি ব্যক্ত করলেন মাঝিপাড়ার বাসিন্দা সুবর্ণ চন্দ্র, শহিবা রানী, অর্জুন চন্দ্র, রমেন ও নিখিল চন্দ্র। তারা জানান, ওই দিনের ঘটনার পর তারা মনে করেছিলেন তারা আর এখানে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এখন সব ভয় কেটে গেছে তাদের। তারা এখন শান্তিতে বসবাস করছেন।

১৭ অক্টোবরের ওই আগুনের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া ১০০ বান্ডিল টিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মেরামত প্রায় শেষের দিকে। প্রতিটি বাড়িতেই এখন লোকজন বসবাস করছেন। তিন দিন আগেই রেডক্রিসেন্টের দেয়া ৪টি তাঁবু গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা এখন নিজ ঘরেই চুলায় রান্না করে খাচ্ছেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের সূত্রে জানা গেছে, তারা অনেক সাহায্য পেয়েছেন। এরমধ্যে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন নগদ ৩১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পুলিশ ১১ লাখ টাকা, স্থানীয় সংসদ সদস্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ৩ লাখ টাকা ও ১০০ বান্ডিল টিন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ৫০ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অন্তত ১ লাখ টাকা সহযোগিতা করেছেন। এভাবে প্রায় ১ কোটি টাকা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন তারা।

পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, হামলার শিকার পরিবারগুলোতে স্বস্তি ফিরেছে। তারা এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিরোদা রানী রায় বলেন, হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। আবার কোনোটা মেরামত করে দেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তরা যেভাবে চাইছেন, সেভাবেই ঘর করে দেয়া হচ্ছে।

সৈকত-রবিউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা : পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে আগুনের ঘটনায় প্রধান উসকানিদাতা সৈকত মণ্ডল ও রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। শনিবার রাতে পীরগঞ্জ থানায় এ মামলা হয়। রোববার তাদের কোর্ট হাজতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শুক্রবার রাতে টঙ্গী থেকে র‌্যাব তাদের আটক করেছিল।

এদিকে ওই ঘটনায় পুলিশের করা চার মামলায় ৬২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৭ আসামিকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রোববার দুপুরে রিমান্ড শেষে এসব আসামিকে আদালতের মাধ্যমে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, রিমান্ডে নেয়া আসামিরা ঘটনার ব্যাপারে যেসব তথ্য দিয়েছে, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কেউ সরাসরি হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। এছাড়া সৈকত ও রবিউল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন