নানা প্রতিবন্ধকতায় পাঁচ মাসের কর্মযজ্ঞ
jugantor
দুবলারচরে জীবনযাপনের অবলম্বন শুঁটকি
নানা প্রতিবন্ধকতায় পাঁচ মাসের কর্মযজ্ঞ

  সিরাজুল ইসলাম, দুবলারচর থেকে ফিরে  

০৬ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুন্দরবনের দুবলারচর

সুন্দরবনের দুবলারচর। এখানে বিশ হাজারের বেশি মানুষের বাস। তবে সবাই পুরুষ। কোনো নারী খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাসিন্দাদের পেশা মাছ ধরা আর শুঁটকি তৈরি। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই চলে এসব মানুষের জীবনযাত্রা। বিদ্যুৎবিহীন এই এলাকার মানুষের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। নলকূপ বা টিউবওয়েলের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। খাওয়ার পানির জন্য একমাত্র ভরসা বৃষ্টি। বৃষ্টি এলে শুঁটকি তৈরির জন্য খুবই অসুবিধা হয়। নষ্ট হয়ে যায় অনেক শুঁটকি। তারপরও খাওয়ার পানির জন্য বৃষ্টির অপেক্ষা করেন। কারণ বৃষ্টি এলে পানি সংরক্ষণ করা যায়। আর এই পানিতেই তৃষ্ণা মেটে। সরেজমিন সুন্দরবন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

চরের কয়েকজন জানান, এখানে যারা বসবাস করেন তারা সবাই জেলে বা শুঁটকির কারবারি। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে অস্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছেন। প্রতিবছরই তারা আসেন। নির্দিষ্ট সময় পর তারা স্থায়ী ঠিকানায় চলে যান। এসব মানুষের জন্য এই চরে চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগী মারা যান। তাদের জন্য চারটি সাইক্লোন শেল্টার আছে। কিন্তু সবকটিই রয়েছে প্রভাবশালীদের দখলে। দাদন এবং সুদের ব্যবসা এখানে রমরমা। অনেক কষ্ট করে জেলেরা মাছ অহরণ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই মাছ বিক্রির স্বাধীনতা তাদের নেই। সুন্দরবনের দক্ষিণে পশুর নদীর পূর্বদিকে দুবলারচর অবস্থিত। আলোরকোল, খেঁজুরতলা, জামতলা, মাঝেরকেল্লা, অফিসকেল্লা, সেলারচর, নারকেলবাড়িয়া- প্রত্যেকটি আলাদা চর। সবকটি মিলে দুবলারচর। সবচেয়ে বড় চড় হলো আলোরকোল। আলোরকোল পশুর নদীর পশ্চিম দিকে। ৮০-র দশক থেকে দুবলারচরে চলছে শুঁটকির কারবার। প্রতিবছরের নভেম্বর থেকে মার্চ-এই পাঁচ মাস এখানে চলে মানুষের কর্মযজ্ঞ। বাকি সাত মাস এখানে মানুষের দেখা মেলে না। এখানকার লোকজন নানা পেশায় জড়িত। কেউ সাগরে মাছ ধরে, কেউ শুঁটকি তৈরি করে। কেউ কেউ রান্না করে, কেউ দোকান চালায়, কেউ লেদ মেশিন কারখানায় কাজ করে। গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবেও দার্য়িত্ব পালন করেন দু-একজন।

দুবলারচরের পরিবেশ শুঁটকি তৈরির জন্য খুবই উপযোগী। তাই এই এলাকাকে বলা হয় ‘শুঁটকির রাজ্য’। চরের পানি-মাটিতে যে শুঁটকি তৈরি হয় তার স্বাদ অন্যান্য এলাকার শুঁটকির চেয়ে অনেক বেশি। এই শুঁটকিতে লবণ বা কোনো ধরনের রাসায়নিক দেওয়া হয় না বলে প্রস্তুতকারকরা জানান।

জানা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে জেলে এবং নানা পেশার লোক প্রতিবছর দুবলারচরে আসেন পাঁচ মাসের জন্য। তাদের চিকিৎসার জন্য দু-একজন গ্রাম্য ডাক্তার আছেন। এমবিবিএস পাশ করা বা স্বীকৃত কোনো ডাক্তার নেই। তাদের জন্য নেই কোনো ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স বা দ্রুতগামী কোনো জলযান। এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা থাকলে, কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত। এখন কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যান। কারণ চর থেকে সরকারি হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট ঘণ্টার পথ। আশপাশে চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় গত বছর সাপের কামড়ে দুজন মারা যান।

চরের কয়েকজন জানান, দুবলারচরে চারটি সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও সবকটিই বেদখল অবস্থায় আছে। কোনোটিতেই জেলারা তাদের বিপদের সময় উঠতে পারে না। একটি সাইক্লোন শেল্টারে চরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কামাল থাকেন। অপর একটি শেল্টার মেহের আলীর দখলে। খেঁজুরতলার সাইক্লোন শেল্টারে থাকেন বন বিভাগের লোকজন। মাঝেরকেল্লার শেল্টারটি দখল করে আছে ব্যবসায়ী খোকন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সিডরের সময় অনেক মানুষ মারা যাওয়ার মূল কারণ সাইক্লোন শেল্টারে উঠতে না পারা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন জেলেকে পাঁচ মাসের জন্য দুবলারচরে থাকতে হলে বড় অঙ্কের টাকা লাগে। এই টাকা তাদের কাছে থাকে না। তাই তারা দাদন নেন। কিন্তু দাদনদার পুরো টাকা দেয় না। এ কারণে তারা সুদে টাকা নেন। এখানে সুদের রেট এক লাখে পাঁচ মাসে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। যেসব জেলে এখানে মাছ ধরতে আসেন তারা সবাই মৎস্যজীবী। কিন্তু তাদের অর্ধেকেরই মৎস্যজীবীর পরিচয়পত্র নেই। এ কারণে মাছ ধরার ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় তারা সরকারি কোনো অনুদান (খাবার বা অন্যান্য সুবিধা) পান না। তাই এ সময় তারা মানবেতর জীবনযাপন করেন। না খেয়ে থাকার কারণে, পেটের তাগিদে ওই সময় তারা সুন্দরবনে ঢুকে নানা অপকর্ম করেন। এমনকি লুকিয়ে বিষ দিয়ে মাছ ধরেন। এটা সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক হুমকি।

জেলেরা জানান, দুবলারচরের পাশের নদীতে জাল ফেললেই মাছ আর মাছ। সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ভরে যায় ট্রলার ও নৌকা। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত দাম তারা পান না। এ কারণেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন না। সরকারের পক্ষ থেকে যদি পুঁজি দেওয়া হতো, তাহলে এক-দুই বছরের মধ্যেই তারা বড় ব্যবসায়ী হতে পারতেন। তারা আরও জানান, তারা বিপুল অঙ্কের টাকার সম্পদ আহরণ করেন। কিন্তু এ সম্পদ স্বাধীনভাবে বিক্রি করার অধিকার তাদের নেই। দাদনদাররা যে দাম নির্ধারণ করে দেন, সেই দামেই বিক্রি করতে হয়। তারা স্বধীনভাবে মাছ বিক্রি করতে পারলে, কারও কাছ থেকে সুদ বা দাদন নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে জেলেরা বাজারমূল্যের অর্ধেক দামও পান না। এছাড়া জেলেরা যে চিংড়ি ধরেন, সেগুলোও বিক্রি করতে পারে না। এ মাছ মহাজনকে বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হয়।

র‌্যাবের দুবলারচর ক্যাম্পে একজন উপসহকারী পরিচালকের (ডিএডি) নেতৃত্বে ১১ সদস্যের দল দায়িত্ব পালন করে। ৩ নভেম্বর ক্যাম্প চত্বরে বসে ডিএডি নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, যখন জেলেরা এখানে থাকেন তখন আমরা পর্যাপ্ত মাছ পাই। বাজারঘাটেও সমস্যা হয় না। নিউমার্কেট থেকে আমরা কাঁচাবাজার করতে পারি। কিন্তু জেলেরা যখন চলে যান, তখন আর বাজার থাকে না। এমনকি মাছও পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, এখানে কেবল মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক আছে। তাও হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ক্যাম্পের নায়েব হাবিবুর রহমান বলেন, এক মাস আগে আমি এখানে এসেছি। এখানে থাকা খুবই কষ্টকর। কেউ এখানে যোগদান করলে দু-এক মাসের বেশি থাকতে পারেন না।

র‌্যাব ক্যাম্পে কর্মরত এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা মাহবুর রহমান বলেন, এখানে বিদ্যুৎ নেই। আমরা সব সময় জেনারেটর ব্যবহার করি। আর মোংলা পোর্ট থেকে এখানে আসতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। আমাদের খাবার পানি আনতে হয় খুলনা থেকে। সেখান থেকে এখানে আসতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। শুঁটকি শুকানোর কাজ করতে সাতক্ষীরার তালা থেকে আসা আবদুস সালাম বলেন, কাঁচা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি হতে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। মাছ শুকাতে দেওয়ার পর শুকানোর আগ পর্যন্ত সময়ে যদি বৃষ্টি এসে যায়, তাহলে ওই মাছ নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেটা রাবিশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

শুঁটকি ব্যবসায়ী নারায়ণ বিশ্বাস বলেন, আমার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়। বয়স ৬৫ বছর। ১৫ বছর বয়স থেকে আমি এ কাজে নিয়োজিত। শুরুতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতাম। পরে নিজেই ব্যবসা শুরু করি। তিনি বলেন, যত বেশি মাছ পাওয়া যায় তত বেশি লাভ হয়। তবে বাজার মূল্যের চেয়ে আমরা শুঁটকি বিক্রিতে মূল্য অনেক কম পাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিন বছর হলো সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছে। এতে আমাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আগে দস্যুরা আমাদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করত। ট্রলার-মাছ সবই কেড়ে নিত। এখন আমাদের মধ্যে সেই ভয় নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নদী এবং ডাঙা-এই দুই জায়গাতেই আমাদের সংসার। তবে এখানে কোনো মেয়েমানুষ নেই। আমরা ইচ্ছে করেই নারীদের আনি না। কারণ ঈশ্বর এখানে অনেক সম্পদ দিয়েছেন। আমরা এই সম্পদ আহরণ করি। নারীদের এখানে আনা হলে ঈশ্বর হয়তো আমাদের এই সম্পদ অর্জনের সুযোগ নাও দিতে পারেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে ডাকাত এবং দস্যুদের প্রতি মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হতো। এখন আর সেটা দিতে হয় না।

সরেজমিন দেখা যায়, জেলেপল্লির বাসিন্দাদের জন্য আলোরকোলে একটি মার্কেট রয়েছে। এর নাম নিউমার্কেট। এখানে রয়েছে শতাধিক দোকানপাট। চাল, ডাল, তেল, কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সবই পাওয়া যায় পাঁচ মাসের এই মার্কেটে। আছে গ্রাম্য ডাক্তার, সেলুন, ওয়ার্কশপ, লেদ, মোবাইল দোকান এবং মোবাইল সার্ভিসিংয়ে ব্যবস্থা। কেনাকাটা করা যায় কাপড়চোপড়ও। বিক্রি হয় সুন্দরবনের মধু। আছে অস্থায়ী মসজিদ-মন্দিরও। প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় হ্রাস মেলা। এই মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেন।

দুবলারচরে জীবনযাপনের অবলম্বন শুঁটকি

নানা প্রতিবন্ধকতায় পাঁচ মাসের কর্মযজ্ঞ

 সিরাজুল ইসলাম, দুবলারচর থেকে ফিরে 
০৬ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সুন্দরবনের দুবলারচর
সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকিপল্লিতে শুকানো হচ্ছে মাছ -যুগান্তর

সুন্দরবনের দুবলারচর। এখানে বিশ হাজারের বেশি মানুষের বাস। তবে সবাই পুরুষ। কোনো নারী খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাসিন্দাদের পেশা মাছ ধরা আর শুঁটকি তৈরি। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই চলে এসব মানুষের জীবনযাত্রা। বিদ্যুৎবিহীন এই এলাকার মানুষের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। নলকূপ বা টিউবওয়েলের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। খাওয়ার পানির জন্য একমাত্র ভরসা বৃষ্টি। বৃষ্টি এলে শুঁটকি তৈরির জন্য খুবই অসুবিধা হয়। নষ্ট হয়ে যায় অনেক শুঁটকি। তারপরও খাওয়ার পানির জন্য বৃষ্টির অপেক্ষা করেন। কারণ বৃষ্টি এলে পানি সংরক্ষণ করা যায়। আর এই পানিতেই তৃষ্ণা মেটে। সরেজমিন সুন্দরবন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

চরের কয়েকজন জানান, এখানে যারা বসবাস করেন তারা সবাই জেলে বা শুঁটকির কারবারি। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে অস্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছেন। প্রতিবছরই তারা আসেন। নির্দিষ্ট সময় পর তারা স্থায়ী ঠিকানায় চলে যান। এসব মানুষের জন্য এই চরে চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগী মারা যান। তাদের জন্য চারটি সাইক্লোন শেল্টার আছে। কিন্তু সবকটিই রয়েছে প্রভাবশালীদের দখলে। দাদন এবং সুদের ব্যবসা এখানে রমরমা। অনেক কষ্ট করে জেলেরা মাছ অহরণ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই মাছ বিক্রির স্বাধীনতা তাদের নেই। সুন্দরবনের দক্ষিণে পশুর নদীর পূর্বদিকে দুবলারচর অবস্থিত। আলোরকোল, খেঁজুরতলা, জামতলা, মাঝেরকেল্লা, অফিসকেল্লা, সেলারচর, নারকেলবাড়িয়া- প্রত্যেকটি আলাদা চর। সবকটি মিলে দুবলারচর। সবচেয়ে বড় চড় হলো আলোরকোল। আলোরকোল পশুর নদীর পশ্চিম দিকে। ৮০-র দশক থেকে দুবলারচরে চলছে শুঁটকির কারবার। প্রতিবছরের নভেম্বর থেকে মার্চ-এই পাঁচ মাস এখানে চলে মানুষের কর্মযজ্ঞ। বাকি সাত মাস এখানে মানুষের দেখা মেলে না। এখানকার লোকজন নানা পেশায় জড়িত। কেউ সাগরে মাছ ধরে, কেউ শুঁটকি তৈরি করে। কেউ কেউ রান্না করে, কেউ দোকান চালায়, কেউ লেদ মেশিন কারখানায় কাজ করে। গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবেও দার্য়িত্ব পালন করেন দু-একজন। 

দুবলারচরের পরিবেশ শুঁটকি তৈরির জন্য খুবই উপযোগী। তাই এই এলাকাকে বলা হয় ‘শুঁটকির রাজ্য’। চরের পানি-মাটিতে যে শুঁটকি তৈরি হয় তার স্বাদ অন্যান্য এলাকার শুঁটকির চেয়ে অনেক বেশি। এই শুঁটকিতে লবণ বা কোনো ধরনের রাসায়নিক দেওয়া হয় না বলে প্রস্তুতকারকরা জানান। 

জানা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে জেলে এবং নানা পেশার লোক প্রতিবছর দুবলারচরে আসেন পাঁচ মাসের জন্য। তাদের চিকিৎসার জন্য দু-একজন গ্রাম্য ডাক্তার আছেন। এমবিবিএস পাশ করা বা স্বীকৃত কোনো ডাক্তার নেই। তাদের জন্য নেই কোনো ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স বা দ্রুতগামী কোনো জলযান। এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা থাকলে, কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত। এখন কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যান। কারণ চর থেকে সরকারি হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট ঘণ্টার পথ। আশপাশে চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় গত বছর সাপের কামড়ে দুজন মারা যান। 

চরের কয়েকজন জানান, দুবলারচরে চারটি সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও সবকটিই বেদখল অবস্থায় আছে। কোনোটিতেই জেলারা তাদের বিপদের সময় উঠতে পারে না। একটি সাইক্লোন শেল্টারে চরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কামাল থাকেন। অপর একটি শেল্টার মেহের আলীর দখলে। খেঁজুরতলার সাইক্লোন শেল্টারে থাকেন বন বিভাগের লোকজন। মাঝেরকেল্লার শেল্টারটি দখল করে আছে ব্যবসায়ী খোকন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সিডরের সময় অনেক মানুষ মারা যাওয়ার মূল কারণ সাইক্লোন শেল্টারে উঠতে না পারা। 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন জেলেকে পাঁচ মাসের জন্য দুবলারচরে থাকতে হলে বড় অঙ্কের টাকা লাগে। এই টাকা তাদের কাছে থাকে না। তাই তারা দাদন নেন। কিন্তু দাদনদার পুরো টাকা দেয় না। এ কারণে তারা সুদে টাকা নেন। এখানে সুদের রেট এক লাখে পাঁচ মাসে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। যেসব জেলে এখানে মাছ ধরতে আসেন তারা সবাই মৎস্যজীবী। কিন্তু তাদের অর্ধেকেরই মৎস্যজীবীর পরিচয়পত্র নেই। এ কারণে মাছ ধরার ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় তারা সরকারি কোনো অনুদান (খাবার বা অন্যান্য সুবিধা) পান না। তাই এ সময় তারা মানবেতর জীবনযাপন করেন। না খেয়ে থাকার কারণে, পেটের তাগিদে ওই সময় তারা সুন্দরবনে ঢুকে নানা অপকর্ম করেন। এমনকি লুকিয়ে বিষ দিয়ে মাছ ধরেন। এটা সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক হুমকি। 

জেলেরা জানান, দুবলারচরের পাশের নদীতে জাল ফেললেই মাছ আর মাছ। সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ভরে যায় ট্রলার ও নৌকা। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত দাম তারা পান না। এ কারণেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন না। সরকারের পক্ষ থেকে যদি পুঁজি দেওয়া হতো, তাহলে এক-দুই বছরের মধ্যেই তারা বড় ব্যবসায়ী হতে পারতেন। তারা আরও জানান, তারা বিপুল অঙ্কের টাকার সম্পদ আহরণ করেন। কিন্তু এ সম্পদ স্বাধীনভাবে বিক্রি করার অধিকার তাদের নেই। দাদনদাররা যে দাম নির্ধারণ করে দেন, সেই দামেই বিক্রি করতে হয়। তারা স্বধীনভাবে মাছ বিক্রি করতে পারলে, কারও কাছ থেকে সুদ বা দাদন নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে জেলেরা বাজারমূল্যের অর্ধেক দামও পান না। এছাড়া জেলেরা যে চিংড়ি ধরেন, সেগুলোও বিক্রি করতে পারে না। এ মাছ মহাজনকে বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হয়।

র‌্যাবের দুবলারচর ক্যাম্পে একজন উপসহকারী পরিচালকের (ডিএডি) নেতৃত্বে ১১ সদস্যের দল দায়িত্ব পালন করে। ৩ নভেম্বর ক্যাম্প চত্বরে বসে ডিএডি নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, যখন জেলেরা এখানে থাকেন তখন আমরা পর্যাপ্ত মাছ পাই। বাজারঘাটেও সমস্যা হয় না। নিউমার্কেট থেকে আমরা কাঁচাবাজার করতে পারি। কিন্তু জেলেরা যখন চলে যান, তখন আর বাজার থাকে না। এমনকি মাছও পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, এখানে কেবল মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক আছে। তাও হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ক্যাম্পের নায়েব হাবিবুর রহমান বলেন, এক মাস আগে আমি এখানে এসেছি। এখানে থাকা খুবই কষ্টকর। কেউ এখানে যোগদান করলে দু-এক মাসের বেশি থাকতে পারেন না।

র‌্যাব ক্যাম্পে কর্মরত এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা মাহবুর রহমান বলেন, এখানে বিদ্যুৎ নেই। আমরা সব সময় জেনারেটর ব্যবহার করি। আর মোংলা পোর্ট থেকে এখানে আসতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। আমাদের খাবার পানি আনতে হয় খুলনা থেকে। সেখান থেকে এখানে আসতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। শুঁটকি শুকানোর কাজ করতে সাতক্ষীরার তালা থেকে আসা আবদুস সালাম বলেন, কাঁচা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি হতে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। মাছ শুকাতে দেওয়ার পর শুকানোর আগ পর্যন্ত সময়ে যদি বৃষ্টি এসে যায়, তাহলে ওই মাছ নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেটা রাবিশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। 

শুঁটকি ব্যবসায়ী নারায়ণ বিশ্বাস বলেন, আমার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়। বয়স ৬৫ বছর। ১৫ বছর বয়স থেকে আমি এ কাজে নিয়োজিত। শুরুতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতাম। পরে নিজেই ব্যবসা শুরু করি। তিনি বলেন, যত বেশি মাছ পাওয়া যায় তত বেশি লাভ হয়। তবে বাজার মূল্যের চেয়ে আমরা শুঁটকি বিক্রিতে মূল্য অনেক কম পাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিন বছর হলো সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছে। এতে আমাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আগে দস্যুরা আমাদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করত। ট্রলার-মাছ সবই কেড়ে নিত। এখন আমাদের মধ্যে সেই ভয় নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নদী এবং ডাঙা-এই দুই জায়গাতেই আমাদের সংসার। তবে এখানে কোনো মেয়েমানুষ নেই। আমরা ইচ্ছে করেই নারীদের আনি না। কারণ ঈশ্বর এখানে অনেক সম্পদ দিয়েছেন। আমরা এই সম্পদ আহরণ করি। নারীদের এখানে আনা হলে ঈশ্বর হয়তো আমাদের এই সম্পদ অর্জনের সুযোগ নাও দিতে পারেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে ডাকাত এবং দস্যুদের প্রতি মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হতো। এখন আর সেটা দিতে হয় না।

সরেজমিন দেখা যায়, জেলেপল্লির বাসিন্দাদের জন্য আলোরকোলে একটি মার্কেট রয়েছে। এর নাম নিউমার্কেট। এখানে রয়েছে শতাধিক দোকানপাট। চাল, ডাল, তেল, কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সবই পাওয়া যায় পাঁচ মাসের এই মার্কেটে। আছে গ্রাম্য ডাক্তার, সেলুন, ওয়ার্কশপ, লেদ, মোবাইল দোকান এবং মোবাইল সার্ভিসিংয়ে ব্যবস্থা। কেনাকাটা করা যায় কাপড়চোপড়ও। বিক্রি হয় সুন্দরবনের মধু। আছে অস্থায়ী মসজিদ-মন্দিরও। প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় হ্রাস মেলা। এই মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেন।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন