ঘুষের ১৫ লাখ টাকা প্রস্তুত ছিল তবুও আত্মহত্যা
jugantor
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন দেবাশীস
ঘুষের ১৫ লাখ টাকা প্রস্তুত ছিল তবুও আত্মহত্যা

  যুগান্তর রিপোর্ট, বাকেরগঞ্জ  

১৬ মে ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

যে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি পড়াশোনা শেষ করেছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন দেবাশীস মণ্ডল। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) ২০০৯-২০১০ সেশনে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ১ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই তিনি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। বিলম্ব হওয়ায় মাঝখানে কিছুদিনের জন্য তিনি কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

সম্প্রতি পবিপ্রবির মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষের দিকে অদৃশ্য সুতার টানে সব আটকে যায়। চাকরি না হওয়ার কথা জানতে পেরে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এই মেধাবী তরুণ ১৪ মে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় চলছে।

দেবাশীস মণ্ডলের ছোটভাই আশিস কুমার বলেন, ভাই পরীক্ষা দিয়ে এসে বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ লাখ টাকা চান। বাকি ৫ লাখ তিনি নিজে দেবেন বলেও আমাদের জানান। আমরা ১০ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলাম, কিন্তু এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে গেল।

দেবাশীস মণ্ডল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার সঙ্গে টাকার দেনদরবার করেছিলেন- জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ভিসি হারুন স্যারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। পরে ভাই জানতে পারেন, কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজির চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। এ চাপ তিনি মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে আমার ধারণা।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পর নানা ধাপ পেরিয়ে ১২ মে তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। এর দুই দিন পর আত্মহত্যা করেন।

সূত্র বলছে, পবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২৪ এপ্রিল। এতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরি প্রার্থী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ দেন ৬ জন। এর মধ্যে দেবাশীস মণ্ডল সব যোগ্যতায় এগিয়ে ছিলেন। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছিল।

কথা হয় তার এক সহকর্মী ও একই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের শিক্ষক আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্যার তার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা দিয়ে কুষ্টিয়ায় এসে খুব চিন্তিত ছিলেন। ঘটনার দিন সকাল থেকে ফোনে কারও সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছিলেন। এ সময় তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। আমরা বারবার তাকে জিজ্ঞাস করেও কোনো উত্তর পাইনি। দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে তিনি অফিস ত্যাগ করে বাসায় ফেরেন। কিছুক্ষণ পর আমি ও অন্য আরেক রুমমেটও বাসায় যাই। গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেতর থেকে আটকানো। অনেক ধাক্কাধাক্কি করে কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা বাড়িওয়ালাকে খবর দিই। পাশের বাসার ৩য় তলার সানশেড থেকে উঁকি দিয়ে তাকে বসা দেখতে পেয়ে দরজা খুলতে অনুরোধ করি। তিনি খুলবেন বললেও আর খুলেননি। একপর্যায়ে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখি। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। কুষ্টিয়া সদর থানা সূত্র বলছে, দেবাশীস একটি চিরকুট রেখে যান, যেখানে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও তার বিছানার চাদর, মোবাইল ফোন ইত্যাদি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

দেবাশীষের বাবা পরিমল মণ্ডল জানান, চাকরি না দিয়ে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলল। টাকা ১০ লাখ তো ব্যাংকেই ছিল। আমার ছেলেটা ফার্স্ট ছিল বলে মেরে ফেলল, এই বলে তিনি কেঁদে ফেলেন। ওই সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। ময়নাতদন্তের পর তার লাশ নিজ বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় সৎকার করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় পবিপ্রবির বর্তমান ও সাবেক ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পবিপ্রবি প্রশাসনের প্রতি।

এ নিয়ে কথা হয় দেবাশীসের বন্ধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও পবিপ্রবির ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সায়মন ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ছেলেটি দীর্ঘদিন পবিপ্রবিতে বিভিন্ন গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রমে জড়িত ছিল। সবাই জানত তার চাকরি হবে, কিন্তু ভাইভা দিয়ে নিশ্চিত হতে না পেরে এ ঘটনা সে ঘটিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এ ছাড়াও এ নিয়োগে যোগ্যতম সবাইকে ভাইভা কার্ড না দিয়ে কেবল প্রথম ১০ জনকে দিয়ে প্রশাসন নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এ ছাড়া টাকা-পয়সার লেনদেন ও নানা অনিয়মের কথাও লোকমুখে শুনেছি। এ ঘটনায় ভিসি প্রফেসর ড. হারুনর রশিদ বলেন, আমি শুনেছি সে সুইসাইড করেছে। কিন্তু টাকা-পয়সার লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানিও না আর শুনিওনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন দেবাশীস

ঘুষের ১৫ লাখ টাকা প্রস্তুত ছিল তবুও আত্মহত্যা

 যুগান্তর রিপোর্ট, বাকেরগঞ্জ 
১৬ মে ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দেবাশীস মণ্ডল

যে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি পড়াশোনা শেষ করেছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন দেবাশীস মণ্ডল। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) ২০০৯-২০১০ সেশনে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ১ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই তিনি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। বিলম্ব হওয়ায় মাঝখানে কিছুদিনের জন্য তিনি কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

সম্প্রতি পবিপ্রবির মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষের দিকে অদৃশ্য সুতার টানে সব আটকে যায়। চাকরি না হওয়ার কথা জানতে পেরে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এই মেধাবী তরুণ ১৪ মে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় চলছে।

দেবাশীস মণ্ডলের ছোটভাই আশিস কুমার বলেন, ভাই পরীক্ষা দিয়ে এসে বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ লাখ টাকা চান। বাকি ৫ লাখ তিনি নিজে দেবেন বলেও আমাদের জানান। আমরা ১০ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলাম, কিন্তু এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে গেল।

দেবাশীস মণ্ডল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার সঙ্গে টাকার দেনদরবার করেছিলেন- জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ভিসি হারুন স্যারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। পরে ভাই জানতে পারেন, কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজির চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। এ চাপ তিনি মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে আমার ধারণা।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পর নানা ধাপ পেরিয়ে ১২ মে তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। এর দুই দিন পর আত্মহত্যা করেন।

সূত্র বলছে, পবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২৪ এপ্রিল। এতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরি প্রার্থী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ দেন ৬ জন। এর মধ্যে দেবাশীস মণ্ডল সব যোগ্যতায় এগিয়ে ছিলেন। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছিল।

কথা হয় তার এক সহকর্মী ও একই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের শিক্ষক আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্যার তার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা দিয়ে কুষ্টিয়ায় এসে খুব চিন্তিত ছিলেন। ঘটনার দিন সকাল থেকে ফোনে কারও সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছিলেন। এ সময় তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। আমরা বারবার তাকে জিজ্ঞাস করেও কোনো উত্তর পাইনি। দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে তিনি অফিস ত্যাগ করে বাসায় ফেরেন। কিছুক্ষণ পর আমি ও অন্য আরেক রুমমেটও বাসায় যাই। গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেতর থেকে আটকানো। অনেক ধাক্কাধাক্কি করে কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা বাড়িওয়ালাকে খবর দিই। পাশের বাসার ৩য় তলার সানশেড থেকে উঁকি দিয়ে তাকে বসা দেখতে পেয়ে দরজা খুলতে অনুরোধ করি। তিনি খুলবেন বললেও আর খুলেননি। একপর্যায়ে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখি। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। কুষ্টিয়া সদর থানা সূত্র বলছে, দেবাশীস একটি চিরকুট রেখে যান, যেখানে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও তার বিছানার চাদর, মোবাইল ফোন ইত্যাদি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

দেবাশীষের বাবা পরিমল মণ্ডল জানান, চাকরি না দিয়ে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলল। টাকা ১০ লাখ তো ব্যাংকেই ছিল। আমার ছেলেটা ফার্স্ট ছিল বলে মেরে ফেলল, এই বলে তিনি কেঁদে ফেলেন। ওই সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। ময়নাতদন্তের পর তার লাশ নিজ বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় সৎকার করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় পবিপ্রবির বর্তমান ও সাবেক ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পবিপ্রবি প্রশাসনের প্রতি।

এ নিয়ে কথা হয় দেবাশীসের বন্ধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও পবিপ্রবির ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সায়মন ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ছেলেটি দীর্ঘদিন পবিপ্রবিতে বিভিন্ন গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রমে জড়িত ছিল। সবাই জানত তার চাকরি হবে, কিন্তু ভাইভা দিয়ে নিশ্চিত হতে না পেরে এ ঘটনা সে ঘটিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এ ছাড়াও এ নিয়োগে যোগ্যতম সবাইকে ভাইভা কার্ড না দিয়ে কেবল প্রথম ১০ জনকে দিয়ে প্রশাসন নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এ ছাড়া টাকা-পয়সার লেনদেন ও নানা অনিয়মের কথাও লোকমুখে শুনেছি। এ ঘটনায় ভিসি প্রফেসর ড. হারুনর রশিদ বলেন, আমি শুনেছি সে সুইসাইড করেছে। কিন্তু টাকা-পয়সার লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানিও না আর শুনিওনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন