দখল-দূষণে মৃতপ্রায় বংশী নদী
jugantor
দখল-দূষণে মৃতপ্রায় বংশী নদী
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় ১৩৩ অবৈধ দখলদার * চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল

  মতিউর রহমান ভান্ডারী, সাভার  

২৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বংশী নদী

বংশী নদী রক্ষায় ২০১৯ সালের শেষের দিকে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিলেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বংশী নদীর দখল বন্ধ করতে এবং দখলদারদের চিহ্নিত করে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো পক্ষই যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে নদীটির উভয় পারের শত শত বিঘা জমি ধীরে ধীরে দখল হয়ে গেছে। আর দূষণে নদীর জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আদেশ পালন না করায় সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজিসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। তারা হলেন-পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাভার মডেল থানার ওসি। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন।

বংশী নদীর সীমানায় মাটি ভরাটের মাধ্যমে দখল প্রতিরোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন ‘বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ ঘোষণা করা হবে না- তা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় নদী কমিশন, স্থানীয় সরকার সচিব, ভূমিসচিব, বন ও পরিবেশ সচিব, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা জেলা প্রশাসক, সাভার ও আমিন বাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাভার থানার ওসিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

হাইকোর্টের আদেশ অবমাননার রুল জারি প্রসঙ্গে সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের কপি এখনও আমাদের হাতে আসেনি। আদেশের কপি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় নদী কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে জাতীয় নদী কমিশনের পক্ষ থেকে ১৩৩ জন দখলদারের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে-স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ছোট কারখানা ব্যবসায়ী, পোশাক তৈরি কারখানার মালিক ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু তখন তালিকাটি আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্ট অন্যসব কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের একার পক্ষে তেমন কিছুই করা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়-সাভার উপজেলার নয়ারহাট এলাকা থেকে শুরু করে আমিনবাজার পর্যন্ত বংশী নদীর উভয়পারে ১৫ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। নদীতীর দখল করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মিল-কারখানা, আড়ত, গুদাম, ইটভাটা ও পোশাক তৈরি কারখানা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ করার নামে নদী ভরাট করা হয়েছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের দখল করা অংশে দেখা যায়-প্রায় ৩ একর জমি দখল করে (প্রকল্পের আংশিক) বালু ভরাট করা হয়েছে। কিছু অংশে সীমানা দেওয়ালও নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ-এ প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে কমিটি করার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ না করে এ প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।

তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-মাটি ভরাট করা বাবদ ২০১৯ সালের এপ্রিল ও জুন পরপর চারটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। চারটি বিলে ৪৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ থেকে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ ব্যয় বহন করা হয়েছে। অথচ কাবিটা প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী টাকা শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা। কিন্তু তা মানা হয়নি। প্রকল্পের চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুর সাত্তার মিয়ার অ্যাকাউন্টে সব টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মাটি ভরাট কাজের পুরো বিল উত্তোলন করা হলেও মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের আংশিক অংশে কিছু বালু ফেলা হয়েছে মাত্র। কাজ না করে বিল উত্তোলন করা প্রসঙ্গে জানতে আলহাজ সাত্তার মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সরেজমিনে নয়ারহাট এলাকায় দেখা যায়, বংশী নদীর পাড় দখল করে একটি পূর্ণাঙ্গ মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। নদী দখল করে কয়েকশ বালুর ব্যবসা (গদি) স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা বাড়াতে দখলদাররা নদীর আরও খালি অংশ ভরাটের চেষ্টা করছেন। নয়ারহাটে দখল কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান।

সাভার নামাবাজার এলাকায় বংশী নদীর একাংশ ভরাট করে একটি ডালের মিল নির্মাণ করা হয়েছে। জানা গেছে, মিলটির মালিক বর্তমান সাভার পৌরসভার মেয়র হাজি আবদুল গনি। এছাড়া সাভার থানা সংলগ্ন নদীর পূর্বতীর দখল করে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে নদী দখল শুরু হয়েছে। চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নদীরপাড় দখল করে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। অভিযোগ- ‘দখলদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়ে সাভার ভূমি কার্যালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।

বংশী নদী দখল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান বলেন, অবৈধ দখলদারদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে, এখানে আমার একটি ছোট কার্যালয় আছে। প্রশাসন চাইলে সেটা যে কোনো সময় উচ্ছেদ করতে পারে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

সাভার থানা ঘাট থেকে নামাবাজার বাঁশপট্টি পর্যন্ত নদী ভরাট করে বড় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। বংশী নদীর ওপর নির্মিত সাভার-ধামরাই সেতুর দুই পাশ দখল করেছে প্রভাবশালীরা। নদীর পূর্ব-পশ্চিম দুই পাশের তীর ঘেঁষে ব্যবসায়ীরা নদী ভরাট করে বালুর ব্যবসা করছে। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সাভারের পরিবেশবাদী সংগঠনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দখলদার ও নদী দূষণকারী কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত আর্থিক সুবিধা নেন। এছাড়া সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একেএইচ বহুতল পোশাক কারখানা বংশী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারখানা মালিকের কাছ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময় মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এ কারণে তারা কারখানার ভবন নির্মাণে বাধা দেননি এবং উচ্ছেদ করেননি।

সরেজমিনে দেখা যায়, একেএইচ পোশাক কারখানাটির প্রায় অর্ধেক অংশ নদীর মধ্যে। কিন্তু কখনোই কারখানাটি উচ্ছেদে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। নদী দখল করে কারখানা নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তার সঙ্গে কথাবলা সম্ভব হয়নি।

আর্থিক সুবিধা নিয়ে একেএইচ পোশাক কারখানা নির্মাণে বাধা না দেওয়া প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফ উদ্দিন যুগান্তরকে মোবাইল ফোনে বলেন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। কেউ আমার নামে টাকা নিয়ে থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০১৭ সাল থেকে কেন কারখানাটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে সাভারের ‘নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন’ পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ জন দখলদারের নাম উল্লেখ করে প্রাথমিকভাবে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকারি দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে।

যাদের দখলে বংশী নদী: নয়ারহাট থেকে সাভারের নামাবাজার হয়ে ঢাকার তুরাগ নদের সঙ্গে মিশেছে বংশী নদী। বংশী নদী দখলদারদের তালিকায় রয়েছে- সাভার থানা মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিঃ, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, মেসার্স রাসেল ট্রেডার্স, সেলিনা ট্রেডাস, রিয়া এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জিৎ রাইস এজেন্সি, নন্দু বেপারী মার্কেট, ওয়ালটন শোরুম, পাথালিয়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়, পাথালিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কার্যালয়, টাঙ্গাইল সুইটস অ্যান্ড বেকারি, ডাউলের গোডাউন, মেসার্স ইফতিহা এন্টারপ্রাইজ, মেঘনা ট্রেডার্স, মেসার্স হালিম ট্রেডিং করপোরেশন, হাসানিন পোলট্রি, মায়ের দোয়া, নুর নাহার হার্ডওয়্যার, ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ, নাঈম স্টোর, লিমা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সেতু এন্টারপ্রাইজ, আহম্মেদ পোলট্রি, হিমেল স্টোর, মেসার্স নিঝুম পশু পুষ্টি ভান্ডার, মা ইলেকট্রনিক, আরাসো গ্লাস, নুরজাহান ট্রেডাস, আনিকা এন্টারপ্রাইজ, মেঘা ওয়েল, তানিয়া রেফ্রিজারেশন, সজল এন্টারপ্রাইজ, রয়েল ফার্নিচার, রাইনা ইলেকট্রনিক, মেসার্স সেতু এন্টার প্রাইজ, আরোজ গ্লাজ অ্যান্ড থাই, আশা মনি বিউ পার্লার, ফাহিমা চাউলের আড়ত, ফাহিম ইলেকট্রনিক, ফারজানা ফার্নিচার, জান্নাতুল ফার্নিচার, আলিফ ফার্নিচার, রিভার ভিউ পার্ক, আজাদ শিল্প বিল্ডার্স, প্রস্তাবিত মাসুদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জিসান নিট কম্পোজিট লিঃ, রাজ রিয়েল এস্টেট লিঃ, পদ্মা সিরামিকস, এ কে এইচ নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিঃ ইউনিট-৪, এ কে এইচ নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিঃ, লুনা এন্টারপ্রাইজ, স্কয়ার ল্যান্ড লিঃ, স্কয়ার ফার্মা লিঃ, রাজফুলবাড়িয়া মৎস্য আড়ত প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এ তালিকায় ৭৭ জনের নামও রয়েছে।

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় বংশী নদী

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় ১৩৩ অবৈধ দখলদার * চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল
 মতিউর রহমান ভান্ডারী, সাভার 
২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বংশী নদী
বংশী নদী

বংশী নদী রক্ষায় ২০১৯ সালের শেষের দিকে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিলেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বংশী নদীর দখল বন্ধ করতে এবং দখলদারদের চিহ্নিত করে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো পক্ষই যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে নদীটির উভয় পারের শত শত বিঘা জমি ধীরে ধীরে দখল হয়ে গেছে। আর দূষণে নদীর জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আদেশ পালন না করায় সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজিসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। তারা হলেন-পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাভার মডেল থানার ওসি। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন।

বংশী নদীর সীমানায় মাটি ভরাটের মাধ্যমে দখল প্রতিরোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন ‘বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ ঘোষণা করা হবে না- তা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় নদী কমিশন, স্থানীয় সরকার সচিব, ভূমিসচিব, বন ও পরিবেশ সচিব, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা জেলা প্রশাসক, সাভার ও আমিন বাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাভার থানার ওসিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

হাইকোর্টের আদেশ অবমাননার রুল জারি প্রসঙ্গে সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের কপি এখনও আমাদের হাতে আসেনি। আদেশের কপি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় নদী কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে জাতীয় নদী কমিশনের পক্ষ থেকে ১৩৩ জন দখলদারের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে-স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ছোট কারখানা ব্যবসায়ী, পোশাক তৈরি কারখানার মালিক ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু তখন তালিকাটি আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্ট অন্যসব কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের একার পক্ষে তেমন কিছুই করা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়-সাভার উপজেলার নয়ারহাট এলাকা থেকে শুরু করে আমিনবাজার পর্যন্ত বংশী নদীর উভয়পারে ১৫ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। নদীতীর দখল করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মিল-কারখানা, আড়ত, গুদাম, ইটভাটা ও পোশাক তৈরি কারখানা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ করার নামে নদী ভরাট করা হয়েছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের দখল করা অংশে দেখা যায়-প্রায় ৩ একর জমি দখল করে (প্রকল্পের আংশিক) বালু ভরাট করা হয়েছে। কিছু অংশে সীমানা দেওয়ালও নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ-এ প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে কমিটি করার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ না করে এ প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।

তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-মাটি ভরাট করা বাবদ ২০১৯ সালের এপ্রিল ও জুন পরপর চারটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। চারটি বিলে ৪৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ থেকে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ ব্যয় বহন করা হয়েছে। অথচ কাবিটা প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী টাকা শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা। কিন্তু তা মানা হয়নি। প্রকল্পের চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুর সাত্তার মিয়ার অ্যাকাউন্টে সব টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মাটি ভরাট কাজের পুরো বিল উত্তোলন করা হলেও মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের আংশিক অংশে কিছু বালু ফেলা হয়েছে মাত্র। কাজ না করে বিল উত্তোলন করা প্রসঙ্গে জানতে আলহাজ সাত্তার মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সরেজমিনে নয়ারহাট এলাকায় দেখা যায়, বংশী নদীর পাড় দখল করে একটি পূর্ণাঙ্গ মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। নদী দখল করে কয়েকশ বালুর ব্যবসা (গদি) স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা বাড়াতে দখলদাররা নদীর আরও খালি অংশ ভরাটের চেষ্টা করছেন। নয়ারহাটে দখল কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান।

সাভার নামাবাজার এলাকায় বংশী নদীর একাংশ ভরাট করে একটি ডালের মিল নির্মাণ করা হয়েছে। জানা গেছে, মিলটির মালিক বর্তমান সাভার পৌরসভার মেয়র হাজি আবদুল গনি। এছাড়া সাভার থানা সংলগ্ন নদীর পূর্বতীর দখল করে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে নদী দখল শুরু হয়েছে। চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নদীরপাড় দখল করে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। অভিযোগ- ‘দখলদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়ে সাভার ভূমি কার্যালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।

বংশী নদী দখল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান বলেন, অবৈধ দখলদারদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে, এখানে আমার একটি ছোট কার্যালয় আছে। প্রশাসন চাইলে সেটা যে কোনো সময় উচ্ছেদ করতে পারে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

সাভার থানা ঘাট থেকে নামাবাজার বাঁশপট্টি পর্যন্ত নদী ভরাট করে বড় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। বংশী নদীর ওপর নির্মিত সাভার-ধামরাই সেতুর দুই পাশ দখল করেছে প্রভাবশালীরা। নদীর পূর্ব-পশ্চিম দুই পাশের তীর ঘেঁষে ব্যবসায়ীরা নদী ভরাট করে বালুর ব্যবসা করছে। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সাভারের পরিবেশবাদী সংগঠনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দখলদার ও নদী দূষণকারী কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত আর্থিক সুবিধা নেন। এছাড়া সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একেএইচ বহুতল পোশাক কারখানা বংশী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারখানা মালিকের কাছ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময় মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এ কারণে তারা কারখানার ভবন নির্মাণে বাধা দেননি এবং উচ্ছেদ করেননি।

সরেজমিনে দেখা যায়, একেএইচ পোশাক কারখানাটির প্রায় অর্ধেক অংশ নদীর মধ্যে। কিন্তু কখনোই কারখানাটি উচ্ছেদে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। নদী দখল করে কারখানা নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তার সঙ্গে কথাবলা সম্ভব হয়নি।

আর্থিক সুবিধা নিয়ে একেএইচ পোশাক কারখানা নির্মাণে বাধা না দেওয়া প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফ উদ্দিন যুগান্তরকে মোবাইল ফোনে বলেন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। কেউ আমার নামে টাকা নিয়ে থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০১৭ সাল থেকে কেন কারখানাটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে সাভারের ‘নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন’ পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ জন দখলদারের নাম উল্লেখ করে প্রাথমিকভাবে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকারি দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে।

যাদের দখলে বংশী নদী: নয়ারহাট থেকে সাভারের নামাবাজার হয়ে ঢাকার তুরাগ নদের সঙ্গে মিশেছে বংশী নদী। বংশী নদী দখলদারদের তালিকায় রয়েছে- সাভার থানা মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিঃ, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, মেসার্স রাসেল ট্রেডার্স, সেলিনা ট্রেডাস, রিয়া এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জিৎ রাইস এজেন্সি, নন্দু বেপারী মার্কেট, ওয়ালটন শোরুম, পাথালিয়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়, পাথালিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কার্যালয়, টাঙ্গাইল সুইটস অ্যান্ড বেকারি, ডাউলের গোডাউন, মেসার্স ইফতিহা এন্টারপ্রাইজ, মেঘনা ট্রেডার্স, মেসার্স হালিম ট্রেডিং করপোরেশন, হাসানিন পোলট্রি, মায়ের দোয়া, নুর নাহার হার্ডওয়্যার, ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ, নাঈম স্টোর, লিমা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সেতু এন্টারপ্রাইজ, আহম্মেদ পোলট্রি, হিমেল স্টোর, মেসার্স নিঝুম পশু পুষ্টি ভান্ডার, মা ইলেকট্রনিক, আরাসো গ্লাস, নুরজাহান ট্রেডাস, আনিকা এন্টারপ্রাইজ, মেঘা ওয়েল, তানিয়া রেফ্রিজারেশন, সজল এন্টারপ্রাইজ, রয়েল ফার্নিচার, রাইনা ইলেকট্রনিক, মেসার্স সেতু এন্টার প্রাইজ, আরোজ গ্লাজ অ্যান্ড থাই, আশা মনি বিউ পার্লার, ফাহিমা চাউলের আড়ত, ফাহিম ইলেকট্রনিক, ফারজানা ফার্নিচার, জান্নাতুল ফার্নিচার, আলিফ ফার্নিচার, রিভার ভিউ পার্ক, আজাদ শিল্প বিল্ডার্স, প্রস্তাবিত মাসুদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জিসান নিট কম্পোজিট লিঃ, রাজ রিয়েল এস্টেট লিঃ, পদ্মা সিরামিকস, এ কে এইচ নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিঃ ইউনিট-৪, এ কে এইচ নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিঃ, লুনা এন্টারপ্রাইজ, স্কয়ার ল্যান্ড লিঃ, স্কয়ার ফার্মা লিঃ, রাজফুলবাড়িয়া মৎস্য আড়ত প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এ তালিকায় ৭৭ জনের নামও রয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন