খুলনা সিটি নির্বাচন পর্যালোচনায় ইসি

‘অস্বাভাবিক ভোটের’ ঘটনায় তদন্তে যাচ্ছে না!

৩১টি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর জয় ভালো ভোটের লক্ষণ * স্থগিত তিন কেন্দ্রে পুনঃভোট ৩ মে, তদন্তে কমিটি গঠন

  কাজী জেবেল ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা সিটি নির্বাচন পর্যালোচনায় ইসি

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে বড় কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। আর বড় কোনো সহিংসতা ও সংঘাত ঘটেনি বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বৃহস্পতিবার বিকালে নির্বাচন কমিশনাররা এক বৈঠকে এমনই মতপ্রকাশ করেন। সেখানে কয়েকজন কমিশনার বলেন, এ নির্বাচনে ২৮৬টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৩১টিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বেশি ভোট পেয়েছেন।

পাশাপাশি দলটির (বিএনপি) সমর্থিত কয়েকজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া কয়েক কেন্দ্রে ৪০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। সবকিছুই ভালো ভোট গ্রহণের লক্ষণ বলেও বৈঠকে মন্তব্য করেন তারা।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বলা হয়, বিএনপি ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক কেন্দ্রে এজেন্ট দেয়নি, এর দায় দলটির। এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে নির্বাচনে তিনটি কেন্দ্রের একটিতে ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, আরেকটি ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ও অপরটিতে ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট পড়ার যে পরিসংখ্যান বেরিয়েছে সেটিও পুরোপুরি সঠিক নয় বলে মনে করছেন কোনো কোনো কমিশনার। তাই এসব কেন্দ্রে তদন্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মন্তব্য করেন তারা।

ভোট গ্রহণের অনিয়মের অভিযোগ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করতেই মূলত কমিশনের এ বৈঠকটি হয়। এতে নির্বাচন কমিশনাররা ভোট গ্রহণের বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখেন। এ সময় তারা ভোট গ্রহণের দিন মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করেন।

এ নির্বাচন নিয়ে বড় কোনো ব্যবস্থা নেয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন কমিশনাররা। তবে স্থগিত তিনটি ভোট কেন্দ্রের তদন্তে ইসির যুগ্মসচিব পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। এ তিনটি কেন্দ্রে আগামী ৩০ মে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা হবে বলে বৈঠক সূত্র জানায়।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, আমরা খুলনায় ভোট গ্রহণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। পত্রিকার খবরও পর্যালোচনা করেছি।

যেসব পত্রিকায় ৯৭ শতাংশ বা ৯৯ শতাংশ ভোট পড়ার খবর ছাপিয়েছে, সেগুলো টেকনিক্যাল কিছু বিষয় না বুঝে লিখেছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, যেই কেন্দ্রে ৯৯ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে সেখানে ২৪৭টি বাতিল ভোট রয়েছে।

এসব বাতিল ভোট দিলে ভোটের হার ৮৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো কোনো কেন্দ্রে জোর করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা অবশ্যই ঘটেছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। অপরদিকে ২৯টি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী বেশি পেয়েছে, সেখানেও কোনো কোনো কেন্দ্রে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর অর্থ কী দাঁড়ায়? তিনি আরও বলেন, অনেক কেন্দ্রে বিএনপি এজেন্ট দেয়নি। সব কেন্দ্রে এজেন্ট থাকলে ভিন্ন পরিস্থিতি হতো।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা নির্বাচনের সার্বিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করব। ইতিমধ্যে ভোট গ্রহণে কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকিগুলো চিহ্নিত করে আগামী নির্বাচনগুলোতে এসব দুর্বলতা দূর করতে পদক্ষেপ নেব।

তিনি বলেন, খবরে দেখেছি, দু’একটি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট যেতে পারেনি। কিন্তু বাকি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট ছিল না। এটাও নির্বাচনের দুর্বলতা। কিন্তু এ দুর্বলতা সারানোর ক্ষমতা ইসির নেই।

জানা গেছে, খুলনা সিটির ভোট গ্রহণ নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদার কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন অপর চার কমিশনার। দীর্ঘ এক ঘণ্টার বেশি বৈঠকে নির্বাচনের ফলাফল শিট, গণমাধ্যমের সংবাদসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

ওই বৈঠকের একাধিক সূত্র জানায়, খুলনা সিটি নির্বাচনে খালিশপুরের নয়াবাঢী হাজী শরীয়ত উল্লাহ (বিদ্যাপীঠ) ভোট কেন্দ্রে ১ হাজার ৮১৭টি ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ৮১৬টি ভোট পড়েছে।

এ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একই এলাকার মওলানা ভাসানী বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে ১ হাজার ৫০৩ ভোটের মধ্যে ১ হাজার ৪৬৭ ভোট পড়েছে, যা মোট ভোটারের ৯৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

নগরীর নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কেন্দ্রে ১ হাজার ৫০৮টি ভোটের মধ্যে ১ হাজার ৩৭৮টি ভোট পড়েছে। এছাড়া ৯টি ভোট কেন্দ্রে ৮০ শতাংশের ওপর ভোট পড়েছে। অপরদিকে এ নির্বাচনে সবচেয়ে কম ২২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে খালিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৬৩টি ভোটের মধ্যে ৩৫৪টি পড়েছে।

এর মধ্যে খালেক ২৪৮টি ও মঞ্জু ৮৫টি ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বনিু ৩৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ভোট পড়েছে গোয়ালখালী সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে। এ কেন্দ্রে ২ হাজার ১টি ভোটের মধ্যে ৬৮৪টি ভোট পড়েছে। এতে আ’লীগ ৩৩৩টি ও বিএনপি ১৬৪টি ভোট পেয়েছেন। বৈঠকে এসব পরিসংখ্যান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

ইসি মনে করছে, সব ভোট কেন্দ্রে জাল ভোট বা ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেনি। এ কারণেই একটি কেন্দ্রে ২২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও আরেকটি কেন্দ্রে ৩৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ভোট পড়ত না। সার্বিকভাবে ভোট পড়ার হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে অনেক বেশি হতো।

এসব বিবেচনায় খুলনার ভোট গ্রহণের বিষয়ে বড় কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও মনে করেন কমিশনারদের অনেকেই। এ কারণে খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই বলেও ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার রিটার্নিং কর্মকর্তাকে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে ঘোষণা দেয়ার জন্য কমিশন থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত গত ১৫ মে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর চেয়ে ৬৫ হাজার ৬০০ ভোট বেশি পেয়েছেন খালেক। আর মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ২৫১ ভোট।

এ নির্বাচনে মোট ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ ভোটের মধ্যে ৩ লাখ ৭১ হাজার ভোট পড়েছে। এর মধ্যে ভোট বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৫৬৫টি ও বৈধ ভোট ৩ লাখ ৬ হাজার ৬৩৬টি।

স্থগিত তিন কেন্দ্রে ভোট ৩০ মে, তদন্ত কমিটি গঠন : কেন্দ্রে দখল করে জাল ভোট দেয়ায় তিনটি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। ওই কেন্দ্রগুলো হচ্ছে- ইকবাল নগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (একাডেমিক ভবন-১), লবনচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়।

এ তিনটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিতের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইসির যুগ্মসচিব খন্দকার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- ইসির উপসচিব মো. ফরহাদ হোসেন ও সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শাহ আলম।

কমিটির সদস্যরা আগামী মঙ্গল ও বুধবার তদন্তে খুলনা যাবেন। এছাড়া এ তিনটি কেন্দ্রে আগামী ৩০ মে ভোট হবে। এ তিনটি কেন্দ্রে একজন সাধারণ কাউন্সিলর ও দু’জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×