আফালের তাণ্ডবে ভাঙছে গ্রাম
jugantor
খালিয়াজুরীতে ধনু নদী ও হাওড়
আফালের তাণ্ডবে ভাঙছে গ্রাম
ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত শতাধিক পরিবার * প্রতিরক্ষা দেওয়াল নির্মাণের দাবি

  কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা  

২৬ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তাণ্ডব

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় হাওড় ও ধনু নদীর ঢেউয়ের তাণ্ডবে অনেক গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ইতোমধ্যে সর্বস্বান্ত হয়েছেন হতদরিদ্র শতাধিক পরিবার। সব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামগুলোর লোকজন এখন আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছেন। ঝড়ো বাতাসে নদী ও হাওড়ে বড় বড় যে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় স্থানীয়রা তাকে ‘আফাল’ বলেন। বাতাস যত বাড়ে আফালের তাণ্ডব তত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। তিন থেকে চার ফুট উঁচু উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে হাওড় পাড়ের গ্রামগুলোতে। এর ফলে গ্রামে ভাঙন দেখা দেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে অনেকগুলো গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। এগুলো হল- জগদীশপুর, মাগনপুর, বিক্রমপুর, কানাইনগর, সুলতানপুর, আমীনপুর, খুরশীগঞ্জ, কালিপুর, হ্যামনগর, আছানপুর, নূরপুর, কাছারীবাড়ী, হাবিবপুর, দুর্গাবাড়ী, নগর, শিবপুর, কামারবাড়ী, নরসিংহপুর, নয়ানগর ও সঁওতাল গ্রাম। ভূমি মানচিত্রে ও ভূমি রেকর্ডে এ গ্রামগুলো উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এগুলো নেই। এছাড়া নদী ও হাওড়ের বুক চিঁড়ে দিনরাত বড় বড় কার্গো, লঞ্চ ও ট্রলার চলাচলের সময় সৃষ্ট ঢেউ গ্রামগুলোতে আঘাত হানে। এতেও গ্রামে ভাঙন দেখা দেয়। শুধু গ্রাম নয়, ঢেউয়ের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না হাট-বাজার। উপজেলা সদরের বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন যে কোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে।

গাজীপুর পাঁচহাট গ্রামের আবুল হাসেম, বল্লভপুর গ্রামের সঞ্জিত তালুকদার ও জগন্নাথপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাওড়ে ঢেউ শুরু হলে রাতে সন্তানদের নিয়ে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। আতঙ্কে থাকি কখন কী হয়!’ তারা আরও বলেন, ‘হাওড়াঞ্চলে পানিসহিষ্ণু হিজল, করচ ও চাইল্যা বন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। এ কারণে প্রতি বছরই আফালের তাণ্ডবে বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে।’

পাথরা গ্রামের ভিটামাটি হারা হিমাংশু সরকার, নেপাল সরকার, সঞ্জিত সরকার বলেন, ‘ধনু নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন গ্রামের পাথরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলায় বসবাস করছি। সংসার চালানোই এখন দায়। সরকারি সহযোগিতা নেই।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য সুবিন্দু কান্তি সরকার বলেন, ‘ধনু নদীর ভাঙনে আমাদের গ্রামটি বিলীনের পথে। ইতোমধ্যে অনেকেই সবকিছু হারিয়ে পথে বসেছে। গ্রামটি রক্ষা করা না হলে এখানকার হাওড়ের একমাত্র ফসলি জমি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে যাবে। তাই দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি এই এলাকার মানুষের।’

নেত্রকোনা কৃষক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আনিছুর রহমান বলেন, ‘হাওড়বাসীর দুঃখ কেউ বুঝতে চান না। নির্বাচন এলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও এমপি প্রার্থীরা আফালের তাণ্ডব থেকে বাড়িঘর রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচিত হওয়ার পর তারা আর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেন না।’

খালিয়াজুরী গাজিপুর গ্রামের অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা চৌধুরী বলেন, ‘হাওড়বাসীর দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে নদী খননসহ গ্রামগুলো রক্ষার জন্য সরকারের উচিত প্রতিটি প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা। কারণ হাওড়ে উঁচু জায়গা নাই এ কারণে গ্রামগুলোতে খুব অল্প জায়গায় অনেক লোক বসবাস করেন।’

জানতে চাইলে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহনলাল সৈকত বলেন, ইতোমধ্যে নদীতে জিও ব্যাগ দিয়ে একটি গ্রাম রক্ষার কাজ চলছে। এছাড়া নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কাজী আবদুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা করা হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা গৃহহীন হয়েছেন তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হবে।

খালিয়াজুরীতে ধনু নদী ও হাওড়

আফালের তাণ্ডবে ভাঙছে গ্রাম

ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত শতাধিক পরিবার * প্রতিরক্ষা দেওয়াল নির্মাণের দাবি
 কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা 
২৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
তাণ্ডব
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে ধনু নদীর ভাঙনে হুমকির মুখে পাথরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিলীনের মুখে গ্রামটিও। সোমবার তোলা -যুগান্তর

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় হাওড় ও ধনু নদীর ঢেউয়ের তাণ্ডবে অনেক গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ইতোমধ্যে সর্বস্বান্ত হয়েছেন হতদরিদ্র শতাধিক পরিবার। সব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামগুলোর লোকজন এখন আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছেন। ঝড়ো বাতাসে নদী ও হাওড়ে বড় বড় যে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় স্থানীয়রা তাকে ‘আফাল’ বলেন। বাতাস যত বাড়ে আফালের তাণ্ডব তত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। তিন থেকে চার ফুট উঁচু উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে হাওড় পাড়ের গ্রামগুলোতে। এর ফলে গ্রামে ভাঙন দেখা দেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে অনেকগুলো গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। এগুলো হল- জগদীশপুর, মাগনপুর, বিক্রমপুর, কানাইনগর, সুলতানপুর, আমীনপুর, খুরশীগঞ্জ, কালিপুর, হ্যামনগর, আছানপুর, নূরপুর, কাছারীবাড়ী, হাবিবপুর, দুর্গাবাড়ী, নগর, শিবপুর, কামারবাড়ী, নরসিংহপুর, নয়ানগর ও সঁওতাল গ্রাম। ভূমি মানচিত্রে ও ভূমি রেকর্ডে এ গ্রামগুলো উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এগুলো নেই। এছাড়া নদী ও হাওড়ের বুক চিঁড়ে দিনরাত বড় বড় কার্গো, লঞ্চ ও ট্রলার চলাচলের সময় সৃষ্ট ঢেউ গ্রামগুলোতে আঘাত হানে। এতেও গ্রামে ভাঙন দেখা দেয়। শুধু গ্রাম নয়, ঢেউয়ের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না হাট-বাজার। উপজেলা সদরের বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন যে কোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে।

গাজীপুর পাঁচহাট গ্রামের আবুল হাসেম, বল্লভপুর গ্রামের সঞ্জিত তালুকদার ও জগন্নাথপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাওড়ে ঢেউ শুরু হলে রাতে সন্তানদের নিয়ে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। আতঙ্কে থাকি কখন কী হয়!’ তারা আরও বলেন, ‘হাওড়াঞ্চলে পানিসহিষ্ণু হিজল, করচ ও চাইল্যা বন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। এ কারণে প্রতি বছরই আফালের তাণ্ডবে বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে।’

পাথরা গ্রামের ভিটামাটি হারা হিমাংশু সরকার, নেপাল সরকার, সঞ্জিত সরকার বলেন, ‘ধনু নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন গ্রামের পাথরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলায় বসবাস করছি। সংসার চালানোই এখন দায়। সরকারি সহযোগিতা নেই।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য সুবিন্দু কান্তি সরকার বলেন, ‘ধনু নদীর ভাঙনে আমাদের গ্রামটি বিলীনের পথে। ইতোমধ্যে অনেকেই সবকিছু হারিয়ে পথে বসেছে। গ্রামটি রক্ষা করা না হলে এখানকার হাওড়ের একমাত্র ফসলি জমি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে যাবে। তাই দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি এই এলাকার মানুষের।’

নেত্রকোনা কৃষক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আনিছুর রহমান বলেন, ‘হাওড়বাসীর দুঃখ কেউ বুঝতে চান না। নির্বাচন এলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও এমপি প্রার্থীরা আফালের তাণ্ডব থেকে বাড়িঘর রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচিত হওয়ার পর তারা আর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেন না।’

খালিয়াজুরী গাজিপুর গ্রামের অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা চৌধুরী বলেন, ‘হাওড়বাসীর দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে নদী খননসহ গ্রামগুলো রক্ষার জন্য সরকারের উচিত প্রতিটি প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা। কারণ হাওড়ে উঁচু জায়গা নাই এ কারণে গ্রামগুলোতে খুব অল্প জায়গায় অনেক লোক বসবাস করেন।’

জানতে চাইলে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহনলাল সৈকত বলেন, ইতোমধ্যে নদীতে জিও ব্যাগ দিয়ে একটি গ্রাম রক্ষার কাজ চলছে। এছাড়া নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কাজী আবদুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা করা হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা গৃহহীন হয়েছেন তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন